এবারের ঈদে গ্রামের বাড়ি যেতে পারলাম না। না যাবার পিছে অনেকগুলো প্রতিকুল কারনও ছিলো। প্রথমত, অফিস থেকে ছুটি পাইনি। দ্বিতীয়ত, আমার বাচ্চারা সব ছোট ছোট, গ্রীস্মের এই তীব্র গরমে তাদের নিয়ে ঈদের সময গরু ছাগলের মতো ঠাসাঠাসি করে বাসে চড়া আমার পক্ষে রিস্কি। এসব বিবেচনায় গ্রামের বাড়ী যাওয়ার প্রোগ্রাম বাদ দিতে হলো।
যাই হোক ভাবছিলাম মাত্র তো তিনদিন, ঈদের সব বাহারি(!) টেলিভিশন প্রোগ্রাম আর সাথে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখে সময় কাটিয়ে দেব। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপে এবার নামি দামি দেশের আজে বাজে খেলা দেখে একটু হতাশই হলাম। তারপর খুব গভীর ভাবে লক্ষ্য করলাম আমার সময় একদম কাটছেই না। কারন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ঈদের যে অনুষ্ঠানমালা প্রচার করছে তা দর্শকদের জোর করে হাসানোর মতো অত্যান্ত নিম্নমানের ভাড়ামিযুক্ত নাটক/অনুষ্ঠানে ভরা।যা ধৈয্য ধরে এবং সময় নষ্ট করে দেখার মতো কোন রুচিশীল দর্শকের আগ্রহ আছে বলে মনে হয়না(ঢালাও ভাবে সবাইকে অবশ্য বলা যাবেনা)। দুইএকটা হাতে গোনা অনুষ্ঠান ছাড়া প্রায় সব একেবারে চতুর্থ শ্রেনীর অভিনেতা(!) দিয়ে সব চ্যানেল তাদের নাটক প্রচার করছেন এবং সব আঞ্চলিকতায় ভরা বিশ্রি ভাষায় রচিত ও অভিনীত। নাটকের নামগুলোও অশ্রাব্য এবং অনেকটা অশালীনও বটে যেমনঃ খালাতে বউ,ভোদাই, কাউয়া মদন, ঘাউরা মজিদ, চালু মাল, ইত্যাদি।
অথচ আমরা যারা অজো পাড়া গাঁয়ে বড় হয়েছি, তখন টিভিতে যে সব নাটক দেখতাম এবং তাতে যারা অভিনয় করত তাদের ভাষা, সংলাপ দেখে মনে মনে মুগ্ধ হয়ে ভাবতাম তারা কতো সুন্দর করে কথা বলে। মনের মধ্যে তাদের জন্য ভালোলাগা ও শ্রদ্ধাবোধ তৈরী হতো। খারাপ লাগে আমাদের বাচ্চারা টিভি নাটক/অনুষ্ঠান বলতে বুজবে ভাড়ামি আর ভারদের এবং আজে বাজে জিনিস শিখবে।
বাচ্চারা ঈদের দিন বাইরে যাবার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করলেও কোথাও গেলাম না এই গরমে কোথায় যাবো? পরের দিন চিন্তা করলাম ফাঁকা ঢাকার শহর একটু ঘুরে দেখি। আমি সল্পআয়ের মানুষ, গাড়ী নাই তাই দরকষা কষি করে সিএনজি ভাড়া করলাম। ঈদের সময় তাই সাধারন সময়ের চাইতে ভাড়া দেড়গুন বেশি। কি আর করার ভাবলাম বাচ্চাদের চিড়িয়াখানায় নিয়ে চিড়িয়া দেখিয়ে আনি, বাঘ,ভাল্লুক, বানর দেখে আনন্দ পাবে। চিড়িয়াখানায় পৌছে মনে হলো ঢাকার মানুষ কেউই গ্রামে যায়নি সব চিড়ীয়াখানায় আসছে। আমি আর ভিতরে ঢুকলাম না। চলে এলাম শিশু পার্কে কিন্তু হায় হায় এখানে গেটের সামনে পা ফেলার জায়গাও নাই আর ভিতরে হাজার হাজার মানুষ। আমার বাচ্চারা দরদর করে ঘামছে। নিরুপায় হয়ে ঢুকলাম রমনা পার্কে। সেখানেও সবশ্রেনির মানুষ গিজ গিজ করছে।তারপর বাচ্চাদের রমনার সবুজ ঘাসে কতক্ষন সময় কাটিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম।
প্রতিদিন আমরা প্রতক্ষ্য আর পরোক্ষ ভাবে আমরা যেসব মানসিক নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছি তা হয়ত আমাদের ভাবনায় আনার সময় আমরা পাইনা। টেলিভিশন চ্যানেলের অত্যাচার, বাড়ীওয়াল অত্যাচার, গাড়ী ভাড়ার অত্যাচার, ক্ষমতার অত্যাতার, চেতনার অত্যাচার, ফরমালিন আর ভেজালের অত্যাচার। এসব এখন গা-সওয়া করে নিয়েছি কিংবা বিবেকের সাথে সবাই আপোষ করে নিয়েছি। সবশেষে মনে হচ্ছিল আমার গ্রামে যাবার প্রোগ্রাম ক্যানসেল করা ঠিক হয়নি।একদিনের জন্য কষ্ট করে গেলেও অনন্তঃ এসব সহ্য করা লাগতনা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০১৮ সকাল ১০:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




