somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লঙ্গরখানা: গুরু নানক-এর 'ট্রু বিজনেস'

১৫ ই জানুয়ারি, ২০১১ দুপুর ১:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

‘লঙ্গরখানা’- এই শব্দটির অর্থ আমরা জানি। আর্তদের বিনামূল্যে খাদ্য বিতরন করার জন্য আপৎকালীন সময়ে লঙ্গরখানা খোলা হয় । এই পদ্ধতির অন্য নাম থাকতে পারে, এবং আছেও, তবে- লঙ্গরখানা শিখধর্মের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। অবশ্য শিখরা লঙ্গরখানা শব্দ ব্যবহার করে না, তারা কেবল লঙ্গর (ইংরেজি Langar) শব্দটি ব্যবহার করে। শিখদের উপাসনালয়কে বলা হয় গুরুদুয়ারা, লঙ্গর তারই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, লঙ্গর ব্যতীত গুরুদুয়ারা সম্ভব নয়। লঙ্গর-এর কিছু অপার মানবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে-যা আমাদের কৌতূহলকে উশকে দেয় ...




লঙ্গর

লঙ্গর শব্দটি ফারসি। এর অর্থ: সমাজের দুঃস্থ ও নিঃস্বদের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। সুফি-দরবেশদের খানকা বা আস্তানাকেও বলা হয় লঙ্গর-ওই ফারসি ঐতিহ্যের সুবাদেই।



গুরু নানক। (১৪৬৯-১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দ ) শিখ ধর্মটি গুরু নানক এর শিক্ষার ওপরই প্রতিষ্ঠিত । যিনি বলেছিলেন: Death would not be called bad, O people, if one knew how to truly die. (হে মানুষ, মৃত্যু কি এমন, যদি তুমি জান কী ভাবে সত্যি সত্যি মরতে হয়!) গুরু নানক ১৫০২ সালে ঢাকায় এসেছিলেন। অবস্থান করেছিলেন-এখন যেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুদুয়ারা নানকশাহী-সেখানে।

লঙ্গর-এর উদ্ভব গুরু নানক-এর তরুণ বয়েসে। শিখদেও বিশ্বাস এই রকম: নানক-এর তখন কুড়ি বছর বয়েস; তাঁর বাবা নানককে কিছু টাকা দিয়ে বললেন ব্যবসাবানিজ্য করতে। নানক দরিদ্র মানুষ দেখে বিচলিত হয়েছিলেন, তবে তিনি তাদের সাহায্য করতে পারেননি। এবার তিনি টাকা দিয়ে গরীব-দুঃস্থদের আহারের ব্যবস্থা করলেন। বাবা জিজ্ঞেস করলেন-টাকা দিয়ে কি ব্যবসা করলে শুনি? নানক বললেন, টাকা দিয়ে দরিদ্র মানুষকে খাইয়েছি। এইই হল ‘প্রকৃত ব্যবসা’ (ট্রু বিজনেস)।
এই হল লঙ্গর- এর আদি ইতিহাস।



গুরু নানক। শিখ ধর্মের মূলে ঈশ্বর-এর আরাধনা হলেও শিখরা বিশ্বাস করে ক্ষুধার্ত থেকে ঈশ্বর-এর সাধনা সম্ভব না। যে কারণে লঙ্গর ব্যতীত গুরুদুয়ারা সম্ভব নয়। কেবলি প্রার্থনাসভা শিখদের কাছে মূল্যহীন। আমার মনে হয় এটি ভারতের ধর্মচিন্তায় পারস্যের সুফিবাদের প্রভাবের ফল। সুফিবাদী চিশতিয়া তরিকায় লঙ্গরখানা একটি অনিবার্য দিক। সুফিবাদের পূর্বে ভারতীয় ধর্মে দান-ধ্যান অবশ্যই ছিল, তবে সুফি কিংবা শিখদের প্রতিষ্ঠিত লঙ্গরখানা যে রকম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, সেভাবে সম্ভবত ছিল না।

লঙ্গর- এ খেতে দেওয়া হয় রুটি, ডাল এবং নিরামিষ । নানক-এর সময়ে অবশ্য মাংস দেওয়া হত। পরে মাংস বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ, লঙ্গর-এ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের লোকজন যেন আসতে পারে। ( বৈষ্ণবরাই ভারতবর্ষে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ) লঙ্গর কেবল শিখদের জন্য না, লঙ্গরে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত ধর্মের অনুসারিরা খেতে পারে। লঙ্গর এ নিরামিষ পরিবেশিত হলেও বিশেষ বিশেষ উৎসবে মাংস দেওয়া হয়।



