somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আত্মজৈবনিক উপন্যাসঃ স্বপ্ন বাসর (পর্ব-৩)

০৬ ই নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আত্মজৈবনিক উপন্যাসঃ স্বপ্ন বাসর (পর্ব-২)

যেদিন সে প্রথম দেখিনু
সে তখন প্রথম যৌবন।
প্রথম জীবনপথে-বাহিরিয়া এ জগতে
কেমনে বাঁধিয়া গেল নয়নে নয়ন।


হাট দেখার খুব শখ ছিল। আমরা শহরের ছেলে মেয়েরা কোনদিন হাট দেখিনি। অথচ গ্রামের লোকেদের কাছে হাটের গুরুত্ব খুব। একদিন ঠিক হলো আমরা সব ভাই বোন মিলে হাট দেখতে যাবো। হাটে নাকি হরেক রকম জিনিস ওঠে। তিলের খাজা, গুড়ের জিলাপী, ভুট্টার খই, খাগড়াই, বাতাসা, কদমা, লাড্ডু, বেলুন, বাঁশি, নাটাই, ঘুড়ি ইত্যাদি এমন কিছু নাই, যা হাটে ওঠে না। মেয়েদের চুলের ফিতা, রেশমি চুড়ি, স্নো, পাউডার, লিপস্টিক সবই পাওয়া যায়। লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা, চপ্পল এসবেরও দোকান বসে। হাটের একদিকে ধান, পান, আখ, পাট ইত্যাদি এবং অন্যদিকে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি এসবের বেঁচাকেনা হয়, আরেক দিকে খাবার জিনিস, কসমেটিক্স ও কাপড় চোপড়ের বেঁচাকেনা চলে। বহু লোকের সমাগমে হাট গম গম করে।
এত রাস্তা আমরা হেঁটে যেতে পারবো না বলে আমাদের জন্য গরুর গাড়ির ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে বড়ভাই ঘোষণা দিলেন, তিনি হাটে যাচ্ছেন না। তাঁর মতে, হাটে আবার দেখার কী আছে? শহরের বাজারও যা, গ্রামের হাটও তাই। শহরের বাজার প্রতিদিন বসে, গ্রামের হাট সপ্তাহে একদিন বসে। এই তো ফারাক। অতএব শুধু শুধু গরুর গাড়িতে ঝাঁকুনি খেয়ে কোমর পিঠ ব্যথা করার কোন দরকার আছে?
মাছের মাথা যায় যেদিকে, লেজও যায় সেদিকে। আমার অন্যান্য ভাইবোনরাও বড়ভাইয়ের পদাংক অনুসরণ করলো। তারা কেউ যাবে না। এদিকে আমার হাট দেখতে যাওয়ার খুব ইচ্ছা। আলেয়ার সাথে বনে বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে আমার আর ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগে না। আমার মনোভাব বুঝতে পেরে বড় চাচা বললেন, ‘তুমি চলো।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু আমার একার জন্য গরুর গাড়ি.........।’
‘আরে বাবা, বাড়ির গাড়ি যাবে আসবে, তাতে অসুবিধা কী? যাও, যাও, গাড়িতে ওঠো।’
আলেয়া আবদার করলো, সেও যাবে। বড় চাচা বললেন, ‘তুই মেয়েমানুষ হাটে গিয়ে কী করবি?’
বড় চাচীমা তড়িঘড়ি করে বললেন, ‘ওর মেজ ভাইয়ের সাথে যেতে চাচ্ছে, যাক না!’
বড় চাচা রাজী হলেন। বললেন, ‘যা তাড়াতাড়ি বোরখা পরে আয়।’

