somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পদ্মার সর্বনাশা নাম ও তার বুকের কলঙ্ক তীলক দুরীকরনার্থে পরিবেশবাদীদের কর্মপ্রচেষ্টার একটি নিকট পর্যালোচনা

১৬ ই জুলাই, ২০১৯ রাত ১:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে/আমার রাখাল মন, গান গেয়ে যায়
এই আমার দেশ, এই আমার প্রেম আনন্দ বেদনায়, মিলন বিরহ সংকটে

ভাল লাগে কবিতা ও গানের কথামালা, এগুলি সকলেরি প্রাণে দেয় দোলা।
কবিতা ও গানে থাকা প্রতিটি কথাই অতি মনোহর অতি মুল্যবান
সেগুলিতে থাকা প্রতিটা কথা কিংবা শব্দেরই দ্যোতনা অতি মহান
তার কোন কোনটি পাঠকের চিত্তকেও করে ব্যকুল, করে ভাবাকুল-
সেই ছোট কাল হতেই দেখেছি শুনেছি
পদ্মাকে অনেকেই বলেছে সর্বনাশা ।
আমাদের এই সামুর পাতাতেও অনেক কবিতায় দেখা যায় এমনতর কথা ।
কবিদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি
পদ্মার কিছু ভয়াল চিত্রের কথা মনে করে একে কবিতায়
গানে কিছুটা আদর করে সর্বনাশাতো বলাই যায়!!!
তাইতো আবদুল লতিফের গানের কথা
সর্বনাশা পদ্মা নদী তোর কাছে শুধাই
নিয়ে আমাদের পল্লীগীতি সম্রাট আবদুল আলীম


গেয়েছেন বিখ্যাত গান সর্বনাশা পদ্মা নদী তোর কাছে শুধাই
সেখানে গানের কথায় হয়েছে বলা -
পদ্মারে তোর তুফান দেইখা পরান কাঁপে ডরে
ফেইলা আমায় মারিসনা তোর সর্বনাশা ঝড়ে।

কিন্ত আসলেই কি তাই ?
পদ্মা কি আসলেই সর্বনাশা !!!
তোফান কি পদ্মা সৃষ্ট নাকি মানব সৃষ্ট জলবায়ুর প্রভাব
বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায়ের


কালজয়ী উপন্যাস পদ্মা নদীর মাঝি তে যদিও পদ্মার কিছু ভয়াল চিত্রের সাক্ষাত পাওয়া যায়,তার পরেও পদ্মা পারের মানুষজন বিশেষ করে দরিদ্র জেলেদের প্রতি নদীটির পরম মমতাময়ী রূপও দেখা যায় সেই শতবছর আগেও ।
তার দুপাড়ের মানুষের জন্য পদ্মার সে কি অপরিসীম দয়া ,অসীম কান্না , অসীম মায়া ।
উল্লেখ্য, পদ্মা নদীর মাঝি বাংলা সাহিত্যে জেলেদের নিয়ে প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসে পদ্মা নদী পাড়ের জেলেদের সম্পর্কে লেখা আছে : দিবারাত্রি কোনো সময়েই মাছ ধরিবার কামাই নাই। সন্ধ্যার সময় জাহাজঘাটে দাঁড়াইলে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অনির্বাণ জোনাকির মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জেলে নৌকার আলো ওগুলি। সমস্ত রাত্রি আলোগুলি এমনিভাবে নদীবক্ষের রহস্যময় ম্লান অন্ধকারে দুর্বোধ্য সঙ্কেতের মতো সঞ্চালিত হয়। এক সময় মাঝরাত্রি পার হইয়া যায়। শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনে ও জাহাজঘাটে শান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষরাত্রে ভাঙা-ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি ওঠে। জেলে নৌকার আলোগুলি তখনো নেভে না। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ। লন্ঠনের আলোয় মাছের আঁশ চকচক করে, মাছের নিষ্পলক চোখগুলিকে স্বচ্ছ নীলাভ মণির মতো দেখায়। এই জেলেরা গরিবের মধ্যে গরিব, ছোটলোকের মধ্যে আরো বেশি ছোটলোক।


পদ্যা নদীর পাড়ের মানুষের দিন কেটে যায়। জীবন অতিবাহিত হয়। ঋতুচক্রে সময় পাক খায়, পদ্মার ভাঙন ধরা তীরে মাটি ধসতে থাকে, পদ্মার বুকে জল ভেদ করে জেগে উঠে চর, অর্ধ-শতাব্দীর বিস্তীর্ণ চর পদ্মার জলে আবার বিলীন হয়ে যায়। জেলেপাড়ার ঘরে ঘরে শিশুর ক্রন্দন কোনোদিন বন্ধ হয় না। ক্ষুধাতৃষ্ণার দেবতা, হাসিকান্নার দেবতা, অন্ধকার আত্মার দেবতা, ইহাদের পূজা কোনোদিন সাঙ্গ হয় না। এদিকে গ্রামের ব্রাহ্মণ কুলীন মানুষগুলি তাদের দূরে ঠেলে রাখে, ওদিকে প্রকৃতির কালবৈশাখী তাদের ধ্বংস করতে চায়, বর্ষার জল ঘরে ঢোকে, শীতের আঘাত হাড়ে গিয়া বাজে কনকন। আসে রোগ, আসে শোক। টিকে থাকার নির্মম অনমনীয় প্রয়োজনে নিজেদের মধ্যে রেষারেষি কাড়াকাড়ি করে তারা হয় হয়রান। জন্মের অভ্যর্থনা সেখানে গম্ভীর, নিরুৎসব, বিষণ্ণ। জীবনের স্বাদ সেখানে শুধু ক্ষুধা ও পিপাসায়, কাম ও মমতায়, স্বার্থ ও সঙ্কীর্ণতায়।
পদ্মানদীর চরাঞ্চলের মানুষের এই প্রায় শতাব্দি প্রাচীন চিত্রের আদৌ কি কোন পরিবর্তন হয়েছে ? না হয়নি ,
তার পরেও পদ্মা নদীর জন্য দেশের মানুষেরও সে কি আহাজারী
ফারাক্কার কারণে শুকিয়ে যাচ্ছে পদ্মা পাড়ের মানুষের জীবন ধারা
এর প্রভাব পড়ছে দেশের বিশাল অঞ্চলের পাকৃতিক ভারমাম্য আর যোগাযোগ ব্যবস্থায়,


