somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঠালো তরলের উপাখ্যান

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১২ ভোর ৪:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার লেখাটি পড়ে আপনি জানতে পারবেন না, বিশ্বায়নের এই মহান যুগে দেশপ্রেম ভৌগলিক সীমারেখার মাঝে চিন্তা ভাবনায় আটকে পড়া কিছু মানুষের অহেতুক চিল্লা পাল্লা কিনা। আপনি জানতে পারবেন না বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনে আমাদের জাতীয় জীবনে আচমকা ঘাই মেরে মিলিয়ে যাওয়া দেশপ্রেমের আপেক্ষিক গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে । তবে আপনি জানতে পারবেন পনের ষোল বছরের এক কিশোর আর খানিকটা আঠালো তরলের উপাখ্যান।

.................................



কাঁচা বাজার জায়গাটাকে আমি হয়তো ততটা অপছন্দ করতাম না, কিন্তু এর মুরগীরঅংশ টাকে মন থেকে পছন্দ করা আসলেই খানিকটা কঠিন। নিজেদের বিষ্ঠার উপর চাপাচাপি করে দাঁড়িয়ে থাকা একদল নিরীহ সদানন্দ জীব কেবল মৃত্যুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে- মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলে কোন মুরগীর চোখে চোখ রাখা তো দূরের ব্যাপার , নিজের চোখের পানি ধরে রাখাই মুশকিল। অবশ্য এখন অব্দি ঐ পরিমাণ মানবিক(কিম্বা মুরগিক) হয়ে উঠতে না পারার ব্যর্থতায় প্রায়ঃশই তাদের বিষ্ঠার দুর্গন্ধ আমার নাকে বড় হয়ে ওঠে।



নিতান্তই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের একজন হওয়ায় আমাকে নিয়ম করে অপছন্দের কাজ গুলো যত্ন সহকারে করতে হয়। যেমন কালকেই সন্ধ্যায় আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম গোপীবাগ রেলগেটের কাঁচাবাজারে, গোটা দশেক ফার্মের মুরগীর খাঁচার সামনে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় । তো দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ খেয়াল হল দোকানদারের হেল্পার ছোকরাটা, বয়স পনের ষোলর বেশি হবে না, তেল দিয়ে পাট করে আঁচড়ানো চুল, সস্তা জ্যাকেট গায়ে, খুবই নোংরা একটা কাজ করছে। সে দুটা ইটের উপর কন্ডেন্স মিল্ক এর কৌটা রেখে তার নিচে কাগজ পুরিয়ে সেই জিনিশ গরম করার চেষ্টা করছে। নাড়ানি হিসেবে যেটা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই চিকন মাথা ছুরিটা একটু পর পর নেয়া হচ্ছে মুরগীর বিষ্ঠা জমে থাকা মেঝের উপর থেকে। স্পষ্টতই এই কন্ডেন্স মিল্ক এর চা আমি নিজে থেকে কখনও আগ বাড়িয়ে খেতে চাইতাম না।



খেয়াল করলাম কাগজের ধোয়ায় আমি একা না, আশে পাশের দোকানদারেরাও পর্যাপ্ত পরিমাণে বিরক্ত হচ্ছে। আঠালো তরলের ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে নিতান্ত ঠ্যাঁটার মতো মুখ গুঁজে বসে থাকে। এক দুই ঘা সেই বেত্তমিজ এর পাওনা হয়েছে কি হয় নাই, এরকম মুখরোচক আলোচনায় জল ঢালতে তার কয়েক বন্ধু এসে উপস্থিত হয়। উদ্ধার হয় কন্ডেন্স মিল্ক এর মতো দেখতে আঠালো তরলের ‘পানি মেশানো আটা’ পরিচয়। যা কিনা আঠা হিসেবে ব্যবহারের অপেক্ষায় কন্ডেন্স মিল্ক এর কৌটায় ততক্ষনে ঢেউ তুলেছে।

‘আঠা, আঠা দিয়ে আবার কি হবে?’

- ছেলে গুলার পকেট থেকে বেশ কয়েক বান্ডিল কাগজের জাতীয় পতাকা বের হয়। আশে পাশের প্রৌঢ় এবং জ্ঞানী দোকানদারদের উচ্চকিত হাসি শোনা যায়।



আঠালো সেই তরলের মতো জিনিশটা আসলে খানিকটা বিশুদ্ধ দেশ প্রেম কিনা, আসুন সেইসব উচ্চ মার্গের বিতর্কে আমরা না যাই। শুধু মনে রাখি, সারাদিন নোংরা ঘেঁটে, রাতের বেলায় আরশোলাদের পাশে শুয়ে যে কিশোর বড় হচ্ছে, এই দেশটা তারও।

হয়ত সেই দিন কখনো আসবে না, কিন্তু যদি এমন হয়, সেই কিশোর খুব বড় একটা জায়গায় পৌঁছালো, সে না হলেও তার মতো কেউ, আমার মনে হয় তারা আজকের মন্ত্রী, আমলা, শিল্পপতিদের মতো দেশের সাথে গাদ্দারি করবে না, নিজের প্রয়োজনে দেশকে বলাৎকার করবে না। দেশ প্রেমের মতো এক আঠালো তরল যার হৃদয়ে আছে সে কি পারে নিজেকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভাবতে?



বিজয় দিবসের বিকেলে ঘুরতে বের হয়ে আমার আড়াই আর সারে ছয় বছর বয়স এর ভাগিনা দ্বয় তাদের গালে জাতীয় পতাকা একে বাসায় ফিরেছে। তারা আলাদা আলাদা ভাবে দাবি করল, তাদের গালে আঁকা জিনিসটা হল বাংলাদেশ। আমাকে তাদের বাংলাদেশে চুমু খেয়ে দিতে হল- আমার আচমকা মনে হল এই বাংলাদেশের ভেতরে এই সব নতুন মানুষদের দিয়ে নতুন আরেকটা বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে । সেই বাংলাদেশ খুব ,খুব আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে বুকের ভেতর আঠালো তরল সমৃদ্ধ মানুষদের। যাদের হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে সে একদিন স্বপ্নের কোমল উদ্যান থেকে বেরিয়ে এসে পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেবে।



সবাইকে বাসি বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ৯:৫৫
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×