somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্মজৈবনিক উপন্যাসঃ স্বপ্ন বাসর (পর্ব-১)

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১৯ ভোর ৪:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আত্মজৈবনিক উপন্যাসঃ স্বপ্ন বাসর
হৃদয়ের কাছাকাছি সেই
প্রেমের প্রথম আনাগোনা
সেই হাতে হাতে ঠেকা-সেই আধো চোখে দেখা
চুপি চুপি প্রাণের প্রথম জানাশোনা-

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। গ্রামের বাড়ি থেকে দাদাজান লোক মারফত আব্বাকে খবর পাঠিয়েছেন সপরিবারে গ্রামে চলে যেতে। আমার জন্মের মাত্র তিন মাস পরে আব্বা আমাদের দুই ভাই ও এক বোনসহ মাকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে রাজশাহী শহরে চলে আসেন এবং ওকালতি পেশার সূত্রে শহরে স্থায়ী হয়ে যান। সেটা ১৯৫৫ সালের ঘটনা। এরপর আমার আরো তিনটি ভাইয়ের জন্ম হয়। অর্থাৎ আমরা ছিলাম পাঁচ ভাই এক বোন। শহরে থেকে আমাদের লেখাপড়া, আব্বার প্র্যাকটিস ও অন্যান্য কারণে গ্রামের বাড়ির সাথে আমাদের যোগাযোগ কমে যায়। যোগাযোগ কমে যাওয়ার আর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল যাতায়াত ব্যবস্থার দুর্দশা। আমাদের গ্রামের নাম ছিল মধুপুর। রাজশাহী শহর থেকে দূরত্ব কুড়ি বাইশ মাইলের বেশি নয়। কিন্তু রাজশাহী থেকে নওহাটা পর্যন্ত ছয় সাত মাইল রাস্তা ঘোড়ার গাড়িতে যাওয়া সম্ভব হলেও নওহাটা থেকে মধুপুর পর্যন্ত অবশিষ্ট চৌদ্দ পনের মাইল রাস্তা ছিল সম্পূর্ণ কাঁচা ও ভাঙ্গাচোরা। এই দুর্গম রাস্তায় স্রেফ পায়ে হেঁটে অথবা গরুর গাড়িতে চড়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। গাড়োয়ান পাকা না হলে এই রাস্তার এবড়ো খেবড়ো গর্তে পড়ে অনেক সময় গরুর গাড়িও উল্টে যায়।

এ যুগে যান্ত্রিক যানবাহনের কারণে কুড়ি বাইশ মাইল রাস্তা তেমন কোন দূরত্ব মনে হয় না। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার কারণে সে যুগে আমাদের গ্রামের বাড়ি ছিল প্রকৃতপক্ষেই এক দুর্গম অজ পাড়াগাঁয়ে। প্রতি বছর ধান ওঠার সময় হলে মা একবার গ্রামে যেতেন। কাঁচা রাস্তায় গরুর গাড়িতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাতায়াত করে কোমরের ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরে দু’দিন বিছানায় শুয়ে থাকতেন তিনি। বলতেন, ‘আর যাবো না বাবা’। কিন্তু পরের বছর ধান ওঠার সময় দাদার বাড়ি থেকে লোক এলে তিনি আবার ঠিকই চলে যেতেন। শ্বশুর বাড়ির প্রতি তাঁর একটা টান ছিল সব সময়। আব্বা তাঁর পেশাগত ব্যস্ততার কারণে গ্রামে খুব কমই যেতে পারতেন। আর আমার বয়স যখন মোটে তিন চার বছর, তখন মায়ের সাথে আমরা ভাই বোনরা একবার দাদার বাড়ি গিয়েছিলাম-যা মায়ের কাছেই শোনা। কিন্তু অত ছোটবেলার স্মৃতি আজ আর আমার মনে পড়ে না।

