প্রতি বছরের মতো এবারেও ভেতর বাড়ির উঠোনের বা’দিকের কোণের আমগাছটিতে লম্বা লম্বা আম ধরলো যেমনটি ধরে আসছে বহুবছর যাবত; ঢেকিঘরের পাশের পৌঢ় তালগাছটি যথারীতি নিস্ফলা থেকে গেল তার কৈশোর এবং যৌবনের অগৌরবের দিনগুলিকে অনুসরণ করে বা ঢেকিঘর নামক ুদ্র স্থাপনাটিকে কোনরূপ হুমকির মুখোমুখি না করে, অন্যান্য বছরগুলির মতোই পর্যাপ্ত শোল, টাকি, কই, শিং ইত্যাদি জিয়েল মাছ ধরা পড়লো বাগানের একবারে শেষ প্রান্তের মজা পুকুরটিতে, এমনকি তার পাশে দাড়িয়ে থাকা গাবগাছটিও মজা পুকুরের প্রতি অনবরত পাতা ঝরানোতে কোন ব্যত্যয় ঘটালো না কিন্তু যে বিশেষ ঘটনাটি বিশেষভাবে অন্যান্য বছরগুলি থেকে এ বছরকে আলাদা করে ফেললো তা হলো, এ বছরেই শাহিদা বেগম টের পেলেন এবং নিশ্চিত হলেন যে তার শরীরের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া বন্ধ হয়েছে, অর্থাৎ তার রজ:নিবৃত্তি ঘটেছে। হায় আল্লাহ, দিনটির জন্য তার কতোকালের অপো! মুহুর্তের মধ্যেই শাহিদা বেগম দেখে নিলেন তার কাটিয়ে দেয়া জীবনের যা যা মনে আছে সবকিছুই, বায়স্কোপের মতো ফ্রেমের পর ফ্রেম। তার মধ্যে অনুজ্জ্বলতা ও নিস্তব্ধতার বাইরে আরো দুটি জিনিস আছে, একটি ত থেকে গড়িয়ে পড়া উজ্জ্বল লাল রক্ত অন্যটি আর্তনাদের শব্দ। ’আর্তনাদের দিন শেষ হয়ে এলো’ একটি লম্বা শ্বাস ফেলতে ফেলতে ভাবলেন তিনি। মৃত আর্তনাদ গুলির শেষকৃত্য করতেই যেনবা তিনি হেটে বেড়ালেন পুরো বাড়ির একপাশ থেকে অন্যপাশ। তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোটা পানি। কিছুণের মধ্যে ফোটাগুলি রীতিমত ধারায় পরিণত হলো। কিন্তু ভেতরে তেমন কোন আবেগ উদ্বেলিত করলো না তাকে। ঘা খাওয়া কালশিটে পড়া পাথুরে স্বত্তা এতোটাই নির্বিকার যে শরীরের এই প্রতিক্রিয়া গা করতেই চাইলো না। যদিও শেষ পর্যন্ত এ প্রতিরোধ টেকে না, টিকলোও না। মাগরিবের আযান পড়লে মাথায় ঘোমটা দিয়ে ঘরের দিকে রওনা হলেন তিনি।
ফেরার পথে সিড়ির পুকুরের পাশে জামরুল গাছটি ধরে কয়েক মুহুর্ত দাড়ালেন, বিশ্রাম নেয়ার ভঙ্গিতে। সেখানেও চমক অপো করছিলো, একদিন দু’দিন নয়, বেশ কয়েকবছর ধরে। কিন্তু যে নিজেই এক অনন্ত অপোর সাধনায় লিপ্ত অন্যের অপোয় তার সাড়া দেয়ার সুযোগইবা কি ছিলো? জামরুল গাছটার একদম নীচ থেকে বেরিয়ে থাকা মোটা ডালটি কবে যেন ভেঙ্গে গেছে। সে এবং তার সমবয়সী কন্যা সালমার বাড়াবাড়ি রকম সখ্য ছিলো এই ডালটির সাথে। ডালভাঙ্গা ত যেখানে একটি স্থায়ী গর্ত তৈরি করেছে জামরুল গাছের শরীরে, সেখানটাতে হাত রাখলেন তিনি। টের পেলেন, অনেকদিনের জমানো অভিমান বাঁধভাঙ্গা পানির মতো সঞ্চারিত হচ্ছে বোবা গাছ থেকে তার শরীরে। চোখ দুটো আগেই ভিজে ছিলো, এ কারণে অনুশোচনা জানানোর কোন ভাষাই খুজে পেলেন না। আর কিছু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে ধরলেন তাকে। জলে ভেজা গাল আর ঠোট একটুখানি ছোয়ালেন সেই তে। টের পেলেন, শান্ত হচ্ছে।
