somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আলোর পথে বাংলাদেশ

০৫ ই নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ৮:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



একটা ধূয়াসে অন্ধকার পেরিয়ে হয়তোবা শুরু এভাবেই, এখান থেকেই। হয়তোবা আলো এখন আমাদের স্পর্শ সীমানার ভেতরেই।
আজ ৪ঠা নভেম্বর ২০১৮ হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে এক বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি মাওলানা মুফতিরা এক বিরাট জন সমাবেশের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দিয়েছেন। দাওরায়ে হাদিস নামের কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে বাংলাদেশের প্ৰচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় মাস্টার্সের সমমানের মর্যাদা দেয়াতে এই সংবর্ধনা ও সম্মান।

প্রথমত আমি খুবই লজ্জিত অনুভব করছি এই ভেবে যে একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক তার শিক্ষা নামের মৌলিক অধিকারের একটিকে সরকারি ঘোষণায় স্বীকৃত হওয়ার পর আজ তারা দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কৃতজ্ঞতা থেকে সংবর্ধনা দিতে হচ্ছে। আসলে তারা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে বন্দি হয়ে আছে যে তারা জানেই না এই স্বীকৃতিটাও তাদের এক অন্যতম মৌলিক অধীকার।

খুবই দুঃখজনক ভাবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশের মানুষকে মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। যারা উচ্চবিত্ত তাদের সন্তানরা যাবে কিন্ডারগার্টেন বা দামী ইংলিশ মাধ্যম স্কুলে, মধ্যবিত্তদের সন্তানরা যাবে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর নিম্নবিত্ত অনোন্যপায় পিতামাতার সন্তানের আশ্রয় হবে মক্তব বা মাদ্রাসায়। স্বাভাবিক ভাবেই রাষ্ট্র যখন তার নাগরিককে মৌলিক অধীকারের নিশ্চয়তা দিতে পারেনা নাগরিক তখন অশিক্ষা অথবা ভুল শিক্ষায় যদি চাপাতিজীবী ধর্মান্ধ মুসলিম হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের তখন আর খুব কিছু করার থাকেনা।

১৮ এপ্রিল ২০১৪ চট্রগ্রামের এক জনসভায় হেফাজতে ইসলামের শাহ মোহাম্মদ শফি ঘোষনা দিয়েছিলেন, নাস্তিকরা মুরতাদ হয়ে গেছে তাদেরকে হত্যা করা ওয়াজিব। এই ঘোষণার পরই বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডে নিহত হয়েছিলেন মুক্তমনা লেখক অভিজিৎ রায়, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন সহ অনেকে। সেই শফি সাহেব প্রধানমন্ত্রীর আজকের সংবর্ধনা সভার সভাপতি ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবে অনেকেই বিষয়টাকে রাজনৈতিক খেলা বা স্বার্থের বিষয় বলে ভাবছেন। আমি কোনভাবেই এটাকে রাজনৈতিক খেলা বা আওয়ামীলীগের স্বার্থ চিন্তার বিষয় বলে ভাবতে পারছিনা। আমি বরং একজন দূরদর্শী রাষ্ট্র নায়কের এক চরম সফলতার চিহ্ন হিসেবেই দেখছি এটাকে।

আমাদের বুদ্ধিজীবী কবি সাংবাদিক লেখক প্রকাশক ব্লগার নামের সোনার মানুষগুলোকে যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে খুন করেছে তারা করা, তারাও কিন্তু আমাদেরই সন্তান। তারা সংখ্যায় কত সেদিন শাপলা চত্বরে এবং আজ সংবর্ধনা সভায় আমরা তা দেখেছি। চিহ্নিত দু চার জনকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হলেও লক্ষ লক্ষ হিসেবের এই ছেলেগুলোকে বিচারের আওতায় এনে জেলে পুরে দেয়া কি সম্ভব ছিল? তাহলে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কি করণীয় ছিল? একমাত্র যে কোন কৌশলে তাদের খুব কাছে চলে যাওয়া ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না. এবং সেটাই করেছে সরকার সেটাই করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের বাস্তবিক অবস্থা বিবেচনায় জনসাধারণের বিরাট একটা অংশ তাদের সন্তানদেরকে মাদ্রাসা নামের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত করতে চাইছেন। সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষাকে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত করে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ খুলা নেই। দাওরায়ে হাদিস মাস্টার্সের সম্মান পাওয়াই শেষ কথা নয়, পর্যাপ্ত মনিটরিংও সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষাকেও বাংলাদেশের মূল শিক্ষানীতির আওতায় নিয়ে আসা খুবই প্রয়োজন। একমাত্র এই উপায়েই মাদ্রাসাগুলো থেকে জঙ্গি উৎপাদন বন্ধ করা সম্ভব।
যতদূর জানি সেই ইংরেজ আমল থেকেই খারিজী বা কওমি শিক্ষাধারাকে রাষ্ট্রের মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করার একটা প্রচেষ্টা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের সরকার বা নীতিনির্ধারকদের খুব কাছাকাছি অন্য একদল ইসলামী ধারার চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বরা থাকার কারনে এবং কওমী নীতিনির্ধারকদের অজ্ঞতার কারণে তা হয়ে উঠেনি। এই উপমহাদেশে সম্ভবত এই প্রথম দাওরায়ে হাদীসকে মাস্টার্সের স্বীকৃতির মাধ্যমে তুলনামূলক ভাবে পিছিয়ে থাকা বা অন্ধকারের থাকা এই শিক্ষাধারাকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতির সাথে জড়িত করে নেয়া গেল। এই জড়িয়ে যাবার মাধ্যমেই কিন্তু সরকার আগামীতে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার করতে পারবে এবং মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে জড়িত আমাদের সন্তানগুলোদেরকেও বিজ্ঞানমনস্ক এবং বাস্তবমুখী করে তুলতে সক্ষম হবে। অতি রক্ষণশীল এই শিক্ষাধারার সাথে জড়িত এই ছেলেগুলো আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানেনা, তথ্য প্রযুক্তির এই যুগেও তারা পৃথিবী সম্পর্কে অজ্ঞ। সুযোগ পেলেই, স্বঘোষিত সর্বজান্তা জাহেল মাওলানা মুফতিদের হাত থেকে উদ্ধার করে প্রকৃত মুসলিম চিন্তাবিদদের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারলে তারাও দেশ প্রেমিক মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

