somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ময়মনসিংহ শশী লজ

২৯ শে জানুয়ারি, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



মুক্তাগাছা জমিদারীর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উত্তরপুরুষ রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী নিঃসন্তান ছিলেন। অথচ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সম্পত্তি সংরক্ষণে সক্ষম একটি পুত্র সন্তান ভীষণভাবে প্রয়োজন!
কি করা যায়? জীবনের জটিল অংক কষতে কষতে দত্তক পুত্র গ্রহণের সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন তিনি।
হ্যাঁ, গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নিলেন রঘুনন্দন। সময়ের এক বিশেষ লগ্নে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারীর ভার অর্পণ করে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পাড়ি জমালেন পরপারে!

জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি! সন্তানহীন অবস্থায় অকাল প্রয়ান ঘটল তাঁরও! গৌরীকান্তের বিধবা পত্নী বিমলা দেবী দত্তক নিলেন কাশীকান্তকে।
কাশীকান্তের কপালও মন্দ ছিল ভীষণ! দীর্ঘ রোগযন্ত্রনায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোক গমন করলেন তিনিও! তাঁর বিধবা পত্নী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরানী পূর্বসুরীদের পথ অনুসরণ করে দত্তক নিলেন চন্দ্রকান্তকে!
ভাগ্যের বিরুদ্ধাচারণে চন্দ্রকান্তও অতিদ্রুত ত্যাগ করলেন পৃথিবীর মায়া। তবে হাল ছাড়লেন না লক্ষ্মী দেবী। পুনরায় দত্তক নিলেন তিনি। দ্বিতীয় দত্তক পুত্রের পূর্বনাম পূর্ণচন্দ্র মজুমদার। কূলগুরুর সামনে মহাসমারোহে লক্ষ্মী দেবী নতুন নাম রাখলেন পুত্রের -সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী!
সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর শাসনামলে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হল সোনালি মাত্রা। প্রায় একচল্লিশ বছর জমিদারী পরিচালনার প্রশস্ত প্রেক্ষাপটে বহু জনহিতকর কাজ করলেন তিনি।
ময়মনসিংহে স্থাপন করলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। উনবিংশ শতকের শেষপাদে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে ৯ একর ভূমির উপর একটি অসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করলেন সূর্যকান্ত।
নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তকপুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হল শশী লজ।

বিখ্যাত এই ভবনটি ১৮৯৭ সালের ১২ জুন গ্রেট ইন্ডিয়ান ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হলে অত্যন্ত ব্যথিত হন সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯০৫ সালে ঠিক একই স্থানে নতুনভাবে শশী লজ নির্মাণ করেন পরবর্তী জমিদার শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। ১৯১১ সালে শশী লজের সৌন্দর্যবর্ধণে তিনি সম্পন্ন করেন আরো কিছু সংস্কারকাজ। নবীন জমিদারের প্রাণান্ত প্রয়াসে শশী লজ হয়ে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দর, অপরূপ।

শতবর্ষী এই ভবনের রূপ-সৌন্দর্য কি অটুট আছে আজও?
অকৃত্রিম কৌতূহলে জানতে চাইলাম রানার কাছে। চলন্ত রিকশায় পথ চলতে চলতে নেতিবাচক উত্তর দিলেন তিনি। জানালেন, ভবনের রূপ-সৌন্দর্য অটুট নেই স্বাভাবিকভাবেই! কালের করাল গ্রাসে শশী লজ খুব বেশী ক্ষতিগ্রস্থ না হলেও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে রাষ্ট্রযন্ত্রের ঔদাসীণ্য ভীষণভাবে বিনষ্ট করেছে ভবনটির ভৌত কাঠামোকে। ১৯৫২ সাল থেকে শশী লজ ব্যবহৃত হচ্ছে মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে। সুতরাং অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক পরিবর্তনের ক্ষত নিয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি।
বিষণ্ন এই বাক্যসমষ্টি বিহ্বলতার মুখোমুখি করে আমাদের। তবে জীবন থেমে থাকে না। রিকশাও এগিয়ে যায় যথানিয়মে। অসংখ্য পথের স্মৃতি পেছনে ফেলে দৃষ্টিপ্রত্যক্ষে উদ্ভাসিত হয় উঁচু দেয়ালঘেরা শশী লজের প্রবেশদ্বার।

রিকশা থেকে নেমে ভেতরে প্রবেশ করলাম আমরা। শান বাঁধানো প্রবেশপথের সামনেই শশী লজের সাজানো বাগান। বিচিত্র প্রজাতির ফুল শোভিত সেই বাগানের মধ্যভাগে বৃত্তাকার জলফোয়ারা। ফোয়ারার কেন্দ্রস্থলে অনুচ্চ বেদীর উপর দণ্ডায়মান গ্রীক স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত স্বল্পবসনা নারীর মর্মর মূর্তি। বাগানের ঠিক পেছনেই লালচে ইট আর হলুদ দেয়ালে নির্মিত শশী লজ।

