somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প - পংতিমালার ডাকপিওন

০১ লা এপ্রিল, ২০১৭ রাত ৯:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বরাবরই একটু পড়ুয়া টাইপের ছেলে আমি। ভার্সিটিতে ওঠার পর তেমন কোন বন্ধু বানাইনি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে যে অবসর পাই ক্যাম্পাসের লাইব্রেরিতেই কাটিয়ে দেই সময়টা । অনেককেই দেখি বন্ধুরা মিলে গ্রুপ স্টাডি করে। আমার অবশ্য গ্রুপ স্টাডি করার দরকার হয় না। একটু বেশীই মেধাবী কিনা ! তবে শুধু ক্লাসের বই পড়েই সময় কাটাই তা কিন্তু না। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর হাবাগোবা টাইপের নিরস ছেলে মনে হলেও রসালো সাহিত্যে্র প্রতি বেশ আগ্রহ আমার। তাই লাইব্রেরিতে বসেই কখনো কখনো গল্প উপন্যাসের মাঝে ডুবে যাই। এই যেমন সেদিন পড়ছিলাম চেতন ভগতের ‘রেভুলেশন ২০২০’ বইটি। ত্রিভুজ প্রেমের গল্প নিয়ে বইটির কাহিনি। বইয়ের পাতা নাড়াচাড়া করতেই এক কোণে চোখে পড়লো পেনসিলে লেখা চার লাইনের পংতিমালা-

‘আজ ইচ্ছেগুলো হারিয়ে গেছে
নীল আকাশের মেঘে,
মনটা তবু ঐ মেঘেদের
পিছে পিছে ভাগে।’

বেশ মজার লাগলো কথাগুলো। কি মনে করে যেন আমিও লিখে দিলাম আরো চারটি লাইন।

‘মেঘের পিছে ছুটছো কেন?
কেন তুমি আজ একা?
চাইলেই তো হতে পারো
হাত বাড়িয়ে দোকা।’

বইয়ের কয়েক পাতা পড়েই রেখে দিলাম আবার লাইব্রেরির তাকে। বাকিটুকু পরেরদিন সময় করে লাইব্রেরিতে এসে পড়ে নিবো ঠিক করলাম।

পরের দিন বইটি পড়ার জন্য নিতেই দেখলাম আমার লেখা পংতিমালার নিচেই আরো চার লাইনের কথামালা। হাতের লেখা সেই আগের লেখার মতই।

‘চাইলেই কি হওয়া যায়
যার তার সাথে একা
বুদ্ধিমতি মেয়ে আমি
নই অতটা বোকা।’

এরপর থেকেই চেতনের রেভুলেশন ২০২০ বইটা আমার আর ঐ নাম না জানা বালিকার কথামালা আদান প্রদানের ডাকপিওন হয়ে গেল। একদিন হঠাৎ করেই কথার ছলেই ওর কাছে ফোন নম্বর চেয়ে বসলাম।

‘করলাম অনেক বকবকানি
এবার তুমি থামো
ফোন নম্বর দিয়ে এবার
আরেক ধাপ নামো।’

কিন্তু সরাসরি নাকোচ করে বসলো। তবে ফেসবুক আইডি দিলো।

‘ফেসবুকেতে খুঁজে পাবে
মেঘ বালিকা নামে
ফোন নম্বর পাবে না তুমি
এত অল্প দামে।’

আমিও লিখে দিলাম তার নিচে-

‘আচ্ছা তবে তাই হবে
ইকারাসের ডানা আমার নাম
তবে একদিন ঠিকই দিবো
তোমার কথামালার দাম।’

ফেসবুকে এড করলাম আমি মেঘবালিকাকে। বইয়ের পাতা ছাড়িয়ে আমাদের কথা চলতে থাকলো ফেসবুকে। অবশ্য আমাদের কেউ কারো আইডিতে কোন ছবি দেইনি, দেওয়া নেই কোন ইনফো দেওয়া। আর আমরাও কেউ কাউকে এসব নিয়ে জিজ্ঞেসাও করতাম না। আমরা শুধু কথার পিঠে কথা লাগিয়ে মালা গেঁথে যেতাম। এক সময় প্রেমে পড়ে গেলাম মেঘবালিকার।

