
চার বছরের অভিনয় আর গানের ক্যারিয়ারে বেশ নাম যশ কামিয়েছিলেন ফিলিপাইনের কুইনি প্যাদিলিয়া। বিশ বছর বয়েসী শোবিজ তারকার জীবন ছিল এক কথায় স্বপ্নের মত - অন্তত তাই কুইনি ভাবতেন।
কিন্তু, "এটা ছিল একটা মিথ্যা স্বপ্ন", আবায়া আর ঘোমটা পরা কুইনি আরব নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বললেন। মেকআপ ছাড়া চেহারায় ছিল একটা প্রশান্তির ছাপ।
গেল বছর মক্কায় হজ্ব শেষে শোবিজ থেকে সম্পর্ক চুকিয়ে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কুইনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে তার জীবন পাল্টে দেয়া হজ্বের অভিজ্ঞতা বর্ণনার ভিডিও ইউটিউবে অসংখ্য লাইক আর শেয়ার পেয়েছে।
কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিলনা। প্রোডিউসার, ডিরেক্টর, গুণগ্রাহী সবার প্রত্যাশা চাপ ছিল তার উপর। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন, "আমি কি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে বাঁচব নাকি ভাল মুসলিম হিসেবে বাঁচার এবং সঠিক ভাবে ইসলাম পালনের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিব? একটা টানাপোড়েন ছিল কিন্তু আমার একটা সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমি (শোবিজ) ছেড়ে দিলাম। "
জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও কুইনি নিজেকে ইসলামে প্রত্যাবর্তিত দাবি করেন কারন, হজ্বের মাত্র আট মাস আগে তিনি পূর্ণহৃদয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সময়টা ছিল অস্ট্রেলিয়ায় তার মাকে দেখে আসার পর, যেখানে তিনি দুবোন আর ছোট ভাইয়ের সাথে নামে মুসলিম হিসেবে বেড়ে উঠেছিলেন।
তার বাবা হলেন জনপ্রিয় ফিলিপিনো অভিনেতা রবিন প্যাদেলিয়া। নব্বই দশকের শুরুতে তিনি অবৈধ অস্ত্র বহনের দায়ে জেল খাটার সময় ইসলামী রিতীতে কুইনির মাকে বিয়ে করেন। ১৯৯৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। তারকার ব্যাস্ত জীবন রবিনকে বাচ্চাদের ইসলামি শিক্ষা দেয়ার সুযোগ দেয়নি। তথাপি বাবকে কৃতিত্ব দিতে ভুলেননি কুইনি।
"যখন আমি ফিলিপাইনে গেলাম, আমার বাবা আমাকে হিজাব পরতে আর সালাত পড়তে বলেছিলেন। কিন্তু আমি বুঝতামনা যে কেন আমি সালাত পড়ছি। আমি ইসলাম আর মুসলিম পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলাম। তখনও আমি বিশ্বাসের মাধুর্য আস্বাদ করিনি। আমার মনে হয় একারণেই আমি ভুলপথে ছিলাম।"
তার মা তার মাত্র দুমাস আগে ইসলাম পালন শুরু করেন। বাচ্চাদেরও তিনি ইসলাম পালনে উৎসাহিত করতে থাকেন। কুইনি জানান যে, যখন মাকে পুরোদমে ইসলাম চর্চা করতে দেখেন তখন তিনি একটা সুখময় "ধাক্কা" খেয়েছিলেন।
