তথ্য প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানুষের জীবন হয়ে উঠছে সহজ এবং নানা সুবিধায় সমৃদ্ধ। আর তথ্য প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ও চলে এসেছে সবার সামনে। আর তা হলো হ্যাকিং। হ্যাঁ, অনলাইনে অপরাধী গোষ্ঠীর অপরাধ প্রবণতা এখন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ের হ্যাকিংয়ের দৌরাত্ম বিষয়ে এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন তরিকুর রহমান সজীব
গত কয়েক মাসের প্রযুক্তি বিশ্বের শিরোনামের জায়গাগুলো বারবার দখল করে নিয়েছে হ্যাকাররা। একদিকে অ্যাপল, গুগল, ইয়াহু, স্যামসং, মটোরোলার মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নতুন নতুন প্রযুক্তি পণ্য আর সেবার খবরে যেমন চমকিত পৃথিবী, অন্যদিকে হ্যাকারদের আক্রমণে একের পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চলেছে নানান প্রতিষ্ঠান। গত কয়েক মাসে প্রতিদিন না হলেও অন্তত:প্রতি সপ্তাহেই বড় কোনো হ্যাকিং এর ঘটনা ঘটেছে। আর তাতে করে প্রযুক্তি বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে।
হ্যাকিং এবং হ্যাকার
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে হ্যাকিং বলতেই বোঝায় কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রবেশ করে সেখান থেকে গুরুত্বপুর্ণ তথ্যসমূহ গ্রহণ করা, মুছে দেয়া বা এমনভাবে পরিবর্তন করা যা ওই প্রতিষ্ঠান এবং তার গ্রাহকের জন্য ক্ষতিকর। অনলাইনের এই যুগে এসে বড় বড় সব প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের গোপন তথ্য সংরক্ষিত থাকে তাদের ডাটাবেজে। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য, ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে তাদের অ্যাকাউন্ট এবং ক্রেডিট কার্ডসমূহের তথ্যগুলোও ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকে। হাকারদের মূল আগ্রহের জায়গাই হচ্ছে এই ডাটাবেজ। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের তথ্যগুলো হাতিয়ে নিতে পারলে তো আর কথাই নেই। বর্তমানে হ্যাকিং তাই মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। আর হ্যাকারদের বলা যায় অনলাইন সন্ত্রাসী।
হ্যাকিংয়ের সূত্রপাত
হ্যাকিং নিয়ে এখনকার সময়ে চরম বিরূপ মনোভাব থাকলেও হ্যাকিংয়ের সূত্রপাতটা ঠিক এমন ছিল না। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মূলত: ম্যাসাচুসেট ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) এর কিছু শিক্ষার্থী তাদের মেধার সর্বোত্তম ব্যবহারে গঠন করে এক বিশেষ দল যারা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় চিন্তা ও দক্ষতায় এগিয়ে। যে কোনো ধরনের প্রোগ্রামিং এর সমাধানে এমআইটির সেই দলই সকলের শেষ ভরসা। ওই দলের প্রতিটি সদস্যকে বলা হতো হ্যাকার।
ধীরে ধীরে কম্পিউটারের ব্যবহার বেড়ে যায় বহুগুণে। আর এর ব্যবহারের ক্ষেত্রও প্রসারিত হতে থাকে। সাথে সাথে বাড়তে থাকে এমআইটির হ্যাকারদের সক্ষমতা। তাদের মেধা ও দক্ষতার কম্পিউটারের প্রসারও নতুন গতি পায়। এসব হ্যাকারদের প্রায় সকলেই ছিলো তরুণ। উদ্ভাবনী শক্তি, চিন্তার গভীরতা আর মেধা ছিলো তাদের অস্ত্র। বর্তমান সময়ের হ্যাকিংয়ের যে ধারা আরও বীজ ছিলো ওইসব তরুণদের মাঝেই। প্রোগামিং এর উপর অসাধারণ দখল তাদের দিয়েছিলো প্রভূত ক্ষমতা। বয়সে তরুণ সেসব হ্যাকারদের সেই ক্ষমতার অপব্যবহারও শুরু হয় কিছু মাত্রায়।
হ্যাকিংয়ের ধারাবাহিকতা
