ওর সাথে যেদিন আমার প্রথম দেখা হয়েছিল,সেদিন আর দশটি স্বাভাবিক দিনের মতই সূর্য উঠেছিল।প্রভাতের সূর্যের সাথে জেগে উঠেছিল পৃথিবীর সমস্ত জনপদ। চির অশান্ত সমুদ্রের ঢেউগুলো স্বাভাবিক দুরন্তপনায় মেতেছিল।শুধু আমার চোখ হঠাৎ করেই আবিস্কার করল এক নতুন পৃথিবী।কী বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল কালো দুটি চোখ,কী স্থির অথচ কত চঞ্চল।কী অন্তর্ভেদী অপলক ভঙ্গি! শাড়ির কুঁচিগুলো আনন্দে যেন তার দু পায়ে লুটোপুটি করছে,অথচ কী শান্ত তার হেটে আসা। সবই যেন স্বপ্নের মতো, সে চলে গেল।পিছন ফিরে তাকাতেই আবার দেখা,সে দেখা শুধু দেখা নয়,শুধু দেখা রইল ও না।
ধূমায়িত চা’র কাপে ঝড় তুলে জমপেশ আড্ডা। সাহিত্য ,সমাজ,প্রেম-ভালবাসা, ধর্ম- ইতিহাস,রাজনীতি,নারীমুক্তি সকাল গড়িয়ে দুপুর আর দুপুর থেকে বিকেল।তারপর সূর্যাস্ত আইনে হলে ঢোকা। তার নির্বাক বিদায় আমার হৃদয় কে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিত। কোন কোন দিন তার ঈষৎ গোলাপি আভার মুক্তার মতো হাসি আমার একাকীত্ব জীবনটাকে কানায় কানায় ভরে দিত।
উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখতে ও খুব ভালবাসত, অনেকেই বাসে।কিন্তু ওর মতো আমি আর দেখিনি। চৌম্বকীয় অংশের সংলাপ মুখস্ত করায় তার কোন ক্লান্তি নেই। কোন এক ছবিতে সুচিত্রা নাকি ব্লাউজ বিহীন শাড়ি পরেছিল। সে দৃশ্য ও ভুলতে পারত না। ওর খুব শখ ছিল গ্রামের মেয়েদের মতো শুধু শাড়ি পরা, একাকী ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে সে নাকি বহুবার তা করেছে।ও রবীন্দ্র নাথের গান খুব ভালবাসত। আর ভালবাসত কোন একটা ঘটনার সাথে গানের মিল করা।বহু ঘটনার সাথে এরকম প্রাসঙ্গিক গান ও আমাকে বহুবার শুনিয়েছে।তবে, পুরুষ সারমেয়র মেয়ে সারমেয়র কাছে বার বার যাওয়া আসাকে, “অলি বার বার ফিরে আসে,অলি বার বার ফিরে যায়” এর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া আমার কাছে গুরু দেবের প্রতি এক নিষ্ঠুর কৌতুক বলে মনে হত। কোন কোন অলস দুপুরে পাশাপাশি বসে জীবনানন্দ দাস শুনতে শুনতে এই জন অরন্নের মধ্যে থেকেও আমরা যেন হারিয়ে যেতাম নির্জন কোন এক গহীন অরঙয়েরর অন্ধকারে। কবিতা থেমে যেত তার শরীর মন কখন যেন উৎসুক হয়ে পাশাপাশি দূরত্ব কমিয়ে আরও কাছাকাছি হত।কখন যেন তার হাত খানা আলতো ভাবে আমার হাতের উপর এসে পড়ত। তার পৃষ্ঠদেশ ব্যাপী ঘন কালো এলায়িত চুল বাতাসে আমোদিত হয়ে আমাকে স্পর্শ করত। চারপাশে কেমন যেন এক হিরণ্ময় নীরবতা আমাদের কে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে থাকতো।