দাদাবাড়ি থেকে আমার চাচারা কালে ভদ্রে শহরে আসতেন। তবে দাদাবাড়ির কামলা-কিষাণ, চাকর-বাকরদের কেউ না কেউ গাছের আম কাঁঠাল, পুকুরের মাছ, চাচীদের হাতে বানানো পিঠে-পুলি এসব নিয়মিত পৌঁছে দিয়ে যেত। আমার নিজের দাদী আমার জন্মের অনেক আগেই মারা গেছেন। তবে সৎ দাদী এত ভালো মানুষ ছিলেন যে তাঁকে কখনোই আমাদের সৎ দাদী বলে মনে হয়নি। আমার আব্বা এবং এক ফুপুকে জন্ম দিয়ে আমার নিজের দাদী মারা যান। আমার তিন চাচার জন্ম সৎ দাদীর গর্ভে। কিন্তু আব্বা এবং ফুপুর প্রতি চাচাদের সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ দেখলে কারো এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হবে না যে এরা ভিন্ন ভিন্ন মায়ের সন্তান। আব্বা ছিলেন দাদাজানের বড় সন্তান। সেই হিসাবে গ্রামের বাড়িতে আব্বার অবস্থান ছিল সবার উর্দ্ধে। চাচারা আব্বার এই অবস্থানকে পুরোপুরি সম্মান করে চলতেন।

আমার জন্মের কয়েক বছর পর বসন্ত রোগে দাদাজানের দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়। চাচারা বিষয় সম্পত্তি বুঝে নেওয়ার পর দাদাজান ঘর থেকে বিশেষ একটা বের হতেন না। মা প্রতি বছর গ্রামে গেলে তাঁকে কাছে বসিয়ে দাদাজান আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। আর মা ফিরে আসার সময় বাড়ির চাকর বাকর দিয়ে ফলমূল, লাউ-কুমড়া, কলার কাঁদি, পুকুরের মাছ, জমির আখ, আতপ চাল, পিঠে-পুলি এমনকি বাড়ির পোষা মোরগ মুরগি পর্যন্ত বেঁধে গরুর গাড়ি বোঝাই করে দিতেন। এগুলো যাতে ঠিকমতো পৌঁছানো হয় সে ব্যাপারে মায়ের সাথে আসা লোকের ওপর দাদাজানের কড়া নির্দেশ থাকতো। দাদাজানের ধারণা ছিল শহরে তাঁর নাতি নাতনিরা এসব ঠিকমতো খেতে পায় না। এসব যে শহরেও কিনতে পাওয়া যায় এবং তাঁর নাতি নাতনিরা হরদম খায়, সে কথা মা কোনদিন দাদাজানকে বোঝাতে পারেননি। দাদাজানের এক কথা, তিনি যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন তাঁর বড় ছেলের সংসারে এসব যাবে। চাচা চাচীরাও দাদাজানের সাথে একমত। গরুর গাড়ি বোঝাই করে দিতে পারলে তারাও খুশি।

শহরের অবস্থা তখন খুব খারাপ। পাকিস্তানী মিলিটারিরা প্রতিদিন গুলি করে লোক মারছে। বিহারীরা চাকু ছুরি রামদা হাতে দিনের বেলা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরছে আর ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে শ্লোগান দিচ্ছে। পাকিস্তানী সৈন্যরা রাজশাহী পুলিশ লাইন জ্বালিয়ে দিয়েছে। বহু পুলিশকে হত্যা করেছে। উর্দুভাষী বিহারীদের সাথে নিয়ে তারা হিন্দুদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, নির্বিচারে লুটপাট ও ধর্ষণ করেছে। শহরে সারা রাত কারফিউ থাকে। দিনে দু’চার ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়। সেই সুযোগে শহরের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে গঞ্জে পালিয়েছে। অনেকে পদ্মা নদী পার হয়ে পালিয়ে গেছে ভারতে। স্কুল কলেজ দোকানপাট সব বন্ধ। দিনের বেলাতেও শহরটা খাঁ খাঁ করে। আব্বা ভেবে চিন্তে গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

