somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প ‘সুইটি’

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


অ
সাত সকালেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি চোখ কচলাতে থাকলাম, কিন্তু উঠলাম না। শীতের দিন হওয়ায় বিছানা থেকে যেন উঠতেই মন সায় দেয় না। মাঝে মাঝে অলসতার কারণে মনে হয় এভাবে যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ঘুমিয়ে কাটাতে পারতাম! প্রতিটি দিনই যদি শীতের মত এমন আলসে কুড়ে হত কী মজাই না হত! দরজায় আবারও টোকা পড়ল- চয়ন ভাইয়া... । কণ্ঠটি বেশ পরিচিত। তাহেরা তাবাস্সুম সুইটি ডাকছে। ও আমাদের বাসার গৃহকর্মী। ওর নাম নিয়েও প্রায়শই ওকে টিজের শিকার হতে হয়। বিভিন্ন খানে বটেই আমাদের বাসায়ও হয়। কাজ করার সময় একটু পান থেকে চুন খসলে আমার খালামণি শায়লা তো জিরাফের মত গলা বাড়িয়ে বলেই চলে- যেনা আমার চেহারা, আবার নাম লাগাইছে তাহেরা...! দেখে শুনে কাজ করতে পারিস না? বলি এসব জিনিসপত্র কি তোর বাপ কিনে দিয়েছে? খালামণির কথার সাথে আমার আম্মুও এসে জোট বাঁধে। আমার খালামণি আরও শক্তি ও সাহস পায়। এ যেন দ্বি দলীয় ঐক্যজোট!
সুইটির বয়স বার ছুইছুই করছে। ওদের পাঁচ সদস্যের এক বড় পরিবার। বছর চারেক আগে ওর বাবা শ্বাসকষ্টে ভোগে বিনা চিকিৎসায় ইহলোক ত্যাগ করেছে। তার দুই বোনের বিয়ে হয়েছে বটে কিন্তু তারাও খুব একটা সুখে নেই। বিভিন্ন জনের বাসায় তাদেরও কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। তার মা জোহরা বেগমও অন্যের বাসায় কাজ করে। ছোটবেলাতে অর্থনৈতিক টানাপোড়নের কারণে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায় নি। বছর চারেক আগে সুইটি যখন আমাদের বাসায় কাজ করতে আসে তখন তার বয়স ছিল আট। চেহারাও ছিল বেশ সুইট। কথাবার্তায় ছিল শিশুসুলভ প্রগলভতা। ওর এই প্রগলভতা আমার ভাল লাগতো। এই কারণে আমি তার পরিবর্তন কর রাখি তাহেরা তাবাস্সুম সুইটি। আমি সেদিন খেয়াল করলাম, নতুন নামকরণের পর তার চোখে মুখে সেকি আনন্দের ঝিলিক! ড. ইউনুস নোবেল পাওয়ার পরে যেমনটি হয়েছিল তেমনি আর কি! অবশ্য এটা আমার পরিবারের কেউ জানে না, কিংবা নতুন নামকরণের আকিকাও করানো হয়ে ওঠে নি।
ওর আচার আচরণে আমি মুগ্ধ হয়ে একসময় তাকে স্কুলে ভর্তি করার প্রস্তাব দেই। সে অবাক হয়ে বলে- ভাইয়া, আমরা গরিব মানুষ, পড়ালেখা ক্যামনে করমু? টেকা পামু কই? সারাদিনই তো কম বেশি কাম থাকে, স্কুলে যাইমু কোন সময়? একসাথে সে অনেকগুলো প্রশ্ন করে । প্রশ্ন করারই কথা তার ছোট মাথাতে সে সময়ের হিসাব মিলাতে পারছে না। আমি অভয় দেওয়ার স্বরে বললাম- তুমি বিকেলের দিকে স্কুলে যাবে। সুইটি বলে- বিকালে আবার কেউ স্কুলে যায় নি? – হ্যাঁ, যায়। যারা বিকালে যায় তারা বেশির ভাগই তোমার মত কর্মী। আর ঐ স্কুলটার নাম ...কর্মমুখী শিক্ষা স্কুল। এখানে কোন টাকা পয়সা দেওয়া লাগে না। উপরন্তু তারাই তোমাকে পড়ার পাশাপাশি কাজ শিখাবে, মাস শেষে কিছু টাকাও দিবে।
টাকা দেওয়ার কথা শুনে সে একটু বেশি খুশি হল। সে বলল – খালাম্মা রাজি অইবো তো?
- সে ব্যাপারটা আমি দেখব।
আমি দেখেছিলামও বটে, কিন্তু এর জন্য যে আমাকে কী পরিমান যে বেগ পেতে হয়েছিল, কী পরিমান যে মায়ের চক্ষুশূল হয়েছিলাম তা কেবল মাত্র শুধু আমিই জানি। এরপর সে স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল এবং এখন পর্যন্তও সে পড়ছে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সে আমার প্রতি একটু বেশি দেখভাল করার চেষ্টা করে। আজ হয়ত সে আমাকে সকাল সকাল জাগিয়ে দেওয়ার জন্যই দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আমি দরজা খুলতেই দেখি সুইটির বড় বোন সাহারা। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। ওদের দুজনের কণ্ঠেই বেশ মিল। আমি কিছু বলার আগেই সে ঈষৎ নত হয়ে অপরাধী স্বরে বলল- ভাইয়া
- বলেন
-সুইটি গতরাতে এক বখাটে পোলার লগে পলাইয়া গেছে।
আমার চোখ যেন তখন কপালে উঠার মত অবস্থা। আমি তখন রুম থেকে একটু বাহিরে আসি। বাহিরে তখন বেশ ঘন কুয়াসা। আমি দূর আকাশের পানে তাকাই। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু দেখি ঘন কুয়াসা আর কুয়াসা। ঘন কুয়াসার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলি- যেখানেই থাকিস, ভাল থাকিস রে সুইটি!