শিল্পীর চোখের নানক-এর সময়ের লঙ্গর

লঙ্গরকে ‘গুরু কা লঙ্গর’ বলা হয়। গুরু মানে গুরু নানক। ঢাকায় যে গুরুদুয়ারা রয়েছে, সেখানেও প্রতি শুক্রবার লঙ্গর -এর ব্যবস্থা করা হয়। লঙ্গর-এর মূল উদ্দেশ্য মানবজাতির সেবা। লঙ্গর-এর রান্নাঘরকে বলা হয় ‘পবিত্র রান্নাঘর’ বা ‘হলি কিচেন’। রান্নাবান্নার কাজটি করে শিখরাই, ‘হলি কিচেনে’ পেশাদার রাঁধুনি-অর্থাৎ,বাবুর্চির প্রবেশ নিষেধ।



রান্না এবং খাবার পরিবেশনায় এমন কী ছোট ছোট শিখ শিশুরাও অংশ নেয়।


লঙ্গর-এ যারা খেতে আসে তাদের বলা হয় ‘সঙ্গত’। সমাজের যে কোনও শ্রেণির মানুষের জন্যই লঙ্গর-এর দরওয়াজা খোলা। গুরু নানক-এর এমনই নির্দেশ। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় ভারতবর্ষের মানুষকে একত্ববোধের শিক্ষা দিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় ভারতবর্ষ ঘুরে দেখেছেন, সপ্তদশ দশকের প্রারম্ভে যে তিনি আমাদের এই ঢাকা শহরে এসেছিলেন, যে কথা প্রারম্ভেই বলেছি; ঢাকা সফরকালে থাকতেন বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ... এখন যেটি গুরুদুয়ারা নানকশাহী, প্রতিদিন উপদেশ দিতেন নানক, ঢাকাবাসী সেসব বাণী মন দিয়ে শুনত। তিনি বলতেন: হে মানুষ, মৃত্যু কি এমন, যদি তুমি জান কী ভাবে সত্যি সত্যি মরতে হয়!



দিল্লির গুরুদুয়ারা


লঙ্গর-এ বছরের প্রতিটি দিনই দু’বার করে খাবার পরিবেশন করা হয়। দিল্লির গুরুদুয়ারায় প্রতিদিন ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ সঙ্গতের খাবার আয়োজন করে! প্রতি সপ্তাহে এক কিংবা একাধিক শিখ পরিবার লঙ্গরের দায়িত্ব নেয়। পরিবারের সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে । তারা বাজার, রান্নাবান্না থেকে শুরু করে খাবার পরিবেশনা, এমন কী ধোয়া মোছার কাজ পর্যন্ত করে। এদের বলে সেওয়াদ্বার (সেবাদার? মানে যারা সেবা করে?)।



স্পেনের একটি গুরুদুয়ারার লঙ্গর। গুরু নানক যখন তাঁর যৌবনে বাবার টাকা দিয়ে ‘ট্রু বিজনেস’ করেছিলেন, অর্থাৎ দরিদ্র দুঃস্থদের খাইয়েছিলেন তখন সেই হতদরিদ্রের সংখ্যা কতই-বা ছিল। বর্তমানে শিখদের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ এবং তা কেবল ভারতবর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ভারতবর্ষের বাইরেও এই গভীর জীবপ্রেম এই নানক-প্রবর্তিত মানবতা ছড়িয়ে গেছে।


তথ্যসূত্র:

Click This Link
২৫টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নির্বাচনী অঙ্গীকার চাই ফুটপাথ ফেরাও মানুষের কাছে

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:৪৬


ভোটের মিছিলে কথা হয় অনেক
পোস্টারে ভরা উন্নয়নের ঢাক
কিন্তু বলো তো ক্ষমতাপ্রার্থী দল
ফুটপাথ কার এ প্রশ্নের কি জবাব?

ঢাকা ছোটে না, ঢাকা পায়ে হেটে ঠেলে চলে
শিশু, নারী, বৃদ্ধ সবাই পড়ে কষ্টের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালুর নিচে সাম্রাজ্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১


(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।

এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০


এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:৫৮


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×