আইসক্রিম এবং ফুচকা খেতে ও খুব ভালবাসত। আইসক্রিম কে একটু আধটু প্রশ্রয় দিলেও, ফুচকা? নৈবচ নৈবচ। কিন্তু কে শোনে কার কথা! হাত ধরে যেভাবে ও টেনে ফুচকার দোকানে নিয়ে যেত কার সাধ্যি সে হাত ছাড়ায়? রাস্তার ধারের খোলা ফুচকা, ধুলাবালিতে ভরা, এবং মাছির এঁটো খাবার,এসব খাওয়া ঠিক না ইত্যাকার ভাষণ ওকে খাওয়া থেকে বিরত রাখবে কি খাওয়ার স্বাদের মাত্রা কে যেন বাড়িয়ে দিত। চোখে মুখে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে সে আমাকে বার বার খাওয়ার জন্য অনুরোধ করত।আমি তার শত অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেও যখন সে একটি ফুচকা আমার মুখের সামনে ধরে আস্তে আস্তে বলতো, “তুমি এখন আমার হাতখানা একটু ধরতে পারো” সেই সাথে তার ঘন কালো দুটি চোখের করুণ মিনতি। আমি দুহাত দিয়ে তার হাতখানা ধরতাম।ধুলাবালি আর মাছির বমিতে ভরা ফুচকাকে তখন মনে হত, জীবনের সর্ব সুখ নিয়ে ফুচকা এমন ফুলে উঠেছে।
রোকেয়া হলের সামনে দাঁড়িয়ে জটলা পাকিয়ে চা খাওয়ার অছিলায় ছেলেদের মুরগির মতো কক কক ডাক ছিল সূর্যাস্ত আইনের এক ধরণের প্রতিবাদ। অনেক সময় অনেক মেয়েরাও ঐ রকম শব্দ করে হলে ঢুকে প্রমাণ করতো তাঁরা মানুষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও নিজেদের ভালোমন্দ বোঝার যথেষ্ট ক্ষমতা তাদের হয়নি। এ বিষয় নিয়ে আলাপে বহুদিন গরম চায়ের আড্ডা আরও গরম হয়েছে। আড্ডা তুঙ্গে ঊঠলে সে গম্ভীর ভাবে ছোটোখাটো একটা ভাষণের মতো দিয়ে বলতো, “রাতে আমাদের চলাফেরা নিরাপদ নয়,কারন রাস্তায় প্রচুর খ্যাপা কুকুর, পাগলা শেয়াল আর দাঁতাল শুয়োর ঘুরে বেড়ায়। যারা আমাদের দেখলেই খাবলে খুবলে খেয়ে ফেলবে। তোমরা নিজেদের জ্ঞানী গুণী বুদ্ধিমান ভেবে ভেবে এমনই মূর্খ হয়েছ যে চাষা ভুষো দের দেখেও শিক্ষা লাভ করোনা। যে এঁড়ে লম্ফ ঝম্ফ দিয়ে গুঁতিয়ে মাটির ঘর উলটিয়ে দেয়, লাফিয়ে আড় ডিঙ্গিয়ে ক্ষেত খায় চাষারা তার গলায় ঘণ্টা বেঁধে দেয়। এঁড়ের লম্ফ ঝম্ফ বন্ধ হয়। কিন্তু তোমরা এমনই মূর্খ যে তোমরা তা না করে আমাদের গায়ে কালো কাপড়ের ঘণ্টা ঝুলিয়ে দাও। যাতে আমরা আরও বেশী দুর্বল আরও বেশী অসহায় হয়ে উঠি। তোমাদের এমনই বিচার যে আসামি থাকে জেলের বাইরে আর বাদী থাকে জেলখানায়। ধর্মের নামে সমাজের নামে আর কতকাল তোমরা এটা চালাবে? আজকের পৃথিবী গায়ের জোরে নয় মেধার জোরে চলে। আমাদের বই কি তোমাদের থেকে আলাদা? আমাদের পরিক্ষা কি তোমাদের সাথে হয় না? তাহলে কিসের জোরে