somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খুন হয়ে যাই

১৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৬ রাত ১০:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তখনো সূর্য দেখা যায়নি। শীতের কুয়াশা আর শিরশির বাতাসে আমি অপেক্ষা করছি বাসের জন্য। আমাদের ছোটখাটো উপজেলা সদরটা পালটে গেছে অনেক। অন্তত: বছর দশেক তো হবেই; পরিচিত দোকান গুলোয় যাওয়া হয় না, আড্ডা দেয়া হয় না। মেরিনা কুলিং কর্ণার আর ক্যাফে ডিলাক্স বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজমীর হোটেল কিংবা শরীফ হোটেল আছে কিনা জানি না। এক টাকায় বড় বড় সিঙাড়া, দুই টাকার ডালপুরি কেটে দুই ভাগ করে দুই বন্ধু খাওয়া। আহ্! পুরনো দিন গুলোর ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছিল বারবার। হঠাৎ দেখি - অ্যাশ কালারের চাদর গায়ে দিয়ে আস্তে আস্তে হেটে আসছেন একজন। আমাদের প্রফুল্ল স্যার। ক্লাস ফাইভে অংক পড়াতেন। ভীষণ ভয় পেতাম। "দুইটি সংখ্যার যোগফল থেকে তাদের বিয়োগফল বাদ দিলে ফলাফল হবে ছোট সংখ্যার দ্্বিগুণ" - এইটা ক্যামনে হবে কিভাবে হবে ব্যাখ্যা করার জন্য সারাদিন সময় দিয়েছিলেন। বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোচিং ক্লাসে কলম মুখে দিয়ে আমরা সারাদিন বসেছিলাম।
...প্রফুল্ল স্যারকে দেখে এগিয়ে গেলাম। পায়ে ধরে সালাম করলাম। সহজ সরল এই মানুষটি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন। নানান কথা হলো। কিন্তু আমি আর কথা এগুতে পারছিলাম না। ক্রমশ: নিজের মাঝে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। অল্প সময়ের জন্য দেশে গেলেও ঘটনাটা শুনেছি -
...গতমাসে কারা জানি (আসলেই?) কোন এক কারণে (আসলেই?) মাঝরাতে স্যারের ঘরের দরজায় লাত্থি মারে। এত রাতে কে এসেছে জানতে চেয়ে দরজা খুলতে দেরী হওয়ায় তারা নাকি ঘরের বেড়া কাটা শুরু করেছিল। শেষমেশ দরজা খুলতে হয়েছিল।
"আমি শিক্ষক মানুষ, আমার কাছে কি পাবা বাবারা..."
কথা শোনার সময় হয়তো ছিলো না। যার জন্য 'বাবা'রা এসেছিল, সে তখন সীমান্তের ওপারে। ঈশ্বর মানুষটা অতো খারাপ না। ঘরে কিছুনা পেয়ে মোবাইলটা নিয়ে গেছে। সিমকার্ড রেখে গেছে দয়াপরবশ হয়ে। আল্লাহ অবশ্যই বিপদশঙ্কুলদের হেফাজত করেন।

আমি প্রফুল্ল স্যারের চোখে তাকাতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না। এক সময়কার ভয় এখন ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। বাস ছাড়ার পর কেমন যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছিল নিজেকে। ক্লাস এইটে ফেল করে পড়ালেখা বন্ধ করে দেয়া আমাদের বন্ধু; এখনকার মুদি দোকানী সেলিমকে খুব হিংসে হয়। এই আগুন বাজারে সে হয়তো স্যারের কাছে খানিকটা কম দামে জিনিস বেচে। ফার্মেসীর দোকানদার ইকবাল হয়তো স্যারকে ডাকে - স্যার, আসেন প্রেশারটা একটু চেক করে দিই। ...আর আমি? আমি কি করছি?

আমি এখনো দৌড়াচ্ছি। মেরিনা কুলিং কর্ণারের তিন টাকার ড্যানিশ/প্যাটিসের বদলে আমি এখন ম্যাকমামা আর কেএফসি দাদুর ভক্ত। সিজলার্স, এমকে, ফুজি শেষ করে সেনানিগামসের ফোর হানড্রেড গ্রামের বীফ স্টেকে কামড় দিই আয়েশ করে। অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার একটা 'ধান্ধা' করছি অনেকদিন ধরে। হবে হবে করেও হচ্ছে না। কারেন্সী রেট ভায়োলেট করে অফিসে কিভাবে নতুন প্রজেক্ট পাস করানো যাবে ঐ চিন্তাটা মাথায় ঘুরে সারাদিন। আহারে প্রফুল্ল স্যার - আপনিই আমাকে যত্ন করে অংক শিখিয়েছিলেন। আপনার আশীর্বাদ আমার পাথেয়...।

