বাতাসের জন্য বুকভর্তি হাহাকার সাথে নিয়েই জীবন্তভাবে টের পেয়েছিলো শাহিদা, তাকে ছিড়েখুড়ে ফেলা হচ্ছে। হাত থেকে হাতের আঙ্গুল, পা থেকে পায়ের নখ, বুক, চোখ, নাক, কান সবই ছিড়ে ফেলা হচ্ছে। শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গের গভীরে বসে গেছে রাসের বিষাক্ত দাত। গভীর থেকে গভীরে বসে গিয়ে সে যেন কামড়ে ছিড়ে আনতে চাচ্ছিলো শাহিদার হৃদপিন্ডটিকে। সমগ্র স্বত্তা দিয়ে সে একান্ত মনের ডেকে যাচ্ছিলো, মা, মাগো! ডান হাতটি চাপা পড়েছিলো খলিলের কনুইয়ের নীচে, পেরেক গাঁথার মতো করে, বা’হাতটা মুক্ত ছিলো। কাঠের রেলিংয়ের ফাক দিয়ে বা’হাত বের করে সে ধরতে চেষ্টা করেছিলো প্রিয় ডালিম গাছটিকে, নাগাল পায়নি কিন্তু হাতটি সে শেষ পর্যন্ত নেড়েই গিয়েছিলো। যখন বরই গাছের নীচ থেকে বাহরাম হঠাৎ ঘেউঘেউ করে ডেকে উঠলো, রাসটা তাকে ছেড়ে দিয়েছিলো। মুক্তি পেয়ে সে নাক মুখ দিয়ে বাতাস টেনেছিলো যতোটা তার ফুসফুসে ধরে। তারপর গায়ের সবটুকু জোর দিয়ে এত জোরে ’মা’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলো যে খলিল তো খলিল, কেঁপে উঠেছিলো মোনাজাত করতে থাকা ফুরফুরার পীর সাহেব, সদম্ভে জ্বলতে থাকা হ্যাজাক লাইটের শিখা, বলতে গেলে চার বিঘার উপর দাড়িয়ে থাকা পুরো বাড়িটিই। শাহিদার দু’পায়ের ফাকে তখন আগুন গড়াচ্ছে, রক্ত হয়ে। এরই মধ্যে রক্তে ভিজে গিয়েছে পূবের বারন্দার মাটির মেঝের প্রায় অর্ধেকটা। জ্ঞান হারিয়েছিলো শাহিদা এবং কয়েক সেকেন্ড অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকিয়ে থেকে এক দৌড়ে এ তল্লাট থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলো খলিল। পর্দা-পুশিদা, নিয়ম কানুন ভেঙ্গে উপস্থিত সব নারী পুরুষ মুহুর্তের মধ্যে হাজির হয়েছিলো পূবের বারান্দায়। শাহিদার সৌভাগ্য যে আশেপাশে কি ঘটছে তা বোঝার মতো চৈতন্য ফিরে পেতে তার প্রায় বাহাত্তর ঘন্টা সময় লেগেছিলো। উঠে দাড়াতে পারে এরকম অবস্থা হওয়ার দু’দিনের মধ্যে হাজী ইজাজত উদ্দিনের তৃতীয় বিবি হয়ে আজকের এ বাড়িতে এসেছিলো সে।
বিয়ের পরে মাসখানেক ধরে কিশোরী শরীরটি নাড়াচাড়া করেছিলেন হাজী সাহেব। নাড়াচাড়া বলাই যুক্তিসঙ্গত কারণ অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করে তাকে অর্থবোধক করে তোলার মতো প্রয়োজনীয় তাগদ হাজী সাহেবের ছিলো না। তিনি নিজেও বুঝেছিলেন যে আর কিছু পারছেন না তার কারণ এই নয় যে তার দ্বিতীয় বিবি আয়েশা খানম বুড়িয়ে গেছেন। বরং কারণটি এই যে তিনি নিজেই আশিতে পৌছেছেন। এই অত্যন্ত জরুরী বোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই তিনি এ জাতীয় প্রচেষ্টা একেবারেই বাদ দিলেন এবং সম্পূর্ণরূপে ধর্মে কর্মে মনোনিবেশ করলেন। অধিকাংশ সময় মসজিদেই কাটাতে শুরু করলেন এবং ঢাকা থেকে বিশেষ মিহি সুতার কাফনের কাপড় কিনিয়ে এনেছিলেন। কিসে ভালো বা কিসে মন্দ সে বোধ ততোটা তীব্র ভাবে বোঝার বয়স না হলেও শাহিদার মনে হয়েছিলো এর চেয়ে আনন্দময় মুক্তি আর কিছুই হতে পারে না।