দেশের প্রতি স্বাধীনতার প্রতি এই ছেলেগুলোর দরদ না থাকলে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে তারা আজ সেলফি তুলতো না, মুক্তিযোদ্ধ যাদুঘরে গিয়ে বিমর্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতামনা তাদেরকে।

আজকের সংবর্ধনাকে বা হেফাজতে ইসলামের সাথে সরকারের ঘনিষ্টতাকে কেউকেউ খুব হাস্যকর ভাবে ভোটার রাজনীতি বলার চেষ্টা করছেন। এই ছেলেগুলো বা তাদের পরিবার নৌকা মার্কায় ভোট দেবে বলে আমি এখনো মনে করিনা। এখনো তারা অন্ধকারে আছে, ব্যালটে ভোট প্রদানের মাধ্যমে বেহেস্ত পাওয়া যায় বলে তাদের অনেকেই এখনো বিশ্বাস করে। আমার ধারণা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানেন এরা নৌকার ভোটার হবে না। আমার মনে হয় কেবল শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকা একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে আলোর অভিমুখে নিয়ে আসার চেষ্টা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অন্য আর কোন বিষয় চিন্তা করছেন না। বিষয়টা একেবারেই মানবিক, যেমনটি মানবিক রোহিঙ্গাদের আমাদের দেশে আশ্রয় দেয়া। ওদেরকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেয়া আর এদেরকে আমাদের সন্তান হিসেবে আলোকিত হবার সুযোগ করে দেয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব ভাল জানেন পর্যাপ্ত মনিটরিং ও যথাৰ্থ সিলেবাসের মাধ্যমে লেখাপড়ার সুযোগ পেলে দেশ দেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হলে এই ছেলেগুলো নিশ্চিত ভাবেই একদিন এই দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে নিজেকে তৈরী করবে সেদিন আর ব্যালটে শীল দেবার মাধ্যমে তারা বেহেস্ত পাওয়ার চিন্তা করবে না।

আরেকদল শিক্ষিত অথচ মননে মুর্খ্যকে শেখ হাসিনাকে মৌলবাদী হিসাবে আখ্যায়িত করতে দেখলাম। ভুলে গেলে চলবে কেন শেখ হাসিনা একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলের প্রধান। ধর্ম নিরপেক্ষ মানে তো সকল ধর্ম। তাহলে শেখ হাসিনা যদি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান পরিষদের সংবর্ধনা নিতে পারেন তবে ইসলাম ধর্মের কিছু মাওলানা মুফতিদের সংবর্ধনা নিতে পারবেন না কেন? উনি পূজায় গিয়ে সিন্ধুর লাগালেই কি কেবল ধর্মনিরপেক্ষ, মাওলানাদের সংবর্ধনা উনাকে ব্রাত্য করে দেবে?

মোল্লা মাওলানাদেরকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনেক কথাই ব্যক্তিগত ভাবে আমার অপছন্দ। অনেক ব্লগার নিহতের পর শেখ হাসিনার বলা অনেক কথাই সমালোচনার যোগ্য, মদিনা সনদ বিষয়ে তাঁর অসচেতন ঘোষণারও আমি বিরোধী কিন্তু কওমী মাদ্রাসার এই শিক্ষাধারাটিকে রাষ্ট্রের মূল শিক্ষা ধারার সাথে সম্পৃক্ত করার তাঁর চেষ্টা সত্যিকার অর্থেই একটি মানবিক প্রচেষ্টা। আজ ঢাকার অলিতে গলিতে, অপরাজেয় বাংলায়, জাতীয় যাদুঘরে এই যে একদল চঞ্চল উচ্ছল আলোকিত উচ্ছসিত তরুণ দেখলাম মন ভাল হয়ে গেল। আচমকা আঁধার কেটে মনে হলো আমার বাংলাদেশ এক আলোর সরোবর।

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১৮ সকাল ৮:২৯
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোথাও কেউ নেই!

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩২

ঢাকা সিটিতে সিসিটিভি কি শুধু জরিমানা আদায়ের জন্য?

রাজধানীতে তিন বাসে আগুন



রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্দেশ্য শুধু ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ছবি ধারণ করে জরিমানা আদায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের স্টেশনে

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৭

রেল স্টেশনে অপেক্ষা। ট্রেন আসছে। এখনো ঐ দূরে। কিন্তু তার আগমন দেখলেই আমার ভেতরে এত কন কন করে উঠে কেন জানি না। কেন এই কষ্ট বারবার হয়?... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাথর ছুঁড়ে হত্যা করার কথা!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯


সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর এমপি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ অপ্রত্যাশিত উপহার

লিখেছেন সামিয়া, ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৪০




সৌদি আরবের রিয়াদের একটা পাঁচ তারকা হোটেলে আমার চাকরি। চাকরিটা খুব কঠিন কিছু না। প্রতিদিন একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হাতে নিয়ে হোটেলের কার্পেট পরিষ্কার করি। লবি, করিডোর, হলরুম, অতিথিদের বসার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×