
ছবি-সংগ্রহ: ফেসবুক থেকে
"শুনলাম শেখ কামাল সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র এবং আবাহনী নামে ধানমণ্ডিতে একটি ক্লাব গঠন করেছে। একদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে ঢুকছি। আমতলায় যে আমগাছটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিরা কেটে ফেলেছিল, পরে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন, তখন আমরা তাঁকে দিয়ে একটি বটগাছ রোপণ করাই।
সেই আমতলার সেই মঞ্চটিতে একদল ছেলে গান গাইছিল। গানটি হচ্ছে, ‘এমন একটা মা দে-না, যে মায়ের সন্তানেরা...’
ওই দলে ফেরদৌস ওয়াহিদ, শেখ কামাল এবং আমার মনে হয় ফিরোজ সাঁইও ছিলেন। শেখ কামালকে জানতাম, তার খেলার প্রতি ঝোঁক ছিল। কিন্তু দেখলাম সংগীতেও তার নেশা।
এরই মধ্যে একদিন রব, মাখন ও কামাল আমার কাছে হাজির। আমাকে বলল, ভারতের কলকাতায় গড়ের মাঠে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী মেলা হচ্ছে। ডাকসু থেকে একটি নাট্যদল আমরা ভারতে নিয়ে যেতে চাই। সেখানে আমরা নাটক করব। আপনি আমাদের একটা নাটক সিলেক্ট করে দেন। আমরা জানি আপনি ভালো নাটক করতেন। স্যার, এই সফরে আপনি আমাদের নাটকটি পরিচালনা করবেন।
আমার মনে হলো, ১৯৫৭ সালে আমি প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি। বার্নার্ড শর ‘ইউ নেভার ক্যান টেল’ নাটক, মুনীর চৌধুরী কর্তৃক অনূদিত ‘কেউ কিচ্ছু বলতে পারে না’। ১৯৫৭ সালে শিক্ষক হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উৎসবে নাটকটি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাদের এই নাটকটির কথা বললাম। কামাল এই নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছিল। অবশ্য এর আগে নাটকটি কার্জন হলে বেশ কয়েকবার মঞ্চায়ন করি। কলকাতার সফর সামনে রেখে রিহার্সাল শুরু হয়। টিএসসিতে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত মাসখানেক নিয়মিত রিহার্সাল থাকত। নাটকটিতে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিল জাহানারা ইমামের বোন তাহমিদা সায়িদা। সে বাংলার ছাত্রী ছিল।
আমরা সদলবলে পৌঁছলাম ভারতে। প্রফেসর মনিরুজ্জামান ও সংগীতশিল্পী আবদুল লতিফও আমাদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। কলকাতায় শ্রী অন্নদাশঙ্কর রায় আমাদের অভ্যর্থনা জানান। সেখানে গড়ের মাঠে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী মেলায় সফলতার সঙ্গে পর পর কয়েকবার নাটকটি মঞ্চায়ন করি। আমাদের এই নাটক দেখতে এসেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ি সান্যাল, কবি বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকে। অন্নদাশঙ্কর বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মেলাটির আয়োজন করা হয়। বালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
কলকাতায় আগে থেকেই কামালের একটা পরিচিতি ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কলকাতায়ই ছিল। বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক আমাদের নাটক দেখতে আসেন। আমাদের মঞ্চাভিনয়টি উপভোগ করে কলকাতার লোকজন বেশ সুনাম করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষ এত সুন্দর করে অভিনয় করতে পারে, সেটা তাদের জানা ছিল না।
শেখ কামাল একদিন আমাকে বলল, ‘স্যার, আপনি তো শপিং করলেন না।’ আমি বললাম, আমি তো কলকাতা চিনি না। সে বলল, ‘স্যার, বলেন কী কী লাগবে?’ আমি বললাম, তোমার ভাবি আমাকে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি তো জানি না কোথায় হারমোনিয়াম পাওয়া যায়। আবার আমার বাসা তো এয়ারপোর্ট থেকে অনেক দূরে। কিভাবে বহন করব? সে বলল, ‘স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনার বাজেট কত?’ আমি বললাম, এক হাজার টাকা। এই টাকায় কি ভালো হারমোনিয়াম পাওয়া যাবে? সে বলল, ‘দেন-না স্যার।’ এরপর বলল, ‘আমি তো চিনি না। লতিফ ভাই, আপনি চলেন।’ কিছুক্ষণ পর দেখি একটা হারমোনিয়াম নিয়ে কামাল হাজির।
বেশ ভালো একটা হারমোনিয়াম। ‘ডয়ার পিন’ নামে কলকাতার একটা ব্র্যান্ডের হারমোনিয়াম। ঢাকায় পৌঁছে নিজের মাথায় করে চারতলার সিঁড়ি বেয়ে হারমোনিয়ামটি আমার বাসায় পৌঁছে দেয় কামাল। আমার স্ত্রী অনেক খুশি হয়েছিলেন। সেই হারমোনিয়ামটি এখনো আমাদের বাসায় আছে। সেটা কামালের স্মৃতি বহন করছে।"
শেখ কামালের স্মৃতিচারণ:
লেখক : রফিকুল ইসলাম
জাতীয় অধ্যাপক
ছবি : বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালI
ছবি-সংগ্রহ ফেসবুক থেকে
লেখার শিরোনাম: ব্লগার কর্তৃক প্রদত্ত
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১১:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