রাজশাহী শহরে তখন একটা ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যান্ড ছিল। কিন্তু শহরের ভয়াবহ অবস্থার কারণে স্ট্যান্ডে কোন গাড়ি পাওয়া গেল না। ঢাকা-রাজশাহী রুটে স্বাভাবিক সময়ে দু’তিনটা বাস চলতো। তবে কাছাকাছি দূরত্বে যাতায়াতের জন্য সে সময় বাস তো দূরের কথা, ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া কোন যন্ত্রচালিত যানবাহনের ব্যবস্থা ছিলনা। সকাল আটটা থেকে চার ঘণ্টা কারফিউ প্রত্যাহারের সুযোগে আব্বা গ্রাম থেকে আসা লোকটিকে সাথে নিয়ে অনেক ঘুরে শহরের চণ্ডীপুর এলাকায় দুই কোচোয়ানের খোঁজ পেলেন। কিন্তু মিলিটারির ভয়ে তারা গাড়ি নিয়ে শহর থেকে বেরুতে রাজী নয়। আব্বা তাদের অনেক বোঝালেন। বললেন, ‘শুধু নওহাটা পর্যন্ত পৌঁছে দাও বাবা’।

ওরা কিছুতেই রাজী হয়না। শেষে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া পাওয়ার লোভে ওরা রাজী হয়ে গেল। কাপড় চোপড় আর প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র একটা বড় ট্রাঙ্কে ভরে বাড়ি ঘরে তালা দিয়ে আমরা সবাই ঘোড়ার গাড়িতে উঠে বসলাম। মা আর বড় বোনের পরনে কালো বোরখা। আমরা ছয় ভাইবোন গুটিসুটি মেরে দুই গাড়িতে আব্বা আর মায়ের সাথে ভাগাভাগি করে বসলাম। বড়ভাই বি,এ, ক্লাসের ছাত্র আর আমি সবে এস,এস,সি, পাশ করে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি। আমাদের এই দুই ভাইকে নিয়েই আব্বার যত চিন্তা। মিলিটারিরা নাকি যুবক ছেলেদের দেখলে মেরে ফেলছে। ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে। কারফিউ বিরতির বাকি দুই ঘণ্টার মধ্যে আমাদের যেভাবেই হোক নওহাটা পৌঁছাতে হবে। সেখানে পৌঁছাতে পারলে অনেকটা নিরাপদ হওয়া যায়। কারফিউ শুরু হয়ে গেলে মিলিটারিদের গাড়ি রাস্তায় নেমে আসবে। তখন বিপদ হতে পারে। দ্রুত গাড়ি ছোটানোর জন্য আব্বা কোচোয়ানদের তাগাদা দিলেন। তবে আল্লাহ সহায়। নওহাটা পর্যন্ত যাওয়ার পথে কোন বিপদ হলো না। আব্বা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

