সে রাতে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমোতে গিয়েছিলো তারা কিন্তু দুজনেই রাতের প্রতিটি প্রহর নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো। পরদিন থেকে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই দুটি তরুনী প্রান অস্থির ছটফটানিতে মেতে উঠতো, কখন ঘুমোতে যাওয়ার সময় হবে। এভাবে বেশ কয়েক রাত কেটে যাওয়ার পরে পরস্পরকে খুজে পাওয়ার আরো নতুন কোন পথ আবিস্কারে উন্মুখ হয়ে উঠলো তারা, যে পথের দিশা তাদের জানা ছিলো না। পথে থাকলে শেষ পর্যন্ত কোন পথই অনতিক্রম্য থাকে না। এরও বেশ কিছুদিন পরে, নির্ঘুম জড়াজড়ির কোন এক বৃষ্টিমুখর রাতে যখন চরম নৈকট্য অনুসন্ধানের তাড়নায় অন্যান্য রাতের মতোই একই কাথার নীচে প্রায় নগ্ন হয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিলো দুটি স্বত্তা, তখন সালমার হঠাৎ কি যেন হয়ে গেল। কোন কৌতুহলই বেশিদিন রহস্যের ঘেরাটোপে বন্দী থাকতে চায় না। সালমা মরিয়া হয়ে উঠলো সাম্প্রতিক অজানা রহস্যের কুলকিনারার খোজে। অনেকটা বাচ্চাদের মতোই হাতের আঙ্গুল আর জিহবা কে সাথে নিয়ে সে নেমে পড়লো অনুসন্ধানে। শাহিদা ঠিক ঘুমোচ্ছিল না, তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। হঠাৎ করে সে টের পেলো একদলা বিষ যেন কুরে কুরে খাচ্ছে তার শরীর। পায়ের নখ থেকে মাথার তালু পর্যন্ত সেই বিষের ঘোরে ঝনঝন করে বাঁজছে। আর বাইরে থেকে কোন এক কালো জাদুকরের জাদুর কাঠি তার শরীরে বুলিয়ে ঐ বিষ বের করে আনতে চাচ্ছে। তন্দ্রাচ্ছন্নতার জগত থেকে একেবারে বাস্তবে ফিরে এলো সে। এ বিষ তার অচেনা নয়। রাস খলিল সেই অন্ধকারময় রাতে পা টিপে টিপে যখন তার পেছনে এসে দাড়িয়েছিলো তখন এই পরিচিত বিষই তাকে অবশ করে দিয়েছিলো। যেন ভুত দেখতে পেয়েছে এমন ভঙ্গিতে শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসেছিলো শাহিদা, বসেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার গতিতে ছিটকে গিয়েছিলো বিছানার কোণে, তুলে নিয়ে গায়ে জড়িয়েছিলো দলামোচড়া হয়ে থাকা শাড়িটা। তারপর বোম মেরে বসেছিলো যেন সত্যিসত্যিই তাকে ভুতে পেয়েছে। মাত্র দু’সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সালমার জন্য এতটাই আকস্মিক ছিলো যে অনেক সময় পর্যন্ত কিছু চিন্তাই করতে পারলো না সে। যখন সে একটু চিন্তা করতে পারলো তখন লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ভাবলো, যে অপার রহস্যের কিনারা দেখতে চেয়েছিলো সেটি বোধহয় এতটাই বিস্ময়কর। সে সহানুভুতি মাখা হাত বাড়িয়ে দিলো শাহিদাকে আশ্বস্ত করতে, সাহস দিতে। কিন্তু তার হৃদয় ভেঙ্গে গেলো যখন সে দেখলো তার প্রিয় সখী তাকে কাছে আসতে দেখে সরে যাচ্ছে, তারচেয়ে বেদনাদায়ক যা তা হলো সালমাকে দেখে সে এমনভাবে চমকে উঠছে যেন মূর্তিমান ভুতটাই সে। অনুশোচনার গ্লানি নিয়ে গুটিয়ে গেলো সালমা, স্বান্তনা পেলো এই ভেবে যে কোথাও এমন কিছু একটা আছে যা সে বুঝতে পারছে না।
