
ব্যক্তিগত জীবনে জিন্নাহ অত্যন্ত পাশ্চাত্য-ঘেঁষা ছিলেন। দামি স্যুট পরতেন, ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন এবং প্রথাগত ইসলামি অনুশাসন (যেমন খাদ্যাভ্যাস বা প্রার্থনা) সেভাবে মেনে চলতেন না; ধার্মিক না হলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার এই দ্বিচারিতা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই; ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কীভাবে চলবেন বা কী করবেন, সেটি আমার আলোচনার বিষয় নয়।
আমার কনসার্ন বাংলা এবং বাংলার রাজনীতি নিয়ে; এই পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেই আমি জিন্নাহ বা অন্য যেকোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে মূল্যায়ন করব।
১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাবে, যা মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ ফোরামে গৃহীত হয়েছিল, ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র বা "independent states" প্রতিষ্ঠার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৬ সালের একটি অধীনস্থ Legislators' Convention-এ সেই প্রস্তাব কার্যত সংশোধন করে একাধিক রাষ্ট্রের ("independent states") পরিবর্তে একটি একক রাষ্ট্রের ("State") ধারণা চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ মূল প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে স্পষ্টভাবে "autonomous and sovereign" বলা হয়েছিল; ফলে ছয় বছর পর জিন্নাহর "states" শব্দটিকে 'মুদ্রণ প্রমাদ' বলে দাবি করা শুধু নথিগত নয়, যৌক্তিকভাবেও অসংগত। কারণ সার্বভৌম ও স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটের সমষ্টি কখনো একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সমার্থক হতে পারে না। এই স্বপ্রনোদিত বিচ্যুতি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হঠকারিতার ফলেই একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিবর্তে ১৯৪৭ সালে এমন একটি পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, যার দুই অংশের মধ্যে ছিল প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটারের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং গভীর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান।
অথচ, মূল লাহোর প্রস্তাবের যুক্তি অনুসরণ করা হলে, ১৯৪৭ সালেই বাংলার মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে একটি পৃথক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। মূল লাহোর প্রস্তাব যে লজিক্যাল ছিল ও ১৯৪৬ এর সংশোধনী যে ভুল ছিল তার প্রমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
একীভূত বাংলা নিয়ে কখনো সেভাবে আন্দোলন গড়ে ওঠেনি; সুভাষ চন্দ্র বসু (কংগ্রেসের সভাপতি) বা বাংলার তৎকালীন নেতৃবৃন্দ অখণ্ড ভারত স্বাধীনের চিন্তা করছিলেন। পরবর্তীতে যখন দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং তার প্রেক্ষিতে লাহোর প্রস্তাব সামনে আসে, তখন জিন্নাহর মূল প্রস্তাবের পরিপন্থী কাঁটাছেঁড়ার ফলে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে আলাদা স্বাধীন 'বাংলা' রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়।
১৯৪৬ সালের রাজনৈতিকভাবে আরোপিত সংশোধনীটি মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামোতে স্বাধীন বাংলার পথ রুদ্ধ করেছিল। তবে বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের চূড়ান্ত মোহভঙ্গ ঘটে ১৯৪৭ সালে। মাউন্টব্যাটেন প্ল্যানের মাধ্যমে যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা স্পষ্ট হয় এবং হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের অনড় দাবিতে ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন তারা অনুধাবন করেন যে ২০০ বছরের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত পরিণতি হতে যাচ্ছে নিজস্ব স্বাধীনতা হারানো এবং মাতৃভূমির দ্বিখণ্ডন। এই কাঠামোগত ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে, মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান ও কংগ্রেসের বিভাজন নীতির প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক অনুঘটক হিসেবেই তারা শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে 'অখণ্ড স্বাধীন বাংলা' (United Bengal)-এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু কংগ্রেসের আধিপত্যবাদ এবং জিন্নাহর ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে এটি বাস্তবায়নের জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎচন্দ্র বসু যে একীভূত সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব করেন, তা মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবেরই প্রতিফলন ছিল। অর্থাৎ, কাঠামোগতভাবে ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাব অনুসরণ করে বাংলা একটি আলাদা রাষ্ট্র হলে মুসলমানদের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল না। একীভূত বাংলা হোক বা বর্তমান বাংলাদেশ, উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রটি হতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
কেন্দ্রীয় হঠকারিতা অর্থাৎ ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার সরাসরি বিরোধিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের কারণে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। জিন্নাহ প্রথমে একীভূত বাংলার পক্ষে মত দিলেও তা ছিল মূলত কংগ্রেসকে চাপে ফেলার কৌশল, কারণ তিনি জানতেন কংগ্রেস এটি মেনে নেবে না।