তোমরা নিজেকে সেরা ভাব? ওই পশু শক্তি ছাড়া? তোমাদের মাথায় মগজ নেই, আছে শুধু অদৃশ্য শিং যা দিয়ে তোমরা গুঁতিয়ে আমাদের কাবু করতে চাও। কোন জবাব দিতে না পেরে বুদ্ধিমানের মতো হেসে বলি, “জয় মা ণৃ মুণ্ড মালিনী, তোমার এই রণ রঙ্গিনী বেশ থামাও মা। রক্ষে কর মা, ক্ষেমা দেও। তুমি মা কল্প তরু আমরা সব পোষা গরু, ভুষি পেলে খুশি হব ঘুষি খেলে বাচবনা”। আগুন লাগা খড়ের গাদায় পানি ঢাললে যেমন কাদা কাদা হয় ও তেমনি কাদা কাদা হয়ে বলতো, “সর্বনাশ টা তো হল ওখানেই, ওই সব মন ভুলানো কথা বলে বলেই তো তোমরা পুরুষরা সারাজীবন আমাদের গরুর মতো খাটিয়ে খাটিয়ে মারলে”। আরেক প্রস্থ কড়া গরম চা’র সাথে এরকম কত দিনের গরম আড্ডার যে মধুরেন সমাপনেৎ হত তার কোন শুমার নেই। সোনার খাঁচায় দিনগুলো ভালই ছিল, কিন্তু...
আমার বউ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। হৃদয় দিয়ে আমি ওর ভালবাসা টা বুঝি, অনুভব করি, আসলে সব মেয়েরাই বোধ হয় এমন করে ছেলেদের ভালবেসে আপন করে নিতে চায়, ঘর বাঁধতে চায়।আমার সমস্ত সুখ , সমস্ত কষ্ট বউটা আমার কবে কবে যেন আমার করে নিয়েছে। একটু আধটু অসুখ বিসুখ যে আমার শরীরে নিশ্চিন্তে বাসা বাঁধবে তার কোন উপায় নেই। বউয়ের জ্বালায় অসুখের কোন সুখ নেই। কোন কোন দিন রাতের ক্লান্তির ঘুম যখন ভাঙে তখন দেখি বউটা আমার পাট ভাঙা শাড়ি পরে ভেজা চুলে পাশে আধ শোয়া হয়ে শুয়ে চুলে আঙুল দিয়ে বিলি দিছে সমস্ত ঘর খানা মিষ্টি একটা গন্ধে ভরে আছে। ও ভালো গান করে, রবীন্দ্র সঙ্গীত ওর প্রথম পছন্দ। গাড়িতে যখন আমরা লং ড্রাইভ এ যাই তখন ও আমার পাশে বসে একটার পর একটা গান শোনায়। বিভিন্ন কেনাকাটায় আমরা একসাথে যাই। অল্প কেনাকাটা হলে ও গাড়িতে বসে অপেক্ষা করে। সেদিনও আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরব বলে ও গাড়িতে একা অপেক্ষা করছিল। যত তাড়াতাড়ি ফিরব বলে ভেবেছিলাম তা হল না। একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। ভেবেছিলাম দেরির জন্য বোধ হয় অনুযোগ করবে, দূর থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে কেমন যেন একটা রহস্যের হাসি হাসতে লাগলো। আমিও ম্লান হাসলাম বটে তবে মনটা আমার ভালো সায় দিল না। কাছে যেতেই বলে উঠল, “ধরা পড়ে গিয়েছ, তাই তো বলি, পুরুষ মানুষ হয়ে তুমি এতো ভালবাসা শিখলে কী করে? গুরু ধরে যে ভালবাসা শিখেছ তা বুঝতে পারিনি”। কপট রাগত স্বরে বললাম আরে বিষয় টা কি? ও চোখমুখ নাচিয়ে বলল,বুলা এসেছিল। বললাম, বুলা? সে তোমাকে চিনল কি করে? ও