নওহাটা একটা ছোট গঞ্জ বিশেষ। বারানই নদের তীরে এর অবস্থান। আত্রাই নদীর শাখা হওয়ায় নৌপথে বারানই নদ দিয়ে ধান, পান, আখ, পাটসহ বিভিন্ন রকম মালামাল এই গঞ্জের হাটে আনা নেওয়া করা হয়। সেখানে পৌঁছে দেখি, আমাদের তিন চাচা ছই তোলা দুটো গরুর গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছেন আমাদের জন্য। মালপত্র ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামিয়ে গরুর গাড়িতে তোলা হলো। আমরা গরুর গাড়িতে উঠে বসলাম। তারপর ভাঙ্গাচোরা ধুলিময় কাঁচা রাস্তায় আমরা রওনা হলাম মধুপুরের উদ্দেশ্যে। চাচারা দু’জন চাকরসহ গাড়ির সাথে সাথে হেঁটে চললেন। আমার তখন একটাই ভাবনা, এই চৌদ্দ পনের মাইল রাস্তা চাচারা হেঁটে যাবেন কিভাবে? কষ্ট হবে না? আব্বাকে সে কথা বলতেই তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘এসব ওদের অভ্যাস আছে বাবা। তোমরা শহরে থাকো তো, তাই বুঝবে না। আমি স্কুলে পড়ার সময় রোজ দুই দুই চার ক্রোশ রাস্তা হেঁটে যাওয়া আসা করতাম। গ্রামে কী আর শহরের মতো বাড়ির কাছে স্কুল থাকে? দাদার বাড়ি গেলে সব বুঝতে পারবে।’
বড় চাচা আব্বার কথা শুনতে পেয়ে বললেন, ‘আমরা তো এর চেয়ে বেশি হেঁটে সপ্তাহে দু’তিন দিন হাট করি বাবা। আমাদের সাথে কিছুক্ষণ হেঁটে দেখ, মজা পাবে।’
মজা পাওয়ার জন্য আমরা ভাইবোনরা গরুর গাড়ি থেকে নেমে চাচাদের সাথে হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু একটু পরেই মজা ফুরিয়ে গেল। সবাই হাঁপিয়ে গেলাম। ঘেমে নেয়ে অস্থির। সব ছোট ভাইটা পা হড়কে পড়ে গেল। বড় ভাইয়ের স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেল। চাচারা হেসে খুন। আমাদের সবাইকে আবার গরুর গাড়িতে তুলে বসিয়ে দেওয়া হলো। গাড়িতে বসে আমি বড় চাচাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, ‘চাচা, এই গাড়িগুলো কী ভাড়া করা?’
বড় চাচা বললেন, ‘ভাড়া করা হবে কেন? বাড়ির গাড়ি।’
মা বললেন, ‘ওদের তো দাদার বাড়ি যাওয়া আসা নাই। জানবে কোত্থেকে?’
আমি একটু চুপ করে থেকে বললাম, ‘তাহলে আপনারা এত কষ্ট করে হেঁটে হাটে যান কেন চাচা? গরুর গাড়িতে গেলেই তো হয়!’
‘পোষায় না বাবা। গাড়ি যতক্ষণে এক ক্রোশ যাবে, আমরা ততক্ষণে হেঁটে দু’ক্রোশ চলে যাবো।’
‘এক ক্রোশ মানে কত মাইল চাচা?’
‘দু’মাইল।’
‘ও’ আমি মনে মনে ভাবলাম কত কিছু জানা নেই আমাদের। আমরা শহুরে মানুষ, গ্রামের জীবন সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানি না।

আমার জ্ঞান হওয়ার পর এই প্রথম গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। রাস্তার দু’পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাটি আর টিনের তৈরি ঘর বাড়ি থেকে নারী পুরুষ ছেলে মেয়ে সবাই বের হয়ে অবাক চোখে দেখছে আমাদের। পরিচিত কাউকে দেখলে চাচারা বলছেন, ‘বড় ভাইজানের পরিবার। রাজশাহী থেকে আসছে।’ আব্বাকে যারা চেনে, তারা সসম্মানে সালাম দিয়ে সরে যাচ্ছে। সরকার বাড়ির বড় ছেলে। মধুপুরসহ আশে পাশের গ্রামগুলোর লোকজনের কাছে সরকার বাড়ির অনেক সম্মান। এই এলাকার মধ্যে লেখাপড়া শিখে একমাত্র আব্বাই উকিল হয়েছেন, সম্মান পাওয়ার সম্ভবত সেটাও একটা কারণ। কেউ কেউ অতি উৎসাহে গরুর গাড়ির পিছে পিছে চাচাদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে আসছে। এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে। শহরের খবর কী জানতে চাইছে। চাচারা ওদের বোঝাচ্ছেন, ‘ভাইজান এখন ক্লান্ত। এখন এসব কথা থাক। সন্ধ্যের পর বাড়িতে এসো, সব জানতে পারবে।’

মাঝে মাঝে অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ি থামাতে হচ্ছে। কারণ আর কিছুই না। বিভিন্ন বাড়ি থেকে ঘোমটা টানা মহিলারা মুড়ির মোয়া, বাতাসা আর ঠাণ্ডা পানি হাতে গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে আর মাকে সালাম দিয়ে বলছে, ‘ছেলেপুলেগুলোর মুখ শুকিয়ে গেছে ভাবী। ওদের একটু পানি খাওয়ান।’
আমরা ভাইবোনরা তো কাউকেই চিনি না। আব্বা এবং মা তাদের কাউকে কাউকে চিনতে পারছেন। যেমন আব্বা হয়তো কাউকে বলছেন, ‘এই তুই গফুরের ব্যাটা আলতাফ না?’ মা হয়তো কাউকে বলছেন, ‘তুমি তো ময়নার মা, তাই না?’ সরকার বাড়ির বড় ছেলে ও বড় বউ তাদের চিনতে পারছে তাতেই তারা খুশি। অথচ তারা আমাদের আত্মীয় স্বজন কেউ না। আমরা ভাইবোন অবাক হয়ে সব দেখছি।