বড় চাচার সাথে পানের টুকরি মাথায় নিয়ে ছয় সাত জন কামলা হেঁটে চলে গেছে আগেই। ঢিমে তালের গরুর গাড়িতে বসে আমি আর আলেয়া গল্প করতে করতে যাচ্ছি। এসব গল্পেরও কোন ঠাঁই ঠিকানা নাই। কলেজে আমরা ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ি শুনে আলেয়ার আক্কেল গুড়ুম।
‘ওমা, এত বড় বড় ছেলেমেয়ে একসাথে পড়ে?’
‘হাঁ, পড়ে।’
‘মেয়েরা কী বোরখা পরে কলেজে আসে?’
‘না।’
‘অত বড় ধিঙ্গি ধিঙ্গি মেয়ে আমাদের মতো সালোয়ার কামিজ ফ্রক প্যান্ট পরে কলেজে যায়?’
‘হাঁ, যায়। তবে ফ্রক প্যান্ট পরেনা। ফ্রক প্যান্ট তো বাচ্চা মেয়েদের পোশাক।’
‘বাচ্চা মেয়েদের কী বলছেন মেজভাই? আমি তো এক দেড় বছর আগেও ফ্রক প্যান্ট পরেছি।’
‘তখন তো তুই বাচ্চাই ছিলি।’
এবার আমার প্রশ্ন, আলেয়ার উত্তর।
‘আচ্ছা, তোর মাথায় এত চুল পরিস্কার রাখিস কিভাবে? চুলে উকুন লাগেনা?’
‘মাঝে মাঝে লাগে। শরিফার বিচি গুঁড়ো করে নিমের তেলে ভিজিয়ে মাথায় লাগালে ভালো হয়ে যায়।’
হাটের কাছাকাছি এসে আলেয়া আমার হাতে কিছু সিকি আধুলি দিয়ে বললো, ‘মেজভাই, হাট থেকে আমার জন্যে একটা লিবিসটিক কিনবেন তো। আমার লিবিসটিকের খুব শখ। কিন্তু...।’ একটু চুপ করে থেকে আলেয়া আবার বললো, ‘অবশ্য আপনি কিনে দিলে কেউ কিছু বলবে না।’
হাটে আসার আগে মা আমার হাতে কিছু টাকা দিয়েছিলেন। আমি আলেয়ার সিকি আধুলি ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এগুলো রাখ, আমার কাছে টাকা আছে। তোকে সাথে নিয়ে কিনবো। তোর পছন্দ মতো কিনতে পারবি।’
আলেয়া ঘাবড়ে গিয়ে বললো, ‘আব্বা তো আমাকে হাটের মধ্যে যেতে দেবে না।’
‘আচ্ছা, যেতে না দিলে তখন দেখা যাবে। তুই ভাবিস না। লিপস্টিক পেলেই তো হলো।’
হাটে পৌঁছে দেখি, বড় চাচা পান বিক্রির কাজ শেষ করে বাড়ির জন্য রসগোল্লা, গুড়ের জিলাপী আর তিলের খাজা কিনে একটা ছাতিয়ান গাছের নিচে বসে আছেন। পরিশ্রান্ত কামলারা বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে।
আমি গাড়ি থেকে নেমে বড় চাচাকে বললাম, ‘চাচা, আলেয়া আমার সাথে একটু হাটে বেড়াতে যেতে চাচ্ছে। বোরখা পরেই যাবে। নিয়ে যাবো?’
বড় চাচা একটু অপ্রস্তুত হলেন। বললেন, ‘আচ্ছা যাক, তবে তোমরা বেশি দেরি করো না বাবা। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে পার হয়ে যাবে।’
বড় চাচা গাইড হিসাবে একজন কামলাকে আমাদের সাথে দিয়ে দিলেন। আলেয়া মহা খুশি। জীবনে কখনো এভাবে হাটে বেড়ানোর সুযোগ পায়নি সে। আমার গায়ে গায়ে ঘেঁষে সারা হাট ঘুরে বেড়ালো সে। তার লিপস্টিক (আলেয়ার উচ্চারণে লিবিসটিক) কেনা হলো। লিপস্টিকের রং টকটকে লাল। সাথে কয়েক গাছি রেশমি চুড়ি, চুলের ফিতা আর স্নো-পাউডারও কেনা হলো। মেজ ভাইয়ের অনেক পয়সা খরচ হয়ে গেল বলে আলেয়া আনন্দের সাথে দুঃখ প্রকাশ করলো। ওর এই ছেলেমানুষি আনন্দ দেখে আমারও আনন্দ হলো। হাটের এক দোকানে বসে আমরা দু’জন আলু পটলের তরকারি দিয়ে গরম গরম লুচি খেলাম। বোরখা পরা মহিলা খদ্দের পেয়ে দোকানদার খুব খাতির করলো। আমাদের কামলার কাছে সরকার বাড়ির নাতি নাতনির পরিচয় পেয়ে তার খাতির আরো বেড়ে গেল। খাওয়া শেষে দাম দেওয়ার সময় দোকানদার দাম না নিয়ে হাত গুটিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বসে রইল। আমি বললাম, ‘দাম নিচ্ছেন না কেন?’
জানা গেল, বড় চাচার তরফ থেকে ইতিমধ্যেই খাবারের দাম পরিশোধ করা হয়ে গেছে। বড় চাচা আমাদের সাথে আসেননি, অথচ দাম শোধ করা হয়ে গেল! এই গায়েবী পেমেন্টের শানে নজুল ঠিক বোঝা গেল না। আমি বোকার মতো আলেয়ার হাত ধরে বেরিয়ে এলাম দোকান থেকে।
যাই হোক, হাট বেড়িয়ে ফেরার পথে আমাদের গাড়ির কাছাকাছি এসে এক আইসক্রিমওয়ালাকে পাওয়া গেল। আমি বললাম, ‘আলেয়া, আইসক্রিম খাবি?’
আলেয়া ওর বাপের দিকে তাকিয়ে হাঁ বা না কিছুই বললো না। আমি দু’আনা দামের দুটো আইসক্রিম একটা ওর হাতে দিলাম, আর একটা নিজে চুষতে চুষতে দাম দিতে গিয়ে দেখি বড় চাচা একজন কামলার হাত দিয়ে দাম পাঠিয়ে দিয়েছেন।
আলেয়া বোরখার নেকাব তুলে মহা আনন্দে আইসক্রিম খাচ্ছে। আমিও খাচ্ছি। গরমে আইসক্রিম গলে রঙিন পানিতে আমার জামা আর আলেয়ার বোরখা রঙিন হয়ে যাচ্ছে। বড় চাচা আমাদের দু’জনকে এ অবস্থায় দেখে একটু বিব্রত। তিনি গাড়োয়ানদের তাড়া দিলেন গরু জুড়ে গাড়ি প্রস্তুত করতে।
হাট থেকে মধুপুর চার ক্রোশ রাস্তা। অর্ধেকটা পথ আসার পর ভুলে যাওয়া কথাটা আমার মনে পড়ে গেল। এই কথাটা আলেয়াকে জিজ্ঞেস করবো বলে অনেকক্ষণ থেকে ভাবছিলাম। কিন্তু হাটে ঘুরাঘুরি করতে গিয়ে আর মনে ছিল না।
‘আচ্ছা আলেয়া, তোকে একটা কথা বলি।’
‘কী কথা মেজভাই?’
‘এই যে তুই হাটে আসার সময় বললি যে, আমি তোকে লিপস্টিক কিনে দিলে কেউ কিছু বলবে না। আমি কিনে দিলে কেউ কিছু বলবে না কেন?’
আলেয়া মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। আমি একটু অপেক্ষা করে বললাম, ‘কি রে কিছু বলছিস না যে!’
‘আপনি যদি রাগ না করেন তো বলতে পারি।’ আলেয়ার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
‘আচ্ছা বেশ, রাগ করবো না। তুই বল।’
গাড়োয়ান যাতে শুনতে না পায় সে জন্য আলেয়া আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে ফিস ফিস করে বললো, ‘আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে তো, তাই।’
‘কী বলছিস তুই?’ আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘এ কথা তোকে কে বলেছে?’
‘হু শ্ শ্!’ আলেয়া ঠোঁটের ওপর আঙ্গুল রেখে গাড়োয়ানের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইশারায় আস্তে কথা বলতে বললো। তারপর সে নিজে ফিস ফিস করে যা বললো, তা’ শুনে আমি প্রায় নির্বাক হয়ে গেলাম। মনে হলো আমার শরীরটা যেন অবশ হয়ে গেছে। শুনলাম আমার জন্মের পর আমার আর আমার মায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রামের কাহিনী।

আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মা প্রায় মরতে বসেছিলেন। সে যুগে সেই অজ পাড়াগাঁয়ে না ছিল ডাক্তার, না ছিল ওষুধ। তিন মাস আমার মা জীবন্মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন বিছানায়। সে সময় হুঁশ জ্ঞান ছাড়া কোন রকমে শুধু বেঁচে ছিলেন তিনি। কবিরাজি শিঁকড় বাকড় দিয়ে চিকিৎসা হতো তাঁর।
এদিকে আমি ছিলাম অপরিণত শিশু। নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস আগে আমার জন্ম হয়। ফলে তখনকার দিনে মধুপুরের মতো গণ্ডগ্রামে আমারও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল প্রায় শুন্য। আলেয়ার মা তখন সরকার বাড়িতে নতুন বউ। পল্লী সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় তাঁরও বিয়ে হয়েছিল খুব কম বয়সে। তা’ সত্ত্বেও তিনি আমাকে ও আমার মাকে বাঁচানোর সব দায়িত্ব তুলে নিলেন নিজের কাঁধে। অচেতন অবস্থায় মায়ের কাপড় বদলানো, মাথার চাঁদিতে তেল ঘষে চুল আঁচড়ে দেওয়া, মায়ের নোংরা পরিস্কার করা, মাঝে মাঝে মায়ের হুঁশ ফিরলে আতপ চালের পাতলা জাউ খাওয়ানো-কী করেননি তিনি?
আমার বড়ভাই ও বড়বোন তখন খুব ছোট। তাদের গোসল, খাওয়া, ঘুম সব কিছু করতে হতো বড় চাচীমাকে। মা রাতে নিষ্প্রাণ পড়ে থাকতেন খাটে, আর বড় চাচীমা আমাকেসহ আমার দুই ভাইবোনকে নিয়ে শুয়ে থাকতেন মেঝেতে। মা-ছেলে দু’জনের যত্ন নিতে গিয়ে রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিতেন তিনি।