হাসতে হাসতে বলল, কেন ‘মায়ামৃগ’ ছবিতে দেখনি? বিশ্বজিতের সাথে ওর আসল মায়ের দেখা হওয়ার সংবাদে ওর পালিত মা কি বলেছিল? কলকাতায় এতো লোক তার মধ্যে ওর সাথেই তোর বার বার দেখা হয় কি করে? বললাম, ওসব কথা ছাড়ো, আসল কথা বল। ও বলতে লাগলো, তুমি চলে যাবার পর আমি এমনি বসে আছি, হঠাৎ হন্ত দন্ত হয়ে শাড়ি পরে এক মহিলা এসে বলল, এটা তারিকের গাড়ি না?? বললাম, হ্যাঁ। আমি তোমার বউ, শুনে উনি বললেন, আমি শুনেছি তারিক বিয়ে করেছে, তবে ও এতো টুকু মেয়ে বিয়ে করেছে? বলে গড় গড় করে তোমার সাথে ওর পরিচয়ের কথা , ভালো লাগার কথা বলতে বলতে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এখনো আগের মতো আছ কিনা, হাহা করে হাসো কিনা, লাল সার্ট পরতে পছন্দ কর কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। মনেই হলনা আমি উনার অপরিচিত কেউ, বরং মনে হল যেন বহুদিনের চেনা, বহুদিনের জানা। বলতে বলতে বলল, আমি তারিকের গাড়ির নাম্বার নিয়েছিলাম। সেদিন থেকেই খুঁজি। আজ দেখতে পেয়ে এলাম, কিন্তু ও কখন আসবে? আমি যে আর থাকতে পারছিনা, সাড়ে আঁটটায় আমার ফ্লাইট, আটটার মধ্যে আমাকে এয়ারপোর্টে ইন করতে হবে, কনফার্ম করতে হবে। ও আসলে আমার কথা বোলো। ও আমাকে চিনতে পারবে। আমার নাম ‘বুলা’। বলে দ্রুত বেগে চলে গেল, দেখলাম রাস্তার ওপারে একটা লাল গাড়ি দাঁড়িয়ে। ওকে দেখতে পেয়ে ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিল।
বুলার কথায় আমি কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলাম। এই ঢাকা শহরে কত গাড়ি, তার মধ্যে গাড়ির নাম্বার দেখে একটা গাড়ি খুঁজে বের করা, একি সম্ভব? বউ খোঁচা মেরে বলল, ধরা পড়ে গিয়েছ বলে ভাবছ? পুরান প্রেমের কথা মনে পড়ছে? বৌ’র হাতে পিটুনি খাবে বলে ভয় করছে? হাসি থামিয়ে বউ বলতে লাগলো, আজ আমি অনেক ভার মুক্ত হলাম, আমার অনেক সন্দেহ কেটে গেল। ভাবতাম আমি যাকে এতো ভালবাসি, সে কি সত্য সত্যই এতো ভালবাসার? নাকি এটা শুধু একটা মোহ, একটা মরীচিকা? আমি আজ এর সবকিছু থেকে মুক্ত। আমার এতো ভালবাসা যাকে আমি দিয়েছি সে সত্য সত্যই ভালবাসার, কারন......আমি ভালবাসি যাকে, বহুজন যে ভালোবাসে তাকে।
জানি একটু পরেই মন্তব্যের ঘরে লিখবেন আমি বেশ ভালো লিখেছি বা আমার লেখা আপনার ভালো লাগলো অবশ্য ভালো নাও লাগতে পারে। যেমন টা ই লাগুক না কেন সকল কৃতিত্ব পাবার দাবিদার আমার ছোট বোন যে কিনা তিন দিন ধরে গল্প টি টাইপ করেছে এবং আমার আব্বু এই তিন দিন ধরেই যিনি আমার বোন কে ব্যাপক উৎসাহের সাথে গল্পটি শুনিয়েছেন আর আমি তার "গুনধর সুপুত্র" হিসেবে গল্প টি শুধু পোস্ট করলাম মাত্র