গফুরের ছেলে আলতাফ গরুর গাড়ির সাথে হাঁটতে হাঁটতে আসছে আর আব্বার কাছে একটা আবদার করছে। ছেলেমেয়ে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে তার মতো গরিবের বাড়িতে বসে একটু জিরিয়ে নিতে হবে আর দু’টা ডালভাত খেতে হবে। বেলা গড়িয়ে গেছে, নিশ্চয় ছেলেমেয়েদের ক্ষিধে পেয়েছে। আলতাফের সামান্য এই আবদার শেষে পীড়াপীড়িতে পরিণত হলো। আব্বা বললেন, ‘না রে আজ থাক। আর একদিন হবে। শহরের যা অবস্থা, কতদিন যে গাঁয়ে থাকতে হবে কে জানে?’
চাচারা গাড়োয়ানদের তাগাদা দিয়ে বললেন, ‘চল্ চল্।’

আমাদের মধুপুর গ্রামে ঢোকার পর এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হলো। সে যুগে মোবাইল ফোন ছিল না। অথচ শুধু মুখে মুখে প্রচার হতে হতে আমাদের গাঁয়ে আসার সংবাদ জানতে কারো আর বাঁকি নাই। সবাই সালাম দিয়ে আব্বার কাছে শহরের খবর জানতে চাচ্ছে আর ছেলে বুড়ো নারী পুরুষ প্রায় মিছিলের মতো করে আমাদের গাড়ির সাথে সাথে আসছে। চাচারা যথাসম্ভব তাদের সামাল দিচ্ছেন আর গাড়োয়ানদের দ্রুত গাড়ি চালানোর জন্য ধমকা ধমকি করছেন। এভাবে দাদাবাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যে পার হয়ে গেল। সকাল দশটার দিকে রাজশাহী থেকে রওনা দিয়ে আমরা দাদার বাড়ি পৌঁছালাম সন্ধ্যের পর।
সেখানে পৌঁছানোর পর আর এক মহাযজ্ঞ। বাড়িসুদ্ধ মানুষ গম গম করছে। চাচীমারাসহ প্রতিবেশি ও দূর দূরান্ত থেকে আসা মহিলারা কেউ মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করছে, কেউ মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। আমরা ভাইবোনরাও তাদের জড়িয়ে ধরা ও কান্নাকাটির শিকার। এদের মধ্যে কারা যে আমাদের আত্মীয় আর কারা অনাত্মীয় বোঝা মুশকিল। দাদাজান ভেতর বাড়ির একটা ঘরের বারান্দায় কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসেছিলেন। আব্বা ও মা গিয়ে তাঁকে পা ছুঁয়ে সালাম করলেন। আমাদের ভাইবোনদের সবাইকে নিয়ে যাওয়া হলো দাদাজানের কাছে। মা আমাদের এক এক করে তাঁর কোলের কাছে নিয়ে এলেন এবং নাম বলতে থাকলেন। অন্ধ দাদাজান তাঁর দু’হাত দিয়ে আমাদের স্পর্শ করে বিড় বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলেন। এরপর দাদীর পালা। তিনি আমাদের জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর ফোকলা মুখের টুকরা টুকরা কথাবার্তা শুনে বোঝা গেল, মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেয়ে আমরা যে সহি সালামতে আমাদের বাপের বাস্তুভিটায় ফিরে আসতে পেরেছি এই আনন্দে তাঁর এই ক্রন্দন।