সকলে্‌ই আমরা কামনা করছি পদ্মা যেন ফিরে পায় তার সেই প্রমত্তা উত্তাল জলরাশীর দিনগুলি
এই পদ্মা নদীর বেগমান চলার পথের যেনো হয়না কোন শেষ
জোয়ার ভাটায় বারে বারে পায় ফিরে যেন তার সেই হারানো যৌবনেরি রেশ।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও তার নদী শীর্ষক ৩০০ পঙক্তি সংবলিত বিখ্যাত কবিতায় পদ্মা নদী সম্পর্কে দিয়েছেন সুন্দর বর্ণনা যা রবীন্দ্রনাথের শিল্পচৈতন্যের উল্লেখযোগ্য একটি সৃষ্টিও বটে। কবিতায় থাকা সেই বর্ণনা পড়ে মনে হয় পদ্মা যেনো কবির জীবনদেবতারই একটা ছায়া । কবি যে কতো অন্তরঙ্গভাবে তার মানসপটে পদ্মাকে ধারণ করেছেন এবং তাঁর কবি কল্পনার সৌরভ ছড়িয়ে দিয়েছেন কবিতাটি পড়েই বুঝা যায়।
কবিতার কয়েকটি লাইন-
হে পদ্মা আমার
তোমায় আমায় দেখা শত শত বার
একদিন জনহীন তোমার পুলিনে
গৌধুলির শুভলগ্নে হেমন্তের দিনে
সাক্ষী করি পশ্চিমের সুর্য অস্তমান
তোমারে সঁপিয়াছিনু আমার পরান ।


এছাড়াও কবি পদ্মাকে কখনো দেখেছেন প্রেয়সীরূপে । পদ্মার প্রতি তার আবেগ, ভালোবাসা এবং উচ্ছ্বাসই তা প্রমাণ করে। তাই পদ্মাকে ভালোবেসে নদীমুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড়ো ভালোবাসি। ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত তেমনি পদ্মা আমার যথার্থ বাহন- খুব বেশি পোষমানা নয় কিছুটা বুনোরকম, তার পরেও পরম যতনে হাত বুলিয়ে ওকে আদর করতে ইচ্ছে করে
কবি গুরু বলেন নির্জনে নদীর বুকে দিন বয়ে যেত নদীর ধারারই মত সহজে । বোট বাধা থাকত ঘাটে,


বোট ভাসিয়ে চলে যেতুম, পদ্মা থেকে পাবনার ইছামতীতে, ইছামতী থেকে বড়লে হুড়োসাগরে, চলনবিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদীতে, যমুনা পেরিয়ে সাজাদপুরের খাল বেয়ে সাজাদপুরের কুঠিবাড়ীতে
শাহজাদপুর কুঠিবাড়ী


যাহোক, পদ্মার উজানে ভারতীয় অংশ গঙ্গার উপর মানুষের ভ্রান্ত প্রকল্প ফারাক্কা বাঁধের কারণে
সেই সাথে অতি বর্ষনে মানবের অপরিনামদর্শী পরিকল্পনার কারণে বন্যা আর প্লাবনে
পদ্মা তার এক কুল ভাঙ্গলেও আরেক কূল সে গড়ে অবলিলায়
আবার তার পানির তোরে কারো একূল ওকূল দুকূলই গেলে
তাদের লাগিও তারি বুকে আশা জাগানিয়া নবরূপ ধরে
বিশাল বিশাল সুজলা সুফলা নতুন চড় সে গড়ায় !!!
স্বচ্ছনীলাভ মণির মতো চোখ জোড়ানো
রুপালী ইলিশ দিয়ে পদ্মা নদী দেশের ভোজন প্রিয়
কোটি কোটি মানুষের জন্য সুস্বাদু রসনাও যোগায় ।
পদ্মার ইলিশ


এহেন গুণের আধার পদ্মা নদীকে যুগের পর যুগ ধরে শুধু কাব্যময় কথার খাতিরে
দেশের কতক কবি সাহিত্যিকদের হাত ধরে কেন তাকে বয়ে বেড়াতে হবে
নামের আগে এক গ্লাণিময় বিশেষণ সর্বনাশা শব্দের যাতনা বয়ে!!
এ প্রসঙ্গে মনে পরে-
রাম তাঁর হনুমান বাহিনী নিয়ে পাথর দিয়ে সাগরের উপর বাঁধ তৈরী করে
লঙ্কাপুরীতে গিয়েছিলেন সিতা উদ্ধারে,
সেখানে গিয়ে বীর হনুমান তার লেজে আগুন নিয়ে সুন্দর লঙ্কাপুরী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড় খাড় করে
সিতাকে রাবনের হাত থেকে উদ্ধার করে।
লেজে আগুন ধরিয়ে হনুমানের লঙ্কাকান্ড


