somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশ ব্যাংকে সিনিয়রদের ডিঙ্গিয়ে পদোন্নতি পেলেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা

১৮ ই ডিসেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি পেলেন দুর্নীতির দায়ে আট বছর সাসপেন্ডে থাকা এবং একাধীক বার স্টান্ড রিলিজ হওয়া মহাব্যবস্থাপক ম. মাহফুজুর রহমান। তিনি এন্টি মানি লন্ডারিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে প্রায় দুই ডজন দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সদ্যবিদায়ী এন্টি মানি লন্ডারিং বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেমও তার বিরুদ্ধে তিন পৃষ্ঠার একটি অভিযোগপত্র গভর্নরের নিকট জমা দিয়ে গেছেন। এদিকে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গির আলমকেও নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এ পদোন্নতির বিষয়েও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বদলি নীতিমালা অনুযায়ী ২৪ মাসের আগে বদলি হবার নিয়ম না থাকলেও ১৪ মাসেই সিলেট থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় তাকে। গতকাল ওই দুই মহাব্যবস্থাপককে নির্বাহী পরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিনিয়র তিন মহাব্যবস্থাপককে ডিঙ্গিয়ে ওই দুজনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। সিনিয়র তিন কর্মকর্তা হলেন খুলনা অফিসের মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সাত্তার, বরিশাল অফিসের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম ফজলুর রহমান এবং সেন্ট্রাল ব্যাংক স্ট্রেনদেনিং প্রোজেক্ট সেলের মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল হক।
ম. মাহফুজুর রহমান ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। যোগদানের পর থেকেই তিনি নানা রকম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পরেন। এসব দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তার চাকুরি চলে যায়। দীর্ঘ ৮ বছর সাসপেন্ড অবস্থায় থাকার পর বিভিন্ন লবিংয়ের মাধ্যমে তিনি আবার চাকুরিতে যোগ দেন। এর পরও তিনি অনেক দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে একবার তিনি স্টান্ড রিলিজ হন।
মাহফুজুর রহমানের নানা দুর্নীতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে একটি চিঠি ইস্যু করা হয় ২০০২ সালের ১০ অক্টোবর। এই সময়ে তিনি খুলনা শাখার উপ-মহাব্যবস্থাপক হিসিবে কর্মরত ছিলেন। চিঠিটি ইস্যু করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অফিসার লুৎফর রহমান। এই চিঠিটি বর্তমানে মাহফুজুর রহমানের ব্যক্তিগত গোপনীয় প্রতিবেদনের ৫৪০ এবং ৫৪১ পৃষ্ঠায় রেকর্ড আছে। চিঠিটির পাঠানো হয়েছে খুলনার দুর্নীতি দমন ব্যুরোর বাংলাদেশ ব্যাংক শাখার পরিদর্শকের কাছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মাহফুজুর রহমান ১৯৮১ সালে এ ডি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করেন। তখন তিনি অগ্রণী ব্যাংকের অফিসার ছিলেন। এ তথ্য গোপন করে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগদান করেন এবং একই সঙ্গে কয়েক মাস উভয় ব্যাংক থেকে বেতন নেন।
১৯৯২ সালে অবৈধভাবে এনসিএল থেকে লাখ লাখ টাকা নিজ নামে ও তার মালিকানাধীন অফসেট প্রেসের নামে ঋণ গ্রহণ করেন। শেয়ার মার্কেটের কনসালটেন্ট এস সি এল নামক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হন। এইভাবে বেআইনিভাবে ঋণ গ্রহণ ও খেলাপি হবার ফলে চাকুরিচ্যুত হন। এখনও এনসিসি ব্যাংকে তার নামে লাখ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ আছে যা মামলাধীন আছে।
২০০০ সালে সাবেক সরকারের স্পিকার আ. হামিদের তদবিরে সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিনকে খুশি করে চাকরিতে পুনঃনিয়োগ পান এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে তদবিরে পোস্টিং নিয়ে বহু দুর্নীতির আশ্রয় নেন। বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়ে আবার বহু ব্যবসা খোলেন। এই ঘটনা জানাজানি হলে ওই বিভাগ থেকে তাকে রংপুর বদলি করে স্টান্ড রিলিজ করা হয়।
রিলিজ হবার পূর্বেই তিনি বহু ব্যবসার মালিক হন। বর্তমানে তিনি মধুমিতা সিনেমা হলের দোতলায় অবস্থিত শেয়ার বাজারের কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান এসসিএল, কিশোরগঞ্জে একটি কোল্ড স্টোরেজ, হাসপাতাল (কিনিক) ও একটি ঔষধ তৈরী ফ্যাক্টরির মালিক। স্ত্রীর নাম দেখিয়ে তিনি নিজেই সাইন করে এসব চালাচ্ছেন বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০১ সালে খুলনায় বদলি হয়ে তদবিরের জোড়ে ভুয়া একটি কাজের অসিলা দেখিয়ে ঢাকায় ডেপুটেশনে আসেন। এই সুযোগে তিনি তার শেয়ার ব্যবসার কাজ করেছেন ও প্রেসের ব্যবসা চালাচ্ছেন বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন ১৯৮১ সালে। দীর্ঘ ২১ বছর পর (এসএসসি পাশের ৩১ বছর পর) তিনি তার জন্ম তারিখ জালিয়াতি করে ব্যাংকের নিকট আবেদন পাঠিয়েছেন। সব জায়গায় জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৫৬ ছিল। তিনি টাকার বিনিময়ে সেটা ১ নভেম্বর ১৯৫৬ করতে চাচ্ছেন। এই সুবিধা পেলে তিনি বিপুল অঙ্কের টাকা রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পাবেন। এটা নৈতিকতা ও ব্যাংকিং আইনের পরিপন্থি কাজ যা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘ ৩১ বছর পর তার জন্ম তারিখ সংশোধনের কি রহস্য তা তদন্ত করে দেখা দরকার। টাকা দিয়ে চাকরির আবেদন পত্রে তার জন্ম তারিখ ইতোমধ্যে ঠিক করেছেন। তবে সব রেকর্ড কাটাতে পারেন নি। একজনকে বড় অঙ্কে ঘুষ দিয়ে একটি ডুপ্লিকেট সনদ সংগ্রহ করেছেন। অন্য সব রেকর্ড আগের মতোই আছে। অগ্রণী ব্যাংকের চাকরিতে ১ জানুয়ারি ১৯৫৬ আছে। তার এইচ এস সি পরীক্ষার (১৯৭৩) সার্টিফিকেটও জাল হয়েছে বলে জানা গেছে যা ঢাকা বোর্ডে যাচাই করা দরকার।
চিঠিতে বলা হয়েছে, মাহফুজ খুলনা শাখার প্রশাসনে পোস্টিং নেয়ার পর ক্ষমতার জোরে ঢাকার মিরপুরে ৪ বছর আগে নির্মিত বাড়ির একটি ফাটের নামে এককালীন ২৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা গৃহনির্মাণ ঋণ নেন যা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ ওই পুরো বাড়িটিই এইচবিএফসিতে মর্টগেজ করা। তিনি আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা শাখা থেকে অনিয়মিতভাবে ঋণ নিয়েছেন। তবে এটার মর্টগেজ করান নাই। কারণ একই ফাট দুই অফিসে মর্টগেজ দেয়া সম্ভব নয়। মর্টগেজ না থাকায় বর্তমানে তাকে দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ২৭ লাখ টাকা অরক্ষিত (জামানতবিহীন) অবস্থায় আছে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।
এদিকে ২০০৩ সালের ১০ মার্চ মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার দুর্নীতির অভিযোগ সম্বলিত একটি চিঠি তৎকালিন গভর্নরের কাছে পাঠিয়েছিল দুর্নীতি দমন ব্যুরোর ব্যাংক শাখা। এই চিঠিটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন বিভাগের ৪৩৯ নম্বর ডায়রি হিসেবে নথিভুক্ত আছে। আর মাহফুজুর রহমানের ব্যক্তিগত রেকর্ডের ৫৩৯ নম্বর পৃষ্ঠা হিসেবে নথিভুক্ত আছে। চিঠিটি গ্রহণ করেছিলেন তখনকার ডেপুটি গভর্নর-২ নজরুল হুদা। এই চিঠিতেও উপরের অভিযোগগুলো উল্লেখ ছিল।
গতবছরের জুনে বদলি করে সিলেট পাঠানো হয় মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গির আলকমে। গত আগস্ট মাসে তাকে ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। তাকে বিআরপি বিভাগের মহাব্যাবস্থাপক করা হয়। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের বদলি নীতি অনুযায়ী ২০১১ সালের জুনের পূর্বে তিনি বদলি হতে পারেন না। কারণ এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, কোন কর্মকর্তা এক অফিসে ২৪ মাস সক্রিয়ভাবে চাকরি না করা পর্যন্ত বদলি হতে পারবেন না। ###
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৪৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পিটিভির আর্কাইভে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ দেখা