টিনের ছাউনি দেওয়া পুরু মাটির দেয়ালের অনেকগুলো ঘর চওড়া বারান্দাসহ প্রায় আধা-বৃত্তাকারে ঘিরে আছে এক বিশাল উঠানকে। উঠানের এক প্রান্তে লম্বা চওড়া বিরাট রান্নাঘর। অন্য প্রান্তে পাশাপাশি দুটো ধানের গোলা। দাদাজানের এত বড় পরিবার এখনও একান্নবর্তী। রান্নাঘরে ভোর থেকে রান্না বান্না শুরু হয়, সন্ধ্যে পর্যন্ত চলতে থাকে। বাড়ির সদস্যদের খাওয়া দাওয়ার কোন নির্দিষ্ট সময় নাই। যে যখন আসে খেয়ে দেয়ে চলে যায়। তা’ ছাড়া বাড়ির কামলা কিষাণ চাকর বাকর এরা তো আছেই। সারাদিন চুলায় আগুন জ্বলতে থাকে। এখন সেখানে আমাদের জন্য স্পেশাল রান্না বান্না হচ্ছে। বাড়ির মুরগি জবাই করা হয়েছে। মাছ ভাজা হচ্ছে। লোহার কড়াই ভর্তি দুধ জ্বাল দেওয়া হচ্ছে। বাড়ির গাইয়ের টাটকা দুধের মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সরকারের নাতি নাতনিরা রাতে দুধভাত খাবে। ইতিমধ্যে ভুট্টার খই, চিঁড়েভাজা, মুড়ি মুড়কি, খাগড়াই আর দই নাড়ু দিয়ে আমাদের নাস্তা খেতে দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মানুষ সন্ধ্যের পর পরই রাতের খাওয়া সেরে ফেলে। আজ আর এ বাড়িতে সেটা হচ্ছে না। আজ এ বাড়ির লোকেদের বোধহয় খাওয়া দাওয়া সারতে অনেক রাত হবে।

বাড়ির ভেতরে অনেক হারিকেন আর কুপিবাতি জ্বালানো হয়েছে। উঠানের মধ্যে মাদুর, খেজুরের পাটি আর শতরঞ্জি বিছানো হয়েছে। সেখানে সামনের দিকে বসেছেন বাড়ির পুরুষ সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরা, পেছনের দিকে পাড়া পড়শি ও অন্যান্যরা। তাদের মুখোমুখি একটা কাঠের চেয়ারে বসে শহরের অবস্থা বর্ণনা করছেন আব্বা। শ্রোতাদের মধ্যে থেকে ঘন ঘন ‘উফ্’, ‘আহ্’ ‘সর্বনাশ’ ইত্যাদি নানারকম আর্তধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এদিকে মা বারান্দায় বসে আমাদের সাথে আত্মীয় স্বজনের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।
‘এ হলো তোদের বড় চাচীমা, এ হলো মেজ চাচীমা আর এ হলো তোদের ছোট চাচীমা। সালাম কর।’
চাচীমারা বোধহয় অপেক্ষাতেই ছিলেন। সালাম করার আগেই আমাদের সবাইকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে গালে চুমু দেওয়া শুরু করলেন তাঁরা।
‘ও ভাবী, এই সোনার টুকরারা কত বড় হয়ে গেছে, আল্লারে! কতদিন তোমাদের দেখিনি বাবা।’
‘আর এই যে মেয়েটাকে দেখছিস’ একটা তের চৌদ্দ বছর বয়সের মেয়েকে দেখিয়ে মা বললেন, ‘এ হলো তোদের বড় চাচার মেয়ে আলেয়া।’
মেয়েটার কপালে চুমু দিয়ে তাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন মা। তারপর বললেন, ‘আর ওই পিচ্চি দু’টা আলেয়ার ছোট ভাই। আর এই এরা হলো দুই ভাই এক বোন। তোদের মেজ চাচার। আর ঐ যে বাঁশের খুঁটি ধরে ভ্যাদ ভ্যাদ করে কাঁদছে, ওটা তোদের ছোট চাচার একটাই ছেলে। তোদের বংশে মেয়ে কম, ছেলেই বেশি।’
চাচীমারা তাদের ছেলেমেয়েদের ছাগল ঠেলার মতো করে ঠেলে এনে আমাদের বড় তিন ভাই বোনের পা ছুঁয়ে সালাম করালেন। লক্ষ্য করে দেখলাম, একমাত্র আলেয়া ছাড়া আর সবারই নাক দিয়ে সর্দি ঝরার বয়স। আরো কিছু আত্মীয় স্বজনের সাথে আমাদের পরিচয় করানো হলো। পরিচয় শেষে তারা মাকে কেন্দ্র করে বারান্দায় গোল হয়ে বসে গল্প শুরু করে দিল। মা হলেন তাদের কারো ভাবী, কারো বড়মা আবার কারো বৌমা। মা এ বাড়ির বড় বউ। গ্রামে যাতায়াত থাকায় তাঁকে কমবেশি সবাই চেনে। সুতরাং গল্প জমে উঠতে সময় লাগলো না। আমার বোন আর ছোট তিন ভাই মায়ের সাথেই বসে থাকলো। বড়ভাই উঠানে চাচাদের পাশে গিয়ে বসলেন। আর আমি নিজের অবস্থান ঠিক করতে না পেরে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। হঠাৎ করে ভিন্ন এক পরিবেশে এসে পড়ায় আমার মন খারাপ হয়ে গেছে।