আজকের রাতটা বহুবছরের মধ্যে এমন একটা রাত যে কিনা নতুন অর্থ, নতুন ভাব বয়ে এনেছে তার জীবনে। ব্যতিক্রমী একটা কিছু যা সচরাচর করা হয় না, এরকম কোন কিছু করার তাড়না অনুভব করলেন তিনি। হতে পারতো তিনি দরজা বন্ধ করে ধৈ ধৈ করে খানিণ নাচলেন বা পাগলের মত হাহা করে একটা অট্টহাসি দিয়ে এ বাড়ির মরা চৌকাঠ-কড়িকাঠে খানিকটা নতুন প্রাণের সঞ্চার করে এবং এখানে বাসরত গুটিকয়েক জীবিত প্রাণী ও ততোধিক মৃত কবরবাসীকে স্তম্ভিত হওয়ার সুযোগ করে দিলেন। কিন্তু তা তিনি করলেন না, চোখের পানিও ফেললেন না কারণ সেটাও আজ যথেষ্ট হয়েছে। কিছু সময় ঘরের মধ্যে উদ্দেশ্যবিহীন হাটাহাটি করে আর কিছু না পেয়ে ঘরের জানালাগুলি খুলে দিলেন। সাথে সাথেই ভৎসনারত হাজী ইজাজাত উদ্দিনের মুখটা চোখে ভাসল তার। খোলা জানালা একদম সহ্য করতে পারত না বুড়ো। মৃত্যশয্যায় থাকাকালীন এর প্রকোপ আরো বেড়েছিল। শুধু জানালা বন্ধ করলেই চলত না, দু পাল্লার মাঝখানে লম্বালম্বি যে ছোট ফাকটা গলে কয়েক ফোটা সূর্যের আলো এসে পৌছাত তাও আটকে দিতে হত ন্যাকড়া দিয়ে। ভাবখানা এমন যে ওখান থেকেই আজরাঈল আসবে। মনে করেই হাসি পেয়ে গেল তার। এক ঝলক দারুন বাতাস হঠাৎ এসে গায়ে মাখলে তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন, বন্ধ জানালার সাথে তারও কি নিদারুণ অভ্যস্ততা গড়ে উঠেছিল। বাইরের হাওয়া কি তিনি ভয় পেতেন? জানেন না, উত্তর খোজেন নি কোনদিন। এটুকু বুঝতেন, ঐ খোলা জানালা দিয়ে, আপাত নিরিহ ঝিরিঝিরি বাতাসের সাথে মিশে কৌশলে চলে আসতে পারতো এমন কিছু যা সচেতন ভাবেই ব্যাঘাত ঘটাতো তার নিঃসীম একাগ্রতায়। এই ঘরের এই বিছানা, এই খোলা জানালা কিন্তু অন্য আরেকটি সময় যখন অনেকটা অজ্ঞাতেই তৈরি হয়েছিল ভাল লাগার দারুন দারুন সব মুহুর্ত, মনে পড়লো তার। চার পাঁচ বছরের চেনাজানায় সমবয়সী কন্যা সালমা তার সখী হয়ে উঠেছিল। সখীর চেয়েও বেশিকিছু নয় কি? আড়ালে আবডালে সালমা তাকে সই বলে সম্বোধনও করতো। সাথে সাথেই সে রেগে উঠতো এবং স্মরণ করিয়ে দিত, সে তার মা হয়। তবে বলার ভঙ্গিতে এমন কিছু থাকতো যাতে এ বক্তব্যের অন্ত:সার অন্তর্হিত হতো এবং খিলখিলিয়ে হেসে উঠতো সালমা। সালমার মা, হাজী সাহেবের মেজবিবি আয়েশা খানম তখন এ সংসারের দাপুটে কত্রী। তিনি ঠিকই এ হাসির শব্দ শুনতেন যেখানেই থাকুন না কেন এবং ধমকে উঠতেন চাপা গলায়, এত জোরে হাসে, এত জোরে! এই ধমকে হাসির আওয়াজ কমতো কিন্তু বেগ বাড়তো। তখন হাসতে বাকী থাকা অন্যজনও যুক্ত হয়েছে। দমকে দমকে ফুলে ফুলে তারা হাসছে, হেসেই যাচ্ছে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে, দুই অষ্টাদশী তরুনী নারী।
