রেসিজম হলো পুরো একটা গোষ্ঠীর সম্পদ চুরির সব চেয়ে হিংস্র এবং কার্যকর উপায়।
.
খুশবন্ত সিং একটা বইয়ে দখলদার ব্রিটিশদেরকে বলেছিলেন বান্দরের পাছার মত লাল মুখো সাহেব। লাল সাহেবরা আবার কালোদের বলতেন ওরাঙ ওটানের মত। এই লাল মুখো ডাচ্ সাহেবরা যখন অাফ্রিকায় পৌঁছালেন, তারা দেখলেন যে পুরো একটা মহাদেশ ভর্তি বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে এক ঝাঁক কালো লম্বা মুখো মানুষ বুনো আয়োজনে বাস করতেছে। ভদ্র লোকের দেশ থেকে এসেতো আর সরাসরি ডাকাতি করা যায় না। তারা মানসিক শক্তি যোগাড় করলেন এই প্রচার করে যে -এই সব কালো প্রানী গুলো প্রায় মানুষের মত মনে হলেও তারা মুলত মানুষ না। ওদের রেস ভিন্ন। তারা ঘোড়া করে কালো মানুষ শিকারে বের হতে লাগলো। দাস বানিয়ে আফ্রিকানদের দিয়েই আফ্রিাকার সম্পদ তুলে জাহাজ বোঝাই করলো। বন্দী করে ইউরোপে নিয়ে চিড়িয়াখানায় নগ্ন করে প্রদর্শন করলো। মারা গেলে শরীর ব্যবচ্ছেদ করে মানুষের সাথে কালোদের পার্থক্য খুঁজে খুঁজে জার্নালে প্রকাশ করার চেষ্টা করতো। সতের শ সাল পর্যন্ত ইউরোপ আমেরিকার চার্চ ফতোয়া ছাড়তো যে রেড ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকানদের সোল বা আত্মা নেই বাকি মানুষের মত। তাই সোল-লেস মানুষদের ঘোড়া গাধার মত খাটাতে পারে আত্মিক সাদা মানুষেরা।

.
দিনে দিনে ধর্মের জোর কমলো। অর্থনৈতিক কাজে চার্চের বয়ান শুনার মানুষও কমে গেলো। এবার আসতে থাকলো বৈজ্ঞানিক জার্নালগুলোর অপ ব্যাখ্যা। ডারউন সাহেব যখন অরিজিন অব স্পেসিসে প্রকাশ করলেন যে বিবর্তনে দুর্বলরা মরে যাবে, সামর্থবানরাই টিকে থাকবে। তখন ইউরোপিয়ানরা আরো উঠে পরে লাগলো নিজেদেরকে সার্ভাইবালের যোগ্য প্রমাণ করতে। সাদা ফিলোসফার আর বিজ্ঞানীরা বলতে লাগলেন যে কালোরা প্রাকৃতিক নিয়মেই এক দিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তারা টিকে থাকতে সামর্থহীন। রবার্ট নক্স নামের এক এনাটমিস্ট শুধু একজন নিগ্রোর উপর গবেষণা করে রায় দেন যে কালোদের ব্রেইন ত্রুটিপূর্ণ। তাদের বুদ্ধি সাদাদের থেকে প্রাকৃতিক ভাবেই কম। কালোদের সম্পদ লুন্ঠন, গন হত্যা, দীর্ঘ সামুদ্রিক যাত্রায় রোগ বালাইতে মারা যাওয়া সব কিছুকেই ঐ সব বৈজ্ঞানিক তত্ব দিয়ে হালাল করতে চাইতো ভদ্র ইউরোপিয় সাদারা।
.
এবার একটা ইন্টারেস্টিঙ বিষয় বলি। ইউরোপিয়ানদের কাছে মানুষের ভাগ ছিলো মুলত দুইটা - হোয়াইট আর নন-হোয়াইট বা কালারড্। এই নন হোয়াইট যে সব সময় কালো চামড়ার মানুষই হতে হবে এমন ছিলো না। উনিশ শতকের দীর্ঘ সময় পর্যন্তও সাদা চামড়ার আইরিশ, ইহুদি বা ইতালিয়ানদের কিছু জাতকে নন-হোয়াইটের ভাগ্য নিয়ে দাসত্ব করতে হয়েছে।
.