সুপ্রাচীন এই ভবনের পূর্বপ্রান্তের ঘরটি বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষের কার্যালয় হিসেবে। মহিলা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষের সহযোগিতায় আমরা প্রবেশ করলাম শশী লজের অন্দরে।
গাড়ি বারান্দা অতিক্রম করে কয়েক ধাপ সিঁড়ি পেরোলেই রঙ্গালয়। সুদৃশ্য সেই রঙ্গালয়ের একপ্রান্তে বিশ্রামঘর। বিশ্রামঘরের পর কাঠের মেঝেযুক্ত হলঘর। হলঘরের পাশেই বর্ণিল মার্বেল পাথরে নির্মিত আরেকটি জলফোয়ারা। জলফোয়ারার ঠিক উপরের ছাত থেকে নীচে ঝোলানো স্ফটিকস্বচ্ছ কাঁচের ঝাড়বাতি।

এছাড়াও আরো কয়েকটি কক্ষের সাথে পরিচয় হল আমাদের। পরিচর্যাহীন, ধুলোমলিন সেই কক্ষগুলোর কোনটি তালাবদ্ধ, কোনটি নানা রকম অপ্রীতিকর আসবাবপত্রে ঠাসা। ভবনটির পেছনে একচিলতে উঠান। সবুজ ঘাসের আঁচল পাতা সেই উঠান পেরোলে একটি অপরিসর জলাশয়। জলাশয়ের পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দুটি জরাজীর্ণ ঘাট থাকলেও দক্ষিণপ্রান্তে অবস্থিত দ্বিতল স্নানঘাটটির সৌন্দর্য সত্যিকারঅর্থেই অসাধারণ!

এলাকার প্রবীণ মানুষদের ভাষ্যে, বিশাল জায়গা জুড়ে অবস্থিত শশী লজের চারদিকে নিকট অতীতেই ফুল বাগান ছিল, ছিল বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষবীথি। কিন্তু মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ব্যবহারিক উপযোগযুক্ত নানা স্থাপনা নির্মাণের ফলে ঐতিহাসিক এই ভবন ও তার পরিপাশের ফুল-বৃক্ষবীথির সৌন্দর্য আজ বিলুপ্তপ্রায়!
সৌন্দর্য বিলোপের পরবর্তী ধাপ কি? প্রৌঢ়ত্ব? তারপর? বার্ধক্য? তারপর? মৃত্যু?
আমাদের নিয়তি আসলে কি? প্রতিটি অতীত স্মৃতির নীরব মৃত্যু প্রত্যক্ষ করা?
যদি তাই হয়, তাহলে কোন ভিত্তিমূলে পা রেখে গড়ে উঠবে আমাদের ভবিষ্যত? কোন ঐতিহ্যের সাথে বসবাস করে সমৃদ্ধশালী হবে পরবর্তী প্রজন্ম?
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শহীদ জিয়া ২৭ মার্চের ভাষণে 'জয় বাংলা' বলেছিলেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১১





সূত্রঃ আমার রাজনীতির রূপরেখা
লেখকঃ জিয়াউর রহমান
পৃষ্ঠাঃ ১৭৭

...বাকিটুকু পড়ুন

ওরা জিডিপি আর সেমিকন্ডাক্টরে ব্যস্ত , আমরা ব্যস্ত গোরুর জিয়াফত নিয়ে ....।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৩৫


গতকাল মামার ফোন এল দুবাই থেকে, রাতের বেলা। বললেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করে জিয়াফত খাওয়ার খবর এখান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, ব্যাপার কী? আমি বললাম, মামা, ওরা গরুর মাংস... ...বাকিটুকু পড়ুন

মীর জাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঐতিহাসিক চুক্তি! যে চুক্তির জন্য বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ২০০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়েছিল!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:৪২


আমরা পলাশী যুদ্ধের কথা জানি। কিন্তু এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছিল মীরজাফর ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্ণধার লর্ড ক্লাইভের এর সাথে সেটা সম্পর্কে খুব কমই... ...বাকিটুকু পড়ুন

যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০


যার যার ধর্ম, তার তার উৎসব....

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- শুনতে চমৎকার, জনপ্রিয়ও বটে। কিন্তু কথাটি কি ধর্মীয় বিশ্বাসের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ?
আমার কাছে তা নয়। এধরণের বাণী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদি আরবে নারীসহ দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ: প্রতিমন্ত্রী, নাকি পাপেট?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০


গত বুধবার সৌদি আরবের শরিয়া আদালত দুই বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে বিবৃতিটি দিয়েছেন, সেটা পড়ে আমি কয়েকটা জিনিস বুঝতে পারলাম।

প্রথমত,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×