সালমার বিয়ে হয়েছিলো আরো একবছর আগে। সালমার স্বামী আহাম্মদ আলী জেলা শহরের কলেজে বি এ কাসে পড়তো, হোস্টেলে থেকে। পড়াশোনার খরচ হাজী সাহেবই যোগাতেন। এ গ্রামের স্কুলে মাস্টারী করে ঘরজামাই থাকবে আলী আহাম্মদ- এরকম একটি পূর্ব পরিকল্পনা থেকেই আয়েশা খানমের দুর সম্পর্কের ভাগ্নের সাথে সালমার সম্বন্ধ করা হয়েছিলো। সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক চলছিলো, তবে যেটা ঠিক স্বাভাবিক ছিলো না তা হলো, স্বামী কাছে না থাকা নিয়ে আদপেই সালমার কোন কাতরতা ছিলো না। কাতর হওয়ার ফুরসৎই বা মিলতো কখন? সালমার সার্বণিক ভাবনা, ব্যস্ততা ও কার্যকম আবর্তিত হতো তার ছোট মা ওরফে সইকে কেন্দ্র করেই। আহাম্মদ আলীর বিভিন্ন রকম পড়াশোনার বাতিক ছিলো। হোস্টেলে থাকলেও তার সংসারের কেন্দ্র এ বাড়ী হওয়ায় আহাম্মদ আলীর বই পুস্তকের ট্রাংকটি এ বাড়ীতেই থাকতো। যাযাবর, মুক্তাদীর আর শরৎচন্দ্রের বেশকিছু বই ছিলো সেখানে। প্রায় প্রতিদিনই দুপুরে দেখা যেত, দুপুরে খাওয়ার পর খাটের দুদিকে উপুড় হয়ে পড়তে বসেছে দুজন। সালমার হতে হয়তো যাযাবরের ’দৃষ্টিদান’, শাহিদার হাতে শরৎ বাবুর দত্তা বা দেনা পাওনা। একদম শুরুর দিকে এই পড়তে বসাটা ছিলো একটা মজার পাতানো খেলা, সালমার কাছে আগাগোড়াই তাই। কিন্তু শাহিদা এই খেলাটার মধ্যে ভালোভাবেই ঢুকে পড়েছিলো। কারণ একে একে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো বিজয়া, মেজদিদি, পল্লী সমাজ, গৃহদাহ। শরৎ বাবুর সাথে তার সম্পর্কটা ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে, গড়ে উঠছে বিবাদ-বিতর্ক। এইসব দুপুর গুলোতে সে যখন ঢুকে থাকতো অকস্মাৎ বিস্ময়ের মতো পাওয়া বইয়ের খনিতে, সালমা একটু পরই অস্থির হয়ে উঠতো। সে নিজেও কিছুণ চেষ্টা করতো পড়ার কিন্তু তার মন পড়ে থাকতো কোন একটা নতুন খুনসুটি তৈরি করার দিকে। সালমা যখন তার মনযোগ আকর্ষনের জন্য ব্যাকুল, কোন কোন দিন হয়তো কাহিনীর গভীরে ডুবে থাকার দরুন ঠিকমতো মনযোগ দিলো না বা বেশি বিরক্ত করার জন্য একটু ধমকই দিলো তখন শুরু হতো অভিমান। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যেতো, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা কিন্তু অনড় অভিমান একবিন্দুও টলতো না। পুরো বাড়ীতে সালমাকে খুজে পাওয়া যেতো না যদিও শাহিদা জানতো কোথায় আছে সে। হাজী সাহেব বাইরের বারান্দায় মাগরিবের নামায শেষ করে তসবি জপতেন আনমনে, সাধারণ অন্যান্য দিনের মতো। মেজবিবি দিনের সমাপনী হিসেবের খুটিনাটি বুঝে নিতেন হালিমা ও মহববতের কাছে থেকে, তাদের ছেলে শরীফের তখনো জন্ম হয়নি। শাহিদা ধীর পায়ে এগিয়ে যেতো