তবে হনুমান বাহিনীকে নিয়ে রামের লঙ্কাপুরী ধংসের করুন চিত্র রুপায়ন করতে গিয়ে
আমাদের মহাকবি মাইকেল মধুসুধন দত্ত তাঁর মেঘনাদ বধ মহাকাব্যে
মাইকেল মধুসুদন দত্ত


রাবনের জবানীতে প্রথমে লঙ্কার সৌন্দর্য বর্ণনা পুর্বক সমুদ্রের প্রতি
কি মিনতী রেখেছিলেন তা নীচে দেখা যাক একটু খেয়াল করে -
প্রথমে সুদর্শনা লঙ্কার বর্ণনায় দেখা যায়
উঠিয়া রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে দেখিলা
রাক্ষসরাজ রাবন


কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন
অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন-
সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী!
হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে;
কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা;
তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন,
যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ
দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি,
বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন
আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে,
রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে,
জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন

সুন্দর লঙ্কাপুরী


লঙ্কাপুরী ধংস যজ্ঞে মেতে উঠা রাম বাহিনীর বর্ণনায় দেখা যায় হয়েছে বলা
দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর—
অটল অচল যথা; তাহার উপরে,
বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রীদল, ....
বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে
................................
উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি
বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে—
হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে,
....................................
সদা! রিপুদলবলে দলিয়া সমরে,
জন্মভূমি-রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?
যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক্ তারে!
....................................
এইরূপে আক্ষেপিয়া রাক্ষস-ঈশ্বর
রাবণ, ফিরায়ে আঁখি, দেখিলেন দূরে
সাগর-মকরালয়। মেঘশ্রেণী যেন
অচল, ভাসিছে জলে শিলাকুল, বাঁধা
দৃঢ় বাঁধে; দুই পাশে তরঙ্গ-নিচয়


ফেনাময়, ফণাময় যথা ফণিবর,
উথলিছে নিরন্তর গম্ভীর নির্ঘোষে।
অপূর্ব-বন্ধন সেতু; রাজপথ-সম
প্রশস্ত; বহিছে জনস্রোতঃ কলরবে,
স্রোতঃ-পথে জল যথা বরিষার কালে।
অভিমানে মহামানী বীরকুলর্ষভ
রাবণ, কহিলা বলি সিন্ধু পানে চাহি;—
“কি সুন্দর মালা আজি পরিয়াছ গলে,
প্রচেতঃ! হা ধিক্, ওহে জলদল পতি!
এই কি সাজে তোমারে, অলঙ্ঘ্য, অজেয়
তুমি? হায়, এই কি হে তোমার ভূষণ,
রত্নাকর? কোন্ গুণে, কহ, দেব, শুনি,
কোন গুণে দাশরথি কিনেছে তোমারে?
.....................................
দূর কর অপবাদ; জুড়াও এ জ্বালা,
ডুবায়ে অতল জলে এ প্রবল রিপু।
রেখো না গো তব ভালে এ কলঙ্ক-রেখা,
হে বারীন্দ্র, তব পদে এ মম মিনতি।


তাই মনে হয় মহাকবি মাইকেল মধুসুধন আজ বেঁচে থাকলে
শুধু মিনতী নয় হয়ত বজ্র কন্ঠেই পদ্মা নদীকে
আহ্বান করে বলতেন তার বুকে সর্বনাসের কলংকচিহ্ন হিসাবে
লেপ্টে থাকা মরনফাঁদ ফারাক্কাকে তারিই জলে নিমন্ন করে ধংসের কথা ।


মনে পরে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে মিছিল করে ১৯৭৬সনে এই লেখকের ফারাক্কা অভিমুখে যাত্রার কথা,
১৯৭৬ সনের ১৬ মে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারাদেশ থেকে ট্রেন, বাস, লঞ্চ ও নৌকায় চড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে ফারাক্কা মিছিলে অংশগ্রহণ করার জন্য রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে এসে মিলিত হই। লাখো জনতার এই জনসমুদ্রে একটি স্লোগান মুখরিত হয়ে উঠেছিল ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও
পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে হবে, দিতে হবে

অসীম সাহসী এই মঝলুম জননেতার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ।


মাওলানা ভাসানীর শুরু করে যাওয়া এই সংগ্রাম দেশপ্রেমিক সাধারণ জনগণকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, ভাসানী বলেছিলেন, আমাদের সংগ্রাম চলবেই চলবে । হতাশ হবার কিছু নেই...ভাসানীই বলেছেন, জনগনের আন্দোলন এটম বোমার চেয়েও শক্তিশালী এবং জনগনের শক্তি আধুনিক ও উন্নত সকল মরণাস্রের চাইতেও দুর্জয়

উলেখ্য, আমরা সবাই জানি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের মনোহরপুরে মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ গড়ে তোলা হয়। এর প্রভাবেই পদ্মা এখন ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বছরের অধিকাংশ সময় এখন পদ্মার বুকে থাকে না বিস্তৃত সেই জলধারা, পালতোলা নৌকা আর মাঝি-মাল্লাদের গান। পদ্মার প্রবেশদ্বারেই যতদূর চোখ যায়, কেবলই ধু ধু বালুচর। শুষ্ক মৌসুমের আগেই পদ্মায় নৌকা চলাচলের পথ রুদ্ধ হওয়ায় মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বালুচর পাড়ি দিয়ে গন্তব্য পৌঁছাতে হচ্ছে এলাকার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষকে। আর মালামাল পরিবহনে দরকার পড়ছে গরুর গাড়ি।