এবারের ষোলই ডিসেম্বর:
এবারের ষোল তারিখ সারাদিন আমি একজন বাবুরাম সাপুড়ের সাথে ছিলাম। ভীষণ ক্ষমতার এই মানুষটি আমার দেশেরই নাগরিক। বিদেশে এসেও তার হম্বিতম্ভির কমতি নেই। সারাদিন তার সাথে আমাকে থাকতে হয়েছে। বিনীত হয়ে কথা বলতে হয়েছে। অনেক অযৌক্তিক কথায় রাইট রাইট বলে যেতে হয়েছে। ব্যাকগ্রাউন্ডটা অফিসিয়াল। আমার মেরুদন্ড সারাদিন বাঁকা হয়ে ছিল। টিকটিকি হয়ে যাচ্ছিলাম প্রতি মুহূর্তে। তবুও সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিলাম, বাংলাদেশ কম্যুনিটির প্রোগ্রামে যাবো...।

পাতায়ায় বাঙালী কম্যুনিটি খুব বড় নয়। 160/170 জনের মতো বাঙালী। আগের সন্ধ্যায় আফজাল ভাইয়ের দোকানে শুনেছি বেশ ভালো প্রোগ্রাম হবে। বিকেলে রেডি হলাম প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য। এবার যখন দেশে গেলাম তখন একজন ব্লগারের সাথে প্রথম দেখা হলো। প্রথম দিনই তিঁনি আমাকে চমৎকার একটি টি-শার্ট গিফট করেছেন। শার্টের বুকে বিভিন্ন বাংলা বর্ণ। নিচে লেখা - "এক একটি বাংলা অক্ষর একেকটি জীবন"। খুব আগ্রহ করে টি-শার্টটি পরলাম। তখনই ফোন পেলাম - গ্রুপিং হওয়ায় বাংলাদেশ কম্যুনিটির প্রোগ্রাম হচ্ছে না, একটা গ্রুপ ব্যাংককে চলে যাচ্ছে। প্রোগ্রাম হবে কিনা অনিশ্চিত। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো।

এটিএন বাংলায় বিজয়ের গান চলছে - 'জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো...'

মা!

সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৬ রাত ১১:১২
১৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মায়াময় স্মৃতি, পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫….(৯)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৬

অষ্টম পর্বের লিঙ্কঃ পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)

১০ই জিলহজ্জ্ব তারিখে (০৬ জুন ২০২৫) সূর্যোদয়ের আগেই আমরা মুযদালিফা থেকে রওনা হয়ে সকাল সকাল ‘বড় জামারাত’ বা জামারাত আল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুদিত, অনূদিত এবং অনুবাদিত, কোনটার কী অর্থ?

লিখেছেন নতুন নকিব, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪

অনুদিত, অনূদিত এবং অনুবাদিত, কোনটার কী অর্থ?

অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত।

প্রথমেই বলা দরকার, "অনূদিত" শব্দটি সাধারণত সঠিক এবং প্রমিত বানান হিসেবে ব্যবহৃত হয় যখন অর্থ "অনুবাদ করা হয়েছে এমন" বা "ভাষান্তরিত"... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শেকল ভাঙার গান

লিখেছেন ইসিয়াক, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:০২

রক্ত-আগুনে প্রতিবাদ চলুক,
বিক্ষোভের অনলে সারাদেশ জ্বলুক ।
শেষ থেকে শুরু হোক না আবার,
নতুন করে তো কিছু নেই হারাবার!

পুনরায় বিনাশিব তিমির রাত
আঁধার কেটে জাগবে প্রভাত।

দিকে দিকে সংগঠিত হও... ...বাকিটুকু পড়ুন

এসি ছাড়াই ঘর থাকবে বরফ শীতল: মেনে চলুন বিশেষজ্ঞদের বিশেষ টিপস

লিখেছেন শিমুল মামুন, ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬


তীব্র তাপপ্রবাহে (Heatwave) জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন ঘর ঠান্ডা রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ঘর শীতল রাখতে যে সবসময় এসির (Air Conditioner) প্রয়োজন হবে, তা নয়। বিশেষজ্ঞরা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Diplomacy is not tourism

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৯


আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের তীরে সেনেগালের রাজধানী ডাকার। এপ্রিলের শেষে সেখানে বসেছে 'Dakar International Forum on Peace and Security in Africa'-এর দশম আসর। নামটা দীর্ঘ হলেও এবারের হাওয়া বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×