ওর সাথে যেদিন আমার প্রথম দেখা হয়েছিল,সেদিন আর দশটি স্বাভাবিক দিনের মতই সূর্য উঠেছিল।প্রভাতের সূর্যের সাথে জেগে উঠেছিল পৃথিবীর সমস্ত জনপদ। চির অশান্ত সমুদ্রের ঢেউগুলো স্বাভাবিক দুরন্তপনায় মেতেছিল।শুধু আমার চোখ হঠাৎ করেই আবিস্কার করল এক নতুন পৃথিবী।কী বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল কালো দুটি চোখ,কী স্থির অথচ কত চঞ্চল।কী অন্তর্ভেদী অপলক ভঙ্গি! শাড়ির কুঁচিগুলো আনন্দে যেন তার দু পায়ে লুটোপুটি করছে,অথচ কী শান্ত তার হেটে আসা। সবই যেন স্বপ্নের মতো, সে চলে গেল।পিছন ফিরে তাকাতেই আবার দেখা,সে দেখা শুধু দেখা নয়,শুধু দেখা রইল ও না।
ধূমায়িত চা’র কাপে ঝড় তুলে জমপেশ আড্ডা। সাহিত্য ,সমাজ,প্রেম-ভালবাসা, ধর্ম- ইতিহাস,রাজনীতি,নারীমুক্তি সকাল গড়িয়ে দুপুর আর দুপুর থেকে বিকেল।তারপর সূর্যাস্ত আইনে হলে ঢোকা। তার নির্বাক বিদায় আমার হৃদয় কে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিত। কোন কোন দিন তার ঈষৎ গোলাপি আভার মুক্তার মতো হাসি আমার একাকীত্ব জীবনটাকে কানায় কানায় ভরে দিত।
উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখতে ও খুব ভালবাসত, অনেকেই বাসে।কিন্তু ওর মতো আমি আর দেখিনি। চৌম্বকীয় অংশের সংলাপ মুখস্ত করায় তার কোন ক্লান্তি নেই। কোন এক ছবিতে সুচিত্রা নাকি ব্লাউজ বিহীন শাড়ি পরেছিল। সে দৃশ্য ও ভুলতে পারত না। ওর খুব শখ ছিল গ্রামের মেয়েদের মতো শুধু শাড়ি পরা, একাকী ঘরে লুকিয়ে লুকিয়ে সে নাকি বহুবার তা করেছে।ও রবীন্দ্র নাথের গান খুব ভালবাসত। আর ভালবাসত কোন একটা ঘটনার সাথে গানের মিল করা।বহু ঘটনার সাথে এরকম প্রাসঙ্গিক গান ও আমাকে বহুবার শুনিয়েছে।তবে, পুরুষ সারমেয়র মেয়ে সারমেয়র কাছে বার বার যাওয়া আসাকে, “অলি বার বার ফিরে আসে,অলি বার বার ফিরে যায়” এর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া আমার কাছে গুরু দেবের প্রতি এক নিষ্ঠুর কৌতুক বলে মনে হত। কোন কোন অলস দুপুরে পাশাপাশি বসে জীবনানন্দ দাস শুনতে শুনতে এই জন অরন্নের মধ্যে থেকেও আমরা যেন হারিয়ে যেতাম নির্জন কোন এক গহীন অরঙয়েরর অন্ধকারে। কবিতা থেমে যেত তার শরীর মন কখন যেন উৎসুক হয়ে পাশাপাশি দূরত্ব কমিয়ে আরও কাছাকাছি হত।কখন যেন তার হাত খানা আলতো ভাবে আমার হাতের উপর এসে পড়ত। তার পৃষ্ঠদেশ ব্যাপী ঘন কালো এলায়িত চুল বাতাসে আমোদিত হয়ে আমাকে স্পর্শ করত। চারপাশে কেমন যেন এক হিরণ্ময় নীরবতা আমাদের কে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে থাকতো।
