somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পুতুলের বিয়ে

০৫ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৮:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শিশুকালে ছেলেদের খেলার বস্তু
গাড়ি আর বল, মেয়েদের খেলার বস্তু পুতুল
। প্লাস্টিকের রংবেরং দেখতে, মাটির
গড়া ঢিমসে পুতুল,
চাবি দেওয়া নাচা গাওয়া পুতুল
কিংবা বাহারী কাপড়ের
হাতে বানানো মমতা মাখা পুতুল ।
কাপড়ের এই হাতে বানানো পুতুল
ছাড়া অন্য পুতুলকে আমার পুতুলই মনে হয়
না ।

আমি ছেলে, তবে আমার গাড়ী কিংবা বল
কোনটাই ছিল না । অভাবের সংসারে ওসব
বিলাসিতার আবদার করাই
যে বিবেকহীনতা তা ওই ছয় সাত বছরেই
বুঝে গিয়েছিলাম । বুঝতে পারার কারণ
আছে । বাবা আমাদের
চিনতে শিখিয়েছিলেন অভাব আসলে কী !
সোহান- শাকিলকে দেখতাম ঘর
থেকে টাকা চুরি করত । গ্রামের
উঠতি বয়সী ছেলেদের ওই সময়কার
রেওয়াজই ছিল বাড়ি হতে কিছু
একটা চুরি করে ঢাকায় চলে আসা ।
এটা করলেই ধরে নেওয়া হত যে,
"ছেলে এখন বড়ো হয়েছে" । কেউ
দুয়েকমাস ঢাকায় থেকে চলে যেত, কেউ
বা টিকে যেত এই শহরে ।

আমি মনে মনে ওসব ছেলেদের
ঘৃণা করেছি । পিতার কষ্টের
টাকা যে এভাবে উড়িয়ে দেয় তার
মতো অকৃতজ্ঞকে ঘৃণা করা ছাড়া আর
কিছু ভাবতে পারিনি তখন । পকেট
থেকে নেওয়া তো দূরের কথা, কখনও
বাবার কাছে চাইওনি একটি টাকা ।
কারণ, আমি জানতাম এই
টাকা কতটা কষ্টের । আমার বিচক্ষণ
বাবা আমাকে একদিন
সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর
কর্মক্ষেত্রে, যাতে ছেলে দেখতে পায়
কতটা কষ্ট করে বাবা তাদের জন্য
উপার্জন করে আনেন !

সবক কাজে দিয়েছিল । তখন
মিষ্টি সিঙ্গারা বাজারে এসেছিল ।
একটা ৩ টাকা করে । এক
পুলিশকে খেতে দেখে খুব ইচ্ছে হয়েছিল
যদি আমিও খেতে পেতাম ! কিন্তু
ঘরে কখনও মুখ ফুটে বলা হয়নি সে কথা ।
একবার খুব শখ হয়েছিল একটা টেনিস
বলের । মা'কে মিনমিন করে বললাম,
একটা বল কিনে দিতে । পরদিন বাবা ১
টাকা দামের একটি প্লাস্টিকের বল
এনে দিয়েছিলেন, সে বল ড্রপ
করলে টেনিস বলের মতো কখনও
ছিটকে ওঠে না ! প্রায়ই
ফুটো হয়ে চুপসে যায় । লজ্জায় সে বল আর
কাউকে দেখাইনি ।
মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম, টেনিস বল
কেনার দরকার কী, বাবার কত কষ্টের
টাকা !

যাহোক, অন্যের বল দিয়ে খেলার মানুষ
আমি ছিলাম না । ঘরকুনোও ছিলাম না ।
গোল্লাছুট, দাঁড়িয়া বান্ধা, হা ডু ডু'র
মতো উপকরণবিহীন খেলা, এবং সব রকমের
দুরন্তপনায় আমি ছিলাম সবার আগে ।

এসবের অবসরে আমার শিশুসুলভ আপন
একটা জগত ছিল । সে জগত বড়ো রঙিন আর
একান্ত । অন্যের প্রবেশ সেখানে ছিল
না । মেয়েদের মতো পুতুল
বানিয়ে সেখানে খেলতাম একা একা ।
অন্য ছেলেরা দেখলে যে পরিহাস
করবে সেটা বুঝেই কাউকে জানাতাম না ।

একটি মেয়েকে খুব পছন্দ হত তখন । নাম
বলব না । সেই মেয়েটাকে চুপি চুপি পুতুল
উপহার দিতাম । মেয়েটার শখই
হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে পুতুলের
বায়না করা । সেই পুতুলেরই বিয়ের
কথা বলছি ।

বিয়ে ঠিক হল ও পাড়ার শ্রাবণীর
মেয়ে পুতুলের সাথে ।

আমরা ছেলে পক্ষ, ওরা মেয়ে পক্ষ ।
প্রস্তাব এসেছিলই আমার মারফত ।
আমি ছিলাম ঘটক । দিন তারিখ ঠিক
করে উভয় পক্ষের দেখাদেখি হল ।
চা বিস্কুট হল ।
আমরা মেয়ে পুতুলকে শাড়ি দিয়েছিলাম,
মনে আছে । গহণা কী ছিল তা আর
মনে নেই ।

