ঘুমের কারণে আজকেও ভার্সিটির বাস মিস করেছি। এলার্ম ঘড়িটা যেদিন বালিশের পাশে রেখে ঘুমাই সেদিনই এমন শনির দশা লাগে। এলার্ম তো সময় মত টিকিই বেজেছে কিন্তু আরকটু ঘুমাই করে যে এলার্ম বন্ধ করেছি এই একটু আমার দুই ঘণ্টা খাইছে । এই পরবাসে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলার জন্য এলার্ম ঘড়িটা আপন জনের মত কাজ করে। কিন্তু ঘড়িটাও মনে হয় মাঝে মাঝে আপন মানুষের মত তেরে মেরে করে, ঠিক মত কাজ করে না। আমি বেচারা নিতান্ত গরিব মানুষ! ট্যাক্সি দিয়ে ভার্সিটিতে মাসে কয়েক বার যাওয়া আসা করলে ফতুর হয়ে যাব, কিন্তু ডক্টররা তো আমার দুঃখ বুঝবে না, রাতে মেইল পাঠাবে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার কারণে তোমার এক মার্ক কাটা হল।
ট্যাক্সির অপেক্ষায় হোস্টেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি । ট্যাক্সি দেখলেই হাত ঈশারা করছি কিন্তু কেউ থামছে না, সবাই সাঁ সাঁ আওয়াজ করে বাতাসের বেগে আমার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। প্রায় বিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ট্যাক্সি আমার সামনে এসে ব্রেক কষল। ড্রাইভার জানালার কাচ খুলে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় যাবেন ? আমি বললাম, ভার্সিটিতে।ড্রাইভার বলল, ঠিক আছে পঁচিশ রিয়াল দিয়েন উঠেন। আমি সুবোধ-বালকের মত হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়িয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কোন রকম সৌজন্যমূলক বাক্য বিনিময় ছাড়াই আমকে বাংলায় জিজ্ঞাস করল, ভাই! আপনার কি কোনো “তুমি” আছে? পর-মুহূর্তে নিজেই বিড়বিড় করে বলল, আপনি তো ভার্সিটিতে পড়েন, আপনার তো একটা না অনেকগুলো “তুমি” থাকবে। আমি তার দিকে অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। আমি তার প্রশ্ন বুঝিনি এমন একটা ভাব নিয়ে হিন্দিতে বললাম, কী? ড্রাইভার বলল ভাই, আপনি আমার সাথে বাংলায় কথা বলতে পারেন, আমিও বাংলাদেশি। আমি ভীষণ লজ্জা পেলাম। সে কীভাবে বুঝল আমি বাংলাদেশি? আসলে আমি একাটা গাদা! আমার খাতার উপরে যে বাংলায় আমার নাম লেখা আছে সেটা আমার খিয়ালিই নেই। আমি আর কোনও ভাবসাব না নিয়ে বললাম, হ্যাঁ, আপনি ঠিকিই বলেছেন, আমার অনেকগুলো “তুমি” আছে। আমার আটটা “তুমি” আছে।ড্রাইভার বলল, ভাই আপনি এতগুলো “তুমি”-কে কীভাবে কন্ট্রোল করেন? আমি তো একটা “তুমি”-কেই কন্ট্রোল করতে পারিনা। আমি বললাম, আমার “তুমি”-গুলোই আমাকে কন্ট্রোল করে আমি তাদেরকে কন্ট্রোল করিনা। আমরা সাত ভাই একবোন। আমার বড় পাঁচ ভাই আর ছোট একভাই এবং একবোন, তাদের সবাইকেই আমি তুমি করে ডাকি আর মাঝে মাঝে “মা”-কে তুমি করে ডাকি, আর বাবা না ফেরার দেশে চলে গেছে তাই আর তাঁকে ডাকা হয়না। ড্রাইভার আমতা আমতা করে বলল, ভাই! আমি এই তুমির কথা বলছি না, গার্ল-ফ্রেন্ড “তুমি”-র কথা বলছি। আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম, নারে ভাই এমন সুখের দিন এখনও আসেনি তবে সন্ধানে আছি, সন্ধান পেলে ছাই দিয়ে ধরব। কী বলেন আপনার কোনো “তুমি” নাই!বর্তমানেই তো আমার তিনটা “তুমি” আছে, আর এর আগে কত তুমি আইছে গেছে সেগুলোর তো হিসেবই নাই আর আমি আপনার জায়গায় থাকলে তো সবসময় চার পাঁচটা “তুমি” রিজার্ভে রাখতাম। কী করুম ভাই, মাইয়া মাইনষেরে বিশ্বাস করা যায় না তাই সবসময় তিন চারটা রিজার্ভে রাখি, একটা তিড়িং বিড়িং করলে আরেকটারে ধরি। আমি মনে মনে বলি, হায়রে মানবপ্রকৃতি! কারো বলে দুই তিনটা তুমি রিজার্ভে থাকে আর কেউ বলে একটা হারিয়েই মানবের অবদারিত পথের অপেক্ষায় দিন গুন্তে থেকে। ইয়া মাবুদ! তুমি আমারে উঠাইয়া লও অথবা মনের মত আরেকটা “তুমি” মিলাইয়া দাও। এই একলা জীবন আর ভাল্লাগে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

