somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

।। একজন মা ও তার ‘বেওয়ারিশ বিড়াল মাতৃকতা’ ।। - আহমেদ রুহুল আমিন ।

০৩ রা অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটি জীবনঘনিষ্ঠ গল্প । উত্তরবঙ্গের একটি জেলা শহরে খুব কাছ থেকে দেখা একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের নানা উত্থান পতনের এই কাহিনী এই সমাজে- যাদের কেউ খোঁজখবর রাখেনা বা কোনদিন কেউ খোঁজখবর রাখার চেষ্টাও করেনি .... !

এটি একটি বড়গল্প, তাই ধারাবাহিকভাবে পর্ব আকারে সামু‘র সম্মানীত পাঠকদের জন্য পোস্ট করলাম ।

(পর্ব-১)

( “ এই মাঘিলা ... মাঘিলার মা-বাপলা উমহার হাতত দিছে মোবাইল...মাঘিলা পড়া লেখা কি করছে- না করছে...আর… হামার ভাতারলার লগত লাইন লাগাছে ........ । মাঘিলাক যদি একবার লগত পানু হয়, ওমহার .........ভিতরত ইন্ডিয়ান কারেন্ট মরিচ পেচকেটায় দিনু হয়...... মাঘিলা.....” - জেলা শহরের পুর্ব-দক্ষিণ বরাবর করোতোয়া নদীর পাড় ঘেষে শহর রক্ষাবাঁধের রাস্তা দিয়ে তুলারডাঙ্গার ‘খতে পাগলি’ চিৎকার দিয়ে ক্ষোভের সাথে এই কথাগুলো আওড়িয়ে সকাল- সন্ধ্যায় দ্রুত হেঁটে যায়....। পথচারী কিংবা বাসাবাড়ির লোকজন তার কথা শুনে শুধু মুখ টিপে হাসে.... ) ।
গল্পের যখন শুরু :
ভিতরগড় কাজিরহাট ব্রীজ সংলগ্ন তালমা নদীর পশ্চিমপাড় আড়াআড়ি উত্তর-দক্ষিণ বরাবর অবস্থিত নয়ানাভিরাম গাছগাছালীতে পরিপুর্ণ 'তালমা গুচ্ছ গ্রাম' । ঠিক নদীর ওপারের গ্রামের নামটি ‘সোনারবান’। একসময় এখানে ছিল বিশাল জঙ্গল । লোকে বলতো 'তালমা নাওঘাটার জঙ্গল' । সেই পাকিস্তান আমলে - তখন তালমা নদীর উপর ব্রীজ ছিলনা । এখানে দিনে-দুপুরে বাঘ আর বুনো শুকরের আনাগোনা ছিল, অবশ্য তা অনেক আগে । যখন ভাটি অঞ্চলের ( ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল বা নোয়াখালী- কুমিল্লা অঞ্চলের) লোকজন এসে এখানে জঙ্গল কেটে বসতি গড়া শুরু করে তখন ধীরে ধীরে বাঘেরা ওপারবাংলার জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের গরুমারার জঙ্গলে পালিয়ে যায় । এখনোও সেই বন্যপ্রাণীদের ওয়ারিশেরা মাঝে মধ্যে তাদের পুর্বপূরুষদের আস্তানায় পথ ভুলে চলে আসে । বর্তমানে অসচ্ছল ভিটেমাটিহীন নিম্নবিত্ত মানুষেরা এখানে মাথা গুজার ঠাঁই পেয়েছে সেই প্রেসিডেন্ট এরশাদ সরকারের সময় । এখানকার ‘কেনু মিয়া’ একজন চা দোকানদার, লোকে বলে ‘কেনু ভুজারী’ । তালমা নদীর ব্রীজ পেরিয়েই কাজিরহাট ইউপি অফিস সংলগ্ন বাজারেই কেনু মিয়ার চায়ের দোকান ।এখানে বোর্ড অফিস, ভুমি অফিস ও স্কুল থাকায় এবং আশেপাশে বাজার-ঘাট না থাকায় খুব জমজমাট থাকে বাজারটা । কী এক পোড়া কপালে জন্ম ‘কেনু মিয়া’ সবসময়ই বলে - আল্লাহ্ তার ভাগ্যে ছেলে লেখে নাই । না হলে পরপর দুইটা মেয়ে হওয়ার পর তৃতীয়টাও মেয়েই হয়েছে । একমাত্র সম্বল এই চায়ের দোকানের উপর নির্ভরশীল হয়ে তিন-তিনটা মেয়েকে মানুষ করতে হিমসিম খেতে হয় তাকে । পর পর তিনটি বাচ্চা জন্ম দেয়া আর একআধপেট খাওয়া-না খাওয়া বউ কুলসুমকে দেখে কেনু মিয়া মাঝে মধ্যে চমকে উঠে । কি সুন্দর পেটানো শরীর ছিল বউটার এখন কেন যেন বউটার শরীর ভেঙ্গে গেছে । আগের মতো ভাল নেই । সবসময় মনমরা ভাব নিয়ে চলে । পর পর তিনটা বাচ্চা নেয়ায় আজকাল তাকে দেখে তার খুব কষ্ট লাগে ।সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নেয়- সে নিজেই খাসি হয়ে নেবে । আর বাচ্চা নিবেনা ... কেননা, বাচ্চা নিতে গেলে আবারও যদি মেয়ে হয় ! সেই সূর্য উঠার আগেই চায়ের দোকানে পানি দেয়া থেকে শুরু করে লাকরী জমানোর কাজটা বউটা করতো । কাস্টমারদের কাপ-পিরিচ ধোয়া থেকে শুরু করে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়া সারাদিন বলতে সেই সকাল থেকে রাত কমপক্ষে দশটা অবধি । কোন কোনদিন রাত বারটাও বাজে । বউটার শরীরে কুলোচ্ছেনা বলে বড়মেয়েটা করে কিছূদিন । কিন্তু শালার পাবলিকের যতো মাথা ব্যথা মেয়েদের নিয়ে । মেয়ে বড় হয়ে গেছে বলে অনেকে গালমন্দ বা সমালোচনা করে । সেই কাজ এখন করে দ্বিতীয় মেয়েটা । খুব হেলা করে কেনু মিয়া মেয়ের নাম রেখেছিল আলেয়া । বড় মেয়ের নাম মরিয়ম । ছোটটার নাম রহিমা । এই নামগুলোর অর্থ কি তাও সে জানেনা বা জানার প্রয়োজনবোধ করেনি কখনও । লোকে এইসব নাম রাখে কিংবা নাম একটা রাখতে হয় তাই রাখা । আলেয়ার বয়স আর কতো হবে এই আট- দশ বছর । তেলচা কালো ছিপছিপে শরীরে ডাগর চোখের বাড়ন্ত বয়সের আলেয়াকে দেখতে বেশ মায়াবী মায়াবী লাগে । মাঝখানে তাকে আনন্দময়ী গ্রামের হবিবর মাষ্টারের বাড়িতে কাজের জন্য রাখে । সেখানে থাকার সময় আলেয়ার সমবয়সী মাষ্টারের মেয়ে তানিয়া আপুকে খুব ভাল লাগতো তার । সবচেয়ে ভাল লাগতো ওর মা যখন ওকে সুন্দরকরে দুটো বেনী বেঁধে স্কুলে পাঠাতো তখন খুব আফসোস হতো তার সে যদি এভাবে স্কুলে যেতে পারতো তবে কতইনা ভাল লাগতো । কিন্তু ভাগ্যবিধাতা'তো সবার ভাগ্য সমান লেখে নাই । বড়মেয়েটাকে কোনও মতেই দোকানে রাখা যাচ্ছেনা বলে কেনু মিয়া আলেয়াকে মাষ্টারের বাড়ি থেকে নিয়ে এসে এখন চায়ের দোকানে ফায়ফরমাস খাটায় । দোকানে কাজ করে বলেই এরই মধ্যে মেয়েটার দিকে কিছু মানুষ আড়চোখে তাকায় । সেই তাকানোর গভীরে ভীমরুলের হুল ফুটানোর মতো একধরনের বিষ আছে যা আলেয়া হারে হারে বুঝেছে মাষ্টারের বাড়িতে থাকতে । এতো সম্মানী ভাল মানুষির অন্তরালে থাকে একধরনের গা ঘিন ঘিন করা কুৎসিতপনা যা মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এগুতে থাকে........। (ক্রমশঃ)

