মেজবিবি চুপ হয়ে গিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু অবরুদ্ধ আর্তনাদগুলি শাহিদার ভেতর থেকে চিৎকারে চিৎকারে তাকে কাঁপাতে থাকলো রাতের পর রাত। সেই সময় থেকে এখন অবধি। বহুরূপী আর্তনাদের দল সারাদিন নিশাচর বাদুড়ের মতো আত্মগোপনে থাকতো। সন্ধ্যা হলেই সাজসাজ রবে জেগে উঠতো যুদ্ধের জন্য। ধেয়ে আসছে হাজার হাজার বিষাক্ত তীর একটি লোহার দরজার দিকে। প্রচন্ড এই দ্বেরথে প্রতিবারই কখনো না কখনো মনে হতো আজই উপড়ে যাবে লৌহদ্বার। কিন্তু কি এক আসুরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সে টিকেই গেলো বছরের পর বছর। এমন একটা সময় আসবে যখন নদী তার স্রোত হারাবে, অলুনে আর্তনাদগুলি হারাবে গতির মাধ্যম। তারপর আসবে সেই মাহেন্দ্রণ যেদিন পলি জমা চরে কবর হয়ে যাবে তাদের। সেইসব বিষমাখা আক্রমন, প্রবল তর্জন গর্জন বা ভেঙ্গে পড়া চাপা কান্না ও সবশেষের হাভাতে অনুনয়ের স্মৃতিটুকু পর্যন্ত সাথে নিয়ে আর্তনাদময় দিনগুলি মিশে যাবে মাটিতে বা মৃত অস্তিত্বের শব হয়ে পানিতে- এ জ্ঞান শাহিদা কোথায় পেয়েছিলো তা জানা যায় না। কিন্তু এর প্রতি অটল বিশ্বাসের নড়বড়ে ডিঙ্গিতে করেই সাফল্যের সাথে সে পার করে দিয়েছে ল কোটি মুহুর্ত।
এরপরেও প্রায় বারো বছর ছোট বাশতলা গ্রামের এই বাড়ীতেই সংসার ছিলো সালমার। এই ঘরে-দ্বোরে, উঠোনেই কাঁটিয়েছে সে বারো বছরের পুরোটা সময়। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়েও তাদের আর পরস্পরের সাথে কথা বলা হয়ে ওঠেনি। প্রথম বছরে তারা ুব্ধ ছিলো পরস্পরের প্রতি। দ্বিতীয় বছরে তাদের মনে হলো, এই ােভ নিজ স্বার্থের প্রতি পপাতমূলক অবস্থান ছাড়া আর কিছুই নয়। তৃতীয় বছরে গিয়ে তারা দুজনেই ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাক্রমের জন্য নিজেকেই পুরোপুরি দায়ী করলো, অনুশোচনায় দগ্ধ হলো এবং এতটাই আত্মগ্লানি অনুভব করলো যে লজ্জা এড়াতে কেউ কারো সামনেই পড়তে চাইতো না। এবং এর পরপরই প্রায় সমসাময়িক সময়ে তারা ধরতে পেরেছিলো, একজন অন্যজনের প্রতি কি অযুত নিযুত পরিমাণ ভালোবাসা জমা হয়েছে। এই ভালোবাসা অনেকটা প্রাপ্তবয়স্ক, কম বয়সের অস্থিরতা, ছটফটানি মুক্ত এক নিখাদ স্বর্ণখন্ড যেনবা! কিন্তু ততোদিনে নিয়তি আবারো নতুন চেহারায় গেড়ে বসেছে কয়েক বছরের ফাক গলে। তাদের দুজনেরই ছোয়া লেগে থাকা বিভিন্ন স্মারক স্পর্শ করে স্মৃতিচারণ করা ছাড়া পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের আর একটিই মাধ্যম ছিলো তাদের; ভাষাহীনতা।