এরই মাঝে ক্লাসের রাশিদের সাথে ভালো বন্ধুত্ত হয়ে গেছে আমার। রাশিদ ম্যানেজেরিয়াল অ্যাকাউনটিং কোর্সে ভাল না, তাই আমার কাছে আসে পড়া বুঝতে। কিন্তু রাশিদ শুধু পড়াই বুঝে আমার কাছে তা না। রাশিদ ভাল গান করে, নিজের গান নিজে লিখে সুর করে। এদিকে আমিও টুকটাক কবিতা লিখি। আমার কবিতাগুলো রাশিদের খুব পছন্দ। আর সেই কবিতাগুলো নিয়ে রাশিদ সুর দেয়, আমাকে শোনায়। বেশ ভাল লাগে যখন দেখি কবিতাগুলো গানের লিরিক হয়ে যায়। বেশি ভাল লাগে যখন দেখি কাম্পাসের প্রোগ্রামে গানগুলো গায় রাশিদ।

ক্লাসের আরেক সহপাঠী আলিশা। দেখতে সুন্দরী আর স্টাইলিশ হলেও ওর মাঝে কোন নমনীয়তা নেই, কিছুটা টম বয় টাইপের। মেয়েটাকে আমার বিশেষ পছন্দ নয়। একদিন ক্লাসের করিডোরে আমার কাছে রাশিদের নম্বর চায় আলিশা।আমিও দিয়ে দেই। ঠিক এর কিছুদিন পর জানতে পারলাম আলিশার সাথে রাশিদের প্রেম হয়ে গেছে। রাশিদ জানালো, ওর লিরিক আর গানের প্রেমে পড়েছে আলিশা।

বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল ফেসবুকে আমার মেঘ বালিকা হঠাৎ গায়েব। অনেক টেক্সট করেছি কিন্তু কোন সাড়া নেই তার কাছ থেকে। মনটা বিষন্ন থাকে সব সময়। এদিকে একদিন রাশিদকে দেখলাম ক্যাম্পাসে। বেচারা মন মরা হয়ে বসে আছে। কাছে গিয়ে হাই হ্যা্লো করতেই জানালো কিছুই ভাল যাচ্ছে না তার। আলিশার সাথে ব্রেক আপ হয়েছে। আর সম্পর্ক রাখতে চাচ্ছে না সে। তার কাছে মনে হচ্ছে সব কিছু থেকেও কি যেন নেই ওর আর রাশিদের মাঝে।

ঠিক সেদিনই বাসায় গিয়ে ল্যাপটপ অন করে ফেসবুজে লগ ইন করে দেখি আমার বহুল প্রতিক্ষিত মেঘবালিকার নামের পাশে সবুজ বাতি। ম্যাসেজ দিয়েছে সে।

‘দুঃখিত, তোমাকে না বলেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিলাম ফেসবুক থেকে। গত দুই মাসে অনেক কিছু ঘটে গেছে আমার জীবনে। একজন্ এসেছিল আমার জীবনে। তোমার সাথে তার বেশ মিল। মিল বললে ভুল হবে। তোমার চিন্তা, তোমার লেখনী্র সাথে অনেক মিল তার। গান করে সে। তার গান আর লিরিকের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকেও অনেক ভালবেসেছিল সে। কিন্তু সব কিছু থেকেও কি যেন ছিল না আমাদের মাঝে। তাই ব্রেক আপ করে ফেলেছি। বাদ দাও পুরনো কথা। আরও কিছু বলার আছে তোমাকে। দেখা করতে চাই। সময় হবে তোমার?’

হঠাৎ করে হৃদ স্পন্দন বেড়ে গেল আমার। এইভাবে কখনো কোন মেয়ের সাথে দেখা করিনি আমি। কাউকে ভালবাসার কথাও জানাইনি।

অবশেষে বলে ফেললাম,

‘অবশ্যই সময় হবে। কখন কোথায় দেখা করবে?’
‘আগামিকাল ৫ টায় কফি ওয়ার্ল্ডে চলে এসো’
‘চিনবো কি করে? নম্বর দাও’
‘নম্বর না হয় পরেই দিলাম। তুমি লাল পাঞ্জাবিতে চলে এসো। আমি আসবো বেগুনি শাড়ি্তে।‘
‘আচ্ছা, অপেক্ষায় থাকবো’