রাতে মুরগির ঝোল, ভাজা মাছ আর দুধ কলা দিয়ে ভাত খেয়ে আমরা পাঁচ ভাই বোন ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়লাম। শুধু বড়ভাই চাচাদের সাথে বসে গল্প করতে লাগলেন। আর মাকে ঘিরে মহিলাদের গল্পগুজব বোধহয় সে রাতে আর ফুরালো না।
*************************************************
আত্মজৈবনিক উপন্যাসঃ স্বপ্ন বাসর (পর্ব-২)

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ৯:৩৬
২৬টি মন্তব্য ২৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রশ্ন-উত্তর

লিখেছেন সাইন বোর্ড, ০৫ ই জুন, ২০২০ সকাল ১১:৫২


শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে জানতে চাইল - বল তো বর্তমান বিশ্বে সব চেয়ে ঘৃণিত প্রধানমন্ত্রী কে ? (অবশ্যই দেশের নামসহ বলতে হবে)

ছাত্র হা করে চেয়ে আছে, কোন কথা বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনার মাঝে আবার ভারতীয় মশামাছি

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৫ ই জুন, ২০২০ বিকাল ৫:১৬



৩ সপ্তাহ আগের ছোট একটি ঘটনা; পিগমী ভারতীয়দের হাতে অসহায় হাতীর করুণ মৃত্যুতে ঘটনাটা এখন বড়ই মনে হচ্ছে; সেটা নিয়ে পোষ্ট।

লকডাউনের মাঝে, মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার রাজিব খানের ফাসি চাই। দু:খিত, টাইপিং মিষ্টেক। ব্লগার রাজীব নুরের মডারেশন স্ট্যাটাস সেফ চাই

লিখেছেন গুরুভাঈ, ০৫ ই জুন, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৮



ব্লগার রাজীব নুর ব্লগ প্রাণবন্ত করতে গিয়ে তার নাম গোত্রীয় আর এক নুরের সাথে ব্লগীয় কবিতা কবিতা পোস্ট করতে গিয়ে মডারেট হয়ে গেছে। আমেরিকান পুলিশ যেভাবে ফ্লয়েডের গলায় হাটু চাপা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ম্যাওম্যাও প্যাঁওপ্যাঁও চাঁদ্গাজীকে অভিনন্দন!

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ০৫ ই জুন, ২০২০ রাত ৮:২৪



অভিনন্দন কেন? কারণ আমাকে টপকিয়ে এখন তিনিই সামুর সর্বাধিক কমেন্টকারী। আমার করা কমেন্টের সংখ্যা অনেকদিন আগেই ৭০ হাজার+ হয়েছিলো। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এই রেকর্ড কেউ ভাংতে পারবে না। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ্যাটম বোমার জনক ওপেনহাইমার কি একজন মানব হন্তারক না মানবতাবাদী ছিলেন?

লিখেছেন শের শায়রী, ০৫ ই জুন, ২০২০ রাত ৮:৩৬


লস আলমাস যেখানে প্রথম এ্যাটম বোমার ডিজাইন করা হয়েছিল

যুদ্ধ শেষ। লস আলমাসে যেখানে এই এ্যাটম বোমা তৈরীর ডিজাইন করা হয়েছিল এবং বোমা বানানো হয়েছিল ( রবার্ট ওপেনহাইমার এই লস আলমাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

×