এদিকে ফারাক্কা বাঁধকে ভেংগে ফেলার জন্য ভারতীয় রাজনৈতিক নেতারা ও নদী বিশেষজ্ঞরা দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে । আমরা তাদের দাবীটির স্বাথে একাত্বতা ঘোষনা করে তাদের দাবীটিকে স্বাগত জানাতে পারি । রাজনীতিবিদদের মধ্যে, ভারতের বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার এখন বেশ জোরে সুরেই এই দাবি করছেন । সম্প্রতি এই চাহিদা তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে উত্থাপন করেছেন বলে জানা যায়।
নিতিশ কুমার


ফারাক্কা ধ্বংসের দাবিতে অনেক বিশিষ্ট ভারতীয় নদী বিশেষজ্ঞগনও এখন নিতিশ কুমারের সাথে যোগ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ম্যাগসেসে পুরস্কার বিজয়ী রাজেন্দ্র সিং, যিনি ওয়াটারম্যান নামেও পরিচিত, তিনি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাটনায় বিহারের পানি সম্পদ বিভাগ আয়োজিত "অপরিসীম গঙ্গা" শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বলেন, "বিহারের জন্য ফারাক্কা অসুখ । এটি একটি অভিশাপ যা অপসারণ করা প্রয়োজন। কারণ যতক্ষণ না আমরা এটি অপসারণ করছি ততক্ষন পর্যন্ত আমরা এগিয়ে যেতে পারি না (দ্য হিন্দু, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ০১৭)।
একই সেমিনারে, দক্ষিণ এশিয়ার নদী সমুহের নেটওয়ার্ক , বাধ ও গনমানুষ এর সমন্বয়কারী হিমগাশু ঠাককার ফারাক্কা বাঁধের জরুরি পর্যালোচনায়ের জন্য অনুরোধ করেছিলেন, যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে ফারাক্কা বাধটি যে উদ্দেশ্য নির্মিত হয়েছিল যথা - সেচ, জলবিদ্যুৎ শক্তি, পানি সরবরাহ – তার সবগুলি উদ্দেশ্য পুরণে ব্যর্থ হয়েছে ( দ্য হিন্দু, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭)।
ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা বাঁধ ধ্বংস করার যে দাবি জানিয়েছেন, তা অবশ্যই, বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণেই নয়। তারা মূলত এটি তাদের যে ক্ষতি করছে তা প্রতক্ষ করে নিজেই করছে। বিশেষ করে, ফারাক্কা নদীর তলদেশের যে অবক্ষেপ (sedimentation) সৃষ্টি করেছে, তাই ব্যাপকহারে সেখানে বন্যা ও নদী ভাঙন সৃষ্টি করছে।

যাই হোক, ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞগন নীজেরাই এখন তুলে ধরছেন যে ফারাক্কা তার বিশেষ লক্ষ্যগুলি যেমন কলকাতা বন্দরের নাব্যতা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং পরিবর্তে এটি ভারতের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়েই দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বিইএন), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন এবং দেশের অন্যান্য অনেক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, বিশেষ করে ২০০৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ট্রান্সবাউন্ডারি নদী (আইসিআরসিটিআর) আঞ্চলিক সহযোগিতার আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সময় শীর্ষ ভারতীয় পানি বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের উপস্থিতিতে এই দাবিটিকে জোরদার করে উপস্থাপন করা হয় । এটি এখন সন্দেহের বাইরে যে ফারাক্কা বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশের জন্যই একটি বিপদ হয়ে দাড়িয়েছে ।

বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক মনে করে যে, সরকার ফারাক্কার পাশাপাশি গজলডোবা এবং অন্যান্য নদীর উপর ভারতীয়দের নির্মিত বাঁধ স্থাপনা ধ্বংসের দাবিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে দাবী উত্থাপন করতে পারে।