বিয়েটা হয়েছিল ডিসেম্বরে ।
ছেলেপুলেদের এই আয়োজনে বুড়োরাও
মেতেছিলেন । বাড়ির
সামনে কলা গাছের গেইট করা হয়েছিল ।
উঠানে চেয়ার টেবিল পেতে সাধারণ
বিয়ের মতোই আয়োজন করা হয়েছিল ।
তবে দাওয়াতী ছিল কেবলই বাচ্চারা ।
বুড়োরা কেউ সে অনুষ্ঠানে খাননি ।

সাধারণ হিসেবের তুলনায় এ বিয়ের
হিসেবটা একটু ব্যতিক্রম ছিল । কনে পক্ষ
আগে ও পাড়া থেকে এসে খেয়ে যাবে,
তারপর যাব আমরা বর পক্ষরা ।
গিয়ে একবারে খেয়েদেয়ে বৌ নিয়ে ফিরব
। এই ছিল পদ্ধতি ।

আমরা বৌ আনতে গিয়ে নাখোশ হলাম ।
আপ্যায়ন অত ভালো হয়নি ।
আমরা করেছি পোলাও আর
ওরা করেছে সাদা ভাত ।
আমরা করেছি গরু মুরগী এবং মাছ,
ওরা করেছে কেবল গরুর গোশতের
ব্যবস্থা ! কৃপণের জাত কোথাকার !
ভেতরে ভেতরে সবাই ফুঁসছিল ।
এরপরে বৌ পুতুলটা সম্প্রদানের বেলায়
অসন্তোষের চুড়ান্ত হল । ওরা বৌকে তেমন
কিছুই দেয়নি অর্থাত শাড়ী গহণা, খাট
পালঙ্ক ইত্যাদি । ছেলেকেও
চাহিদা মতো তেমন কিছু দেওয়া হল না !

আমরা থমথমে মুখে বৌ গ্রহণ করলাম ।
ওদের বাড়ি থেকে বের
হয়ে হেঁটে হেঁটে ফেরার
সময়ে আমরা প্রতিশোধ নিলাম ।
বৌটাকে পুতুলের বাকশো হতে বের
করে গলায়
দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে টেনে হিঁচড়ে বাড়ি পর্যন্ত
নিয়ে এলাম । সে পুতুল আর এ বাড়ির
বৌয়ের মর্যাদা পায়নি । বিবর্ণ বিবস্ত্র
সে অভাগীর শেষ ঠাঁই হয়েছিল বাড়ির
পাশের পুকুরে । সে দিনের
সে শিশুগুলো টেরই পেল না যে বাংলার
বধূদের চিরন্তন দুঃখের
পালাটিকে তারা নিজের অজান্তেই
আপন চেতনায় বাস্তবে মঞ্চায়িত
করেছে ।

আমি এখনও ভেবে পাই না, সেই
শিশুগুলোকে কে শিখিয়ে দিয়েছিল এ
নির্দয় রীতি ! কে ?
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাদ্রাসা শিক্ষা একটা কর্মবিমুখ শিক্ষা

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:১৫

এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষারে আপনি একটা স্ক্যাম হিসেবে ধরতে পারেন। মাদ্রাসার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে যে মাদ্রাসাগুলো আছে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্য সব মাদ্রাসাই এই স্ক্যামের ভেতরে। এটা একটা ভিক্ষার সাইকেল, দারিদ্র্য'র দুষ্টু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝর্ণা জল

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:২১


আমি ব্যস্তবতা দেখি
পানকৌড়ির সাঁতার-
কল্পনায় শুধু স্বপ্ন আঁকি,
মধ্যবিকাল ঢেউ তোলা সাগর
হতাশা ডিঙিয়ে যায়- নিরিবিলি
রাত দুপুরের বাসর।

উড়ে ধোয়া, নিঃশ্বাসে সাদা বক,
খেলা করে যে, প্রণয়ের চক-
নীল মেঘ ভীর জমায়, বর্ষা কাঁদাময়,
ভোরের ক্লান্তি দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিশীথের মুঠোয় - কেয়া ।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪



আমি সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়,
হিমশীতল সকালের ভেতর নত চোখে চেয়ে আছি।
হিমার্ত জানালায় জমে ওঠে নিঃশ্বাসের মেঘ—
আঙুল বুলিয়ে মুছে দিই;,
যদিও জানি, আজ সেখানে তোমার পদচিহ্ন নেই।

শরতের বৃক্ষেরা পত্রমোচনের ভাষা জানে;
আমি কেবল তোমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিম করা কি হারাম?

লিখেছেন চারাগাছ, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৬




জিম করা কি হারাম?

হ্যাঁ, জিম করা হারাম!

যদি জিমে গিয়ে নিজের পেশিবহুল বাহুডোরে কোনো ললনাকে জড়িয়ে ধরেন!

কিন্তু তারপরেও কথা থাকে।

এখানে জড়িয়ে ধরাটা হারাম। জিম করাটা নয়!

অর্থাৎ, জিমে গিয়ে শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রচন্ড রোদে

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০০

প্রচন্ড রোদে
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

রূপসী এদিক ওদিক কী খুঁজো
মনের মতো কাঙ্ক্ষিত পুরুষ
এভাবে সোনালি কতোদিন বিনষ্ট করবে
আমায় একটু ভেবে দেখো।
শূন্য হৃদয় নিয়ে কেঁদে মরি
কেউ নেই পাশে, গেছে সবাই ছাড়ি।
দরিদ্র বলে জুড়েনি তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×