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৪১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেমোরি লুপ (Memory Loop)

লিখেছেন চারাগাছ, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:০৪




মেমোরি লুপ (Memory Loop)

​গভীর রাত। ল্যাবের নিস্তব্ধতা চিরে শুধু ভেসে আসছে মনিটরের নীলচে আলোর মৃদু কম্পন। টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসে আছেন ডা. আরিয়ান। স্ক্রিনে ভাসছে তার বহু বছরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মেসি’ নামক মুগ্ধতা

লিখেছেন সালমান মাহফুজ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪২


লিওনেল, রোজারিও থেকে ঢাকা । বার্লিন থেকে নিউইয়র্ক । ২০০৬ থেকে ২০২৬ । উড়ন্ত কৈশোর থেকে পড়ন্ত যৌবন । ফুটবল পায়ে তোমার প্রতিটা পদক্ষেপের সাথে আমরা ছিলাম । আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

টাই চাই

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে: অদ্য হইতে কোনো সরকারি বা বেসরকারি কার্যালয়ে ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে টাই ও বেল্ট পরিধান দণ্ডনীয় অপরাধ। কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে একবাক্যে: "কর্মক্ষেত্র ও যত্রতত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের জন্য ৭-গ্রেডভিত্তিক ন্যায়সংগত সরকারি বেতন ও প্রশাসনিক সংস্কার একটি প্রস্তাবিত নীতিপত্র

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক, বেতন বৈষম্য হ্রাস, মেধার মূল্যায়ন এবং দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠার একটি সমন্বিত প্রস্তাব

বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ২০টি গ্রেডের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ভেবেছিলাম দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুlie ২৪ আন্দোলন পরবর্তী বৈষম্যহীন বাংলায় (যেহেতু বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই), বেসরকারী ও সরকারী কর্মজীবীর জীবন...

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ০১ লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২১

/বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের মধ্যে সরকারী আর বেসরকারী কত শতাংশ?

/গত ২ বছরে যত শিল্প কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে এবং তাতে যত সংখ্যক বেসরকারী কর্মজীবী (কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিক….) চাকরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×