আইসক্রিম এবং ফুচকা খেতে ও খুব ভালবাসত। আইসক্রিম কে একটু আধটু প্রশ্রয় দিলেও, ফুচকা? নৈবচ নৈবচ। কিন্তু কে শোনে কার কথা! হাত ধরে যেভাবে ও টেনে ফুচকার দোকানে নিয়ে যেত কার সাধ্যি সে হাত ছাড়ায়? রাস্তার ধারের খোলা ফুচকা, ধুলাবালিতে ভরা, এবং মাছির এঁটো খাবার,এসব খাওয়া ঠিক না ইত্যাকার ভাষণ ওকে খাওয়া থেকে বিরত রাখবে কি খাওয়ার স্বাদের মাত্রা কে যেন বাড়িয়ে দিত। চোখে মুখে একরাশ তৃপ্তি নিয়ে সে আমাকে বার বার খাওয়ার জন্য অনুরোধ করত।আমি তার শত অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেও যখন সে একটি ফুচকা আমার মুখের সামনে ধরে আস্তে আস্তে বলতো, “তুমি এখন আমার হাতখানা একটু ধরতে পারো” সেই সাথে তার ঘন কালো দুটি চোখের করুণ মিনতি। আমি দুহাত দিয়ে তার হাতখানা ধরতাম।ধুলাবালি আর মাছির বমিতে ভরা ফুচকাকে তখন মনে হত, জীবনের সর্ব সুখ নিয়ে ফুচকা এমন ফুলে উঠেছে।
রোকেয়া হলের সামনে দাঁড়িয়ে জটলা পাকিয়ে চা খাওয়ার অছিলায় ছেলেদের মুরগির মতো কক কক ডাক ছিল সূর্যাস্ত আইনের এক ধরণের প্রতিবাদ। অনেক সময় অনেক মেয়েরাও ঐ রকম শব্দ করে হলে ঢুকে প্রমাণ করতো তাঁরা মানুষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও নিজেদের ভালোমন্দ বোঝার যথেষ্ট ক্ষমতা তাদের হয়নি। এ বিষয় নিয়ে আলাপে বহুদিন গরম চায়ের আড্ডা আরও গরম হয়েছে। আড্ডা তুঙ্গে ঊঠলে সে গম্ভীর ভাবে ছোটোখাটো একটা ভাষণের মতো দিয়ে বলতো, “রাতে আমাদের চলাফেরা নিরাপদ নয়,কারন রাস্তায় প্রচুর খ্যাপা কুকুর, পাগলা শেয়াল আর দাঁতাল শুয়োর ঘুরে বেড়ায়। যারা আমাদের দেখলেই খাবলে খুবলে খেয়ে ফেলবে। তোমরা নিজেদের জ্ঞানী গুণী বুদ্ধিমান ভেবে ভেবে এমনই মূর্খ হয়েছ যে চাষা ভুষো দের দেখেও শিক্ষা লাভ করোনা। যে এঁড়ে লম্ফ ঝম্ফ দিয়ে গুঁতিয়ে মাটির ঘর উলটিয়ে দেয়, লাফিয়ে আড় ডিঙ্গিয়ে ক্ষেত খায় চাষারা তার গলায় ঘণ্টা বেঁধে দেয়। এঁড়ের লম্ফ ঝম্ফ বন্ধ হয়। কিন্তু তোমরা এমনই মূর্খ যে তোমরা তা না করে আমাদের গায়ে কালো কাপড়ের ঘণ্টা ঝুলিয়ে দাও। যাতে আমরা আরও বেশী দুর্বল আরও বেশী অসহায় হয়ে উঠি। তোমাদের এমনই বিচার যে আসামি থাকে জেলের বাইরে আর বাদী থাকে জেলখানায়। ধর্মের নামে সমাজের নামে আর কতকাল তোমরা এটা চালাবে? আজকের পৃথিবী গায়ের জোরে নয় মেধার জোরে চলে। আমাদের বই কি তোমাদের থেকে আলাদা? আমাদের পরিক্ষা কি তোমাদের সাথে হয় না? তাহলে কিসের জোরে