somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আবীর চৌধুরী
পৃথিবী আমার আবাস। মানুষ আমার পরিচয়।

এই দেশ, শোধরানোর নয়

১৬ ই এপ্রিল, ২০২০ রাত ১২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নরওয়ের মত উন্নত অনেক দেশেই শ্রমের মর্যাদা দেওয়া হয়। ক্ষেতে-খামারে যারা চাকরি করে, ওদের "চাষা" বলে গালি দেওয়া হয় না। কৃষকদের না খেয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যা করতে হয় না। কৃষিকাজের সাথে জড়িত শ্রমজীবিদের কাজের অভাবে শহরের ভিড় জমাতে হয় না। প্রাকৃতিক, খনিজ ও প্রযুক্তিগত সম্পদে ভরপুর হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশের চেয়ে অপেক্ষাকৃত অনুর্বর এবং অপেক্ষাকৃত চরমভাবাপন্ন জলবায়ুর দেশ হওয়া সত্ত্বেও, নরওয়ে কৃষিজ সম্পদে অনেকাংশে স্বয়ংসম্পূর্ণ, এবং কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বরাংকিং-এ আছে।

করোনা ক্রাইসিসের কারণে সার্ভিস সেক্টরের হাজার হাজার কর্মচারী এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা তাদের কাজ থেকে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছে, যাকে ইংরেজিতে Lay Off বলা হয়ে থাকে। ধীরে ধীরে সরকার এদেরকে নানাবিধ সুবিধার আওতায় আনা শুরু করেছে। কৃষিউদ্যোক্তারা তাদের ক্ষেত-খামারের আসন্ন সিজনের জন্য এই লেইড-অফ ওয়ার্কফোর্সকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

অসঙ্গতি, অপ্রাপ্তি, সমস্যা, ইত্যাদি সব দেশেই কমবেশি আছে। কিন্তু পার্থক্যগুলি অনেক বিস্তর, এবং স্পষ্ট।

নরওয়েতে প্রথম যেদিন এসেছিলাম, সেদিন পথ হারিয়ে উদ্ভ্রান্ত এই আমাকে নিজের দামী গাড়িতে লিফট দিয়েছিল এক মধ্যবয়সী জেলে (Fisherman)! প্রথম দিন থেকেই বুঝতে শুরু করেছিলাম, বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থার সাথে, উন্নত দেশগুলির কি কি তফাত। এখানে টাকা গাছে ধরে না। মূল পার্থক্য হল, এখানে আপনার শ্রম ও মেধার মূল্য আছে। এখানে আপনাকে আপনার সামাজিক, আর্থিক, রাজনৈতিক বা অন্য যে কোন ধরণের স্ট্যাটাস/ক্ষমতা অনুযায়ী অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না, হবে না।

বিশ্বব্যাপী করোনা ক্রাইসিস শুরু হওয়ার পর থেকে, স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি, দেশভেদে এক এক দেশে নানারকম নতুন/পুরাতন সমস্যা ও Loop-Hole গুলি স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এরকম একটা সমস্যা হল- "প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি"।

যার শুরুটা মূলত হয়েছিল, ইতালি ও অন্যান্য দেশ হতে আগত প্রবাসীদের দিয়ে। যে ঘটনার ব্যাখা-বিশ্লেষণে আমি যাবো না।

প্রবাসী বাংলাদেশীদের মূলত তিনভাগে ভাগ করা যায়ঃ-
১) যারা শ্রমভিত্তিক কাজে নিযুক্ত হয়ে বিদেশ যায়, বৈধ বা অবৈধভাবে।
২) যারা পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বিদেশ যায়, এবং সুযোগ পেলে চাকরি নিয়ে বিদেশে অবস্থান/বসবাস করতে থাকে।
৩) যারা শিল্পপতি, পুঁজিপতি, রাজনৈতিক নেতা এবং আমলাদের সন্তান; যারা তুড়ি মেরেই "ইনভেস্টমেন্ট ভিসা" বা "সেকেন্ড হোম স্কিম" কিনতে পারে।

আপনার যদি বিবেক-বুদ্ধি, ন্যুনতম জ্ঞান এবং common sense থাকে, তবে এই তিন ক্লাস সম্পর্কে ভালোই ধারণা আছে আপনার।