অর্থাৎ, কাঠামোগত বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, জিন্নাহ যখন "states" শব্দটিকে মুদ্রণ প্রমাদ বলে খারিজ করে একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিলেন, তখন তিনি কার্যত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের বহুরাষ্ট্রভিত্তিক রূপরেখাকেই প্রত্যাখ্যান করলেন। সেই মুহূর্ত থেকেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার সম্ভাবনার বিরোধিতা তার রাজনৈতিক প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
অথচ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মুসলিম লীগের অবস্থান ছিল কাঠামোগতভাবে ভঙ্গুর। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাব, সিন্ধু বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (সিন্ধু: ২৭/৩৪ আসন পেলেও অন্তর্দলীয় দ্বন্দ্বে সরকার ভেঙে যায়, পাঞ্জাব: ৭৩/৮৬ আসন, এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ: ১৭/৩৮ আসন পেয়েও এই সকল প্রদেশ সরকার গঠন করতে পারেনি) কিন্তু বাংলায় মুসলিম লীগ শুধু নির্বাচনে জয়ীই হয়নি, প্রাদেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণও অর্জন করেছিল।
ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনে বাংলার এই আইনসভা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ জিন্নাহকে কেন্দ্রের (কংগ্রেস ও ব্রিটিশ) বিরুদ্ধে দরকষাকষির সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করে। এই সরকারি কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ১৬ আগস্টের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' রাষ্ট্রীয় মদদে কার্যকর করা অসম্ভব হতো। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের বিপুল আসনজয় মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পক্ষে একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট, এমনকি কার্যত একটি গণভোট (Referendum) হিসেবেও কাজ করে।
Harun-or-Rashid, "The Foreshadowing of Bangladesh: Bengal Muslim League and Muslim Politics, 1906-1947" (UPL, 2003), Chapter 5.
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় নিরঙ্কুশ বিজয় এবং পরবর্তীতে বাংলার আইনসভা ও প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত ১৬ আগস্টের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' ব্রিটিশদের সামনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বাস্তবতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। এর ফলে ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয় যে, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি অখণ্ড ভারত রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। পাকিস্তান দাবির পক্ষে জিন্নাহর রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল বাংলা; কারণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর মধ্যে বাংলাই ছিল সর্বাধিক জনবহুল এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই, বাংলার বিপুল জনসমর্থন, আইনসভার সমর্থন এবং প্রাদেশিক সরকার ছাড়া জিন্নাহর পৃথক রাষ্ট্রের দাবি একই মাত্রার রাজনৈতিক বৈধতা, গণভিত্তি বা দরকষাকষির ক্ষমতা অর্জন করতে পারত না।
দেশভাগের পর জিন্নাহ সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিবর্তে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় গভর্নর-জেনারেলের পদ গ্রহণ করেন, যে পদটি মূলত ঔপনিবেশিক ভাইসরয়ের উত্তরাধিকার। একই সঙ্গে তিনি গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগের প্রধানও ছিলেন। ফলে আইনসভা, দল এবং নির্বাহী ক্ষমতা কার্যত একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যা সংসদীয় জবাবদিহিতার পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভর শাসনের ভিত্তি তৈরি করে।
অর্থাৎ, যে ঔপনিবেশিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর সেই একই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামোই নতুন রাষ্ট্রে বহাল রাখা হয়। শাসকের পরিচয় বদলালেও শাসনের চরিত্রের মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
এই মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা যায় ভাষা প্রশ্নে। ঢাকায় জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বহুজাতিক ও বহুভাষিক রাষ্ট্রে ভাষানীতি নিয়ে গণতান্ত্রিক আলোচনা বা রাজনৈতিক সমঝোতার পথ না নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের একতরফা ঘোষণাকে জাতীয় নীতিতে পরিণত করা হয়। ফলস্বরূপ, পরবর্তীকালে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ এবং ‘জাতির পিতার’ ঘোষণার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এভাবেই একটি ভাষাগত দাবিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নে রূপান্তরিত করা হয়, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল নীতি—বিরোধিতা ও ভিন্নমত প্রকাশের বৈধতার—সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
Sayeed, Khalid bin. Pakistan: The Formative Phase, 1857-1948. Oxford University Press, 1968, pp. 223–225. (Analyzes Jinnah's adoption of the Viceregal system and his unilateral dictates on provincial matters, including the language issue).
