somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃ "কবিতারাও আজ ভালোবাসবে" (ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল কিন্তু B-))

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সকাল ১১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

- এই যে আপনাকে বলছি। ভদ্রতা জিনিসটা জন্মগত। এটা আপনার মধ্যে কোনদিনই ছিল না আর থাকবেও না।

শায়ন কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। মোটা ফ্রেমের চশমার মধ্য দিয়ে ভয়ংকর সুন্দর এই মেয়েটিকে পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদে পরীর মতো লাগছে।

- হ্যালো মিস্টার। সরবেন নাকি ধাক্কা দিয়ে চারতলা দিয়ে ফেলে দেব। আর যখনি দেখা হয় চার চোখ দিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন কেন?

এই বলে প্রায় ধাক্কা দিয়েই লিমা হনহনিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। আর শায়ন এক বুক আশা নিরাশার দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে। আচ্ছা ওর বুকের বাম দিকটায় এমন চাপা ব্যাথা হচ্ছে কেন। ব্যাথা কিন্তু কি সুখকর। ঠোঁটের কিনারায় হাসির রেখা ফুটিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায় শায়ন।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার আধ খোলা কাঁচ সরিয়ে বৃষ্টিবিন্দু ধরার ব্যর্থ চেষ্টায় শায়ন বেশ ক্লান্ত। ইচ্ছে করছে একছুটে ছাদে যেতে। উন্মুক্ত উদার আকাশের নিচে বৃষ্টির জল ছুঁয়ে যাবার আনন্দই অন্যরকম। বহুদিন সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত রয়েছে শায়ন। ছাদের অধিকারিণী যে লিমা। শায়নের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। কেন জানি মেয়েটা ওকে দুচহ্মে দেখতে পারে না সেই প্রথম দিন থেকেই। শায়নের চোখে ভেসে ওঠে সেই সে দিনের স্মৃতি।

শায়নের বাবা জাফর সাহেব একজন উর্ধ্বতন সরকারী কর্মকর্তা। বছরে দু একবার তার ট্রান্সফার হয়। সেই সুবাদে শায়ন তার এই হ্মুদ্র পরিসরের জীবনে প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশ দেখে ফেলেছে। জাফর সাহেব শেষবার ট্রান্সফার হয়ে লিমাদের বাড়িতে বাসা ভাড়া নেন।শায়নরা যে দিন সিফট হয় সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল।

শায়ন কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ি ঘরে। বুক সেলফটা তুলতে গিয়ে টিশার্টটার একটা অংশ আবার ছিড়ে গেছে। হঠাৎ করেই শায়নের মনে হলো কেউ ওকে লহ্ম্য করছে। সিঁড়ির দিকে তাকাতেই শায়নের শিড়দাড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা অনুভূতি বয়ে গেল। নীল কামিজ পরিহীত অষ্টাদশী এক তরুণী। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি। অদ্ভুত সুন্দর সেই মেয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

- এই কে আপনি? ভেতরে ঢুকলেন কি করে? দারোয়ান চাচা দারোয়ান চাচা! বের হয়ে যান। কিছু না বলে অন্যের বাড়িতে ঢুকে পড়েন। আপনার সাহস কত?
দারোয়ান এসে ব্যাপার দেখে জিহ্বা কামড়ে বললো
- মামুনি হে আসলে আপনাগো নতুন ভাড়াটিয়া।
কুঞ্চিত ভ্রু জোড়া আরো কিছুটা কুঞ্চিত হয়ে উঠল।

- কথা বলতে পারে না নাকি? যত্তোসব। বাবা যে কি করে? আলতু ফালতুদের যে কেন বাড়ি ভাড়া দেয় বুঝি না!

শায়নের সামনে দিয়ে সেদিনও লিমা চলে গিয়েছিল। ফিরে তাকায় নি। তাকালে দেখতে পেত শায়নের চোখদুটো কিছু বলতে চাচ্ছিল। না ভালোবাসি নয়। অন্য কিছু। মাতৃহারা শায়ন যে এই পৃথিবীর একাকিনী নৈসর্গিক সৌন্দর্যের নির্বাক দর্শক। তাই মুখফুটে বলতে পারি নি ওর অনুভূতির কথা। বলতে পারি নি প্রথম দেখার পছন্দের কথা।

কলিংবেলের আওয়াজে শায়ন সম্বিত ফিরে পায়। কি ভাবছিল ও। ও কি লিমাকে ভালোবাসে? কিন্তু শায়নদের তো ভালোবাসতে নেই।

কে এসেছে? জানার ইচ্ছাটা দমিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায় ও। বৃষ্টিশেষের রোদেলা আকাশ, ঝিরিঝিরি হাওয়াতে কবিতারা খুব আপন হয়ে ওঠে শায়নের। আবেগের চাবুকে রক্তাক্ত হয় কবিতা। আজ ও কবিতা লিখবে। নিখাদ প্রেমের কবিতা। হ্যাঁ, লিমার জন্যই লিখবে। কবিতার খাতার প্রতিটি পৃষ্ঠায় শায়ন বড় সযত্নে এঁকেছে লিমার তৈলচিত্র।  ভালোবাসার সাত রঙে রঙীন কবিতারা যেন সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে। তারা আজ মুক্তি পেতে চায়। শায়নের বাকহীনতা গুমরে কেঁদে ওঠে বুকের গভীরে। রূপ নেয় কবিতার। জীবন্ত আস্ফালনে পরাবাস্তব হয়ে ওঠে সেই কবিতার আবেগ। প্রেমময় দংশনে রক্তাক্ত হৃদপিন্ড।