এই লম্বা সময়ে একটি দিনই ছিলো ব্যতিক্রম যেদিন সালমার ছেলে রিফাতের জন্ম হয়েছিলো। খুব সকালে ব্যাথা উঠেছিলো সালমার, রিফাত হয়েছিলো মধ্যরাতে। ঐ একটা দিনই তাদের সুযোগ হয়েছিলো নিবিড়ভাবে পাশে থাকার। প্রসবের ব্যাথাটা কিরকম জানতো না শাহিদা, জানা হয়নি এই জনমে। নারীত্বের এই কথিত সুখের ব্যাথা পাওয়া হয়নি বলে কোন হা হুতাশও নেই তার। কিন্তু সেদিন ব্যাথাটা পেতে চেয়েছিলো সে, সালমার অসম্ভব সেই যন্ত্রনা ভাগ করে নেয়ার জন্য। বাস্তবে তা সম্ভব নয়, আর এ কারণেই বোধ হয় শক্ত মুঠির মধ্যে সালমার হাতটি চেপে ধরা অবস্থায় কল্পলোকে অস্তিত্বশীল ব্যাথাটা আরো কয়েক গুন বেড়ে গিয়ে আঘাত হেনেছিলো শাহিদার হৃদপিন্ডে। বিকেলের দিকে সালমা তার সাথে কথাও বলেছিলো। ঘর্মাক্ত, যন্ত্রনাকাতর মুখটিকে যতোদুর সম্ভব স্বাভাবিক করে স্পষ্ট স্বরে বললো, যদি মইরে যাই.. বাক্যটি শেষ হলো না, সালমা চুপ হয়ে গেলো। কি যেন একটা বুঝে এ বক্তব্য থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলো।
অনেকবার ভেবেছে শাহিদা, জানতে চাইবে, ’যদি মইরে যাতি তো কি?’ কিন্তু সময় ঠিকই গড়ালো, নিয়তি বদলালো না। একটি অর্ধসমাপ্ত বাক্য তাদের রহস্যঘেরা জীবনে নতুন কিছু দূর্বোধ্যতা তৈরি করে ঝুলতে থাকলো, অর্ধসমাপ্ত জীবনেরই আরেকটা প্রতিরূপ হিসেবে। ঠিক কিভাবে রিফাত তার কাছে এসে পড়লো, তার ন্যাওটা হয়ে পড়লো এবং মুখে বোল ফোটার সাথে সাথেই তাকে সই বলে ডাকা শুরু করলো তা আর ঠিকমতো মনে পড়ে না আজকের শাহিদা বেগমের। সালমা তাকে কোন এক কালে সই বলে ডাকতো যা ঐ বাচ্চা ছেলেটির কখনোই শোনার কথা নয়। হতে পারে সালমাই কোন এক মুহুর্তে শিখিয়েছিলো সই ডাকতে এবং ঐ একবারই যথেষ্ট হয়েছিলো। কি ভেবেছিলো সালমা তা না জানলেও এতো সত্যি, তাদের দুজনের অস্তিত্বের মাঝখানে গড়ে উঠলো এমন এক সেতু যা অতিক্রম করা যায় না ঠিকই কিন্তু যাকে ছুয়ে এপার ওপার একই সাথে পেতে পারে যৌথ মাটির সুবাস। দিন যতো গেলো রিফাত এমনভাবে তার ব্যক্তিগত অধিকারে চলে আসলো, শাহিদার মনে হলো, øেহের খেলা খেলতে খেলতে একাকিত্ব ঘোচানোর যে প্রক্রিয়ায় সে রত তা হয়তো সালমাকেই ঠেলে দিচ্ছে একাকিত্বের অতলে। সালমার স্বামী আহাম্মদ আলী এর মধ্যে আইন পাশ করে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিয়ে জেলা শহরে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত। তার ইচ্ছা সালমা ও রিফাত তার সঙ্গেই থাকুক। কারণ পসার জমে ওঠার সাথে সাথে তার পে কঠিন হয়ে পড়ছে সপ্তাহান্তে আসা যাওয়া করা। কিন্তু সালমার আপত্তির কারণে তা আটকে ছিলো। এ সময়কালে শয্যাশায়ী মেজবিবির পরলোকগমন সালমার আপত্তির ভিতটিকে অনেকখানি দূর্বল করে দিলো। রিফাতের উপর একক অধিকার প্রসূত অপরাধবোধে ভুগে শাহিদাও চাইলো, তারা চলে যাক। তাছাড়া বহুকাল ধরে শাহিদার সাথে বসবাস করা আদি নিয়তিবাদী নির্দেশক মহাশয়ও হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে পড়লো। একটি বাচ্চা ছেলেকে অবলম্বন করে স্বাচ্ছ্যন্দে পার করতে থাকা এই জীবন শাহিদার প্রাপ্য কিনা সে প্রশ্ন ঘোরতরভাবে উত্থাপন করে লাগাতার খোচাখুচি চলতেই লাগলো। সেবার আহাম্মদ আলীর উপস্থিতিতে শাহিদাকে তার সাথে বিভিন্ন শলা পরামর্শ করতে দেখা গেলো, বিষয়টি সালমার চোখ এড়ালো না। একদিন সবার সামনেই শাহিদা এ প্রসঙ্গ পাড়লো, অনেকটা সিদ্ধান্তের মতো করেই বললো, রিফাতের লেখাপড়া ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে তাদের সপরিবারে জেলা সদরে থাকা উচিত বলে সে মনে করে। সালমা কোন আপত্তি করলো না বরং অতিরিক্ত উদ্যোগী ভুমিকা নেয়াতেই দেখা গেলো, এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা এ বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। তারা যেদিন এ বাড়ি ছেড়ে গেলো, আশ্চর্যজনকভাবে ল করা গেলো শাহিদা, রিফাত বা সালমা কেউই একফোটা চোখের জলও ফেললো না। অনেকটা দূর্ঘটনাচক্রে একেবারে শেষদিকে সালমার চোখে চোখ পড়ে গেলো শাহিদার। সালমার শান্ত মুখটা থেকে কি পরিমাণ ক্রোধের আগুন নিঃসৃত হচ্ছিলো তা পড়বার মতা একমাত্র শাহিদারই ছিলো, সে কারণে মুহুর্তেই চোখ নামিয়ে ফেলতে হয়েছিলো তাকে। বিস্ময়করভাবে রিফাতের অভিব্যক্তিও ছিলো মায়ের কার্বন কপি। শেষ পর্যন্ত ক্রুদ্ধ চোখে সে তাকিয়েই ছিলো শাহিদার দিকে, যেভাবে এজলাসে দাড়িয়ে মিথ্যা মামলার আসামী তাকায় ষড়যন্ত্রকারীর দিকে। ইতিমধ্যে সে বেশ বড়ো হয়ে গেছে, কান্নার চেয়ে ক্রোধই তাকে ভালো মানালো। আর কোনদিন এ বাড়িতে পা ফেলেনি তারা। আহাম্মদ আলী প্রায়ই এসেছে। সহায় সম্পত্তির দেখভাল বিষয়ে আলাপ আলোচনা হয়েছে শাহিদার সাথে। কিন্তু সালমা বা রিফাত আসেনি। দু’বছর পরে এ খবর কানে এসেছে শাহিদার, রিফাতকে ক্যাডেটে পাঠানো হয়েছে। ছেলেটাকে আর একবারের জন্যও দেখতে পাওয়া গেলো না।
দীর্ঘকাল পরে আজ রাতে তিনি একটি পুরোনো ট্রাঙ্ক খুজে বের করলেন। ধুলো পড়ে, পোকায় কেটে প্রায় গত হয়ে পড়া শরৎচন্দ্র স্পর্শ করতেই হাঁচি পেয়ে গেলো তার। শরিফকে ডেকে ট্রাঙ্কটি বুঝিয়ে দিয়ে বইগুলি বাধাতে দিতে বললেন। রাতের খাওয়ার পর শরিফের মা ও তার স্বামী মোহব্বত আলীর সাথে পরামর্শ করতে বসলেন, ইলেকট্রিসিটি ও গ্রামের অন্যান্য সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ বিষয়ে। অনেক দিন পরে বড়ো এক গ্লাস দুধ খেলেন এবং বিছানায় যাওয়া মাত্র ঘুমিয়ে পড়লেন।