Talbot, Ian. Pakistan: A Modern History. Hurst & Company, 1998. (Examines the use of Islamic ideology and Jinnah's legacy as instruments for centralizing state power).
এর পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। জিন্নাহ স্বাধীন পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে ১৯৩৫ সালের ঔপনিবেশিক ভারত শাসন আইন এবং ভাইসরয়-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোকে বহাল রাখেন। ফলে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস হিসেবে নির্বাচিত সংসদের পরিবর্তে নির্বাহী আমলাতন্ত্র ও গভর্নর-জেনারেলের পদ ক্রমশ অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পাকিস্তান জন্মলগ্নেই এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, যেখানে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার চেয়ে কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীকালে সংবিধান প্রণয়নে বিলম্ব, নির্বাচিত সরকার বরখাস্তের সংস্কৃতি, আমলাতন্ত্রের প্রভাব বিস্তার এবং সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালেই গৃহীত এই ঔপনিবেশিক শাসন মডেলের যৌক্তিক পরিণতি ছিল। সেই অর্থে, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক পথচলার আকস্মিক বিচ্যুতি নয়, বরং প্রতিষ্ঠাকালেই নির্মিত ক্ষমতা কাঠামোর পরিণত রূপ।
Jalal, Ayesha. The State of Martial Rule. Cambridge University Press, 1990, pp. 277-279. (Examines how the central bureaucracy invoked Jinnah's legacy posthumously to crush provincial autonomy and validate an un-elected executive apparatus).
প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও সংসদকে কার্যত পাশ কাটিয়ে জিন্নাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নয়, বরং নির্বাহী প্রধানের হাতে ন্যস্ত। ফলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার পরিবর্তে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হয়ে ওঠে।
এই মানসিকতার ধারাবাহিকতায় কেন্দ্র Section 92A-এর অপব্যবহার করে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারগুলোকে বারবার বরখাস্ত করতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালে সিন্ধু সরকার এবং ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারের বরখাস্ত তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। এর ফলে প্রদেশগুলোর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতা কেন্দ্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল; কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরিতার বীজ তখনই স্থায়ীভাবে রোপিত হয়।
অন্যদিকে স্বাধীনতার প্রায় এক দশক পর পর্যন্ত একটি নিজস্ব সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থতা এবং ব্রিটিশ আমলের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরতা, নির্বাচিত সংসদের পরিবর্তে আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেই সাংবিধানিক বৈধতার পরিবর্তে প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনায় অ-নির্বাচিত শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপও ক্রমে স্বাভাবিক ও বৈধ বলে প্রতীয়মান হতে থাকে।
ফলত, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠালগ্নে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রীভূত ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার যৌক্তিক পরিণতিই ছিল ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১৯৬২ সালের একনায়কতান্ত্রিক সংবিধান। যা শুরু হয়েছিল নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে নির্বাহী কর্তৃত্বকে সর্বময় করার মধ্য দিয়ে, তা শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্ণ অবসানে গিয়ে পৌঁছায়।
যৌক্তিক উপসংহারে এটি প্রমাণিত যে, জিন্নাহ কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্রের স্থপতি। বাংলার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে পুঁজি করে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই বাংলার/ পাকিস্তানের ওপরই ঔপনিবেশিক ভাইসরয়ের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য চাপিয়ে দিয়েছেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের একাধিক রাষ্ট্রের রূপরেখাকে মুছে ফেলে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে তিনি যে চরম কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করেছিলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তারই অনিবার্য পতন।
সুতরাং, ঐতিহাসিক ডেটা ও কাঠামোগত বাস্তবতার নিরিখে স্বাধীন বাংলাদেশে জিন্নাহকে ত্রাণকর্তা বা মহামানব হিসেবে মহিমান্বিত করা শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব ও ঐতিহাসিক সংগ্রামের সাথে সরাসরি প্রতারণা। ব্যক্তিগত জীবনে জিন্নাহ অত্যন্ত পাশ্চাত্য-ঘেঁষা ছিলেন। দামি স্যুট পরতেন, ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন এবং প্রথাগত ইসলামি অনুশাসন (যেমন খাদ্যাভ্যাস বা প্রার্থনা) সেভাবে মেনে চলতেন না; ধার্মিক না হলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার এই দ্বিচারিতা নিয়ে কোনো আপত্তি নেই; ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কীভাবে চলবেন বা কী করবেন, সেটি আমার আলোচনার বিষয় নয়।