অনেকহ্মণ হলো শায়ন দাঁড়িয়ে আছে। ছাদে যদিও ও উঠতে পারে না। কিন্তু আজ লিমা হঠাৎ বাইরে যাওয়ায় অনেক গুলো দিন পর শায়ন আকাশের সান্নিধ্য পাচ্ছে। চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে আছে। অনুভব করতে চাইছে হিমেল হাওয়ার পরশ। হাতে ধরে আছে ওর কবিতার খাতা। পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে উড়িয়ে দিচ্ছে নীল আকাশে। কবিতারা ভেসে যাচ্ছে। সাথে শায়নের স্বপ্ন।

এটাই বাস্তবতা। শায়নের মতো প্রতিবন্ধীদের ভালোবাসতে নেই। ওরা উপেহ্মার আরেক নাম। নিজের জীবনেই ওরা পালিয়ে বেড়ানো হেরে যাওয়া সৈনিক।

- এই আপনি এখানে কেন? আপনাকে না নিষেধ করেছি ছাদে আসতে। যান নিচে যান।
শায়ন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। লিমার অপমান বর্ষণে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে শায়নের। ছাদের মেঝের কংক্রিটও যেন শায়নের অপমানে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

- এই আপনার হাতে কি? দেখি।
শায়নের হাত থেকে কবিতার ছেঁড়া খাতাটা নিয়ে নেয় লিমা। শায়ন তাকিয়ে থাকে লিমার দিকে। লিমা চেহারার কাঠিন্যে যেন অনুতাপ খুঁজে পায় শায়ন। সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে লিমার মনের সব রাগ অভিমান যেন অশ্রুকণা হয়ে ঝরে পড়ে। কবিতার খাতাটা শায়নের হাতে দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে যায় লিমা।

শায়ন দাঁড়িয়ে আছে। কবিতার খোলা খাতায় একটা পৃষ্ঠা চাঁদের আলোয় অলৌকিক হয়ে ওঠে। শায়ন তাকিয়ে আছে সে দিকে। বুকটা হু হু করে ওঠে ওর। লেখাটায় হাত বোলায় শায়ন।

"হে আল্লাহ, আমি শুধু একটি বারের জন্য কথা বলতে চাই। ওই রাগী মেয়েটির সাথে শুধু একবার কথা বলতে চাই। ওকে জানাতে চাই কতটা ভালোবাসা পুষে রেখেছি ওর জন্য। আমার বোবা চাহুনি যে আমার অহমিকা নয় আমার অহ্মমতা। সবার মতো কেন আমি কথা বলতে পারি না। কেন পারিনা ভালোবাসার মানুষটাকে আপন করে নিতে।"

রাত গভীর হচ্ছে। আর গভীর হচ্ছে হৃদয়ের হ্মত। শায়নের একাকীত্ব বেরঙীন কাঠপেন্সিলের মতোই আবেগহীন হয়ে ওঠে।

মোবাইলের ম্যাসেজ টোন জাগতিক জগতে নিয়ে আসে শায়ন কে। অজানা নাম্বার। কে? শায়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মোবাইল স্ক্রিনে। সেখানে একটা লেখা ভেসে আছে, 'আমি আসছি'।

শায়ন তাকিয়ে আছে চাঁদটার দিকে। বড্ডবেশি প্রেমময় মনে হলো ওর চাঁদটাকে। হাতে হঠাৎ পাওয়া উষ্ণ স্পর্শে ফিরে তাকায় শায়ন। দেখে লিমা দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক ওর কবিতার মতো।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৫:১৫
৩৭টি মন্তব্য ৩৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চন্দ্রপ্রভা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

চন্দ্রপ্রভা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তোমাকে দেখে মোহিত হই চন্দ্রপ্রভা
রোদ পড়লে চকচক করে
এতই সুন্দর লাগে
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
কিন্তু পাই না যে সাহস।
তুমি নাই বলে কি এত ঝড়?
তুমি পাশে নাই বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কি পেলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



বাংলার দুই নোবেল জয়ী রবি ঠাকুর আর ডঃ ইউনুসের পিছনে অনেক কথাই তো বললেন।
ব্লগ লেখায় ভরিয়ে ফেললেন!
খোদা তাঁদেরকে যে জায়গা দিয়েছেন, তা থেকে এক চুল কি নিচে নামাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমরা নেহা বোরা কে বাংলাদেশের কথা বোলো না

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২


নেহা বোরাকে তোমরা বাংলাদেশের কথা বোলো না। বোলো না যে, তিনি যখন বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, তখন বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনেরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে জেয়াফত খাওয়ার আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রংয়ের মানুষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গ্রেট মাদ্রাজ ফ্যামিন যখন অনুপ্রেরণার উৎস
একদিন আমাদের সবার প্রিয় সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজে বেশ গরম গরম কথা বলছিলেন। মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ রাশমিকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×