সাধারণত টেম্পো বা কোন ধরণের যান্ত্রিক যান এ গ্রাম পর্যন্ত আসে না, পাশের গ্রামেই থেমে যায়। কিন্তু এই হেমন্তে খোলস বদলানো সূর্যের চনমনে ছন্দমাখা একটি দিনে ছোট বাশতলা গ্রামের এবড়ো থেবড়ো মাটির রাস্তা দিয়ে ধুকতে ধুকতে একটি টেম্পো এসে দাড়ালো হাজী বাড়ির সামনে। বড়ো একটি ব্যাগ নিয়ে টেম্পো থেকে নেমে দাড়ালো আঠারো/ উনিশ বছরের দীর্ঘদেহী এক তরুণ। কোমরের একেবারে নীচে নামিয়ে পরা অসংখ্য পকেটওয়ালা একটি প্যান্ট ও কালোর উপর উৎকট রং চংয়ে একটি টি-শার্ট তার পরনে। শরিফ গরুগুলিকে গোসল করাতে নিয়ে যাচ্ছিলো। টেম্পো থেকে নেমে পড়া ছেলেটিকে দেখেই সে গরু রেখে পড়িমড়ি করে ছুট লাগিয়ে বাড়ীর ভেতরে চলে গেলো, হাপাতে হাপাতে বললো, ম্যালা বড়ো হইয়ে গেইছে, তাও আমি চিনতি পারিছি! রিফাত ভাই আইছে, রিফাত ভাই।
খবরটি অনেক বড়ো এবং বড়ো ধরণের প্রতিক্রিয়াই হলো শাহিদা বেগমের ভেতরে। তাকে বেশি করে ভাবালো দূঃশিন্তা মেশানো একটি কৌতুহল। শেষ যেদিন রিফাত এ বাড়ি ছেড়ে গেলো, শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তাকে দেখতে থাকা সেই ক্রুদ্ধ দৃষ্টি কি আবারো একইরকম ভাবে আক্রমন হানবে? এ আশঙ্কা সত্যি হলো না। মূর্তিমান রিফাত, পুরোদস্তুর একজন যুবক, দাড়িয়ে আছে একদম তার নাক বরাবর কৌতুহলী ভঙ্গিতে, মুখে বিস্ময় ও হাসি ফুটিয়ে। রিফাতের দিকে ভালো করে তাকিয়ে শাহিদা বেগমেরও হাসি পেয়ে গেলো। লম্বা চুলগুলি এমনভাবে কাটা যেন খুব পরিকল্পিত ভাবে মাথার উপর এলোমেলো হয়ে থাকে। পরিস্কার কামানো মুখে শুধু থুতনির নীচে একগোছা দাড়ি। রিফাতের হাসিমাখা মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বললো, সই! মাইগড! তোমাকে তো এ্যাঞ্জেলিনা জোলির মতো লাগছে। কথাটির অর্থ কি তা দূর্বোধ্য হলেও শাহিদা বেগমের মনে হলো, ঐ বাক্যের মধ্যে দিয়েও সালমাই ফুটে বেরোলো। একহারা পুরুষালী একটি শরীরের ঘাড়ে সালমার মুখটাই যেন বসানো হয়েছে। সেই গায়ের সোনা রং, সেই নাকমুখ! সালমার থুতনির নীচে দাড়ি- এরকম একটি বিচিত্র চিন্তা হঠাৎ করে মাথায় আসাতে তিনি শব্দ করে হেসে ফেললেন। সঙ্গত কারণে রিফাত ধরে নিলো যে তার বেশভুষাই এ হাসির কারণ। কিছুটা কৈফিয়ত দেয়ার ভঙ্গিতে সে বলে উঠলো, ’ এরকম ফ্যাশন আমার যে খুব ভালো লাগে তা না। মুক্তির আরাম নিচ্ছি। ক্যাডেট কলেজের নিয়ম কানুনে জানটা একেবারে ঝালাপালা হয়ে গ্যাছে।’
স্বাভাবিক ছিলো না এরকম একটি দীর্ঘ বিরতির পর দুজন মানুষের সাাৎ পর্বটি হালকা চালের বাক্যালাপের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি ভারী হয়ে উঠলো না, যে আশঙ্কা দুজনরেই ছিলো। এবং অনেকটা ইচ্ছার জোরেই যেন তারা ছুড়ে ফেলে দিলো কয়েকটি বছরের ফাক ও অন্যান্য ’আসলেও আসতে পারে’ এ জাতীয় প্রশ্নের ঝাপি। কোন আড়ম্বর ছাড়াই আজ একটি উদ্দাম প্রাণ নেচে বেড়াতে লাগলো কোন এক দৃশ্যপটের আড়ালে থাকা মল পরা বালিকার ছদ্মবেশ নিয়ে। এক রোমাঞ্চকর জলতরঙ্গের বাজনা বেজেই গেলো আজ সারা দুপুর, সারা বিকেল, সারা সন্ধ্যা।