তোমরা নিজেকে সেরা ভাব? ওই পশু শক্তি ছাড়া? তোমাদের মাথায় মগজ নেই, আছে শুধু অদৃশ্য শিং যা দিয়ে তোমরা গুঁতিয়ে আমাদের কাবু করতে চাও। কোন জবাব দিতে না পেরে বুদ্ধিমানের মতো হেসে বলি, “জয় মা ণৃ মুণ্ড মালিনী, তোমার এই রণ রঙ্গিনী বেশ থামাও মা। রক্ষে কর মা, ক্ষেমা দেও। তুমি মা কল্প তরু আমরা সব পোষা গরু, ভুষি পেলে খুশি হব ঘুষি খেলে বাচবনা”। আগুন লাগা খড়ের গাদায় পানি ঢাললে যেমন কাদা কাদা হয় ও তেমনি কাদা কাদা হয়ে বলতো, “সর্বনাশ টা তো হল ওখানেই, ওই সব মন ভুলানো কথা বলে বলেই তো তোমরা পুরুষরা সারাজীবন আমাদের গরুর মতো খাটিয়ে খাটিয়ে মারলে”। আরেক প্রস্থ কড়া গরম চা’র সাথে এরকম কত দিনের গরম আড্ডার যে মধুরেন সমাপনেৎ হত তার কোন শুমার নেই। সোনার খাঁচায় দিনগুলো ভালই ছিল, কিন্তু...
আমার বউ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। হৃদয় দিয়ে আমি ওর ভালবাসা টা বুঝি, অনুভব করি, আসলে সব মেয়েরাই বোধ হয় এমন করে ছেলেদের ভালবেসে আপন করে নিতে চায়, ঘর বাঁধতে চায়।আমার সমস্ত সুখ , সমস্ত কষ্ট বউটা আমার কবে কবে যেন আমার করে নিয়েছে। একটু আধটু অসুখ বিসুখ যে আমার শরীরে নিশ্চিন্তে বাসা বাঁধবে তার কোন উপায় নেই। বউয়ের জ্বালায় অসুখের কোন সুখ নেই। কোন কোন দিন রাতের ক্লান্তির ঘুম যখন ভাঙে তখন দেখি বউটা আমার পাট ভাঙা শাড়ি পরে ভেজা চুলে পাশে আধ শোয়া হয়ে শুয়ে চুলে আঙুল দিয়ে বিলি দিছে সমস্ত ঘর খানা মিষ্টি একটা গন্ধে ভরে আছে। ও ভালো গান করে, রবীন্দ্র সঙ্গীত ওর প্রথম পছন্দ। গাড়িতে যখন আমরা লং ড্রাইভ এ যাই তখন ও আমার পাশে বসে একটার পর একটা গান শোনায়। বিভিন্ন কেনাকাটায় আমরা একসাথে যাই। অল্প কেনাকাটা হলে ও গাড়িতে বসে অপেক্ষা করে। সেদিনও আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরব বলে ও গাড়িতে একা অপেক্ষা করছিল। যত তাড়াতাড়ি ফিরব বলে ভেবেছিলাম তা হল না। একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। ভেবেছিলাম দেরির জন্য বোধ হয় অনুযোগ করবে, দূর থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে কেমন যেন একটা রহস্যের হাসি হাসতে লাগলো। আমিও ম্লান হাসলাম বটে তবে মনটা আমার ভালো সায় দিল না। কাছে যেতেই বলে উঠল, “ধরা পড়ে গিয়েছ, তাই তো বলি, পুরুষ মানুষ হয়ে তুমি এতো ভালবাসা শিখলে কী করে? গুরু ধরে যে ভালবাসা শিখেছ তা বুঝতে পারিনি”। কপট রাগত স্বরে বললাম আরে বিষয় টা কি? ও চোখমুখ নাচিয়ে বলল,বুলা এসেছিল। বললাম, বুলা? সে তোমাকে চিনল কি করে? ও