পুরো ভেতর বাড়ির উঠোন জুড়ে শরীফের মা একাই মহা হৈচে জুড়ে দিয়েছে। প্রতিদিন ঠিক এই সময়ে এটাই স্বাভাবিক কারণ এখনই হাস-মুরগীগুলিকে খোপে পাঠানোর জন্য তাকে দস্তুরমতো যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে হয়। বারবার এদিক ওদিক ছোটাছুটি করা মুরগীগুলিকে সে একের পর এক বাক্যবান হানতে থাকে। ইতিমধ্যে খোপে ঢুকে যাওয়া মোরগকে ইঙ্গিত করে সে বলে, ’ও মাগীরা, ইহানে সিহানে দৌড়োচ্ছো কেন? তুমাগো নাং তো ভিতরে ঢুইকে গেইছে, তুমরা যাতিছো না কেন? নাকি এই নাংয়ে আর চলবে না, বন বিলেইর ঠাপ খাতি হবে।’ সন্ধ্যায় মুরগী খোপে পাঠানোর ব্যাপারে ইদানিং সে একটু বেশিই সতর্ক। মাঝেমধ্যেই বন বিড়াল হানা দিয়ে মুরগী নিয়ে খেয়ে ফেলছে। একদিন খোপেই আক্রমন চালিয়ে মেরে ফেলেছে বেশ কয়েকটি। তারপর খোপের প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আগের চেয়ে জোরদার করা হয়েছে।
শরীফের মার নিত্যকার এই রুটিন বাক্যবাণে সাধারণত প্রতিক্রিয়াহীন থাকলেও আজ একটুখানি হেসেই ফেললেন শাহিদা বেগম। অন্যান্য দিনের মতো সান্ধ্যকালীন ঝিম মারা বাদ দিয়ে হারিকেনের চিমনিগুলিকে পরিস্কার করতে বসলেন। সময় খুব বেশি নেই। চারপাশ থেকে গাছপালা ঘিরে থাকা বাড়িটিতে অন্ধকার চোখের পলকেই জেকে বসবে। পুরো শেষ বিকেলই অন্ধকারের প্রস্তুতির সময়। হঠাৎ করেই যেন দিনের শ্বাসনালী চেপে ধরে সে। একটু একটু করে তারিয়ে তারিয়ে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। শ্বাস হারিয়ে একসময় লাশ হয়ে পড়ে দিনের আলো, আর তখনই ঝুপ করে নেমে সময়ের উপর তার কালো মালিকানা ঘোষণা করে অন্ধকার। সর্বনাশা আর্তনাদগুলি থাকে এর লেজে লেজেই। তাদের নজর শুধু শাহিদা বেগমের উপরে। স্পষ্ট করে বললে তার শরীরের উপর। নাহ, সেই আতঙ্কের দিন আর নেই। তার শরীরের মালিক এখন আর কেউ নয়, তিনি নিজেই। আজকের দিনে দ্বিতীয়বারের মতো এই ভাবনা অনাবিল স্বস্তি দেয় তাকে। ক্রমান্বয়ে অস্পষ্ট হয়ে আসা হারিকেনের চিমনিগুলির দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ে যে ইলেকট্রিসিটি চলে এসছে একেবারে পাশের গ্রাম পর্যন্ত। শরীফের মা ও তার চোখের সামনে চারা থেকে চাম্বল গাছের গতিতে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠা শরীফ প্রায় প্রতিদিনই ঘ্যানঘ্যান করে, তিনি যেন এ গ্রামে ইলেকট্রিসিটি আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেন। থানা সদর থেকে চলে আসা পাকা ইটের রাস্তাটিও থেমে গেছে পাশের গ্রামেই। এখনো এ গ্রামের মানুষ বর্ষাকালে হাটু কাদা ভেঙ্গেই যাতায়াত করে। শরীফের মা ও শরীফের মতো গ্রামের অন্যান্যরাও আশা করে এসব সমস্যা সমাধানে তার সক্রিয়তার। কারণ প্রায় ন’বিঘার ভিটেবাড়ি, দুটো নারকেল সুপারী বাগান আর শ’দুয়েক বিঘা ধানী জমি নিয়ে হাজী ইজাজত উদ্দিন ছিলেন ছোট এই গ্রামের উল্লেখ করার মতো ধণী। উইল সূত্রে সে সম্পত্তির প্রায় পুরোটারই মালিক শাহিদা বেগম। কিন্তু বাস্তব কারণেই কোন বিষয়ে সচেতন উদ্যোগ গ্রহণ করার মতো অবস্থা তার ছিলো না এক সর্বগ্রাসী অপোর কাল কাটাতে কাটাতে। তার অর্থ দাড়িয়ে যায় যে তিনি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। হয়তো সেটিই সত্যি। কিন্তু এ কেমন ব্যস্ততা? নিরন্তর নিজেকে নিস্ক্রিয় থেকে নিস্ক্রিয়তর করে ফেলা। একমাত্র তিনিই জানেন, আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই মহাযুদ্ধে অন্য কোন গোলা বারুদ তার কাছে ছিলো না।
গত দশ বছরে একবারের জন্যও এ বাড়ির বাইরে পা ফেলেন নি তিনি। এমনকি মাত্র কয়েক মিনিটের হাটা দূরত্বের নাগালে অবস্থিত তার বাপের বাড়ীতেও না। চিন্তা করেই বুকের ভেতরে কেমন ছটফটানি লাগে আজ। আব্বা-আম্মা কেউ এখন আর বেচে নেই। দু’ভাই আছে, তাদের ছেলেমেয়েরা আছে। এরা মাঝেমধ্যে আসতো কিন্তু তার সার্বণিক ঘোরে থাকা তাদের কাছে ভুল বার্তা পৌছে দিয়েছে। কারো উপরেই কোন রাগ নেই তার। কখনো ছিলোও না। ছিলো শুধু যুদ্ধ, নিজের সাথে। হারিকেনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই হারিকেনটিকে হ্যাজাক লাইটের মতো উজ্জ্বল মনে হলো। পোড়া কপাল! স্মৃতির বায়স্কোপ কি আজই তাকে সব দেখিয়ে ছাড়বে?
যেদিন প্রথম হ্যাজাক লাইট দেখেছিলো চৌদ্দ বছরের কিশোরী শাহিদা সেদিন তার বিস্ময়ের অবধি ছিলো না। এর আগে সে হ্যাজাক লাইটের গল্প শুনেছে, যাত্রাগান বা গাজীর গীত হলে এই লাইট জ্বালানো হয়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তার, সুযোগ হওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। কিন্তু সেদিন তাদের বাড়ির উঠোনের দুই কোণে দুই হ্যাজাক লাইট জ্বলছিলো। আলো, এত আলো যে মনে হচ্ছিল চোখে ধাধা লেগে যাবে। ফুরফুরার গর্দিনশীন পীর সাহেব এসেছিলেন পাশের গ্রামে ওয়াজ করতে। ফেরার পথে একটু হঠাৎ করেই অল্প সময়ের নোটিশে পদধুলি দিলেন প্রিয় মুরিদ ওসমান ফরাজীর বাড়িতে। শাহিদার বাবা ওসমান ফরাজী গ্রামের বাজারের সবচেয়ে বড়ো মুদির দোকানের দোকানী। কিছু জমিজমাও ছিলো, যথেষ্ট স্বচ্ছলই বলা চলে। অকস্মাৎ স্বয়ং পীর সাহেবের আগমনে বিরাট হৈচৈ পড়ে গেল। লোকজন খবর দিয়ে পুকুরে জাল ফেলে বড়ো বড়ো দুটি কালবাউশ মাছ ধরা হলো। খাসী জবাই হলো। গ্রামের অন্যান্য সম্ভান্ত লোকদেরকে দাওয়াত দেয়া হলো। উঠোনে হ্যাজাক