আমার কনসার্ন বাংলা এবং বাংলার রাজনীতি নিয়ে; এই পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেই আমি জিন্নাহ বা অন্য যেকোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে মূল্যায়ন করব।
১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাবে, যা মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ ফোরামে গৃহীত হয়েছিল, ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র বা "independent states" প্রতিষ্ঠার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৬ সালের একটি অধীনস্থ Legislators' Convention-এ সেই প্রস্তাব কার্যত সংশোধন করে একাধিক রাষ্ট্রের ("independent states") পরিবর্তে একটি একক রাষ্ট্রের ("State") ধারণা চাপিয়ে দেওয়া হয়। অথচ মূল প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে স্পষ্টভাবে "autonomous and sovereign" বলা হয়েছিল; ফলে ছয় বছর পর জিন্নাহর "states" শব্দটিকে 'মুদ্রণ প্রমাদ' বলে দাবি করা শুধু নথিগত নয়, যৌক্তিকভাবেও অসংগত। কারণ সার্বভৌম ও স্বায়ত্তশাসিত ইউনিটের সমষ্টি কখনো একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সমার্থক হতে পারে না। এই স্বপ্রনোদিত বিচ্যুতি ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হঠকারিতার ফলেই একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিবর্তে ১৯৪৭ সালে এমন একটি পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়, যার দুই অংশের মধ্যে ছিল প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটারের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং গভীর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ব্যবধান।
অথচ, মূল লাহোর প্রস্তাবের যুক্তি অনুসরণ করা হলে, ১৯৪৭ সালেই বাংলার মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে একটি পৃথক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। মূল লাহোর প্রস্তাব যে লজিক্যাল ছিল ও ১৯৪৬ এর সংশোধনী যে ভুল ছিল তার প্রমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
একীভূত বাংলা নিয়ে কখনো সেভাবে আন্দোলন গড়ে ওঠেনি; সুভাষ চন্দ্র বসু (কংগ্রেসের সভাপতি) বা বাংলার তৎকালীন নেতৃবৃন্দ অখণ্ড ভারত স্বাধীনের চিন্তা করছিলেন। পরবর্তীতে যখন দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং তার প্রেক্ষিতে লাহোর প্রস্তাব সামনে আসে, তখন জিন্নাহর মূল প্রস্তাবের পরিপন্থী কাঁটাছেঁড়ার ফলে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে আলাদা স্বাধীন 'বাংলা' রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়।
১৯৪৬ সালের রাজনৈতিকভাবে আরোপিত সংশোধনীটি মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ আইনি কাঠামোতে স্বাধীন বাংলার পথ রুদ্ধ করেছিল। তবে বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের চূড়ান্ত মোহভঙ্গ ঘটে ১৯৪৭ সালে। মাউন্টব্যাটেন প্ল্যানের মাধ্যমে যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখা স্পষ্ট হয় এবং হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের অনড় দাবিতে ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন তারা অনুধাবন করেন যে ২০০ বছরের ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত পরিণতি হতে যাচ্ছে নিজস্ব স্বাধীনতা হারানো এবং মাতৃভূমির দ্বিখণ্ডন। এই কাঠামোগত ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে, মাউন্টব্যাটেন প্ল্যান ও কংগ্রেসের বিভাজন নীতির প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক অনুঘটক হিসেবেই তারা শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে 'অখণ্ড স্বাধীন বাংলা' (United Bengal)-এর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু কংগ্রেসের আধিপত্যবাদ এবং জিন্নাহর ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালে এটি বাস্তবায়নের জন্য তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।
১৯৪৭ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎচন্দ্র বসু যে একীভূত সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব করেন, তা মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবেরই প্রতিফলন ছিল। অর্থাৎ, কাঠামোগতভাবে ১৯৪০ সালের মূল লাহোর প্রস্তাব অনুসরণ করে বাংলা একটি আলাদা রাষ্ট্র হলে মুসলমানদের কোনো ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল না। একীভূত বাংলা হোক বা বর্তমান বাংলাদেশ, উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রটি হতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ।
কেন্দ্রীয় হঠকারিতা অর্থাৎ ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার সরাসরি বিরোধিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশের কারণে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। জিন্নাহ প্রথমে একীভূত বাংলার পক্ষে মত দিলেও তা ছিল মূলত কংগ্রেসকে চাপে ফেলার কৌশল, কারণ তিনি জানতেন কংগ্রেস এটি মেনে নেবে না।