ভেতর বাড়ির সিড়ির পুকুরের পাশের জামরুল গাছের গোড়ায়। অন্ধকারে দেখা যেত বসে আছে সালমা, একদম নীচের মোটা ডালটার উপর। বসার ভঙ্গিটার মধ্যে অনমনীয়, অনড় একটা ভাব ফুটিয়ে তুলতে সে ঘাড় শক্ত করে স্তব্ধ হয়ে থাকতো, এমনকি পাও নাড়াতো না, গাছের ডালে বসে আছে কোন তরুনী অথচ পা নাড়াচ্ছে না এরকম একটা বিরল দৃশ্যের অবতারণা করে। শাহিদা যেভাবে ধীর পায়ে এগিয়ে এসেছিলো ঠিক ওভাবেই এগিয়ে কোমর সমান ডালটির সামনে সালমার মুখোমুখি গিয়ে দাড়াত। প্রথম সম্ভাষণ এরকম নির্বাক প্রক্রিয়ায় করে সেও উঠে বসতো জামরুল গাছের ডালে, দুপাশে পা ঝুলিয়ে গাছের শরীরে পিঠ ঠেকিয়ে। ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে মেজবিবি দুজনের নাম ধরেই হাকডাক শুরু করতেন এবং অন্ধকারে বাইরে থাকা মোটেই নিরাপদ নয় জীনের আছর হতে পারে তা মনে করিয়ে দিতেন। বেশ কয়েক বার হাকডাকের পর শাহিদা সাড়া দিতো, আপা, আসতিছি। কিন্তু গাছের ডাল থেকে নামার কোন লণ দেখা দিতো না বরং দেখা যেতো নড়েচড়ে জাকিয়ে বসছে সে। তারপর সে এটা ওটা টুকটাক কথা বলা শুরু করতো সালমাকে উদ্দেশ্য করে। বেশ কিছু সময় চলছিলো এ পর্যায়, কোন কথার উত্তর আসলো না সালমার কাছ থেকে। খানিক সময় পরে সালমাও কথার পিঠে দু এক কথা বলতো কিন্তু স্পষ্ট বোঝা যেত রাগ এখনো পড়ে নি। হঠাৎ করে সালমার হাত ধরলো শাহিদা এবং তাকে কাছের দিকে টানলো। ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে,নেয়ার চেষ্টা করেছিলো সালমা। ফলে , এরকম একটি নিস্তব্ধ পরিবেশে যেখানে হঠাৎ জোরে বাতাস আসলে পাতাদের শো শো শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই সেখানে অকস্মাৎ চুড়ি ভাঙ্গা টুং টাং শব্দ পাশেই একঘেয়ে সময় কাটাতে থাকা মাছেদের মধ্যে বেশ একটা আন্দোলন তৈরি করলো। তারা যে যেখানে ছিলো সেখান থেকে জায়গা বদল করলো চকিতে যে কারণে পানিতেও ভারী একটা আন্দোলনের আবহ সৃষ্টি হলো। জামরুল গাছ থেকে কয়েক গজ দূরে ধানের পাল্লার পাশে ঝিমুতে থাকা এ বাড়ির কুত্তা ’বড়বাবু’ বসে অবস্থা থেকে উঠে দাড়ালো, কান খাড়া করলো এবং বোঝার চেষ্টা করলো ঘেউঘেউ করার কোনো দরকার আছে কি না। দ্রুতই বুঝে ফেললো, পুকুরের আশেপাশে কারা আছে, কোনো শব্দ না করে আবারো পুরোনো ভঙ্গিতে ফিরে গেল। সালমা ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেও তাকে ছাড়া হলো না। এরপর যখন আবারো ঘনঘন টান পড়তে লাগলো হাতে সালমা তখন একহাত জায়গার দুরত্ব অতিক্রম করে শাহিদার একেবারে কাছে চলে গেল যেখানে সে জামরুল গাছের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। হাত ধরা অবস্থাতেই শাহিদা বলেছিলো যে সালমার মন খারাপ হয় এরকম কিছু আর কখনো করবে না সে। এ বক্তব্যের ইতিবাচক প্রত্যুত্তরের ভাষা হিসেবে সালমা