একজন মানুষের তার নিজের মতো করে জীবন যাপনের সম্পূর্ণ অধিকার আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কেটে, ধুয়ে, মুছে, অপরিষ্কার হাতে আমড়া বিক্রি করে কেউ সংসার চালায়। মানুষ তা খাচ্ছেও। কেউ রিজেক্টড শার্ট নতুন স্টিকার দিয়ে বিক্রি করে তার মেয়েটির যৌতুকের খরচ জোগায়। মানুষ সেই শার্টও কিনছে। কারো স্ট্যান্ডার্ডে না মানালে রাস্তার আমড়া খাবে না। আবার দমে কুলালে শার্ট-প্যান্ট বানিয়েও পড়তে পারে। অপশন আছে।
আশরাফুল আলম ওরফে হিরো আলমের সিডি বিক্রি দিয়ে জীবনের শুরুটা অন্যদিকেও প্রবাহিত হতে পারতো। সে মাদকসেবি, বদমায়েশ, বা রাজনীতির পান্ডা হতে পারতো। আমাদের দেশীয় পরিবেশে সেটাই হয়তো স্বাভাবিক হতো কিন্তু যা ঘটছে তা অস্বাভাবিক ঠেকছে আমাদের কাছে, এবং এই অস্বাভাবিকতাটাই স্বাভাবিক, কারণ এটা আমাদের কাছে নতুন। এই নতুনত্ব আমাদের সামন্ততান্ত্রিক বিশ্বাসে আঘাত করেছে। এই আঘাতটা আমাদের 'জ্বি হুজুর' মন বরদাশত করতে পারছেনা।
আশরাফুল আলমের বিদ্যা সঙ্কট আছে কিন্তু সে যে নিজ যোগ্যতায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে একটা জায়গা করে নিয়েছে এটা স্বীকার করতে আমাদের বিদ্যালংকারদের কষ্ট হচ্ছে কারণ আমরা সৈয়দ বংশের লোক! তাই আমরা তাঁকে নিয়ে হাসি, ঠাট্টা করি। তাঁর চেহারা, কথা, বেশভূষা নিয়ে মজলিস গরম করি কিন্তু আমরা যা করি না তা হলো আমরা আমাদের চারদিকে তাকাই না।
ভালো করে নজর ফেললে অবশ্যই পরিচিত এমন কাউকে পাওয়া যাবেই যিনি কখনো অডিও বা ভিএইচএস ক্যাসেট বিক্রি করতেন। ৪০, ৩০, ২০ বছর আগের সেই মানুষগুলো কি আজকে একেকটি অডিও কোম্পানির মালিক হতে পেরেছে? নাটক, সিনেমার, বিজ্ঞাপনের প্রোডাকশন হাউয খুলেছে? আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের যে দোকানীর কাছ থেকে আমি নিয়মিত সাপ্তাহিক যায়যায়দিন কিনতাম সে কি কোনও খবরের কাগজের মালিক হয়েছে? না হয়নি। কিন্তু আজাদ প্রোডাক্টস ঠিকই হয়েছে। আর আমরা তাঁকে নিয়েও হেসেছিলাম।
হতে পারে হিরো আলম কড়া বাথরুম সিঙ্গার, হতে পারে তাঁর জন্যই মাহফুজুর রহমানকে আমাদের গানের পাখি বলে মনে হয়, কিন্তু আপনারা তাঁর অন্ট্রাপ্রনিউ্যয়ারশিপ(entrepreneurship)টা দেখুন। তাঁর অ্যামবিশন(ambition)টা দেখুন। তাঁর রেযিলিয়েন্স(resilience) দেখুন। তাঁর অ্যাসপিরেইশন (aspiration) দেখুন। তাঁর নেটওয়ার্কিং(networking) দেখুন। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততা(spontaneity) দেখুন। ক্রুর নেগেটিভ সমালোচনা কে সামাল নেয়ার মেন্টালিটি ও অ্যাটিচুওড(attitude) দেখুন, ইতিবাচকতা(posetivity) দেখুন।
