somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

৭ মার্চ , রবিবার ১৯৭১ বাঙ্গালীর নতুন করে জন্ম নেয়া আরো একবার

০৭ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :





৭ মার্চ , রবিবার ১৯৭১ ( একাত্তরের দিনগুলি - শহীদ জননী জাহানারা ইমাম )








আজ বিকেলে রমনা রেসের মাঠে গণজমায়েত । গত কদিন থেকে শহরের সবখানে , সবার মধ্যে এই জনসভা নিয়ে তুমুল জল্পনা-কল্পনা, বাকবিতন্ডা , তর্ক-বিতর্ক । সবাই উত্তেজনায় , আগ্রহে , উৎকন্ঠায় , আশঙ্কায় টগবগ করছে । আমি যদিও মিটিংয়ে যাব না , বাসায় বসে রেডিওতে বক্তৃতার রিলে শুনব , তবুও আমাকে এই উত্তেজনার জ্বরে ধরেছে ।







এর মধ্যে সুবহান আমাকে জ্বালিয়ে মারল । আজ তাড়াতাড়ি রান্না সারতে বলেছিলাম ।শরীফ বলেছে বারোটার মধ্যে খাওয়া সেরে একটূ বিশ্রাম নেবে । ঠিক দেড়টাতে রওনা দেবে , নইলে কাছাকাছি দাঁড়াবার জায়গাও পাবে না । আর সুবহান হতচ্ছাড়াটা এগারোটার সময় গোশত পুড়িয়ে ফেলল । বারেককে দিয়েছিলাম রুমী জামীদের সর্ট ইস্ত্রি করতে । সুবহান চুলোয় গোশত রেখে বারেকের সঙ্গে ইস্ত্রি করাতে মেতেছে । তিনি আজও শেখের বক্তৃতা শুনতে যাবেন , তাই তার নিজের প্যান্ট সার্ট ইস্ত্রি তদারকিতে ডিমের অমলেট করে ডাল-ভাজি সহ ভাত দিলাম শরীফকে ।





স্বামী শাফী ইমাম, সন্তান শহীদ রুমি ও জামী সহ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

এতবড় কান্ড করে , এত বকা খেয়েও সুবহানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই । রান্নাঘরে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্যান্ট-সার্ট পরে তিনি শরীফদের সঙ্গে চললেন বক্তৃতা শুনতে।
আজ বারেক্ব গেছে ওদের সঙ্গে । এর আগে কোনো মিটিংয়ে যেতে দিইনি ওকে । আজকে না দিলে বড় অন্যায় হবে । কিটির ঘরে গিয়ে ওর বারো ব্যান্ডের দামী রেডিওটা চেয়ে নিয়ে উপরে গেলাম ।

ওকেও আস্তে বললাম আমার ঘরে । বাবা দুপুরের খাওয়ার পরে শুয়ে ঘুমোচ্ছেন ।

আমি রেডিওটা নিয়ে আয়েশ করে বিছানায় শুলাম । একটূ পরে কিটীও এল । রেডিও অন রেখেই দু'জনে শুয়ে শুয়ে গল্প করতে লাগলাম ।






রেডিওতে " আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালোবাসি " গানটা শোনা গেল । আমরা কথা বন্ধ করে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম ।ওমা ! তারপর আর শব্দ নেই । কি ব্যাপার ? শব্দ নেই তো নেই - ই ।কারেন্ট গেল? বাতির সুইচ টিপে দেখলাম কারেন্ট আছে ।
রেডিওটা খারাপ হল ? নব ঘুরিয়ে দেখলাম অন্য স্টেশন ধরছে / তাহলে?
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েবলয়াম , " চল ছাদে যাই তো " ।
দুজনে ছাদে গেলাম । পুবদিকে সোজাসুজি মাপলে মাত্র আধ মাইল্ দূরে রেসের ময়দান ।

নানা রকম শ্লোগানের অস্পষ্ট আওয়াজ আসছে । আকাশে চক্কর দিচ্ছে হেলিকপ্টার ।হেলিকপ্টার কেন ? কি ব্যাপার ?