পরদিন সকাল থেকে সালমার সাথে বাক্যালাপ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলো শাহিদা। অন্যান্য দিনের মতোই নিজের জন্য নির্ধারিত কাজ ঠিকঠাকমতো সম্পন্ন করলো, কখনো চুপচাপ বসে থাকলো, এলোমেলো হাটাহাটি করলো কিন্তু সালমার সাথে একটিবারের জন্যও কথা বললো না এমনকি তাকালো পর্যন্ত না। লজ্জা ভেঙ্গে সারা সকাল সালমা তার মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো, বলা চলে প্রায় পিছুপিছুই ঘুরলো কিন্তু পাত্তা পেলো না। দুপুরের পরে শাহিদা যখন তার ঘরে পড়তে বসলো, সালমাও হাতে একটি বই নিয়ে ঢুকলো তার ঘরে। তাকে দেখেই শাহিদার চেহারাটা এমন হলো যে একটু দুরে জানালার কার্নিশে বসে থাকা চড়–ই পাখিটাও বুঝতে পারলো, সালমার এ ঘরে আসাটা তাকে অখুশী করে তুলেছে। এর পরিস্কার অর্থ সে চায়, সালমা তার ঘর ছেড়ে চলে যাক। বুকের ভেতর থেকে কান্না দরা পাকিয়ে এলো সালমার। পরণেই এ কান্না ক্রোধে পরিণত হলো। ’বয়েই গেছে আমার’ ভাবলো সে এবং সিদ্ধান্ত নিলো আর একবারের জন্যেও শাহিদার পিছে ঘুরবে না, কথা বলারও চেষ্টা করবে না যদি সে নিজে থেকে কথা বলতে আসে। দাতে দাত চেপে কয়েকটা দিন কাটিয়ে দিলো সালমা কিন্তু তার প্রত্যাশামাফিক কিছুই ঘটলো না। তার জমে ওঠা ক্রোধ যা তাকে শক্ত থাকার প্রেরণা দিচ্ছিলো তাও দিনকে দিন নখদন্তহীন কাদার দলা হয়ে নিরেট কষ্ট বনে গেলো, তার বুকটাকে ভারী করে দিলো। তার চোখের কোণে কালি পড়লো, গায়ের রং আঠারো বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে অনুজ্জ্বলতম বর্ণ ধারণ করলো। শরীফের মা ও বুড়ি জয়গুন বেওয়া যার ভিে করার পরিধি ছিলো দশ গ্রাম ব্যাপী বি¯তৃত , তারা বলে বেড়াতো সালমার মতো গায়ের রং দশ গ্রামের কোন মেয়ের নেই।
একদিন বিকেলে আবারো পরিচিতি জামরুল গাছের তলায় দাড়ালো সালমা। প্রথমেই হাউমাউ করে কিছুণ কেঁদে নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নীরবে চোখের জল ফেললো সে। সেই নীচু ডালটার উপর বসে থাকলো এ অপোয় যে অনেক সময় ধরে তাকে ঘরে না দেখলে দূঃশ্চিন্তা করে হলেও একবার আসবে, মুখোমুখি দাড়িয়ে হাত ধরে বলবে, ’ আর কখনোই তোমাকে কষ্ট দেবো না।’ ডালটার উপরে সে বসেই ছিলো যতণ পর্যন্ত না হারিকেন হাতে আয়েশা খানম ও শরীফের মা এসে তাকে উঠিয়েছিলো।
কেউ যখন দীনতা প্রকাশের সর্বশেষ সীমায় পৌছে যায় তখন বাস্তবিক অর্থেই তার আরকিছু হারাবার থাকে না। সালমার েেত্রও সেটিই ঘটলো। গভীর রাতে যখন পুরো বাড়িটা ঘুমিয়ে পড়েছে, পা টিপে টিপে সে হাজির হলো শাহিদার ঘরে, বিছানার পাশে। সালমার বিছানা থেকে উঠে এসে এখানে তার পাশে দাড়ানো, পুরো প্রক্রিয়াটা টের পেলো শাহিদা। সে জানে, গত কয়েকটা দিন রাত তার কেমন কাটছে! অপরিসীম কষ্ট সয়ে নিয়েও সে প্রায় সচেতনভাবে আঘাত দিচ্ছে তার প্রিয় সহচরীকে, যে কোন বিচারেই যে কিনা তার সবচেয়ে আপন। কেউ যেন ভেতর থেকে তাকে সাবধান করে দিচ্ছে, শুধু সাবধান করেই ান্ত হচ্ছে না, তাকে রীতিমত চালাচ্ছে হাতের পুতুলের মতো এবং অবশ্যমান্য একটি সীমারেখা নির্দেশ করে সদম্ভে ঘোষণা করছে, এই তোমার নিয়তি। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূলে রয়েছে শরীরের গভীরে গেঁথে থাকা একদলা বিষপুট্টুলি যে শাহিদার বোধ অর্জনের একদম প্রথম প্রহরেই বিষক্রিয়া শুরু করে দিয়ে এখন সুপ্ত আছে, যেমন থাকে চোরাকাঁটা। তাকেই সবচেয়ে বেশি ভয়। তাছাড়া ভয় বা আতঙ্ক ছাপিয়ে অন্য একটি বিস্ময়কর অনুভুতির লীলা চলছে তার চেতন রাজ্যের একেবারে গভীরে যা সম্পর্কে কখনোই সে জ্ঞাত ছিলো না। যে শরীর প্রত্যভাবে তার প্রথম মৃত্যুর কারণ হয়েছিলো সেই শরীরবৃত্তিয় যে কোন কিছু, যেমন সুখানুভুতি বা অন্য কোন অনূভুতির অস্তিত্ব মূর্ত হওয়া মাত্রই ’না’বাচক এক আদি নিয়তিবাদ ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছিলো, তার চারপাশে গড়ে তুলেছিলো বাঁধার প্রাচীর। সেই রাতের সেই মুহুর্তে সমস্ত লাজলজ্জা, হিসেব নিকেশের থোড়াই পরোয়া করে সালমা যখন আবারো তার বিছানায় একরকম অনুপ্রবেশ করলো তখন যে কোন কিছুর চেয়ে বেশি করে সালমার হৃদয়ের তটি উপলব্ধি করে চুপ রইলো শাহিদা। সালমা স্বেচ্ছাচারীর মতো তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে উন্মোচন করে নগ্ন বুকে নিজেকে স্থাপন করলেও সে চুপ করে রইলো। কোন ধরণের ভব্যতার ধার না ধেরে সালমা যখন তার গালের উপর গাল রাখলো তখনও সে চুপ করেই রইলো, এমনকি সাপের মতো হিসহিসে জিহবা দিয়ে সে যখন তার ঠোট ভেদ করে একেবারে মুখের ভেতর ছোবল দিলো শান্তই থাকলো শাহিদা যদিও টের পেলো বিষাক্ত গোখরার বিষক্রিয়া কার্যকর হচ্ছে। মুহুর্তের মধ্যে বিষ ছড়িয়ে পড়লো শরীরের প্রতিটি কোণে। ছড়িয়ে স্থির থাকলো না, রণদামামা বাঁজিয়ে ছুটতেই লাগলো। একটি প্রাণের মধ্যে যেন আলাদা আরো ল কোটি প্রাণ। আচমকা এই প্রাণগুলি সমস্বরে তীব্র আর্তনাদে ফেটে পড়লো অথবা প্রত্যেকেই এক একটি স্বতন্ত্র ও স্বশস্ত্র আর্তনাদে পরিণত হলো। ধাঁরালো তার গাছি দা’য়ের মতো, বেরিয়ে আসতে চাইলো সব অবরুদ্ধতার প্রাচীর ভেঙ্গে। দাত দিয়ে নিজের জিহবা কামড়ে ধরলো শাহিদা, যতোটা জোরে কামড়ে ধরলে রক্ত বেরিয়ে আসা সম্ভব ততোটা জোরে। পা দুটিকে কুকড়ে তুলে ফেললো বুকের কাছে। যুদ্ধটিকে নিয়েছে সে, সর্বনাশা আর্তনাদগুলির কাছে কোনভাবেই হারবে না। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে ল করলো শাহিদা, ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী এই যুদ্ধে তার প্রিয় সখীর অবস্থান শত্র“প।ে প্রাণপন শক্তি দিয়ে দূর্গের যে দ্বারগুলিকে সে বন্ধ করেছে শত্র“কে প্রতিরোধ করতে, সালমা উল্টো তার সাথে ঝুঝছে সেগুলি খুলে দেয়ার জন্য। আর কোন উপায় ছিলো না শাহিদার, শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সালমাকে ছিটকে ফেলা ছাড়া। আচমকা প্রকান্ড শব্দে সেদিন ঠিকই ঘুম ভেঙ্গে গেলো মেজবিবির। ’কি হলো, কিসির শব্দ হলো’ বলে উঠেছিলেন তিনি। কোন সাড়া না পেয়ে আবার চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