হাসতে হাসতে বলল, কেন ‘মায়ামৃগ’ ছবিতে দেখনি? বিশ্বজিতের সাথে ওর আসল মায়ের দেখা হওয়ার সংবাদে ওর পালিত মা কি বলেছিল? কলকাতায় এতো লোক তার মধ্যে ওর সাথেই তোর বার বার দেখা হয় কি করে? বললাম, ওসব কথা ছাড়ো, আসল কথা বল। ও বলতে লাগলো, তুমি চলে যাবার পর আমি এমনি বসে আছি, হঠাৎ হন্ত দন্ত হয়ে শাড়ি পরে এক মহিলা এসে বলল, এটা তারিকের গাড়ি না?? বললাম, হ্যাঁ। আমি তোমার বউ, শুনে উনি বললেন, আমি শুনেছি তারিক বিয়ে করেছে, তবে ও এতো টুকু মেয়ে বিয়ে করেছে? বলে গড় গড় করে তোমার সাথে ওর পরিচয়ের কথা , ভালো লাগার কথা বলতে বলতে জিজ্ঞাসা করল, তুমি এখনো আগের মতো আছ কিনা, হাহা করে হাসো কিনা, লাল সার্ট পরতে পছন্দ কর কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। মনেই হলনা আমি উনার অপরিচিত কেউ, বরং মনে হল যেন বহুদিনের চেনা, বহুদিনের জানা। বলতে বলতে বলল, আমি তারিকের গাড়ির নাম্বার নিয়েছিলাম। সেদিন থেকেই খুঁজি। আজ দেখতে পেয়ে এলাম, কিন্তু ও কখন আসবে? আমি যে আর থাকতে পারছিনা, সাড়ে আঁটটায় আমার ফ্লাইট, আটটার মধ্যে আমাকে এয়ারপোর্টে ইন করতে হবে, কনফার্ম করতে হবে। ও আসলে আমার কথা বোলো। ও আমাকে চিনতে পারবে। আমার নাম ‘বুলা’। বলে দ্রুত বেগে চলে গেল, দেখলাম রাস্তার ওপারে একটা লাল গাড়ি দাঁড়িয়ে। ওকে দেখতে পেয়ে ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিল।
বুলার কথায় আমি কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলাম। এই ঢাকা শহরে কত গাড়ি, তার মধ্যে গাড়ির নাম্বার দেখে একটা গাড়ি খুঁজে বের করা, একি সম্ভব? বউ খোঁচা মেরে বলল, ধরা পড়ে গিয়েছ বলে ভাবছ? পুরান প্রেমের কথা মনে পড়ছে? বৌ’র হাতে পিটুনি খাবে বলে ভয় করছে? হাসি থামিয়ে বউ বলতে লাগলো, আজ আমি অনেক ভার মুক্ত হলাম, আমার অনেক সন্দেহ কেটে গেল। ভাবতাম আমি যাকে এতো ভালবাসি, সে কি সত্য সত্যই এতো ভালবাসার? নাকি এটা শুধু একটা মোহ, একটা মরীচিকা? আমি আজ এর সবকিছু থেকে মুক্ত। আমার এতো ভালবাসা যাকে আমি দিয়েছি সে সত্য সত্যই ভালবাসার, কারন......আমি ভালবাসি যাকে, বহুজন যে ভালোবাসে তাকে।
গল্পটি আপনার যেমন টা ই লাগুক না কেন সকল কৃতিত্ব পাবার দাবিদার আমার ছোট বোন যে কিনা তিন দিন ধরে গল্প টি টাইপ করেছে এবং আমার আব্বু এই তিন দিন ধরেই যিনি আমার বোন কে ব্যাপক উৎসাহের সাথে গল্পটি শুনিয়েছেন আর আমি তার "গুনধর সুপুত্র" হিসেবে গল্প টি শুধু পোস্ট করলাম মাত্র

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



