আমাদের কত যে শব্দ তৈরী হয় মনের ভেতরে -তার কিছু বলি আর কিছু গোপন করে যাই ... ভদ্রতা আর অনাকাঙ্খিত বাস্তবতার মুখোমুখি হবার ভয়ে ... কতবার মনে হয়েছে একটি জায়গাও যদি থাকতো অন্তত বাছবিচারহীন প্রকাশ করতে পারতাম ইচ্ছেমতো আমাদের ইচ্ছের কথাকে ...আমার মনে হয় বেচে থাকার অজস্র্য পরাধীনতার মধ্যে এতটুকু স্বাধীনতা থাকলেও তবু বেচে যেতাম - এতটুকু স্বাধীনতা একজন মানুষ পেতেই পারে ... নূন্যতম শব্দের নিঃসংকোচ প্রকাশের। এটিকে নাহয় নিছক শব্দ হিসেবেই শুধু নেয়া হোক ...অন্য অর্থে নয়... এমনকি সে সেটা করবে এ অর্থেও নয়... আমরা কয়েকবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে সপ্তাহে দুই তিন দিন বই, গান আর কি কি সব বিষয় নিয়ে একসাথে কিছুটা সময় কাটাতাম ... আমরা সেই ঘরের কোনে একটা ছোট জলচৌকি পেতে সবাই মিলে ঠিক করলাম এই জলচৌকির উপর দাড়িয়ে যে যা খুশী মনে হয় তাই বলতে পারবে ... আইন হলো 'বলার জন্য সে দায়ী নয়'- আমরা খুব উৎসাহ নিয়ে শুরু করলাম ঠিক কিন্তু প্রথমবারই সেই চৌকির উপর দাড়িয়ে বলতে গিয়ে দেখি ... বলতে পারি না ... নিজেই নিজের বলাকে থামিয়ে দিয়েছে - ভয় - প্রকাশের ভয় - লজ্জ্বার ভয় ...এই জলচৌকির বাইরে, এই চৌহদ্দিকে আরো দুর সীমানা পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারি এই ভয়ে ... এইটুকু সময়কে আর অন্য সময়েও বয়ে নিয়ে বেড়াতে পারি এই ভয়ে... , কোথাও গিয়ে চুক্তির সীমানা লঙ্ঘন করে হটাৎ অতর্কীত মনে পড়ে যেতে পারে সেই শব্দগুলো ... আমরা ভয় পেয়ে যাই আমরা আমাদের মনে রাখবো এই ভয়ে। সেদিন এর পর থেকে আমরা আর দ্বিতীয়বার এই জলচৌকিতে দাড়িয়ে শব্দখেলার প্রসঙ্গ মুখেও আনে নি... জলচৌকি অবহেলায় পড়ে ছিলো মাস দেড়েক... কেউ ওর দখল করে রাখা কোনাটির দিকেই যায় নি পাছে শব্দ বলার কথা মনে পড়ে.. ধূলো ময়লা মেখে জলচৌকি পড়ে ছিলো মাস দেড়েক ... এরপর তার ঠিকানা হয় আস্তাকুড়ে ...আপনাদের এখানে লেখার সব ব্যাপার স্যাপার দেখে মনে হলো এ বুঝি সেই আমাদের হারিয়ে যাওয়া জলচৌকিটা - এতদিনে আবার ফিরে এসেছে ... আরো গোটা বছর কয়েক পরের আরেকটি স্মৃতি বুকে ধরে ... আমি তখন বেশ ঘুরে টুরে বেড়াই... আজ নদীর চরে , কাল অজানা অচেনা কোন মফস্বল শহরে, ঘুটঘুট্টি অন্ধকার রাতের নিশুতি গ্রামে এখন তো পরমূহুর্তে বাসে, ঘুম ভাঙে পাহাড়ে তো রাত নামে জেলে নৌকায় ... এমন সব উৎরোল দিনের বিশেষ কয়েকটি