আমি সামান্য করে বলবো, ২য় শ্রেণী সম্পর্কে। কারণ, আমি ২য় শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী একজন।

কেন এই লেখা লিখতে বসেছি। গতকাল চট্টগ্রাম নগরলেভেলের কিছু পাতিনেতার গালি শুনলাম।
গালির সারমর্ম- "দেশের টাকায় বিদেশে গিয়ে আরামে শুয়ে-বসে জ্ঞান ঝাড়ি আমরা"। এসব শুনে সাময়িকভাবে ব্লাডপ্রেসার কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল।
সাথে সাথে মনে পরে গিয়েছিল, আমার এক বন্ধুর মধ্যপ্রাচ্যফেরত ডাক্তার আত্মীয়ের কথা, যিনি গত বছর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন, দেশসেবা করবেন বলে; আর ছিনতাইকারীর ছুরির আঘাতে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
আরো মনে পরে, সবদেশের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার আগে, কানাডায় উচ্চশিক্ষারত সেই মেয়েটি দেশে এসেছিল, এই দুর্যোগের সময়টা পরিবারের সাথে কাটাবে বলে। তাকে মরতে হলো বিনা চিকিৎসায়, নিছক সন্দেহের কারণে।
এরকম কাহিনী বলতে থাকলে অমনিবাস লেখা হয়ে যাবে, শেষ হবে না।

এই দেশ কখনো এই দেশের শান্তিপ্রিয় এবং যোগ্য নাগরিকদের সম্মান দিতে পারে নি, হোক দেশে অবস্থানরত, কিংবা প্রবাসী। তারপরেও আমাদের শুনতে হয়, শেরে বাংলা ফজলুল হকদের মত প্রাচীন মনীষীদের উদাহরণ, যারা বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফেরত এসে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগ দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হয়, দেশে ফিরে যেতে, বিদেশে বসে দেশের কথা না বলতে। না বললেও আবার চরম সমস্যা।

কারা এসব বলে?

যাদের উপরের লেভেলের নেতা, মন্ত্রীর ছেলে-মেয়ের জন্মই হয়েছে বিদেশে বসবাসের জন্য। যারা এমন এমন কোম্পানিতে চাকরি করে, যেসব কোম্পানির মালিকের সন্তানের জন্মই হয়েছে বিদেশের হাসপাতালে। যারা এমন এমন মানুষের কথায় উঠেবসে, যারা সামান্য অসুখে স্পেশাল বা নিজস্ব ফ্লাইটে চড়ে বিদেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ছুটেন। যাদের বস/বড়কর্তাদের আমোদ-প্রমোদের একমাত্র ঠাই হলো উন্নত দেশগুলির বিলাসবহুল অবকাশযাপন স্থান।

বাংলাদেশ হলো এখন সুবিধাবাদী, সুবিধাভোগী, চামচাশ্রেণীর মানুষদের স্বর্গ; যারা একে অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে দিনযাপন করে। বাংলাদেশে আপনি একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে কিছুতেই জীবনযাপন করতে পারবেন না। প্রতিটা পদে পদে আপনাকে আপনার ক্ষমতা, লিংক, নেটওয়ার্ক, এসব দেখিয়ে সামনে চলতে হবে। এসব না দেখালে, না থাকলে, আপনি অপমানিত হবেন, বঞ্চিত হবেন, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হবেন, Victimized হবেন।

বাংলাদেশে আপনাকে আপনার মতামত, আপনার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে আমলে নেওয়া হবে না। আপনার রাজনৈতিক গডফাদার, আপনার প্রভাবশালী আত্মীয়, আপনার লোকদেখানো সামাজিক কাজ, আপনার অতীত গুণ্ডামি, ইত্যাদির কারণে আপনাকে চিনবে/জানবে মানুষ।

শেষের দিকে এসে একটু পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণ করি।

বাল্যকালে পড়েছিলাম, কৃষিভিত্তিক দেশ বাংলাদেশ। অন্য অনেক কিছুর মতই এটা এখন একটি রূপকথা। কৃষিভিত্তিক দেশ হলে, ক্লাসের প্রথমসারির কয়টা ছেলে কৃষিকাজে যেতে চায়? কয়টা গ্রাজুয়েট কৃষকের কোম্পানিতে (?) চাকরি পায়? নাহ, এসব কল্পকথা না। উন্নত দেশগুলিতে এরকমই হতে দেখেছি, শুনেছি।