লাইটের আলোয় চেয়ার পেতে বিভিন্ন রকম ধর্মীয় আলাপ আলোচনার ছবক নেয়া হচ্ছিল হুজুরের কাছ থেকে। এদিকে রান্নাঘরে কয়েক বাড়ির মহিলারা মহা ব্যস্ত। বাটনা কুটনা চলছে, চলছে বিভিন্ন পদ রান্নার প্রস্তুতি। আম্মা রান্নাঘর থেকে দু’একবার চিৎকার করে ডাকলেও সাড়া দেয়নি শাহিদা। সামনের ঘর থেকে উঠোনের দিকেই তার সব নজর। এক মুহুর্তের জন্যেও চোখ ফেরাতে রাজী নয়।
উঠোনের দিকে তাকিয়ে শাহিদার বিস্মিত চোখ শুধু হ্যাজাক লাইট দেখছিলো তা নয়। তার চোখ ঘুরপাক খাচ্ছিলো চাচাতো ভাই খলিলের উপরেও। উনিশ/কুড়ি বছরের খলিল লুঙ্গির উপর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে কোমরে গামছা বেঁধে এমন ভাবভঙ্গি করছিলো যেন আয়োজনের সমস্ত দায়ভার তার উপরেই ন্যস্ত। উজ্জ্বল আলো খলিলের সাদা গেঞ্জির বাইরে থাকা কাঁধ ও হাতে পড়ে চিকচিক করছিলো যেন আলো শুধু হ্যাজাক থেকে নয় বেরোচ্ছিল তার শরীর থেকেও। বেশ কিছুদিন ধরেই খলিল একটা আগ্রহের বিষয় হয়ে গিয়েছিলো শাহিদার কাছে। খলিল এ বাড়িতে আসছে তা টের পেলেই অচেনা অজানা সব অনুভুতি আক্রমন করতো তাকে। অনুভুতিগুলির কোন গোছানো রূপ তার কাছে পরিস্কার ছিলো না। এটা যে বিশেষ একটা কিছু সে ধারণাও ছিলো না। কি যেন একটা ধেয়ে এসে তাকে কেমন দূর্বল করে ফেলতো। ভেতর থেকে কিছু একটা তাকে উস্কানী দিয়েই যেতো চোখ জোড়াকে খলিলের আশেপাশে ঘুরঘুর করানোর জন, যা তখনো জানা হয়নি, বোঝা হয়নি। বোধগম্যতা থেকে ঐ অনুভুতির অবস্থান কোন সুদূরলোকে ছিলো তাও নয়। শেষ বিকেলে যখন পুকুরে জাল ফেলা হয়েছিলো তখন মহা উৎসাহে লুঙ্গি কাছা মেরে খালি গায়ে পুকুরে নেমেছিলো খলিল। সাপের মতো নাচতে থাকা কালো শরীরের পেশীগুলি এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিলো কিশোরী চোখে যে একমাত্র হ্যাজাক লাইটের উজ্জ্বল চোখ ধাধানো আলো ছাড়া আর কিছুই তাকে সরাতে পারতো না। বাস্তবিক অর্থে এটা ছিলো তার বালিকা পর্যায়, পরিপূর্ণ কিশোরীরও নয়। অথবা ব্যাপারটি হয়তো এমন, বয়সন্ধি তার উল্লম্ফনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলো খলিল নামের একজনকে। সেই উল্লম্ফন এমনই বিপর্যয়কারী ও বেদনাবহ হয়েছিলো যে কপালে একটা অদৃশ্য ধাতব ছ্যাকা হয়ে পরবর্তী জীবনের স্মারক হয়ে গেলো।
উঠোনে হুজুরের ছবক চলছে। একপাশে চলছে খাসির চামড়া ছাড়ানো। বড়ো একটা গামলা হাতে অপো করছিলো খলিল, মাংশ ছাড়ানো হলেই পৌছে দেবে রান্নাঘরে। আর তখনই এশার আযান পড়েছিলো। রান্নাঘরে মহিলারা অসীম ব্যস্ততার ফাকেও মাথায় কাপড় তুলে দিলো। আম্মা এদিক ওদিক তাকিয়ে খুজলেন শাহিদা কোথায়। মেয়েটাকে বারবার বলা স্বত্তেও একই ভুল করে। মনে করে মাথায় কাপড় তুলে দেয় না। উঠোনে উপস্থিত সবাই