সত্তরের দশকে আবির্ভাব ঘটে কোন হ্যাকার বা ফ্রিকদের। এরা টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করার মাধ্যমে বিনা খরচে কথা বলতো টেলিফোনে। আশির দশকে এরা কম্পিউারের নেটওয়ার্কে হামলা করা শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এমবিআই ৬ তরুণকে গ্রেফতার করে হ্যাকিংয়ের অপরাধে। লস অ্যালামস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ৬০টি কম্পিউটারের অবৈধভাবে প্রবেশ করে এই হ্যাকাররা। ১৯৮৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রকাশ হতে থাকে হ্যাকিং নির্ভর ম্যাগাজিন ২৬০০। হ্যাকারদের জন্য নানা ধরনের টিপস নিয়ে প্রকাশিত হতে থাকে এই ম্যাগাজিন। আর ক্রমেই বাড়তে থাকে হ্যাকারদের উত্পাত। এরমধ্যে ১০৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘কম্পিউটার ফ্রড অ্যান্ড অ্যাবিউস অ্যাক্ট’ নামে হ্যাকিং রোধে আইন প্রণয়ন করলেও তাতে হ্যাকাররা থেমে যায়নি, বরং আরো বিস্তৃত হতে থাকে তাদের কার্যক্রম। এরমধ্যে ১৯৮৮ সালে আর্পানেট এর নেটওয়ার্কের ৬,০০০ সিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে মরিস ওয়ার্ম নামক এক ভাইরাস। একই বছর ন্যাশনাল ব্যাংক অব শিকাগো ৭০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয় পিসি হ্যাকিংয়ের ফলে। ১৯৯৩ সালে গ্রিফিথের এয়ার ফোর্স বেজ, নাসার নেটওয়ার্ক প্রতিসমানের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে ‘ডাটা স্ট্রিস’ এবং ‘কুজি’ নামক দুই হ্যাকার। ১৯৯৭ সালে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এনটি অপারেটিং সিস্টেমে হাই প্রোফাইল আক্রমণ হয়। ১৯৯৮ সালে হামলা হয় পেন্টাগণের তথ্য ভাণ্ডারে।
নতুন শতাব্দীতে নতুন করে হ্যাকিং
২০০০ সালে এসে হ্যাকার এবং হ্যাকারা তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়। এ বছরেই মাত্র তিনদিনের মধ্যে ইয়াহু, অ্যামাজন, বাই ডট কম, ই-বে, সিএনএন এর মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সার্ভার বিকল করে দেয় হ্যাকাররা। ‘ডেনিয়েল অফ সার্ভিস’ ব্যবহার করে এই আক্রমণ চালায় তারা। এ বছরে ক্রেডিটকার্ড ডট কম সাইট থেকে ৫৫,০০০ ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করে হ্যাকাররা। এই ২০০০ সালেই বিশ্বব্যাপী ইন্টারটেনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে কম্পিউটার ওয়ার্ম ‘আই লাভ ইউ’। প্রেমপত্রের ছদ্মবেশে এই ওয়ার্ম ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। ২০০১ সালেই বের হয় তত্কালীন জনপ্রিয় প্রমীলা টেনিস তারকা আন্না কুর্নিকোভার নামে কুর্নিকোভা ভাইরাস। ২০০৬ সালে ইসকরপিক্স নাম নিয়ে এক তুর্কী হ্যাকার ২১,৫৪৯টি ওয়েবসাইট হ্যাক করে। আবার ২০০৭ সালে জাতিংসংঘের ওয়েব সাইট হাক করে তুরস্কের হ্যাকার যার কোড নাম কেরেম ১২৫। ২০০৯ সালে জনপ্রিয় অ্যান্টিভাইরাস ক্যাসপারস্কির নেটওয়ার্কে হামলা চালিয়ে একে বিকল করে দেয় হ্যাকাররা। এভাবেই চলে আসছে হ্যাকারদের অগ্রযাত্রা।
সাম্প্রতিক হ্যাকিংয়েগুলো
চলতি বছরের শুরু থেকেই হাকাদের দৌরাত্ম দেখছে বিশ্ব। সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে টেক জায়ান্ট এবং বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে হামলা করে এখন প্রযুক্তি বিশ্বের শিরোনামে রয়েছে হ্যাকারাই। প্রতিদিনই নতুন নতুন চমক জাগানো প্রযুক্তি পেছনে ফেলে হাকাররাই এখন প্রযুক্তি বিশ্বের ‘টক অফ দ্য টাইম’। এক মাসের মধ্যে হ্যাকাররা বেশ বড় বড় কিছু হামলা চালায় অনলাইনে। ‘অ্যানিনোমাস’ এবং ‘লুলজ’ সিকিউরিটি’ নামক দুইটি হাকার গ্রুপ রয়েছে হ্যাকিং কর্মকাণ্ডের শীর্ষে। সনি মিউজিক, সনি পিকচার্স, সনি’র প্লেস্টেশন নেটওয়ার্ক, নিনটেনডো, ইরান সরকারের ওয়েব, ব্রিটিশ নেভী সহ সরকারি-বেসরকারি নানান ধরনের প্রতিষ্ঠানে একে একে হামলা হয়েই চলেছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে জাপানি গেম কোম্পানি সেগা’র নেটওয়ার্কেও হামলা করে হ্যাকাররা। সবমিলিয়ে হ্যাকাররাই এখন প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম দুর্ভাবনার নাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