ব্যাপার সব জানা গেল শরীফরা মিটিং থেকে ফেরার পর ।
কলিং বেলের শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে দরজা খুলতেই রুমী দুই হাত তুলে নাটকীয় ভঙ্গিতে ' এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম , এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম ' বলতে বলতে ঘরে ঢুকল। দেখি , ফকরুদ্দিন ও এসেছেন । ফকরুদ্দিন - সংক্ষেপে ফকির , শরীফের স্কুল জীবনের বন্ধু ।তবে রাজনৈ্তিক অঙ্গনের খবরাখবরে তার চেয়ে ওয়াকিবহাল আমাদের জানার মধ্যে আর নেই ।
সোফায় ধপ করে বসে পড়ে ফকির বললেন , ' ভাবী , চা খাওয়ান । একসঙ্গে তিন কাপ-গলা শুকিয়ে কাঠ ।





শহীদ রুমী

' চেহারাও তো শুকিয়ে কাঠি । কি করে বেড়ান আজকাল ? খান না নাকি ?
শরীফ মুচকি হেসে বলল , নেতাদের লেজ ধরে দৌতাদৌড়ির চোটে ওর নাওয়া - খাওয়ার ফুসরত নেই । ' সুযোগ পেয়েই শরীফ ফকিরের পিছনে লাগে । আমি সুবহানকে চায়ের হুকুম দিয়ে সোফায় বসলাম , ' ওসব লেগ-পুলিং এখন রাখ । মিটিংয়ার কথা বল ।রেডিও বন্ধ করা হয়েছে কেন ? আকাশে হেলিকপ্টার দেখলাম যেন । '
রুমী বলল , ' হেলিকপ্টার তো পয়লাতারিখে পল্টনের জনসভাতেও ছিল । ওরা বোধ হয় গার্ড ইব অনার দেওয়ার রেওয়াজ করেছে ।'

সবাই হেসে উঠল । কিটি রেডিও হাতে গুটিগুটি এসে দাঁড়াল , মৃদুকণ্ঠে বলল , ' রেডিও এখনো চুপ ' ।





আমি বললাম ,' কিটি এখানে এসে বস । আজ তোমার বাংলা বোঝার পরীক্ষা নেব ।এখানে বসে আমাদের বাংলায় কথাবার্তা শোন , তারপর পুরোটা বলতে হবে । রেডিওতা খোলাই থাক । '
কিটি হেসে সহজ হল , সোফায় এসে বসল । আমরা বাঁচলাম --- এখন কলকল করে মাতৃভাষায় আলাপ ন আকরলে প্রাণে শান্তি হবে না ।
রেসকোর্স ময়দানে মাঠের জনসভায় লোক হয়েছিল প্রায় ত্রিশ লাখের মতো । কত দুরদুরান্ত্র থেকে যে লোক এসেছিল মিছিল ক অরে , লাঠি রড ঘাড়ে করে --- তার আর লেখাজোখা নেই । টঙ্গী , জয়দেবপুর,ডেমরা ---এসব জায়গা থেকে তো বটেই, চব্বিশ ঘন্টার পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে ঘোড়াশাল থেকেও বিরাট মিছিল এসেছিল গামছায় চিড়ে - গুড় বেঁধে । অন্ধ ছেলেদের মিছিল করে মিটিংয়ে যাবার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলাম ।বহু মহিলা , ছাত্রী মাঠে গিয়েছিল শেখের বক্তৃতা শুনতে ।

