জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন ৫৬ জন ব্লগার । ধর্ম অবমাননা ও নবীকে নিয়ে কটূক্তি করার কারনে ২০১২ সালের ৩১ মার্চ এসব ব্লগার আইনের আওতায় আনতে একটি ধর্মভিত্তিক সংগঠন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি তালিকা জমা দিয়েছিলেন । এদের মধ্যে চারজনকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উপায়ে গ্রেপ্তারও করেছে । সম্প্রতি আনসারুল্লাহ নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের হিট লিস্টে থাকা ব্লগার অভিজিৎ রায় খুন হওয়ার পর থেকে অন্য ব্লগাররা ও হামলা আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন বলে তাদের এক ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে ।
এসব ব্লগারের আশঙ্কা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া ওই তালিকা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। ব্লগারদের ভয় ওই তালিকা ধরে জঙ্গিরা তাদের ওপরও অভিজিৎ এর মতো হামলা চালাতে পারেন।
এ অবস্থায় অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার সবারই আছে । তাই বলে সেক্ষেত্রে যদি কেউ ধর্ম অবমাননা করে কোনো মন্তব্য করেন তাহলে তাকে প্রচলিত আইনে এনে বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু তাদের খুন করে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া কোনোভাবেই কারো কাম্য নয়। এতে ধর্ম ব্যবসায়ীরা ভালো সুযোগ পেয়ে যাবে। এ কারণে যত দ্রুত সম্ভব এসব খুনিকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ধর্ম অবমাননাকারীদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
তাই সার্বক্ষণিক ভাবে ব্লগগুলোর ওপর নজরদারি চালালে ভবিষ্যতে কেউ আর ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার সাহস পাবেনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের ডিসি মাসুদুর রহমান বলেন ৫৬ জনের ওই তালিকা হাতে পাওয়ার পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পাশাপাশি ওইসব ব্লগারের ব্লগ আইডি গুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। একই সঙ্গে অন্য ব্লগগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে ।
এরপর কোনো ব্যক্তি কোন ব্লগে ধর্ম বা ব্যক্তি নিয়ে কটূক্তি করে কোনো কিছু লেখার সাহস পায়নি । তারপরও যদি কেউ নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন তাহলে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানালে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া পুলিশের দায়িত্ব।
জানা গেছে ২০১২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার রাজীব খুন হওয়ার পর ব্লগারদের ধর্ম অবমাননার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর ব্লগারদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে তাদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল সভা-সমাবেশ শুরু করেন ।
এ পরিপ্রেক্ষিত ওই বছরের ৩১ মার্চ এসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেখানে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকার, ধর্ম ব্যবসায়ী, মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদ বিরোধী মজলিশের ব্যানারে 'আনজুমানে আল বাইয়্যিনাতের' পক্ষ থেকে ৫৬ 'নাস্তিক' বস্নগারের তালিকা জমা দেয়া হয়। এসব ব্লগার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্লগের মাধ্যমে ধর্ম ও নবীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে দাবি করা হয় । তবে বেশিরভাগ ব্লগারই ছদ্মনাম ব্যবহার করে বলে জানা যায় । ওই ব্লগাররা হচ্ছেন_ আরিফুর রহমান, মনির হাসান, বৃত্তবন্দি, সবাক/আমি রোদের ছেলে, শয়তান, মনজুরুল হক, ক-খ-গ, রাসেল (........), নাস্তিকের ধর্মকর্তা, দূরের পাখি, আরিপুল হক তুইন (দ-িত), তিতি আনা, নাজিম উদদিন, আলমগীর কুমকুম, ফরহাদ উদ্দিন স্বপন, দস্যু বনহুর, ফারহানা আহমেদ, ঘনাদা, রাহান, অন্য কেউ, পাপী ০০৭, হোরাস, প্রশ্নোত্তর, ভালো মানুষ, ভ-পীর, বৈকুণ্ঠ, সত্যান্বেষী, পড়ুয়াথপড়ুয়া, হাল্ক (সানাউল), বিপ্লব০০৭, রাস্তার ছেলে, ঘাতক, বিলাশ বিডি, সাহোশি৬, লাইটহাউস, মমতা জাহান, রাতমজুর, কৌশিক, মেঘ দূত, স্বপ্নকথক, প্রায়াপাস, আহমেদ মোস্তফা কামাল, লুকার, নুহান, সোজা কথা, ট্র্যানজিস্টার, দি ওয়ান, রিসাত, আমি এবং অাঁধার, অরণ্যদেব, কেল্টুদা, আমি রোদের ছেলে, ভিন্ন চিন্তা, আউটসাইডারথআউটসাইডার ও প্রণব আর্চার্য। এ তালিকা হাতে পাওয়ার পর ২০১২ সালের ২ ও ৩ এপ্রিল চারজন বস্নগারকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গেয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছেন_ আসিফ মহিউদ্দীন, সুব্রত অধিকারী, মশিউর রহমান ও রাসেল পারভেজ। এরা সবাই ব্লগে ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন বলে তদন্তে উঠে আসে। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র মশিউর রহমান বিপ্লবের ব্লগার নাম (আল্লামা শয়তান), রাসেল পারভেজের (অপবাঘ) ও সুব্রত শুভর (লালু কসাই)। বর্তমান সবাই জামিনে মুক্ত। এই চার ব্লগারের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ও মুক্তির দাবিতে পরের দিন প্রতিবাদ সমাবেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। পরে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে থেকে তারা মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে আধাঘণ্টা অবস্থান করেন। এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সভায় উপাচার্য বিষয়টি দেখার আশ্বাস দেন। এরপর থেকেই মূলত বিষয়টি এখানেই থেমে যায়।
জানা গেছে, এসব ঘটনার আগে ২০১২ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে উত্তরায় নিজ কার্যালয়ের সামনে ব্লগার আসিফকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। গ্রেপ্তার চারজন উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে জানান ডিবি কর্মকর্তারা। এই আদর্শের অনুসারীরাই হত্যা করে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে। এই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে নিজবাসার অদূরে বস্নগার রাজীব হায়দারকে খুন করা হয়। রাজীব হত্যায় আনসারুল্লাহ বাঙলা টিম নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করলে ব্লগে ধর্ম অবমাননাকারী লেখকরাই তাদের শত্রু বলে প্রকাশ পায় । এরপর ওই সংগঠনের প্রধান জসিমউদ্দিন রাহানীসহ আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর গোপীবাগে কথিত ভ-পীর লুৎফার রহমানসহ ৬ অনুসারী ও ফার্মগেটে উপস্থাপক ফারুকীকে একই স্টাইলে কুপিয়ে এবং গলা কেটে হত্যা করা হয়। পুলিশের ধারণা, এসব ঘটনার সঙ্গে উগ্রপন্থীদের যোগসূত্র রয়েছে। তবে এসব ঘটনায় জড়িতদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে ২৬ ফেব্রুয়ারি টিএসসি বইমেলা প্রাঙ্গণে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রগতিশীল লেখক ড. অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশের ধারণা, এই খুনের সঙ্গেও আনসারুল্লাহ নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের হাত রয়েছে। এসব খুনের সঙ্গে ধর্ম বিষয়ের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এ কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া ৫৬ ব্লগারের অনেকে আতঙ্কে রয়েছেন।
তাদের মধ্যে চারজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভিন্নমত প্রকাশের কারণে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগে সবাই নিজেদের মত প্রকাশে ব্লগকে বেছে নেন। কিন্তু ব্লগে নিজেদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখলেও প্রযুক্তিতে পারদর্শী জঙ্গিরা ঠিকই এসব ব্লগারদের খুঁজে বের করে হত্যা করছে। আবার কখনো হত্যা চেষ্টাও চালানো হচ্ছে। এ কারণে অনেক ব্লগার জঙ্গি হামলার আতঙ্কে রয়েছেন। দ্রুত এসব খুনিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনলে হয়তো এ ধরনের খুনের তালিকা বাড়তেই থাকবে। পাশাপাশি নিজের জীবনের নিরাপত্তাও দাবি করেন এই চার ব্লগার। তাদের দাবি তালিকার ৫৬ জনই আতঙ্কে রয়েছেন। .
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকা জমা দেয়া আনজুমানে আল বাইয়্যিনাতের কর্মকর্তা ও একই প্রতিষ্ঠানের দৈনিক আল ইহসান পত্রিকার চিপ রিপোর্টার পরিচয় দেয় । টেলিফোনে বলেন তারা ২০১২ সালে ৫৬ জন ব্লগারের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলেন। এসব ব্লগার বিভিন্ন সময় ইসলাম ধর্ম ও নবী রাসূল সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করে ব্লগে লেখালেখি করেছেন বলে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়। এর কয়েকদিন পর চারজন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অন্য ব্লগারদের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ওই সময় পদক্ষেপ নিলে হয়তো ধর্ম নিয়ে অন্য কেউ মন্তব্য করার সাহস পেত না। তবে ভিন্ন মতের কারণে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া উচিত হয় বলে দাবি করে মোক্তাদির জানান, শান্তির ধর্ম ইসলামে খুন-খারাবি সমর্থন করে না

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