...............................
22.09.2014
মুনশি আলিম
টিলাগড়, সিলেট


৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:৫৬

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত



সময় চলেছে তার আপন খেয়ালে,
নদীর স্রোতেরা হারায় কালের বুকে;
আমি শুধু এক অনন্তকাল ধরে,
ডুবে আছি প্রিয়, তোমার চাওয়া পাওয়ার ওই সুখে।

বাহিরের সব নিয়ম চলুক তার মতো,
মহাবিশ্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ের অবস্থা নিয়ে আলাদা গুরুত্ব দেয়া দরকার

লিখেছেন অপলক , ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫



পাহাড়ীদের হাতে এখন প্রচুর টাকা। সে টাকার যোগান প্রত্যাক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে আমরা সমতলের জনগন দিয়েছি। পাহাড়ীরা এখন জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। তাদের মাঝে প্রচুর উচ্চ শিক্ষিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলার পথে ক্ষণিক দেখা – (১১)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০২

পূর্বের পোস্টঃ ক্ষণিকের দেখা, মায়াময় এ ভুবনে -১০


অবশেষে আমার কিছু কথা শুনে ওরা হাসিতে ফেটে পড়লো। সবার মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি।

আজ দুপুরে একটি এলাকার মাসজিদ সংলগ্ন পুকুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২



আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে।
যা আমরা দেখতে পাই না। ব্যাকটেরিযয়া, ভাইরাস, ডার্ক ম্যাটার, অণু ও পরমাণুর কথা বলছি না। আমি বলছি, মৃত মানুষের কথা। প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে দেড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিছু কিছু স্মৃতি ভুলার মত না।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:১৯

আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি ২০১১ সালে। ঐ পরীক্ষার এক মাসের কথা এখনো মনে পড়ে। ১ম পরীক্ষার সময় খাতা পাওয়া, রোল নাম্বার লেখা, প্রশ্ন হাতে পাওয়া এগুলো এখনো মনে পড়ে। মাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×