অনেক কালের অব্যবহৃত দণি দিকের ঘরটি চমৎকারভাবে ঝেড়েপুছে রিফাতের জন্য বিছানা করা হলো। নতুন কাঁথা বালিশ ও জানালার পর্দা থেকে হালকা ন্যাপথলিনের সুবাস ভেসে আসা পরিবেশটিও রিফাতকে সন্তুষ্ট করতে পারলো না, অন্তত এ ঘরে ঢোকার পর থেকে তার চেহারা দেখে তাই মনে হলো। আঙ্গুল দিয়ে শাহিদার এখনকার শোবার ঘরটিকে ইঙ্গিত করে জানালো ঐ ঘরটাতে শোবে সে। এই সিদ্ধান্তের মর্ম ঠিকভাবে না বুঝলেও শাহিদা বেগম কথা না বাড়িয়ে তার নিজের ঘরটিকে পূনর্বিন্যাস করে নিজের ব্যবহার করা বালিশ কাঁথা নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন রিফাত প্রায় মারমুখী ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। অল্প কয়েকটি কথায় রিফাত তাকে মনে করিয়ে দিলো, তাকে আলাদা রাখার অপচেষ্টা সে অতীতেও বহুবার করেছে কিন্তু কোনবারই সফল হয়নি। এমনকি ঘুমিয়ে পড়ার পরেও রিফাতকে কোলে নিয়ে শুইয়ে দেয়া হতো সালমার ঘরে কিন্তু সে ঠিকই বস্তায় ভরে দূর গাঁয়ে ফেলে দেয়া বেড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে ফিরে আসতো চেনা অঙ্গনে অর্থাৎ সইয়ের বিছানায়। এককালের নাছোড়বান্দা পুচকে ছেলেটি গায়ে গতরেই শুধু বড়ো হয়নি, গোয়ার্তুমিতেও পরিপক্ক হয়েছে এটা বুঝতে দেরী হলো না। রিফাতকে ওর মায়ের কাছে ঘুমোতে পাঠাবার ষড়যন্ত্রের শাস্তি হিসেবে যেসব আচড়-কামড়গুলি উপরি পাওনা হতো সেসব স্মারকগুলি হয়তো এখনো বিরল নয় তার শরীরে। শাহিদার ঘরেই মশারি খাটিয়ে ঘুমোতে গেল তারা দুজন; শৈশব স্মৃতির জরাক্রান্ত তরুন ও বয়স্ক এক আত্মবিশ্বাসী নারী।
কোনরকম ভনিতা ছাড়াই রিফাত পূর্বাপর অভ্যস্ততার ধারাবাহিকতায় শাহিদা বেগমের বুকের মধ্যে মুখ গুজে দু’হাত দিয়ে শক্ত করে পিঠ জড়িয়ে ধরলো। সম্প্রতি শাহিদা বেগমের ঘুম ভালো হচ্ছিলো। শোয়া মাত্রই গভীর ঘুমের অতলে চলে গেলেন তিনি। স্মৃতি হাতড়ানো ধারণাটিকে আরিক বাস্তবে পরিণত করে একজোড়া চওড়া অথচ কোমল হাত তার কাঁধ হয়ে কোমর পর্যন্ত ঘুরতে ফিরতে লাগলেও তাতে এতটুকু চিড় ধরলো না ঘুমে বরং গভীরতর হলো। কিন্তু বুকের মধ্যে গুজে থাকা মুখটি অবস্থান পরিবর্তন করে পেটের মুক্তভূমিতে নেমে এসে হঠাৎ পানি থেকে ডাঙ্গায় উঠে পড়া কাকড়া ছানার মতো ইতস্তত এপাশ ওপাশ করতে লাগলে অনেকটা সুড়সুড়ি লাগার মতো অনুভুতি নিয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেলো তার। চকিতেই বুদ্ধিমতী শাহিদা বেগম ধরে ফেললেন যে শৈশব স্মৃতির সুতোর গুটির জড়ানো প্যাচানো জটিল অংশের সমান্তরালে অবস্থান নিয়ে আকস্মিকভাবে উৎকন্ঠার কাটাগুল্মে ঝাপ দিয়েছে সদ্য বয়:প্রাপ্ত এক পুরুষ। এই ধরে ফেলাটা পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে নয়, খানিকটা সন্দেহের মতোই। কিন্তু সাফাত কৌতুহলী শিশুর মতো আধো আধো জড়তাগ্রস্থ পায়ে পুরো আঙ্গিনা জুড়ে পরিভ্রমন শুরু করলে সন্দেহের মধ্যে ঘাপটি মারা অন্যসব সন্দেহ দুর হলো অর্থাৎ যা তিনি ধরে নিয়েছিলেন তাই ঠিক। বন্ধ চোখ না খুলেই তিনি এ মুহুর্তের করণীয় নিয়ে ভাবলেন। যে কোন রকম সিদ্ধান্ত নিতে তার মধ্যে বৈরাগ্যভাব উপস্থিত হলো, করণীয় নিয়ে ভাবনাটিই অপ্রয়োজনীয় মনে হলো। মৃত নদীর আর নদী ভাঙ্গনের ভয় কি? এছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা ছিলো, øেহময় সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়ানো এই ছেলেটি হয়তো অল্প কয়েকটি দিন থাকবে এ বাড়ীতে; সে সময়টুকু তার আনন্দ নিয়েই যেন সে থাকতে পারে। নতুন কোন অস্বাভাবিকতা, অস্থিরতার আমদানী আর না ঘটুক। পরিবর্তিত সময় এই নিস্পৃহতার সুযোগটুকু তাকে করে দিয়েছে। কিছুদিন আগে হলেও অন্য সবকিছু ভুলে তাকে অবশ্যই নেমে পড়তে হতো হৃদয়ঘাতী এক প্রতিরোধে।
বোকার স্বর্গে বাস করা ধারণাগুচ্ছ সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমানিত হলো একটি বিস্ময়কর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহনের মধ্য দিয়ে যা শাহিদা বেগমের শরীরের প্রতিটি প্রত্যঙ্গতো বটেই এমনকি সমস্ত রোমকুপ ও মগজের কোষকে পর্যন্ত বিবশ করে দিলো। একসময়কার সশস্ত্র যে আর্তনাদগুলিকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছিলো তারা একটি অনুপম সুরের মূর্ছনায় রুমঝুম করে জেগে উঠলো নুপুর পরা নর্তকী রূপে। একটি বড়ো ঢেউ হঠাৎ করে আছড়ে পড়ে ভেঙ্গে দিলো এতোকাল ধরে গড়ে ওঠা মজবুত বাধটিকে। নৃত্যের তালে তালে বেরিয়ে এলো নর্তকীরা, ডানা গজিয়ে পরী হয়ে উড়ে চলে গেলো এ বাড়ির টিনের চালকে ঝমঝম শব্দে কাপিয়ে আর বৃরাজিতে শো শো শব্দ তুলে। অন্যদিকে ছোট ছোট মৃদু কোমল ঢেউ আছড়ে পড়তেই লাগলো একের পর এক যতণ পর্যন্ত না ভেঙ্গে যাওয়া বাধের শেষ মাটিটুকুও পানিতে মিশে গেলো। বন্ধ চোখেও জলের প্লাবন নামলো। অনির্বচনীয় শিহরণে তিরতির করে কাঁপতে থাকা শাহিদা বেগম ভাবলেন, নিজেকে ভুল প্রমাণ করে গুড়িয়ে দেয়ার অনন্যসাধারণ এই মুহুর্তটুকুর জন্য একটি জনম শুধু নয়, অন্তত তিনটি জনমের বঞ্চনাকে উৎসর্গ করা যায়।
আজ রাতে সমস্ত বাংলাদেশ রাস্ট্রের যাবতীয় জোনাকী পোকা জড়ো হতে শুরু করলো এ বাড়িটিকে ঘিরে। আসুক জোনাকী পোকারা, গুবরে পোকারাও আসুক। চলে আসুক রাজ্যের বনবিড়াল, শেয়াল, বাঘডাসা আর নিশাচর বাদুড়েরাও। জামরুল গাছটি অন্তত এ রাতটার জন্য হলেও ফিরে পাক ভেঙ্গে যাওয়া ডালটি।
কিছুটা উৎসব আজ রাতে তো হতেই পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