মেঘবালিকা নম্বর না দেওয়ায় মনটা খচখচ করতে লাগলো। যদি না আসে সে? তবুও সকল দিধা ভুলে হাজির হলাম কফি ওয়ার্ল্ডে । সময় ৪টা ৫৫ মিনিটে।

পাঁচটা পনেরো বাজে। কাঁচের দরজার ওপাশে অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বেগুনি শাড়ি পরা একটি মেয়েকে । তবে কি আসছে আমার মেঘবালিকা? দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আমি হতবাক। সেই মেঘ বালিকা আর কেউ নয়। আমাদের ক্লাসেরই আলিশা । লাল পাঞ্জাবিতে আমাকে দেখে আলিশাও হতবাক। কাছে এসে জানতে চাইলো, ‘তুমি কি তবে সেই ইকারাসের ডানা?’ ওর কথার উত্তর না দিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি মেঘবালিকা?

অনেকক্ষণ কেউ কারো সাথে কথা বললাম না। অবশেষে নিরবতা ভেঙ্গে বললাম, ‘রাশিদের সাথে এভাবে তো্মার ব্রেক আপ করা ঠিক হয়নি। ও আসলেই তোমাকে অনেক ভালবেসে ফেলেছিল।’

-‘ওর গানের লিরিকগুলো শুনে ভেবেছিলাম ও ইকারাসের ডানা। কারন তো্মার আমার সাথে যে কথা হত তার সাথে আমি অনেক মিল খুঁজে পেতাম । ভেবেছিলাম ওকে সারপ্রাইজ দিব সম্পর্কে জড়ানোর পর। কিন্তু পরে বুঝলাম যে ও ইকারাসের ডানা নয়, আমার ভালবাসা ইকারাসের ডানার জন্য ছিল,রাশিদের জন্য না।

-‘কিন্তু তো্মাকে আমি ভালবাসিনি,আলিশা।’

কথাগুলো যদিও মিথ্যা তবুও বলতে হল বন্ধু রাশিদের জন্য। আমি চাইনা আমার জন্য রাশিদ কষ্ট পাক।

সেদিনকার পর থেকে নিজেকে নিঃস্ব মনে হতে লাগলো। হয়তো আমি আলিশার প্রেমে আসলেই পড়ে গিয়েছিলাম।

ভ্যালেনটাইনস ডে আজ। রাশিদ ভার্সিটির প্রোগ্রামে গান করবে। আমাকে খুব করে যেতে বলেছে। আসলাম সময় করে। আমার লেখা গানে নিজের করা সুরে গাইলো গান। প্রোগ্রাম শেষে ফিরে যেতেই আমাকে ডাকলো পেছন থেকে রাশিদ।

-শারিক,শোন। কথা আছে।
-হুম ! বল।
-আলিশা আমাকে তোদের সব কিছু বলেছে।
-কিন্তু আলিশা তোকে পছন্দ করে রাশিদ
-একদম না। আমার সাথে যতদিন ছিল ততদিন শুধু ইকারাসের ডানাকে খুঁজেছে আলিশা। ও আমার গানের কথার পাগল ছিল যেগুলো তোর লেখা ছিল, আমার না। তোদের দুজনের মাঝে কাবাব মে হাড্ডি হতে চাইনা আমি।

আজ আলিশার সাথে অফিসিয়ালি প্রথম ডেট আমার। যেই আলিশাকে আমি এক সময় দু চোখেও দেখতে পারতাম না আজ আমি তার প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে বসে আছি। এ এক অদ্ভুত অনুভুতি। সত্যিকারের ভালবাসা হয়তো এমনই হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা এপ্রিল, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:২০
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তার পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিমানবন্দরে নির্ঘুম রাত (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৭

আমার এখানে বাজছে রাত প্রায় দুটা! এখনো জেগে আছি। জেগে থাকার শানে নুযুল হলো, আমি অনেকটা ফাইসা গেছি! হায়দার সাহেবের গানের মতো, "আমি ফাইসা গেছি, আমি ফাইসা গেছি মাইনকা চিপায়!"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×