আরেকটু এগিয়ে তার মাথাটা আস্তে করে রেখে দিয়েছিলো শাহিদার বুকে। স্বস্তির একটা হাসি দিয়ে সালমার চুলগুলো মুঠো করে ধরেছিলো সে দু হাত দিয়ে, আলতো করে টেনে দিচ্ছিল। সালমা মুখ গুজে বসেছিলো নীরবে। হঠাৎ বেশ জোরেই যেন টান পড়েছিলো সালমার চুলে, শাহিদার মনে হয়েছিলো, হয়তো অনেক ব্যাথা লেগেছে তার। মুখটা সালমার কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে জানতে চাইলো, ব্যাথা লেগেছে? মাথাটা তুলে তার দিকে তাকালো সালমা, অন্ধকার থাকায় ঠিক বোঝা গেল না কি অভিব্যক্তি ছিল তার মুখে। কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে ঠিক আগের ভঙ্গিতেই মুখটা গুজে দিয়েছিলো তার বুকে, হাত দুটো লম্বা করে দিয়েছিলো তার পিঠ যেখানে গাছের সাথে ঠেসে আছে সেখানটায়, আকড়ে ধরার জন্য জায়গা খুজে বের করার চেষ্টা করছিলো শাহিদার এবং জামরুল গাছের মাঝখান দিয়ে। একটু সামনে এগিয়ে সালমাকে জায়গা করে দিয়ে সেও তার হাত রেখেছিলো সালমার পিঠে। এভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে মুহুর্তের পর মুহুর্ত বসে থাকার মধ্যে কি ছিলো জানতো না তারা, কোনো ধারণাও ছিলো না। শুধু বুঝতে পারছিলো সময়টা এমন একটা অনুভুতি নিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল যেনবা এক ঝলক মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে শ্রাবণ মাসের সবুজ কচি ধানেেতর উপর দিয়ে, গায়ে গা মাখিয়ে দুলিয়ে দিচ্ছে আইলের পর আইল বিস্তীর্ণ ধানতে। মেজবিবির অবিরাম চেচামেচিতেও থামছিলো না সময়। কিন্তু তিনি হারিকেন হাতে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লে তাদেরকে উঠতেই হলো। এরপরের দিনগুলিতেও নিয়মিত ভাবে চলতে লাগলো দুই সখীর অভিমান ও মানভঞ্জনের পালা। প্রায় অচল হাজী ইজাজত উদ্দিন সে সময়টাতে বাইরের বারান্দাতেই সার্বণিক অবস্থান করতেন। কয়েক পা দূরেই ছিলো তার পায়খানা, গোসল ও ওযু করার জায়গা। শরিফের মায়ের স্বামী মহব্বত তার তদারকি করতো। প্রায় সব বেলাতেই দু একজন দর্শনার্থী উপস্থিত হতো হাজী সাহেবের কাছে, সব ওয়াক্তেই তার ঈমামতিতে বাইরের বারান্দায় জামাতে নামায পড়া হতো। তিনি ওখানেই ঘুমাতেন। শুয়ে পড়ার আগে মেজবিবি অথবা শাহিদা কেউ একজন গুছিয়ে রাখতো বাইরের বারান্দা। মশারিটা টানিয়ে কোন কোন দিন হাতপাখা দিয়ে হাজী সাহেবকে একটু বাতাস করা বা একটু পিঠ চুলকে দেয়া হতো। অধিকাংশ দিন মশারি টানানো হয়ে গেলে তিনি নিজেই ইঙ্গিত করতেন আর কোন দরকার নেই। শেষ দিকে দেখা গেল এ রুটিন কাজের পুরোটারই দ্বায়িত্ব নিয়েছেন মেজবিবি। দনি পাশের ঘরটিতে ঘুমোতো শাহিদা, এখানেই হাজী সাহেবের সাথে তার খেলাবাটির সংসারের সূচনা ঘটেছিল। বড়বিবি এ ঘরেই থাকতেন যিনি শাহিদা এ বাড়িতে আসার অনেক আগেই