তবে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বিইএন), বাংলাদেশ সরকারকে ১৯৯৭ সনের জাতিসংঘ কনভেনশন তথা আন্তর্জাতিক নদী সমুহের নন-নেভিগেশনাল ব্যবহারের উপর স্বাক্ষর ও অনুমোদন দেওয়ার আহ্বান জানান, যা বাংলাদেশের চাহিদার জন্য আইনি ভিত্তি সরবরাহ করতে পারে বলে তারা মনে করেন , কারণ এই কনভেনশনটি আন্তর্জাতিক নদী সমুহের নিম্নাঞ্চলের দেশগুলিকে ঐতিহাসিক অধিকারের দাবীকে সমর্থন করে এবং নদীর প্রথাগত ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয় এবং নদীর নিন্মাঞ্চলের দেশগুলির সম্মতি ছাড়া নদী শাসনমুলক অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে উজানের অংশের দেশ গুলির উপর নিষিদ্ধাজ্ঞা জারী করে। বিইএন মনে বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নজর রাখবে, নদীগুলিতে ওপেন পদ্ধতির নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করবে, ১৯৯৭ সনের জাতিসংঘ কনভেনশনে স্বাক্ষর করবে এবং ভারতকে আর কোন বিলম্ব না করে ফারাক্কা এবং অন্যান্য অপরিনামদর্শী নদী শাসন অবকাঠামো অপসারণের জন্য ভারতকে আহ্বান জানাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বিইএন) একইসাথে বাংলাদেশ অভ্যন্তরে প্রস্তাবিত গঙ্গা বাঁধের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে ফারাক্কা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে। ফারাক্কা মত করে এই প্রস্তাবিত গঙ্গা বাঁধ নির্মাণ করা হলে তা আপস্ট্রিম নদী এলাকা বর্ধন করে বন্যা এবং নদীর তীরভুমির ক্ষয় সাধনে আরো জোড়ালো ভুমিকা রাখতে পারে । বাংলাদেশের নদীগুলির প্রবাহ বাড়ানোর দরকার এতে কোন সন্দেহ নেই। এই সমস্যাটির প্রকৃত সমাধান হল ফারাক্কা এবং অন্যান্য ডাইভারসনারি ব্যারেজ ধ্বংস করা , যাতে গঙ্গা ও পদ্মার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা যায়। এর ফলে বাংলাদেশের নদীগুলির প্রবাহ পুনঃস্থাপিত হবে।
উপরে উল্লেখিত জাতিসংঘ কনভেনশনটির প্রতি স্বাক্ষরের জন্য এত উতলা কেন তা বুঝার জন্য ১৯৯৭ সনের গুরুত্বপুর্ণ জাতিসংঘ কনভেনশনটির হাল হকিকত অবস্থা জানতে গিয়ে দেখা গেল এতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬টি দেশ স্বাক্ষর করেছে যারমধ্যে এশিয়া অঞ্চলের মরুভুমিময় মাত্র তিনটি দেশ যথা সিরিয়া , জর্দান ও ইয়েমেন অন্তর্ভুক্ত আছে ।

এই কনভেনশনের আর্টিকেল ৭ টিও বিতর্কিত । এর কিছু ক্ষতিকর ব্যখ্যা বিশ্লেষন রয়েছে বলে আইন বিশেষজ্ঞগন মনে করেন । ২০১৭ সনের Stockholm Water Prize বিজয়ী আ্ন্তর্জাতিক নদীসমুহের পানি আইন বিশেযজ্ঞ McGeorge School of Law এর অধ্যাপক Stephen McCaffrey এর মতে "in utilizing an international watercourse in their territories the upstream countries can take all appropriate measures to prevent the causing of significant harm to other watercourse states and compensate sharing states for any such harm. তিনি ব্যাখ্যা করে দেখান যে ধরা যাক উজানের কোন দেশ তার পাহাড়ী ভূখণ্ডের কারণে তার পানি সম্পদগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেনি। অপরদিকে নিম্মাঞ্চলের দেশগুলিতে প্রবাহিত নদী অববাহিকার স্থলভাগ সমতল এবং শতাব্দী ধরে তারা নদীর জলাধার ব্যাপকভাবে সেচের জন্য ব্যবহার করেছে। এখন উজানের দেশগুলি জলবিদ্যুৎ ও কৃষির উদ্দেশ্যে তার পানি সম্পদ বিকাশ করতে চায়। এমন ক্ষেত্রে নিন্মাঞ্চলের দেশগুলি এই কনভেনশনের ফলে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ।সুত্র : McCaffrey, "Chapter 2: The UN Convention on the Law of Non-Navigational Uses of International Watercourses", 20-21.
এখন প্রশ্ন হলো Bangladesh Environment network ( BEN ) এর উদ্দেশ্যাবলী নিয়ে । এটি বাংলাদেশের পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যাগুলি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমনডলে সচেতনতা বৃদ্ধি , জনমত সৃস্টি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ সৃজনের লক্ষ্য নিয়ে জুলাই ১৯৯৮ সনে কিছুসংখ্যক পরিবেশবাদী বাংলাদেশীদের নিয়ে গঠিত একটি এলায়েন্স । উদেশ্য ভাল হলে অন্তরের অন্তস্থল হতে সাধুবাদ । আর যদি তা ভারতের কোন পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে ঐ বিতর্কিত কনভেনশনে স্বাক্ষর করার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রলুব্দ করার জন্য হয় তাহলে তা হবে ভারতের জন্য শাপে বর ।
বিহারসহ ভরতের কিছু রাজনীতিবিদ ফারাক্কা বাঁধ ধংসের জন্য যে সমস্ত প্রতিক্রয়া দেখাচ্ছেন তা নেহায়েত লোক দেখানো না হলেই হয় । যদি এসম্ত বিষয় ভারতীয় কতৃপক্ষ আমলে নিত তাহলে তারা বাংলাদেশের উজানে ভারতীয় অংশে থাকা নদীগুলিতে এত এত বাঁধ নির্মান করতনা ,আবার তাদের ঐসমস্ত বাঁধই বাংলাদেশে বন্যার প্রধান কারন হয়েও দাঁড়াত না ।
সাম্প্রতিক বন্যায় পানির বিপুল চাপ সামাল দিতে না পেরে ভারত ইতোমধ্যে ফারাক্কা ও গজলডোবার গেটগুলোই নাকি খুলে দিয়েছে।
গজলডোভা বাঁধের ছবি


ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য এক গণবিধ্বংসী মারণাস্র । একুশে পদক প্রাপ্ত এদেশের বরেন্য লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা একবার লিখেছিলেন, ভারত ঠাণ্ডা মাথায় যে কাজটি করে যাচ্ছে, তা হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর অমানবিক বোমা বর্ষণের চাইতেও কম নিষ্ঠুর নয় । তার প্রলয়ঙ্কারী প্রতিক্রিয়াগুলো একসাথে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি না বলে আমাদের বেশীর ভাগ মানুষ চোখ বুজে এই জুলুম সহ্য করে যাচ্ছে

চলমান বন্যায় এখন দেশের অনেক জেলাই মারাত্বক বন্যাকবলিত। সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদ মাধ্যমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে দিন দিন আরো সম্প্রসারিত হচ্ছে , বিভিন্ন জেলায় বিশেষ করে কুড়িগ্রাম , জামালপুর , নেত্রকোনা , ও চট্রগ্রাম অঞ্চলে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির যে চিত্র বিভিন্ন সংবাদ ভাষ্যে দেখা যাচ্ছে তাতে করে বন্যায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে সে বিষয়ে এখনো সঠিক কোন পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে নিন্মের চিত্রগুলি হতে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কিছুতো ধারনা করাই যায় ।



বানের জল ধেয়ে যাচ্ছে আরও নতুন এলাকার দিকে। এবারের বন্যার ভয়াবহতা এর আগের বছরের ভয়াবহ বন্যার চেয়ে কোন অংশে কম নয় । দেশের বন্যা কবলিতদের জন্য রইল সহানুভুতি ও তাদের প্রতি সরকারী সাহায্য সহযোগীতার পাশাপাশি সমাজের সকল মানুষের সামর্থ আনুযায়ী সাহায্য সহযোগীতা প্রদানের জন্য একটি আকুল আবেদনও রইল এ সাথে । আগ্রহীগন নীজেরাই সরাসরি অথবা নীজ পছন্দ আনুযায়ী নির্ভরযোগ্য দল কিংবা দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে বন্যা দুর্গতদের মাঝে পৌঁছে দিতে পারেন তাদের সহযোগীতামুলক ত্রান সামগ্রী।

এবার আসা যাক পদ্মা নদীর তথাকথিত সর্বনাশা নাম গোচানোর কথা প্রসঙ্গে।
একটি কথা প্রথমেই মেনে নিতে হবে পাকৃতিক নিয়মেই নদী তার উৎস মুখ হতে জন্ম নিয়ে দুর্বার দুরন্ত গতিতে এঁকে বেঁকে তার চলার পথ তৈরী করে তার মুল গন্তব্য সাগরপানে ধাবিত হবেই । এটাই তার স্বাসত চরিত্র, সেই প্রগৌতিহাসিক কাল হতেই এটা চলে এসেছে প্রকৃতির বুকে । পরবর্তীতে এর চলার পথে মানূষ যতই বাধার প্রাচীর গড়েছে সে ততই তার বিধ্বংসি রূপ ধারণ করেছে । নদীর একটি স্বাভাবিক গথিপথ আছে, সে হঠাত করেই তার কুল ভাঙার কাজে মগ্ন হয় না । সঠিক ভাবে পরিচালিত নদী গবেশনা ও জরীপে তার ভবিষ্যত গথিপথ জানা যায় অনেক আগেই। অতি সামপ্রতিক কালের শরিয়তপুরে পদ্মা নদীর ভাঙ্গন নিয়ে সরকারী গবেষনা সংস্থাই বলেছে 'পদ্মার ভাঙন: পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু করা হয়নি কিছুই'
বাংলাদেশের পলিমাটি মিশ্রিত নরম বালুময় নদী তীরের ভাঙন রোধে বালির বস্তা পাথর কিংবা বাঁধ যাই দেয়া হোক না কেন সে হয় খুবই ক্ষনস্থায়ী । নেত্রকোনার উত্তরে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিছিড়িতে গাড়ো পাহার হতে নেমে আসা বর্ষাকালের খরশ্রোতা শুমেশ্বরী নদীর কুল ভাঙ্গার প্রক্রিয়া আমি বছরের পর বছর পর্যবেক্ষন করেছি ব্যক্তিগত ভাবে। সেখানে আমি দেখেছি যে গ্রামটি শুমেশ্বরী নদী হতে ছিল প্রায় কিলোমিটার দুরে, সেটিই একদিন রাতের আধারে বিলীন হয়ে গেছে নদী গর্ভে ।
গ্রীষ্মে ভাঙ্গন কবলিত সোমেশ্বরী নদীর গৃষ্মকালীন একটি দৃশ্য


কথা হলো নদী তার পাকৃতিক গতিপথে কোন বাধার সম্মুখীন হলে তার পানি প্রবাহ সে এলাকায় থাকা মাটির তলদেশের বালু স্তর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে দীর্ঘ দিন ধরে । এবং একদিন অকস্যাৎ তার গতি পথ পরিবর্তন করে সেখান দিয়ে প্রাবহিত হতে শুরু করে , তলিয়ে দেয় বিস্তির্ণ জনপদ । ঠিক তেমন বাংলাদেশের যে সমস্ত নদীতে বছরের বার মাসই ভাঙ্গণ লেগে থাকে সেখানকার বিষয়ে কিছু চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে । জানা কথাই, নদী তার কুল ভাঙবেই দুদিন আগে আর পরে। তাই নদীতীর হতে আগে ভাগেই স্থাপনা সমুহ সরিয়ে নিতে হবে নিরাপদ দুরত্বে ।
এ বিষয়ে নিন্মলিখত কিছু সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা ও আইন প্রনয়ন করাও জরুরী হবে।
১) নদী ভাঙ্গনের সম্মুখীন জনগুষ্ঠিকে আগে ভাগেই নিরাপদ দুরত্বে সরিয়ে নিয়ে তাদেরকে পুর্ণবাসন করতে হবে ।
২) ভাঙ্গনের মুখামুখী পাকা দালান কোঠা সড়িয়ে নেয়া যায়না বিধায় নদীর তীরের এক হতে দুই কিলোমিটারের মধ্য কোন রকম পাকা দালান কোঠা নির্মান করা যাবেনা ।


