নোলা ওকস্ ৯৮ বছরে লাভ করলেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি
বয়স কি স্বপ্নপূরণে কোনো বাধা সৃষ্টি করে? না, সেটাই প্রমাণ করে দেখালেন ক্যানসাসের নোলা ওকস্ নামের এক বৃদ্ধা। গিনেজ রেকর্ড বুকে আরেকবার লেখালেন নিজের নাম। ‘আরেকবার’ মানে, এর আগে তিনি ২০০৭ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে নাম লিখিয়েছিলেন গিনেজ রেকর্ড বুকে!
২০১০ সালের ১৫ মে। ক্যানসাসের ফোর্ট হেইস স্টেট ইউনিভার্সিটি। শিক্ষার্থীদের বড়সড় সমাবেশ। মাস্টার ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে তাঁদের মধ্যে। সবাই ২০-২১ বছর বয়সের উচ্ছল তরুণ-তরুণী। যেমন ২১ বছরের আলেকজান্দ্রা ওকস্। আলেকজান্দ্রার পাশে তাঁর নানু নোলা ওকস্। ভাবতেই পারেন, নোলা ওকস্ বুঝি এসেছেন নাতনির আনন্দের সাথি হতে। আসলে কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে সেদিন ওই অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ নোলা ওকস্ নিজেই। কারণ ওই দিন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ হিসেবে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেছেন। মাথার সব চুল সাদা। তবু চুলে তাঁর বেণি বাঁধা। তার ওপর মাথায় গোল ঘেরটুপি। মাস্টার ডিগ্রি নেওয়ার দিন নোলা ওকসেক দেখে মনেই হয়নি তাঁর মনে বয়সের তেমন ছাপ পড়েছে। যদিও বয়স তাঁর ৯৮! মাটি থেকে মাত্র পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি উঁচু তাঁর মাথা। অবশ্য মানসিক উচ্চতা তাঁর আকাশ সমান। যেন, আকাশই তাঁর একমাত্র সীমানা!
জন্ম ১৯১১ সালের নভেম্বরে, আমেরিকায়। ব্রাউন সিটিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করে আয়েন্সওয়ার্থে দুই বছরের জন্য স্কুলে ভর্তি হন। তখন ‘ঘোড়ায় করে স্কুলে যাওয়ার মজাটা’ই অন্য রকম ছিল। ১৯২৭ সালে তাঁরা চলে যান ক্যানসাসে। সেখানে ১৯২৯ সালে ডজ সিটি কলেজ থেকে স্কুল ফাইনাল শেষ করেন নোলা। সংসারে তাঁদের টানাপোড়েন লেগেই থাকত। এ জন্য একটি স্কুলে পড়ানোর দায়িত্ব নেন নোলা ওকস্। কিন্তু যে স্কুলে যোগ দিয়েছেন, সেখানে শিক্ষকতার শর্তে লেখা ছিল, তিনি তত দিন শিক্ষকতা করতে পারবেন যত দিন একা থাকবেন, বিয়ে করলেই শিক্ষকতায় ইস্তফা। কারণ? নোলা বলেছেন, ‘অন্তঃসত্ত্বা একজন নারী ক্লাস করালে কি তা দৃষ্টিকটু হবে না?’ তাই ১৯৩৩ সালে যখন ভারনন ওকসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়, তখনই শিক্ষকতা ছেড়ে দিতে হলো নোলাকে। ‘বিয়ের পর কম বিপদের মধ্যে যায়নি আমাদের জীবন,’ নোলা তাঁর স্মৃতি থেকে বলছিলেন, ‘বিশেষ সমস্যা ছিল অর্থনৈতিক। দিনগুলো কাটত নানা দুর্বিপাকের মধ্যে।’ চার সন্তানের মা নোলা ওকস্ আর্থিক সচ্ছলতার জন্য মাঠে কৃষকের ভূমিকায় গম চাষ করেছেন। কষ্ট আরও বেড়ে যায় যখন স্বামী ভারনন ১৯৭২ সালে নোলাকে ছেড়ে ওপারে চলে গেলেন চিরতরে। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। শেষে, বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন। এর কি কোনো গোপন রহস্য আছে? নোলা ওকসের কাছ থেকেই শুনুন:
‘আমি পড়াশোনা ভালোবাসি। আমার পরিবার আর বন্ধুরা খুবই ভালো। তারা আমার স্বপ্নকে শ্রদ্ধা করেছে বলেই হয়তো আমি মানসিকভাবে অনেকটা এগিয়ে থেকেছি। কখনোই মনে করিনি যে হেরে যাব। আত্মবিশ্বাস ছিল আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। জানতাম, এ জন্য অনেক কাজ করতে হবে। আমি তা করেছি। এমনকি, বয়সের অজুহাতে কখনো ক্লাস ফাঁকি দিইনি। বিশেষ কোনো সুবিধাও নিইনি স্যারদের কাছ থেকে। ভালোবেসেই পড়াশোনাটা করেছি। আমার স্বপ্নের সঙ্গে আমি কখনো লুকোচুরি করিনি। নিজ ইচ্ছাশক্তিই আমার আসল প্রেরণা। বয়সের ভারে বসে পড়া কিংবা আক্ষেপে আঙুল মোচড়ানো আমি পছন্দ করি না। কারণ, বয়সকে মাথায় নিলে সেটা হতো আমার পথের সবচেয়ে বড় বাধা। আমার কাছে বয়স আর কিছুই নয়, বরং বয়স একটা সংখ্যা মাত্র।’
যাঁরা স্বপ্ন দেখেন নিজেকে, দেশকে বা বিশ্বকে বদলে দেওয়ার, তাদের উদ্দেশে নোলা ওকস্ বলেন, ‘প্রত্যেকের ভেতরে আরেকটা মানুষ থাকে। সেখানে থাকে তাঁর গোপন চাওয়া। সে যা হতে চায় বা করতে চায় সেই বাসনাটা ওখানেই বাস করে। কারও কাছে মনে হতে পারে স্বপ্নটা সে ছুঁতে পারবে না। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ইচ্ছে আর একাগ্রতা থাকলেই সাফল্য পাওয়া ভার নয়। কিন্তু ইচ্ছেটা হতে হবে ভেতর থেকে। আমি সবাইকে বলি, তোমার বুকের ভেতর অনেক চাওয়া থাকতে পারে। সবচেয়ে পছন্দের স্বপ্নটা স্থির করো। আর সেই অনুসারে পরিশ্রম করো। শেষ পর্যন্ত লেগে থাকো। স্বপ্ন সত্যি হবেই। আমি তো আমার নাতি-নাতনিদের বলি, তোমাদের নানু পেরেছে। তোমরা কেন পারবে না?’
সংগৃহীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