' কিন্তু শেখ নিরাশ করেছেন সবাইকে ।' রুমীর একথায় সবচেয়ে প্রতিবাদ করে উঠলেন ফকির , ' তোমার মাথা গরম , চ্যাংড়া ছেলেরা কি যে বল না --- ভেবেচিন্তে ---শেখ যা করেছেন , একদম ঠিক করেছেন ।'
সেটি পুরোন বাকবিতন্ডা --- যা গত কয়েকদিন ধরে সর্বত্রই শুনছি । একদম চায় শেখ স্বাধীনতা দিক ...আরেক দল বলছে তাহলে সেতা রাষ্ট্রদোহিতা হবে । বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হবে ।
রুমী তার স্বভাবস্বিদ্ধ মৃদু গলাতেই দৃঢ়তা এনে প্রতিবাদ করল , ' আ্পনারা দেয়াল লিখন পড়তে অপারগ । দেখেন নি আজ মিটিংয়ে ক লাহা লোক স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে নিয়ে এসেছিল ? জনগণ এখন স্বাধীনতাই চায় । এটা তাদের প্রাণের কথা । নইলে মাত্র এই ছয়দিনের কর্মকান্ডের মধ্যে সবাই সবখানে স্বাধীন বাংলার ওই রকম ম্যাপ লাগানো পতাকা সেলাই করার মত একটা জটিল কাজ , অন্যসব কাজ ফেলে , করে , সেটা । আবার বাতাসে নাড়াতে নাড়াতে প্রকাশ্যে দিবালোকে মিছিল করে যায় ? '

তর্কের গন্ধ পেলে তর্কবাগীশ ফকির সর্ব্দাই চাঙ্গা , তিনি বললেন , ' তুমিও দেখছি চার খলিফার দলের ।'








রুমী বলল ,' আমি কোন দলভুক্ত নই , কোন রাজনৈ্তিকদলের শ্লোগান বয়ে বেড়াই না । আমি সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন , মান- অপমান জ্ঞানসম্পন্ন একজন সচেতন মানুষ । আমার মনে হচ্ছে শেখ আজ অনায়াসে ঢাকা দখল করারা মস্ত সু্যোগ হারালেন ।

আমি বাঁধা দিয়ে বলে উঠলাম , ' এই সুদুরপ্রসারী তর্ক শুরু করার আগে য়ামি তোমাদের কাছ থেকে শুনতে চাই ছোট্ট একটা খবর । শেখের বক্তৃতা রিলে করা হবে বলে রেডিওতে আন্যাউন্স করেও শেষ পর্যন্ত রিলে করা হল না কেন ? কেনই বা রেডিও একদম ডেডষ্টপ ? এইটে শোনার পর আমি রান্নাঘরে চলে যাব । তখন তোমরা মনের সুখে সারারাত কচকচ করো । '

' শেখের বক্তৃতা রিলে করার জন্যে বেতার- কর্মীরা তো তৈ্রিই ছিল শেষ মুহূর্তে মার্শাল ল অথরিটি বক্তৃতা রিলে করতে দিল না ।ব্যস , অমনি রেডিও ষ্টেশনের সমস্ত কর্মীরা হাত গুটিয়ে বসল । শেখের বক্তৃতা রিলে করতে না দিলে অন্য কোন প্রোগ্রামি যাবে না । তাই রেডিও এরকম চুপ । '




জামী এতক্ষন একটাও কথা বলে নি , এখন হঠ্যাৎ বলে উঠল , ' জান মা , আজ বিকেলের প্লেনে টিক্কা খান ঢাকায় এসেছে গভর্নর হিসাবে ।"

এক সপ্তাহ , দুইবার গভর্নর বদল । এক তারিখে ভাইস এডমিরাল এস। এম ।আহসানকে বদলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকে দেওয়া হয়েছিল , এখন আবার ছ'দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে আনা হল । কি এর আলামত ?

আজ রাতে রেডিও আর গলাই খুলল না ।






সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মার্চ, ২০১৭ রাত ২:১২
২টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:১৭

একটি মেয়ের দৌড়াদৌড়ি ও একটি মায়ের অপেক্ষা

মঙ্গলবার রাত ১০টা ২৭ মিনিট। গুলশানের একটি হাসপাতালে থেমে গেল ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজের হৃদয়- দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর।

আর ঠিক তখন, শহরের অন্য প্রান্তে, মুন্সিগঞ্জ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৫

ট্রাম্পের উপর ওভার ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন একটি সমীকরণ তৈরি হয়েছ- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি। ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঙ্গালী কেন মুসলমান হতে পারে না?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৫

অনারব টার্কিশ, কুর্দি আর ইরানিয়ানরা তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষন করে ও তা ধারন করেও তারা মুসলিম, পাকিস্তানের পাঞ্জাবীরাও যখন নিজেদের পাঞ্জাবী জাতি হিসেবে অহংকার করে, তখনও তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×