এখন বুঝহ সুজন, এর জন্য কি দায়ী নদী ? নাকি দুদিন বাদেই ভেঙ্গে এটা যাবেই , তা জেনে শুনেই নদীর কুলে যে এটা গড়েছিল সে দায়ী ।
৩) নদী তীরবর্তী জমি জমাকে সমবায় ভিত্তিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে , এবং নদী পারের মানুষ জনদের জন্য নিরাপদ দুরত্বে গ্রৌথ সেন্টারে বসবাসের ব্যবস্থ করতে হবে
৪) তাদেরকে চাষাবাদ স্থানে যাতায়াতের জন্য যথাযথ যোগাযোগ ব্যবস্থাও সৃজন করতে হবে ।
৫) নদী তীরে গড়ে উঠা ভাঙ্গনের হুমকির মুখে এমন ভবনগুলিক পরিতক্ত ঘোষনা করে কাছাকাছি নিরাপদ কোন এলাকায় সেগুলিকে সড়িয়ে নিতে হবে ।
৬) সেই অর্ধ শতক হতেই দেখছি পাক আমলের WAPDA আর বাংলাদেশ আমলের BWDB ( Bangladesh Water Development Board) নামক সরকারী সংস্থাটি নদী তীর রক্ষার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে । তার পরেও নীচের মত শুধু হায় হায় চিত্রই দেখা যায় ।


বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড তার সমাপ্ত ঘোষিত মোট ৮৪৫ টি উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নদীর উপরে প্রায় শতাদিক ‘’নদী তীর সংরক্ষন’’ ও ‘’শহর রক্ষা’’ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে । এ সমস্ত প্রকল্পে মোট বিনিয়োগ ব্যয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার উপরে । ( সুত্র বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড : বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড Click This Link ) এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প খাতেও এর থেকে বেশী পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করছে ।
তাতে কি নদীর ভাঙ্গন রোধ করা গেছে আদতেই? কিংবা নদী ভাঙ্গন কবলিত সহায় সম্বলহীন ভাসমান মানুষের সংখ্যা কমনো গেছে, নাকি সরকারী কা মাল দড়িয়ামে ডাল হয়েই দাঁড়িয়েছে!
এ প্রকল্পগুলি ছড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ড দেশের আরো কিছু নদীর জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, এখনো কিছু প্রকল্প চলমান আছে । কিন্ত তাদের সন্মিলিত নীট ফলাফল কি ? দেশের সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় বর্তমানে দেশে নদী ভাঙ্গণ কবলিত প্রায় ৫০ লাখ গৃহহীন ভাসমান মানুষ রয়েছে এবং প্রতি বছর এদের সংখ্যা গড়ে লক্ষাধিক করে বাড়ছে ( সুত্র : দৈনিক ইনকিলাব Click This Link )। নদী ভাঙ্গন কবলিত ভাসমান এসব মানুষ সাধারণত বাঁধ, রাস্তা, পরিত্যক্ত রেল সড়ক, খাস চর বা খাস জমি প্রভৃতি স্থানে ভাসমান জীবন যাপন করছে। অভাবের তাড়নায় এরা শহরমুখী হয় এবং শহরের বস্তিগুলিতে বাড়তি জনসংখ্যার চাপ সৃস্টি করে । নদী শাসনের জন্য নদী তীর রক্ষার জন্য সরকার প্রতি বছর যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে তা যদি অকার্যকর এ সমস্ত প্রকল্পখাতে ব্যয় না করে নদী তীরের মানুষগুলিকে সেখান হতে উঠিয়ে নিয়ে তাদের জন্য যথাযথ পুর্নবাসনে ব্যয় করা হত তবে তাই হত দীর্ঘস্থায়ী ও অধিক মাত্রায় কল্যানকর। বিদেশী বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্প সাহায্য নির্ভর প্রকল্পের এমন সরকারী কা মাল দরিয়া মে ডাল জাতীয় প্রকল্প আর কোন খাতে নেই । তাই টাকা জলে ডেলে প্রতি বছর গেল গেল বলে হায় হায় মাতম তুলে এই পানিশাসন প্রকল্প আর কাহাতক এদেশবাসী বহন করবে তা আজ এক দারুন প্রশ্নেরই সম্মুখীন।
নদী ভাঙ্গন কবলিত ভাসমান মানুষদের পরিবার পিছু ( গড়ে ৫ জনের একটি পরিবার হিসাবে ) যদি প্রায় এক লক্ষ টাকা ব্যয় করে নদী ভাঙ্গন কবলিতদেরকে পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নেয়া হতো তাহলে ৫০ লাখ নদী ভাঙ্গণ কবলিত মানুষের পুর্নবাসনের জন্য ব্যয় হতে পারত মাত্র ১০হাজার কোটি টাকা যা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সন্মিলিত নদী তীর সংরক্ষন ও শহর রক্ষা প্রকল্প ব্যয় হতেও কম । তাই কথা হল পাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নদী গুলিকে কোন রকম বাঁধাহীন ভাবে বিনা প্রতিকুলতায় পাকৃতিকভাবেই বয়ে চলতে দেয়া উচিত , এতে করে নদী গুলির স্বাভাবিক প্রবাহমান ধারা ও নাব্যতা বজায় খাকবে , নদীগুলি ন্বাভাবিক গতিতে চললে এর বুকে পলিউ জমতে পারবেনা , ফলে এদের গতিপথের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার ড্রেজীং কর্মসুচী পরিচালনার প্রয়োজনও ক্রমে ক্রমে হ্রাস পাবে এমনকি ড্রেজিং এর প্রয়োজনই হবেনা, নদীর স্বাভাবিক স্রোত তাদের ঠেলে নিয়ে যাবে বঙ্গোপসাগরের গহীনে। সাগর মোহনায় জমে উঠা পলিমাটির স্তরও বিদুরিত হয়ে আরো বেশী নেভিগেশন সুবিধা তৈরী করে দিবে দেশের সমুদ্র বন্দর গুলিকে ।
মোট কথা হল একটি নদীর তান্ডব লীলা লক্ষগোচর হয় কেবলমাত্র মনুষ্য সৃস্ট অশুভ কর্মের কারণে। নদী খোরেরা নদী খেয়ে ফেলে, দেশের অসচেতন জনতা বর্জ দিয়ে নদীর বুক ভরে ফেলে , সর্বোপরি হীনস্বার্থ চরিতার্থে অপরিনামদর্শী নদী বাঁধ সৃজনকারীরাই নদীর সর্বনাশা রূপ সৃজনের জন্য দায়ী । অন্যথায় নদীগুলি কেবল পরম দয়াময়ি হয়ে আমাদের এই ধরাকে সুজলা সুফলা শষ্যময়ী করে গড়ে তোলে মানব জীবনে এনে দিত নির্মল বাধাহীন সজিবতা , সর্বত্র জাগাত প্রাণের স্পন্দন , মানুষের জীবন ভরিয়ে তোলত আনন্দ গানে। এখনো সামান্য দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া নদী গুলিই আমাদের জীবন , বলাই হয়ে থাকে নদী বাচলে বাঁচবে আমাদের জীবন । তাই, দেশের সুপ্রিয় কবি, সাহিত্যক, শিল্পী সহ সকলের কাছে বিনীত আবেদন রেখে গেলাম তাঁরা যেন এমন প্রাণময়ী , স্সেহময়ী , জীবনের সজিবতা দানকরী সত্বাকে নদীকে কোন প্রকারেই কোন অযুহাতেই সর্বনাশা অভিধায় অভিহিত না করেন । উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি হইকোর্টের রায়ে নদীকে দেয়া হয়েছে জীবন্ত সত্বার অধিকারী । তাই এহেন উপকারী জীবন্ত সত্বার অধিকারী নদীকে কেহ যদি সর্বনাশা নাম দিয়ে তার গলায় কলংকের কালিমা লেপন করে দিতে চায় , তাহলে সে কিন্তু আইনের আশ্রয় নিয়ে প্রতিকার দাবী করতেই পারে , এর দায় কিন্তু নিতে হবে অভিযুক্ত মানুষদেরকেই !!!