আমার জন্মের পর আমি নাকি কাঁদিনি। এ নিয়ে সরকার বাড়ির সবাই খুব উদ্বিগ্ন ছিল সে সময়। অপরিণত অবস্থায় জন্মের কারণে আমার চোখ ফুটতেও দেরি হয়। বড় চাচীমার আপ্রাণ চেষ্টায় আর দাদাজানের দোয়া দরূদ পাঠের কল্যাণে দুই দিন পর আমি নাকি হঠাৎ চিৎকার করে নবজাতকের কান্না কেঁদে উঠি। আমাকে বুকে নিয়ে বড় চাচীমাও শিশুর মতো কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে সাফল্যের আনন্দে তিনি হাসতে থাকেন। আমি যত কাঁদি, বড় চাচীমা তত হাসেন। স্বর্গ থেকে নেমে আসা মাতৃস্নেহে উতলে ওঠে বড় চাচীমার মন।
মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ ছিল না। আমাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য মায়ের কাছে নেওয়া হলে দুধের অভাবে আমার পেট ভরতো না। আমি কান্নাকাটি করতাম। বড় চাচীমা গরুর দুধে পানি মিশিয়ে পাতলা করে কাঁচের ফিডারে ভরে আমাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করতেন। আমি হাত পা ছুঁড়তাম, পেশাব পায়খানা করে বড় চাচীমার গা নোংরা করে দিতাম। বড় চাচীমা হাসিমুখে সব সহ্য করতেন। কাঁথায় জড়িয়ে আমাকে সব সময় তাঁর বুকের মধ্যে ধরে রাখতেন। আমার যেন ঠাণ্ডা না লাগে, ক্ষিধেয় কষ্ট না পাই এসব দিকে তাঁর ছিল সার্বক্ষণিক নজর। যেন আমি ছিলাম তাঁরই সন্তান। মা একটু সুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত পুরো তিনটি মাস আমার মা হয়ে বড় চাচীমা এভাবেই আমাকে বুকে নিয়ে কাটিয়ে দেন।
ইতিমধ্যে আব্বা ওকালতি পরীক্ষায় পাশ করে রাজশাহী বারে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। রাজশাহী শহরে তিনি বাড়ি ভাড়া নিলেন এবং আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। দাদাজান বলেছিলেন, ‘বউমার শরীরটা আর একটু সেরে উঠলে তখন নিয়ে গেলে ভালো হতো না?’
আব্বা বলেছিলেন, ‘বাপজান, ওর শরীরের দিকে তাকিয়েই তো তাড়াতাড়ি যেতে চাচ্ছি। রাজশাহী শহরে আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। সেখানে পাশ করা ডাক্তার, ওষুধপত্র সবই আছে। আপনার বউমা তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে।’
দাদাজান বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। উকিল ছেলের কথা তাঁর মনে ধরলো। তিনি রাজী হয়ে গেলেন।