কবরবাসিনী হয়েছিলেন। এ নিয়ে কখনোই কোন বিশেষ অস্বস্তি বোধ হয়নি শাহিদার। মেজবিবি থাকতেন উত্তরের ঘরে, সালমা তার সাথেই থাকতো। একদিন শুয়ে পড়ার মুহুর্তে সে শুনতে পেল, সালমা মেজবিবিকে বলছে, আমি ছোটমার সাথে শোব। এরপর নিজের কাঁথা বালিশ সাথে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে এসে সালমা তার বিছানার ভেতরে ঢুকে পড়লো। একটু মজা করার জন্যই শাহিদা ঘুমের ভান ধরে পড়েছিলো। সালমা তার মুখের কাছে মুখ এনে নিঃশ্বাস ফেলাটা আসল না নকল তা পরীা করলো, বুকের উপর আড়াআড়ি রাখা হাতটা তুলে ধরে ছেড়ে দিলো। থপ করেই পড়লো ওটা ঘুমন্ত মানুষের েেত্র যেমনটি হয়। এরপর বেশ হতাশ হয়ে সালমা শুয়ে পড়লো। হঠাৎ তার কি মনে হলো, সে তার জানা পুরোনো আরেকটি কৌশল বাস্তবায়নে মনযোগ দিলো। তার পা শাহিদার পায়ের তালুতে ঘসতে আরম্ভ করলো। পায়ের তালুতে প্রচন্ড সুড়সুড়ি থাকায় শাহিদার পে ঘুমের ভান ধরে থাকাটা অসম্ভব হয়ে দাড়ালো। না পেরে বলে ফেললো, সুড়সুড়ি লাগে তো! বিজয়ের আনন্দে চাপা হাসিতে ভেঙ্গে পড়লো সালমা। এবং তার সাথে তঞ্চকতার প্রতিশোধ নিতে এ শাস্তিটাই লাগাতার দিতে লাগলো। অসহায় শাহিদা অনেক অনুনয় বিনয় করেও কোন ফল না পেয়ে ধমকে উঠেছিলো, আমারে জালাতি এখানে আসিছিস। তোরে ঢুকতি দিয়াই উচিত হই নেই।’ আচমকা এরকম একটা কড়া ধমকানি কোনভাবেই হজম হলো না সালমার। কিন্তু ফিরে গিয়ে মায়ের কাছে শোয়াটা হবে আরো বড়ো পরাজয়। ঝট করে শরীরটা ঘুরিয়ে বিছানার অন্যপাশে সরে শুল সে। টের পাওয়া গেল, রীতিমত ফুসছে। বেশ কয়েকবার পিঠে হাত রাখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে আর কিছু না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পেছন থেকে শক্ত করে সালমাকে জড়িয়ে ধরলো সে। দু এক বার মোচড়ামুচড়ি করলো সালমা কিন্তু ছাড়াতে পারলো না। খুব বেশি দাপাদাপি হলে তা উত্তরের ঘরে কান পাতলা মেজবিবির কাছে পৌছবে এ ভয়ে শান্ত থাকতে হলো তাকে, কিন্তু পাশ ফিরলো না শাহিদার দিকে। তার ঘন কোকড়া চুলে শাহিদার শান্ত আঙ্গুল গুলি বিলি কেটেই যাচ্ছিলো, পাথর তখন ভাঙ্গছিলো। গলার নীচে পিঠের ওপরের খোলা জায়গাটায় যখন একটি কোমল অশ্র“সিক্ত গাল এসে লাগলো, না দেখেও পড়া যায় যেখানে স্পষ্ট লেখা রয়েছে অনুশোচনা, পাথর তখন একেবারেই গলে গেলো। শাহিদার দিকে পাশ ফিরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো সালমা, ছুয়ে দিয়েছিলো অশ্র“মাখা গাল। সে রাতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমোতে গিয়েছিলো তারা কিন্তু দুজনেই রাতের প্রতিটি প্রহর নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো। পরদিন থেকে সন্ধ্যা নামার সাথে

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