দিন কেটেছিলো নিজের সঙ্গে নিজের আজব এক খেলায়... এর শুরুটা হয়েছিলো শরীয়তপুরের এক চরে - আমি যখন সেখানে নামি তখন বেলা দুপুর- একজন আমার নাম জানতে চাইলে হটাৎ কি যে মনে হলো - নিজের নাম পাল্টে বললাম আমি অরিন্দম - লোকটা আমাকে দিব্যি অরিন্দম নামে ডাকতে লাগলো ... আমিও তার সাথে চলতে লাগলাম অরিন্দম হয়ে - চলতে চলতে আমি সব আজব কথা বলতে লাগলাম নিজের সম্পর্কে... যা বাস্তবের অর্থে সত্যি ছিলো না- কিন্তু নিজেই এর একধরনের অস্তিত্ব টের পাচ্ছিলাম নিজের মধ্যে- আরেকটি মজার ভাবনার জন্ম হয়েছিলো ঐ মূহুর্তে - এখানে আমি সম্পূর্ন নতুন ইমেজে গড়তে পারি নিজেকে - দেবতার মতো - দানবের মতো - যা খুশী তাই ... কেউ এসে তুলনা করবে না আমার প্রতিষ্ঠিত নামের অতীতের মূর্তির সাথে- আমি কখনও রাগী কখনও গালিবাজ বখাটে ছোকরা- কখনো আর কখনো ধর্মহীন নাস্তিক যুবক আবার কখনো শরীয়তের রাস্তায় সপে দেয়া বিশ্বাসী তরুন- (তখন বয়সটা ছিলো এমনি যে মুখের ভাবের আর চলার ভঙ্গীর খানিকটা হেরেফের ঘটালেই ছোকরার তারল্যে ডুব দেয়া যায় আবার যুবকের গাম্ভীয়র্্য মুখে এটে চলা যায়) .. নাম কখনো শরীফ কখনো বাবু , কখনও অ্যালবাট, নিজাম, মিজহান, মাসুদ, গৌতম, পিনাকী... যেমন খুশী সাজার অন্তহীন তিনদিনের যাত্রায় একদম অচেনা ভুবনে ঘুরে বেড়ানোর পর হুট করে সামনে এস পড়লো কুমিল্লা যেখানে আমার অনেক বন্ধু আছেন.. যারা আমাকে চেনেন তিল তিল করে গড়ে তোলা নির্দিষ্ট আয়নায় ... আমি আর পারি না নিজেকে নতুন নতুন রূপে সাজাতে... ঐ বন্ধুদের চেনা মুখের ভয়ে - আমি হারিয়ে ফেলি নিজেকে আবিস্কারের উম্মাতাল অভিযান এরপর ... এখানে এই ব্লগে অনেকের লেখাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই বুঝি সেই যেমন খুশি সাজোর মেলা ... আহা বেশতো ... আমরা শব্দে শব্দে নাহয় খেলি আমাদের গোপন পৃথিবী.... ঐ গালিবাজ লোকটা রক্ত মাংসের দুনিয়ায় হয়তো শ্রেষ্ঠ ভদ্রলোক, আক্রোশে ফেটে পড়া লোকটা হয়তো মুখ ফুটে কথা বলতেই পারেন না সবার সামনে, হুমকিতে নিষ্ঠুর লোকটার মতো নরম লোকটি আর কোথাও দেখেছেন আপনি?... আর আপনাকে ধুয়ে দেয়া লোকটি হয়তো আপনার বিপদে সবার আগে ঝাপিয়ে পড়া বন্ধুটি... আপনি হয়তো আমাকে বধ করার শব্দ ছুরিতে শান দিচ্ছেন আমার কথা শুনে - আমি আপনার কথাকে স্তব্ধ করে দিতে চাই আপনার কথা বলার অধিকারকে বুকে ধরে ....
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