বাংলাদেশের মূল পেশা হল দালালি; ছোট থেকে শুরু করে বিশাল। পাড়া-মহল্লার গেট থেকে শুরু করে সচিবালয়-বন্দরের অন্দরমহল পর্যন্ত। খুব সাধাসিধা ক্ষেত্রে টাকা আয়ের উৎস হল বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দেওয়া। আর, খুব বিশাল ক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি-মেডিকেল কলেজ-ব্যাংক-টিভি চ্যানেল এসব খুলে ব্যবসা করা।

সঙ্গত কারণেই বছরের পর বছর ইঞ্জিনিয়ার বের হয়েছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত হয়েছে, যারা সুযোগ পেয়েছে- বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারদের বাম্পার ফলনের পাশাপাশি ডাক্তারদেরও বাম্পার ফলন করে টাকা কামিয়েছে অনেকেই। কিন্তু ডাক্তারদের সেই সম্মান, সেই সুবিধা, সেই কাজের ক্ষেত্র দিতে পারেনি। ফলস্বরূপ, মহামারির মত দুর্যোগের সময়ে এসে, চিকিৎসাখাতের গর্তগুলি চাঁদ থেকেও দেখা যাচ্ছে, "পৃথিবীর কলংক" হয়ে।

আমরা যখন অন্য একটা বাংলাদেশীকে দেখবো, বিচার করবো, মন্তব্য করবো, তখন বুঝতে হবে, বাংলাদেশী জাতিটাই এরকম, তাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্যই এরকম, কুকুরের লেজের মত- সোজা হবে না কখনো। কোন আশা দেখি না এই দেশকে নিয়ে, এই জাতিকে নিয়ে। যারা দেখাতে আসেন, তাদের ভণ্ডামি দেখে হাসি, কিংবা তাদের নির্বুদ্ধিতা দেখে আফসোস করি।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০২০ রাত ৮:০৬
১২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গানটি বন্ধুত্বের, গানটি শান্তির প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ ভোর ৪:০০

আমেরিকা ও ইরানের শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এই গানটি বুনেছি, নিজের বেসুরো গলা 'ব্যবহার' করেই।
এবারে কি ভারত - বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তির আলো দেখা দেবার কথা?



বন্ধু হে অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল || একটা রোমান্টিক গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৪ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪

সে আমার দিকে তাকিয়েছিল
ওওও
বহুবার সে তাকিয়েছিল
আমি ভাবতে চেয়েছি
আমাকে তার ভালো লেগেছিল



সে দেখতে এতটা সুন্দরী
তার উপমা যেন সে নিজেই
মাঝে মাঝে অধরে তার ফুটছিল হাসি
মুগ্ধতায় আমি হারিয়েছিলাম খেই
তখন মিহিসুতোর মতো বৃষ্টিরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীল গ্রহের শেষ প্রেম // কেয়া এবং আমি।

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ২৪ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১৯



আমি ভেসে আছি মহাশূন্যে।
আমার শরীরে রূপালী স্পেসস্যুট।
চারপাশে অসীম অন্ধকার।
আর আমার সামনে দূরে জ্বলছে এক নীলাভ-সবুজ গ্রহ—
Earth-666।
এই গ্রহেই আমার জন্ম।
এই গ্রহেই আমি প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম।
আর এই গ্রহই আমার কাছ থেকে সবকিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৪



“নির্বাচিত সরকার যখন সেনাবাহিনী মাঠে নামায়, গণতন্ত্র তখন নিজের সত্ত্বা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে।”

এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দর্শনে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কিছু গোপন ব্যথা রেখে দিলাম অন্তরে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৩



আমার হয়ে থাকুক কিছু
মন কুঠুরির আড়াল হয়ে
দুঃখগুলো যাক না নিরব
একটু করে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।

বাড়ুক ব্যথা বুকের গহীন
কেউ না জানুক গোপন থাকুক
ব্যথার কাঁপন উঠুক না হয়;
হেলা বুকে কষ্ট আঁকুক।

যাক না এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×