অর্থাৎ, কাঠামোগত বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, জিন্নাহ যখন "states" শব্দটিকে মুদ্রণ প্রমাদ বলে খারিজ করে একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিলেন, তখন তিনি কার্যত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের বহুরাষ্ট্রভিত্তিক রূপরেখাকেই প্রত্যাখ্যান করলেন। সেই মুহূর্ত থেকেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার সম্ভাবনার বিরোধিতা তার রাজনৈতিক প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
অথচ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মুসলিম লীগের অবস্থান ছিল কাঠামোগতভাবে ভঙ্গুর। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে পাঞ্জাব, সিন্ধু বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (সিন্ধু: ২৭/৩৪ আসন পেলেও অন্তর্দলীয় দ্বন্দ্বে সরকার ভেঙে যায়, পাঞ্জাব: ৭৩/৮৬ আসন, এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ: ১৭/৩৮ আসন পেয়েও এই সকল প্রদেশ সরকার গঠন করতে পারেনি) কিন্তু বাংলায় মুসলিম লীগ শুধু নির্বাচনে জয়ীই হয়নি, প্রাদেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণও অর্জন করেছিল।
ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনে বাংলার এই আইনসভা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ জিন্নাহকে কেন্দ্রের (কংগ্রেস ও ব্রিটিশ) বিরুদ্ধে দরকষাকষির সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করে। এই সরকারি কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ১৬ আগস্টের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' রাষ্ট্রীয় মদদে কার্যকর করা অসম্ভব হতো। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের বিপুল আসনজয় মূলত ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পক্ষে একটি রাজনৈতিক ম্যান্ডেট, এমনকি কার্যত একটি গণভোট (Referendum) হিসেবেও কাজ করে।
Harun-or-Rashid, "The Foreshadowing of Bangladesh: Bengal Muslim League and Muslim Politics, 1906-1947" (UPL, 2003), Chapter 5.
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলায় নিরঙ্কুশ বিজয় এবং পরবর্তীতে বাংলার আইনসভা ও প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে সংঘটিত ১৬ আগস্টের 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' ব্রিটিশদের সামনে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বাস্তবতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। এর ফলে ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয় যে, হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি অখণ্ড ভারত রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। পাকিস্তান দাবির পক্ষে জিন্নাহর রাজনৈতিক শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল বাংলা; কারণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর মধ্যে বাংলাই ছিল সর্বাধিক জনবহুল এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই, বাংলার বিপুল জনসমর্থন, আইনসভার সমর্থন এবং প্রাদেশিক সরকার ছাড়া জিন্নাহর পৃথক রাষ্ট্রের দাবি একই মাত্রার রাজনৈতিক বৈধতা, গণভিত্তি বা দরকষাকষির ক্ষমতা অর্জন করতে পারত না।
দেশভাগের পর জিন্নাহ সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিবর্তে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় গভর্নর-জেনারেলের পদ গ্রহণ করেন, যে পদটি মূলত ঔপনিবেশিক ভাইসরয়ের উত্তরাধিকার। একই সঙ্গে তিনি গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগের প্রধানও ছিলেন। ফলে আইনসভা, দল এবং নির্বাহী ক্ষমতা কার্যত একই ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যা সংসদীয় জবাবদিহিতার পরিবর্তে ব্যক্তিনির্ভর শাসনের ভিত্তি তৈরি করে।
অর্থাৎ, যে ঔপনিবেশিক কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর সেই একই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা কাঠামোই নতুন রাষ্ট্রে বহাল রাখা হয়। শাসকের পরিচয় বদলালেও শাসনের চরিত্রের মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
এই মানসিকতারই প্রতিফলন দেখা যায় ভাষা প্রশ্নে। ঢাকায় জিন্নাহ ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বহুজাতিক ও বহুভাষিক রাষ্ট্রে ভাষানীতি নিয়ে গণতান্ত্রিক আলোচনা বা রাজনৈতিক সমঝোতার পথ না নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের একতরফা ঘোষণাকে জাতীয় নীতিতে পরিণত করা হয়। ফলস্বরূপ, পরবর্তীকালে বাংলা ভাষা আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ এবং ‘জাতির পিতার’ ঘোষণার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এভাবেই একটি ভাষাগত দাবিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রশ্নে রূপান্তরিত করা হয়, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল নীতি—বিরোধিতা ও ভিন্নমত প্রকাশের বৈধতার—সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।
Sayeed, Khalid bin. Pakistan: The Formative Phase, 1857-1948. Oxford University Press, 1968, pp. 223–225. (Analyzes Jinnah's adoption of the Viceregal system and his unilateral dictates on provincial matters, including the language issue).