শহরে রওনা হওয়ার তিনদিন আগে থেকে বড় চাচীমা শুধু কাঁদেন আর কাঁদেন। আমার গায়ে তেল মাখানোর সময় কাঁদেন, কপালে কাজলের টিপ দেয়ার সময় কাঁদেন, ফিডারে দুধ খাওয়ানোর সময় কাঁদেন। কাঁথায় জড়িয়ে ধরে বুকে নিয়ে আদর করতে করতে কাঁদেন। আমি তখন একটু একটু হাসি মুখ করতে শিখেছি। বড় চাচীমা আমাকে তাঁর পায়ের ওপর শুইয়ে পা ঝাঁকিয়ে ঘুম দিতে দিতে কাঁদেন আর বলেন, ‘আমাকে কাঁদিয়ে তুই হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছিস আব্বা? তোর জানে কী একটু রহম নাই?’
বিদায়ের দিন মাকে জড়িয়ে ধরে বড় চাচীমার কান্না আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল। মাও কাঁদছেন ছোট শিশুর মতো। বাড়ির সবার চোখে পানি। মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার আর আমার এই ছেলের জন্য তুই যে কষ্ট করলি, নিজের বোন হলেও কেউ করতো না। তুই না থাকলে আমার এই ছেলে বাঁচতো না। আমি আজ সবার সামনে শপথ করে বলছি, তোর মেয়ে হলে তার সাথে এই ছেলের বিয়ে দিয়ে আমি তোর ছেলে তোর কাছেই ফিরিয়ে দেব। এই ছেলে জামাই হলেও তোর, ছেলে হলেও তোর। আমি এই ছেলেকে শুধু জন্মই দিয়েছি, কিন্তু তুইই ওর মা।’
বড় চাচীমা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে পড়ে রইলেন। দাদীমা ও উপস্থিত প্রতিবেশী মহিলারাও কাঁদছেন। দাদাজান বড় চাচীমাকে বললেন, ‘ওদের ছেড়ে দাও মা। অনেক পথ যেতে হবে। বেলা হয়ে যাচ্ছে।’
বড় চাচীমাকে এক রকম জোর করে ওঠানো হলো মায়ের পা থেকে। মোষের গাড়িতে চড়ে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমরা। বড় চাচীমা গাড়ির পিছে পিছে পাগলের মতো ছুটতে ছুটতে আসছেন। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেও উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটে আসছেন তিনি। মনে হচ্ছে যেন তাঁর সন্তানকে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁর কাছ থেকে। প্রতিবেশী মহিলারা আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাঁকে থামাতে পারছে না। মা গাড়িতে বসে হাউ মাউ করে কাঁদছেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলছেন, ‘তোর ছেলেকে আমি তোর কাছে ফিরিয়ে দেব রে, আল্লাহর কসম। এখন শান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যা বোন।’
তারপর ধীরে ধীরে সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কাঁচা রাস্তায় মোষের গাড়ির চাকায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ নাই। আমি আমার তিন মাসের পালক মায়ের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গর্ভধারিণী মায়ের কোলে শুয়ে রওনা হলাম শহরের দিকে।
******************************************************
আত্মজৈবনিক উপন্যাসঃ স্বপ্ন বাসর (পর্ব-৪)


সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:৩৬
১৯টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রশ্ন-উত্তর

লিখেছেন সাইন বোর্ড, ০৫ ই জুন, ২০২০ সকাল ১১:৫২


শিক্ষক তার ছাত্রের কাছে জানতে চাইল - বল তো বর্তমান বিশ্বে সব চেয়ে ঘৃণিত প্রধানমন্ত্রী কে ? (অবশ্যই দেশের নামসহ বলতে হবে)

ছাত্র হা করে চেয়ে আছে, কোন কথা বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনার মাঝে আবার ভারতীয় মশামাছি

লিখেছেন চাঁদগাজী, ০৫ ই জুন, ২০২০ বিকাল ৫:১৬



৩ সপ্তাহ আগের ছোট একটি ঘটনা; পিগমী ভারতীয়দের হাতে অসহায় হাতীর করুণ মৃত্যুতে ঘটনাটা এখন বড়ই মনে হচ্ছে; সেটা নিয়ে পোষ্ট।

লকডাউনের মাঝে, মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার রাজিব খানের ফাসি চাই। দু:খিত, টাইপিং মিষ্টেক। ব্লগার রাজীব নুরের মডারেশন স্ট্যাটাস সেফ চাই

লিখেছেন গুরুভাঈ, ০৫ ই জুন, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৮



ব্লগার রাজীব নুর ব্লগ প্রাণবন্ত করতে গিয়ে তার নাম গোত্রীয় আর এক নুরের সাথে ব্লগীয় কবিতা কবিতা পোস্ট করতে গিয়ে মডারেট হয়ে গেছে। আমেরিকান পুলিশ যেভাবে ফ্লয়েডের গলায় হাটু চাপা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ম্যাওম্যাও প্যাঁওপ্যাঁও চাঁদ্গাজীকে অভিনন্দন!

লিখেছেন হাসান মাহবুব, ০৫ ই জুন, ২০২০ রাত ৮:২৪



অভিনন্দন কেন? কারণ আমাকে টপকিয়ে এখন তিনিই সামুর সর্বাধিক কমেন্টকারী। আমার করা কমেন্টের সংখ্যা অনেকদিন আগেই ৭০ হাজার+ হয়েছিলো। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এই রেকর্ড কেউ ভাংতে পারবে না। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ্যাটম বোমার জনক ওপেনহাইমার কি একজন মানব হন্তারক না মানবতাবাদী ছিলেন?

লিখেছেন শের শায়রী, ০৫ ই জুন, ২০২০ রাত ৮:৩৬


লস আলমাস যেখানে প্রথম এ্যাটম বোমার ডিজাইন করা হয়েছিল

যুদ্ধ শেষ। লস আলমাসে যেখানে এই এ্যাটম বোমা তৈরীর ডিজাইন করা হয়েছিল এবং বোমা বানানো হয়েছিল ( রবার্ট ওপেনহাইমার এই লস আলমাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

×