তোড়জোড় শুরু করলো এশার জামাত আয়োজনের। স্বয়ং ফুরফুরার পীর সাহেবের এমামতিতে নামায পড়ার সুযোগ তো সচরাচর পাওয়া যাবে না। মাংশের গামলা রেখে পাটি নিতে খলিল আবারো বাড়ীর ভেতরে আসলো। হ্যাজাক লাইটের ধাধা তখন পুরোনো হয়ে গেছে। বয়সন্ধির ঝুকিপূর্ণ সাঁকো পেরোনোর ঘোর বাড়তে বাড়তে দূর এক রহস্যের পানে ছুটে যাওয়ার জন্য উন্মুখ। সামনের ঘরে ঢোকার দরজার আড়ালে দাড়িয়ে সে খলিলের ভেতরে ঢোকা দেখলো। একগাদা পাটি বগলে করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাহসটা ঘোরের কাঁধে ভর করে আর কোন বাঁধই মানলো না। দরজার ফাক দিয়ে মাথা বেরিয়ে পড়লো শাহিদার এবং একবারে মোম সময়ে। পূর্বাপর ঘটনার যোগ ছাড়াই চোরের মতো ধরা পড়াতে স্পষ্ট বুঝে গেল খলিল, লুকিয়ে লুকিয়ে তাকেই দেখা হচ্ছিল। লজ্জায় শাহিদার মনে হলো, সে মাটিতে মিশে যাচ্ছে না কেন। লজ্জা ঢাকতেই পেছনের ঘরের বারন্দায় গিয়ে কাঠের রেলিংয়ের ঠিক বাইরে দাড়িয়ে থাকা প্রিয় ডালিম গাছটিকে ছুয়ে দাড়ালো। তার বয়সী এই ডালিম গাছ ও শাহিদা একই সাথেই বড়ো হচ্ছিলো। প্রতিদিনই বেশ কয়েকবার তারা বাক্য বিনিময় করতো। অভিযোগ আদান প্রদানই ছিলো বেশি। কোনদিন শাহিদার অভিযোগ থাকতো এত চেষ্টা সত্বেও পোষা টিয়াপাখি কেন কথা বলা শিখছে না। ডালিম গাছের অভিযোগ পিপড়াগুলি তাকে বড়ো জ্বালায়। অন্যান্য ছোটখাট নিত্যকার ঘটনাও আলাপচারিতা থেকে বাদ পড়তো না। এত বড়ো লজ্জা বুকে নিয়ে রাতের অন্ধকারের যে ণে সে দাড়িয়েছিলো পূবের বারান্দায় তখন বাতাসও যেন কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলো। নিস্তব্ধতার মধ্যে থির হয়ে থাকা ডালিম গাছের পাতাগুলিও তার লজ্জা কাঁধে নিয়েছিলো, ছুয়ে দেয়ার সময় থেকেই। উঠোনে তখন এশার জামাত শুরু হয়ে গেছে, তাকবীরের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিলো। যে কসাই খাসির ছাল ছাড়াচ্ছিলো তার কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। সামনের দরজা দিয়ে কেউ একজন ঢুকলো ঘরের ভেতরে। দেখতে না পেলেও বোঝা গিয়েছিলো যে ওটা খলিল। নতুন একটা লুঙ্গি ছিলো তার পরনে। হেটে যাওয়া এলাকার চারপাশ থেকেই খসখস শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো। যদিও পুরোপুরি নিরিহ ঐ শব্দ কিন্তু শাহিদার জন্য শব্দটার প্রভাব ছিলো অনেকটা হৃদপিন্ডের উপর দিয়ে একটা আছাঁচা বাঁশের চটা ঘসে দেয়ার মতোই অভিঘাতপূর্ণ। কল্পনা করাও শক্ত যে বুকটা কেমন করে কেঁপে উঠেছিলো তার যখন টের পাওয়া গেল নতুন লুঙ্গির খসখস শব্দ পা টিপে টিপে হাজির হয়েছে একেবারে তার পিঠের কাছে, নিঃশ্বাস ফেলার দূরত্বে। বাইরের বাতাস, গাছপালা এমনকি বরই গাছের নীচে ঝিমাতে থাকা এ বাড়ির কুকুর ’বাহরাম’ এমনি থম মেরেছিলো যেন তাদের মাথায় বাজ পড়েছে অথবা তারা জানে যে তাদের মাথায় বাজ পড়তে যাচ্ছে। খলিলের বুক যখন তার পিঠ ছুইছুই তখন তার পৃথিবী দুলতে আরম্ভ করলো ভীষণ বেগে। কতোণ চলেছিলো এ ভয়ংকর দুলুনি তা সে জানে না। কিন্তু দুলুনিটা একেবারেই থেমে গেল এবং জোরে একটা বাতাস ছেড়ে বাইরের থমথমে পরিস্থিতির অবসান ঘটলো , যখন অতর্কিতে পেছন থেকে গায়ের জোরে জড়িয়ে ধরে খলিল তার বুকের দু’পাশে হাত দিয়ে রীতিমত মুচড়াতে শুরু করলো। বেশ ব্যাথা লাগা ছাড়া আর কোন অনুভুতি হলো না তার। এই পশুটিকে এখনি নিরস্ত করতে হবে, ভাবলো সে কিন্তু ভাবনার মুহুর্তটুকুর মধ্যেই পশু পর্যায় থেকে দানব পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে খলিল। এক ঝটকায় শাহিদাকে নীচে ফেলে দিয়ে তার উপর চড়ে বসেছিলো সে। পুরো ঘটনাপ্রবাহ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ’না’ শব্দটিকে প্রকাশ করার জন্য হাত পা ছুড়ে ধস্তাধস্তি করে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছিলো শাহিদা যদিও সেটা ছিলো অসম্ভব এক কাজ। কোনভাবেই তা না পেরে সে মৃদু চিৎকারে যা ছিলো অনেকটা অনুনয়ের ভঙ্গি, বলে উঠেছিলো না, না। কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল দানব কিন্তু তাকে ছাড়লো না। দানবটার নিঃশ্বাসের শব্দ ছিলো আহত সাপের ফোসফোস আওয়াজের মতো হলকা বাতাস। সেকেন্ডের বিরতি শেষে দানবটা রূপ নিলো ুধার্ত রাসে। চওড়া বা’হাতের থাবা দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো শাহিদার মুখ। তার নিঃশ্বাসই বন্ধ হয়ে গেলো। বাকী সবকিছু ভুলে সে তখন শ্বাস নেয়ার জন্য আকুপাকু করছিলো। রাসের ডান হাতের থাবা শাহিদার কোমরে পাজামার দড়ি খোজাখুজি করতে লাগলো। দড়িটা খুজে পেয়েই এত জোরে টান দিলো যে টেট্রনের দড়ি একটা বৃত্তাকার পাক খেয়ে ঘুরে আসার সময় পেটের ছাল চামড়া উঠিয়ে নিয়ে এলো। অদেখা হলেও অজানা নয় এমন একটা ফুল, ছোট্ট একটা গোলাপকুড়ি যে তার সংপ্তি জীবনের সেরা সময় কাটাচ্ছে, কুড়ি থেকে ফুল হয়ে ওঠার মাহেন্দ্রণ। একদিন ফুলটা দেখাও দিলো। কি চমৎকার তার সৌন্দর্য। ফোটা ফোটা শিশিরবিন্দু মুক্তার মতো লেগে আছে তার গায়ে। কিন্তু ফুলটা ছুয়ে দিতেই দেখা গেল যে ফুল নয়, সদ্য কামারের হাপর থেকে বের করা ধাঁরালো দা’য়ের গনগনে লাল পাশটাকেই ধরেছে শাহিদা। বাতাস, একটু বাতাস দরকার ছিলো তার। জগতের অসীম বাতাসের মধ্যে আর এক ফোটা বাতাসও কি বরাদ্দ নেই তার জন্য?
বাতাসের জন্য বুকভর্তি হাহাকার সাথে নিয়েই জীবন্তভাবে টের পেয়েছিলো শাহিদা, তাকে ছিড়েখুড়ে ফেলা হচ্ছে। হাত থেকে হাতের আঙ্গুল, পা থেকে পায়

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