আরো ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে এই রেইসের সংজ্ঞা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে বদলেছে মানুষ। যার মূলে ছিলো সম্পদ লুন্ঠন। যে কোন ভাবে সমাজের একটা অংশকে বিভিন্ন অযুহাতে ধীরে ধীরে অন্যদের থেকে আলাদা করা। বেকুব আর অদক্ষ বলে তাদের মত প্রকাশ বন্ধ করা হলো রেসিজমের সবচেয়ে মোক্ষম এবং কার্যকরি পদ্ধতি। ব্যাটারির মত শ্রম দাস হিসেবে ব্যবহার করে তাদের পরিশ্রমের ফসলটা নিজেরা ভোগ করাই সকল রেসিজমের চুড়ান্ত উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিন সামাজিক মর্যাদাহীন থাকার কারনে তাদের উপর যে কোন অত্যাচার সমাজ নির্বিকার ভাবেই দেখতে থাকে। তার সামাজিক অধিকার এমন ভাবে দমিয়ে রাখবে যাতে সে কখনো মুখ খুললেই সেটাকে বিশাল বেয়াদবি ধরা হবে। প্রকাশ্যে পুড়িয়ে, পিটিয়ে মেরে ফেললেও যেন কিছু বলার না থাকে। এই রেসিজম চামড়ার রঙ, ধর্ম, জাত, পেশা যে কোন দিক থেকেই আসতে পারে।

মধ্য যুগে ইউরোপে জ্ঞান- বিজ্ঞান, চিকিৎসা, ব্যবসায় সম্পদশালি হয়ে উঠেছিলো উইকান বা প্যাগান সম্প্রদায়। তারা ছিলো মাতৃ প্রধান জাতি। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি সহ বিভিন্ন কর্ম কান্ডকে ডাকিনি বিদ্যা বলে প্রচার চালালো ইউরোপিয়ানরা। উইকান মহিলাদের কে ডাইনি, কালো যাদুকর অপবাদ দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো হাজারো হাজারে। আখেরে উইকানদের নিয়ন্ত্রনে থাকা ব্যবসা সম্পদ নিজেদের দখলে নিতে পারলো ইউরোপিয়ানরা।
.
ফারাও সম্রাট গ্রেট রামেসিস ব্যবহার করেছিলেন সিরিয়া-ফিলিস্তিন থেকে যাওয়া বনি ইসরাইলিদেরকে। বিশাল বিশাল পিরামিড আর মূর্তি বানিয়ে দাসের দল তৈরী করেছিলো মিশরিয় সভ্যতা।
.
ধর্ম ব্যবহার করে হিটলার ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইহুদিদের উপর। এ যুগে আমাদের পাশের মগের মুল্লকে বার্মিজরা যেভাবে দখল করেছে রোহিঙ্গাদের সম্পদ। ৪৭ এ দেশ ভাগের সময়ও চলেছে ধর্মের অযুহাতে সম্পদ লুন্ঠন। এর পর পাকিস্তানি পাঞ্জাবী গোষ্ঠী দেখাতে শুরু করেছিলো যে বাঙ্গালীরা ইনফেরিওর। একই ধর্মের হলেও সনাতনী বাঙালি সমাজে ছিলো ব্রাম্মণ ও অব্রাম্মণের বিরাট কুল বৈষম্য।
.
দূনিয়ার কোথায় কখন কোন জন গোষ্ঠী কি অযুহাতে আরেকটা গোষ্ঠীর উপর ঝাঁপিয়ে পরবে বলা মুশকিল। এবার চার দিকে চোখ খুলে তাকান। অঙ্কুরে থাকা বিভিন্ন রকম রেসিজমের বিষ চোখে পরে কিনা দেখুন।
.
যদি বিশটা ফেমিলির একটা এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে আট জন মালিক, বার জন ভাড়াটে থাকে। দেখা যায় বিল্ডিঙ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে কমিটি হয় এবং তার যে মিটিঙ হয় সেখানে ঐ ভাড়াটেদের কোন জায়গা থাকেনা। প্রতিদিনের দশ বার ঘন্টা পরিশ্রমের বিশাল ভাগ ভাড়া দেয়ার পরও। এমন ভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক দল, ভিন্ন জেলার বাসিন্দা, অফিসার শ্রমিক ইত্যাদি ইত্যাদি হেন কোন ইস্যু নাই যেটা থেকে রেসিজম খুনো খুনি পর্যন্ত না গড়াতে পারে। আর রেসিজম বাঁচিয়ে রাখার সব চেয় বড় জায়গা হলো শিক্ষা। এক জন জন্মগত অধিকারে ভালো শিক্ষা আর ট্রেইনিঙ্গ এর সুযোগ পাবে, অন্য জন পাবে না। এই রেইসে বাকি দল আজীবন পিছিয়েই থাকবে।
.
#Afnan_Abdullah
06082020
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০২০ বিকাল ৪:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