লিখেছেন অর্ক, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:২৫



‘খুব ভালো জঙ্গ চলছে। একের পর এক নাপাক হিন্দু সেনা হালাক (মৃত্যু) হচ্ছে। রাজাকার আলবদরদের নিয়ে পাকিস্তানের বীর সেনা যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। দুয়েক দিনের মধ্যেই হিন্দুস্থান হাঁটু গেড়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপরোধের আগে

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



একটা ক্ষণ,
ক্ষীণ, তবুও অবয়,
আমাকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবে সবুজ অটবীর আলেখ্যে,
তুমি এলে,
সেই পুরোনো মায়া হয়ে।

কতকাল পরে সম্মুক্ষে দু জোড়া চোখ?
সে প্রশ্নের প্লাবনে আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি আধুনিক যুগের জন্য প্রস্তুত।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৩

২০০৯ সাল থেকে সম্ভবত সকল সরকারি কর্মচারীদের ব্যাংকে বেতন হয়। এবং এই বেতন দেওয়ার পক্রিয়া ১০০% কম্পিউটার বেইস। সরকারি কর্মচারীদের বেতন সিজিএ অফিস হ্যান্ডেল করে। আর সম্ভবত আইবিবিএএস+ সার্ভার বেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫৫ বছরে কেন আরেকটা রিফাইনারি হলো না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৪


রাশিয়া থেকে তেল আনতে হলে আমেরিকার অনুমতি লাগবে। এই একটা বাক্য পড়লে অনেকে ভাববেন এটা কোনো রাজনৈতিক ভাষণের অংশ, কিংবা অতিরঞ্জন। কিন্তু এটা ২০২৬ সালের বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লেগেছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা সত্যিই পথ হারিয়েছি!

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২০ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:১৭

আমরা সত্যিই পথ হারিয়েছি!
--------------------------------
আমরা যেন এক দূর্ভাগা জাতি দক্ষতা, জ্ঞান আর উন্নতির জন্য যেখানে আমাদের লড়াই করার কথা, সেখানে আমরা বারবার জড়িয়ে পড়ছি সস্তা রাজনীতির ফাঁদে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ আবারও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×