Talbot, Ian. Pakistan: A Modern History. Hurst & Company, 1998. (Examines the use of Islamic ideology and Jinnah's legacy as instruments for centralizing state power).
এর পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। জিন্নাহ স্বাধীন পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে ১৯৩৫ সালের ঔপনিবেশিক ভারত শাসন আইন এবং ভাইসরয়-কেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোকে বহাল রাখেন। ফলে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস হিসেবে নির্বাচিত সংসদের পরিবর্তে নির্বাহী আমলাতন্ত্র ও গভর্নর-জেনারেলের পদ ক্রমশ অধিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পাকিস্তান জন্মলগ্নেই এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, যেখানে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার চেয়ে কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীকালে সংবিধান প্রণয়নে বিলম্ব, নির্বাচিত সরকার বরখাস্তের সংস্কৃতি, আমলাতন্ত্রের প্রভাব বিস্তার এবং সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালেই গৃহীত এই ঔপনিবেশিক শাসন মডেলের যৌক্তিক পরিণতি ছিল। সেই অর্থে, ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক পথচলার আকস্মিক বিচ্যুতি নয়, বরং প্রতিষ্ঠাকালেই নির্মিত ক্ষমতা কাঠামোর পরিণত রূপ।
Jalal, Ayesha. The State of Martial Rule. Cambridge University Press, 1990, pp. 277-279. (Examines how the central bureaucracy invoked Jinnah's legacy posthumously to crush provincial autonomy and validate an un-elected executive apparatus).
প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও সংসদকে কার্যত পাশ কাটিয়ে জিন্নাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নয়, বরং নির্বাহী প্রধানের হাতে ন্যস্ত। ফলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার পরিবর্তে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি হয়ে ওঠে।
এই মানসিকতার ধারাবাহিকতায় কেন্দ্র Section 92A-এর অপব্যবহার করে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারগুলোকে বারবার বরখাস্ত করতে শুরু করে। ১৯৪৮ সালে সিন্ধু সরকার এবং ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারের বরখাস্ত তার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। এর ফলে প্রদেশগুলোর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতা কেন্দ্রের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল; কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও বৈরিতার বীজ তখনই স্থায়ীভাবে রোপিত হয়।
অন্যদিকে স্বাধীনতার প্রায় এক দশক পর পর্যন্ত একটি নিজস্ব সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থতা এবং ব্রিটিশ আমলের সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর নির্ভরতা, নির্বাচিত সংসদের পরিবর্তে আমলাতন্ত্র ও সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেই সাংবিধানিক বৈধতার পরিবর্তে প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনায় অ-নির্বাচিত শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপও ক্রমে স্বাভাবিক ও বৈধ বলে প্রতীয়মান হতে থাকে।
ফলত, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠালগ্নে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রীভূত ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার যৌক্তিক পরিণতিই ছিল ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১৯৬২ সালের একনায়কতান্ত্রিক সংবিধান। যা শুরু হয়েছিল নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে নির্বাহী কর্তৃত্বকে সর্বময় করার মধ্য দিয়ে, তা শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্ণ অবসানে গিয়ে পৌঁছায়।
যৌক্তিক উপসংহারে এটি প্রমাণিত যে, জিন্নাহ কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি কাঠামোগত স্বৈরতন্ত্রের স্থপতি। বাংলার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ম্যান্ডেটকে পুঁজি করে তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই বাংলার/ পাকিস্তানের ওপরই ঔপনিবেশিক ভাইসরয়ের মতো একচ্ছত্র আধিপত্য চাপিয়ে দিয়েছেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের একাধিক রাষ্ট্রের রূপরেখাকে মুছে ফেলে এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে তিনি যে চরম কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করেছিলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তারই অনিবার্য পতন।
সুতরাং, ঐতিহাসিক ডেটা ও কাঠামোগত বাস্তবতার নিরিখে স্বাধীন বাংলাদেশে জিন্নাহকে ত্রাণকর্তা বা মহামানব হিসেবে মহিমান্বিত করা শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং এটি আমাদের অস্তিত্ব ও ঐতিহাসিক সংগ্রামের সাথে সরাসরি প্রতারণা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