ধন্যবাদ এতক্ষন সাথে থাকার জন্য ।

তথ্যসুত্র : লেখার সাথে লিংক আকারে দেয়া হয়েছে
ছবি সুত্র : ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও গুগল অন্তরজাল
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০১৯ সকাল ৮:১৪
২৯টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোলকাতার পথে পথে- ২ (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ৯:৫২



ছবির প্রতি আমার দুর্বলতা আছে।
তাই সব সময় ছবি তুলি। ছবি তুলতে আমার ভালো লাগে। কোলকাতা গিয়েও আমি অনেক ছবি তুলেছি। আজ এই ছবি ব্লগ পোষ্টে বোলপুর, শান্তিনিকেতনের বেশ কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

জেসাস রিবর্ন....

লিখেছেন আহমেদ জী এস, ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ৯:৫৬



সামনের টেবিলে ইতস্ততঃ ছড়ানো গত ক’দিনের খবরের কাগজের দঙ্গল থেকে চোখ সরিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। প্রতিদিনকার মতো অস্থির ভাবে পায়চারী করলেন ঘরের ভেতর এদিক থেকে ওদিক ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতিকথা:- আগে যদি জানিতাম!

লিখেছেন হাবিব স্যার, ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৮



তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। নভেম্বর মাসের শেষের দিকের কথা। ক্লাসে যাবার পথে একটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পড়তো পথে। সেই বিদ্যালয়ের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। রাস্তায় আসা যাওয়ার সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোলকাতা ভ্রমন- ২

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:১৩



রাতে পৌঁছেই হোটেলে রুম নিয়ে নিলাম।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম রাতের খাবার খাওয়ার জন্য। প্রিন্স রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেলাম। রুই মাস, আলু ভর্তা, ডাল ভর্তা আর ডাল। ভাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

কালের যাত্রা.....

লিখেছেন কিরমানী লিটন, ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:০৭



কালকে যাহার বৃহস্পতি
আজকে তাহার শনি
কালকে যে জন পথের ফকির
আজকে বিরাট- ধনী।

চোখের তারায় একটি আকাশ
কালকে রাতের ঘোর,
আজকে সেথায় রোদের ঝলক
আলোর নাচন- ভোর।

কালকে সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×