"আমি তাঁর মাঝে একটা ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেয়েছিলাম যেটা বেড়ে উঠার সময় কখনো দেখিনি। তাঁর মুখ দিয়ে যে কথাই বের হচ্ছিল সবই ছিল ইসলাম আর আল্লাহকে নিয়ে। আর তিনি নিয়মিত কুরআন পড়ছিলেন আর লেকচার শুনছিলেন এবং পরনে ছিল হিজাব। আমি তাঁকে জিজ্ঞাস করলাম যে তিনি সমাজে হিজাব পড়তে কি ভয় লাগে কিনা। তিনি জবাব দিলেন যে তাঁর লাগেনা কারণ তাঁর আছে ধর্মানুরাগ এবং সেটাই মূল ব্যাপার।"
রাতের খাবার খেতে খেতে তারা আলোচনা করতেন পরকাল নিয়ে আর কাজে কর্মে তারা আল্লাহকে মান্য করছেন কিনা সেটা নিয়ে।
তিনি বললেন, "এটা আমাকে ভাবালো। আমি নিজেকে জিজ্ঞাস করতে লাগলাম যে আমি কি আসলেই সুখী? এবং আমি উপলব্দ্ধি করলাম যে আমার জীবনে কিছু একটা অনুপস্থিত। অন্তরে একটা শূণ্যতা ছিল। আমার মা যেমন অনুভব করছেন আমিও তেমন অনুভব করতে চাচ্ছিলাম কারণ, তিনি ছিলেন সুখী ও সন্তুষ্ট - আর প্রশান্ত। আমি তাঁকে বললাম, 'দোহাই লাগে, আমি ইসলাম নিয়ে আরও জানতে চাই।' "
তার মা তাকে আরও জানাতে লাগলেন। তিনি যতই ইসলাম নিয়ে জানতে লাগলেন ততই বুঝতে পারলেন মনের শূণ্যতা পূরণ করতে কি দরকার: নতুন করে ধর্মীয় উৎসাহ।
"এটা ছিল একটা চমকপ্রদ অনুভুতি। আমি মনে করি এটা ছিল আল্লাহর আহবান। আমি যতই ইসলাম নিয়ে জানলাম, এটা ততই আমার আবেগে পরিণত হল। আর প্রতিদিন, যখন আমি আরো বেশি বেশি জ্ঞান অর্জন করতে থাকলাম, আমার জীবনের অনুপস্থিত অংশগুলো ভরতে থাকলা। ধীরে ধীরে শূণ্যতাও কেটে যাচ্ছে।"
দুসপ্তাহ সৌদি আরব থাকাকালীন সময়ে তার সবচেয়ে স্মরনীয় ঘটনা ঘটেছে একটা হাসপাতালে। সেখানে তিনি দুর্লভ ক্যান্সারে আক্রান্ত এক ফিলিপিনো মহিলাকে দেখতে গিয়াছিলেন। কুইনি ঐ মহিলার জন্য দোয়া করলেন যার কাবায় যাবার স্বপ্ন ছিল। অল্পকাল পরেই ঐ রুগি ইসলামে প্রত্যাবর্তন করলেন শাহাদা ঘোষণা করে।
কুইনি বলেন, "ঐ রুগী আমাকে একরকম জাগিয়ে দিয়েছেন; তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিলেন যে অসুস্থতা বা মৃত্যু আমাদেরকে যেকোন সময় আঘাত হানতে পারে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রতিদিন (এর জন্য) প্রস্তুতি নেয়া উচিত।"
কুইনির বাবা মা যারা এখন আলাদা আলাদা সংসার করছেন, তার এ সিদ্ধান্তি ভীষণ খুশি। তার পরবর্তী লক্ষ তার ছোট বোন কাইলকে ইসলামের ব্যাপারে জানানো, যে নিজেও একজন উঠতি তারকা।
আজকাল কুইনি দৃঢ়তার সাথে কথা বলছেন যেটা তার পূর্বেকার টিভি সাক্ষাতকারগুলোতে অনুপস্থিত ছিল। তিনি এমন একজন নারীতে পরিণত হয়েছেন যিনি সাহস আর আত্মবিশ্বাসের সাথে মানুষকে ইসলামের পয়গাম দেন, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে তার জ্ঞানের পরিধি এখনো সীমিত।
(আরব নিউজ অবলম্বনে)
বোন খাদিজা/ কুইনির হজ্বের অনুভুতি নিয়ে আবেগঘন ভিডিওটি দেখুন:
আল্লাহ সুবহানাওতা'লা আমাদের এই বোনকে দুনিয়া আর আখিরাতের জীবনে শান্তি আর সাফল্য দান করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