আপনারা ইন্টিরিওর(interior) টা অবজ্ঞা করে শুধু এক্সটিরিওর(exterior)টা-ই দেখছেন।
মানছি সে আপনার ক্লাস(class) এর গায়ক বা অভিনেতা না রাজনীতিবিদ না, আমি নিজেও কোনও সময় একথা সেকথা বলেছি কিন্তু হি ইয অ্যা ব্রেইভ ম্যান। হয়তো ক্রেইযি(crazy)ও। ব্রাদার, কিছু অর্জন করতে ক্রেইযি আপনাকে হতে হবেই, crazy না হয়ে আজ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে কেউ কিছু অর্জন করেনি। হিমালয় অভিযান পাগলামি, আকাশে উড়ে বেড়ানো পাগলামি, মহাকাশ অভিযান আরো বড় পাগলামি, তাজমহল এমনকি আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতার যুদ্ধ এসব পাগলামিই ছিল।
দেড় যুগ আগে লন্ডনে এক ক্যাফে মালিকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। নাম ছিল Joe. Joseph এর শর্ট ফর্ম। তাঁর ক্যাফে'র নাম Crazy Joe. রেফিউজি হয়ে আসা জো লেবাননের ছেলে। পথে পথে ঘুরে বেড়াতো লন্ডনে, তারপর কিছু একটা করতে হবে তাড়না থেকে Crazy Joe's Cafe'র মালিক বনে যাওয়া। ওর ওখানে প্রতি সপ্তাহে যাওয়া হতো। জো'র গল্পটা শুনে আমি এতো মুগ্ধ হয়েছিলাম যে Western University'র Ivey Business School এ ওকে নিয়ে case study'র একটা ব্যাবস্থা করে দেই যাতে ছাত্ররা ওর বিযন্যাস ট্যাকটিক্স(tactics) নিয়ে স্টাডি করতে পারে। হিরো আলমকে নিয়ে আমাদের স্টুডেন্টদের অবশ্যই case study বানানো উচিত। He is a learning tool.
অথচ তাঁকে নিয়ে যা হচ্ছে সেটা সাইবার বুলিইং(bullying) এবং একঘরে(ostracism) করে রাখা আচরণ। এসব কাজ ধর্ম বহির্ভূতও বটে। ন্যায় বিধান বা ফিকাহ পরিপন্থী। (ফিকাহের ব্যাখ্যায় আমার ভুল হলে কেউ ঠিক করে দেবেন)।
হিরো আলমের আসল নাম আশরাফুল আলম, মানে জগৎশ্রেষ্ঠ। আপনি তীর্যক দৃষ্টিতে তাঁর ক্লাসলেস(classless) জগৎটা কত বড় সে প্রশ্ন তুলতে পারেন। আলম আপনার কাছে হিরো না হতে পারে এবং তাতে কারো বিন্দু পরিমান আপত্তি থাকার কথাও না কিন্তু তাঁরও একটি আলম কিন্তু আছে। একটু একটু করে একটি আলম সে তৈরি করে নিয়েছে। আর তাঁর সেই আলমে সে অনেকেরই হিরো।
আপনার হিরোইযমের কী অবস্থা?
আমি হলফ করে বলতে পারি, আগামীকাল যদি হিরো আলম দশটি হামদ ও নাতের একটি অ্যালবাম বের করে, আজকে আপনারা যারা তাঁকে নিয়ে তামাশা করেন তারাই পরশুদিন স্ট্যাটাস দেবেন, 'আল্লাহ তুমি হিরো আলমকে নেক হায়াত দান কর'।
এটা হিপোক্রেসি।
প্লিজ, আপনার ক্লাসটাকে সংযত করুন। সবাইকে আপনার লেভেলের হতে হবে না। ব্যাঙটাকে তার মতো করেই ডাকতে দিন। এটা তার সহজাত। এতেই তার আনন্দ। অযথা ঢিল ছুড়ে আপনার নিজের পরিচয় জাহির করবেন না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

