শুয়ে শুয়ে মেয়ের সাথে খুনসুটি করতেসি। আমি জানি কি করলে মেয়ে বিরক্ত হওয়ার ভান করে আর মেয়েও জানে আমার সাথে কিভাবে দুষ্টামি করতে হয়। অহনার কাজ হচ্ছে তাঁর হাত-পা সমানে আমার দিকে ছোঁড়া। কিছু হইলেই বলে, "বাবা মার খাবা?"
"বাবাকে মারবি?"
"হ্যাঁ তোমাকে মারব"
"কেন, আমাকে কেন মারবি? স্কুলে কি করিস?"
"বাবা, তুমি না কিচ্ছু জানো না। আমরা স্কুলে মজা করি, learn করি। মারামারি কেন করব?"
"তো বাসায় এসে আমার সাথে মারামারি করবি?"
"হুম, জানো না?"
এই পর্যায়ে আমি টিভি'র দিকে তাকাই। Ntv তে হুমায়ুন আহমেদের 'উড়ে যায় বকপক্ষী' দেখায়। আমার অত্যন্ত প্রিয় একটা নাটক। শাওন, রিয়াজসহ সবাই দুর্দান্ত অভিনয় করেছে। মৃত্যুপথযাত্রী রিয়াজ কিছুক্ষন পর পর ব্যাগ থেকে টাকা বের করে সবাইকে টাকা বিলি করে। হুমায়ুন আহমেদ মধ্যবিত্তের স্বপ্ন জানতেন খুব ভাল করে। আমরা মধ্যবিত্তরা সারাজীবন কখনও না কখনও টাকা বিলানোর স্বপ্ন দেখেছি। হুমায়ুন আহমেদ আমাদের স্বপ্নগুলো টিভি'র পর্দায় নিয়ে আসতেন।
টিভি'তে বিজ্ঞাপন। University of Amsterdam থেকে একটা চিঠি এসেছে। LinkedIn এ তাদের একটা recommendation লিখে দিতে হবে। অহনা হা করে আমার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে পড়তে থাকে।
I LOVE MY...এতটুকু পড়ে সে আর পড়তে পারেনা, কারণ এর পরের শব্দটা বেশ বড়। এদিকে এতটুকু শুনে আমার বউ কান খাড়া করে কড়া চোখে তাকিয়েছে। আমি মেয়েকে ফিস ফিস করে ধরিয়ে দিলাম, "University, university!"
মেয়ে এবার পড়ে, "I love my university"
আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। মেয়েকে বললাম এত টাকা দিয়ে তোকে English medium এ পড়াই এখনও University পড়তে পারিস না?
"এই বাবা, আমি KG I এ পড়ি আর এটা এত্ত বড় একটা শব্দ। তুমি কিচ্ছু জান না।"
বলেই মারতে তেড়ে আসে। আমি বলি,
"সব চোটপাট আমার ওপর দেখাতে আসিস, স্কুলে কি করিস? আমি ছোটকালে মল্টোভা খেতাম আর স্কুলের ছেলেদের পিটাতাম। তুই বুস্ট খাস বলে তোর কোন শক্তি নাই।"
মেয়ে আবার তেড়ে আসে। আমি রণে ক্ষান্ত দেই! আসলে আমি তো স্কুলে গুডি গুডি বয় ছিলাম। মারামারি টাইপের হইসি কলেজে উঠে।
মেয়ে আবার টিভি'র স্ক্রিনে তাকায়। বানান করে পড়ে Ntv.
আমি বললাম, "বাংলা পড়তে পারিস?"
অহনা বলল, "না"
"কেন পারিস না, বলতে পারিস, তাহলে পড়তে পারিস না কেন?"
"আমাদের টিচার বলেছে বাসায় নিজের ভাষায় কথা বলতে।"
এবার আমি বউয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলি, "Serious?"
বউ বলল, "জানি না তো!"
মেয়েকে বলি, "তুই তো ভাল ইংরেজি পারিস, বলতেও লিখতেও, তাহলে বলিস না কেন?"
"আমার টিচার বলেছে বাসায় নিজের ভাষায় কথা বলতে। আমি বাঙ্গালী, আমি বাংলা ভাষায় কথা বলব! তুমি কিচ্ছু জান না বাবা!"
আমি মুগ্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি ক্ষ্যাত জেনারেশনের মানুষ। নটর ডেমে পড়ি এই 'হ্যাডম' দেখিয়েই ইংরেজিতে কথা বলা, কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম আর আমার সাড়ে ৬ বছরের মেয়ে স্কলাসটিকায় পড়েও বাংগালিয়ানা শেখায় আমাকে! মেয়েকে স্কলাসটিকা'য় পড়ানো নিয়েও আমার মধ্যে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ কাজ করে। এক, অর্থনৈতিক সাচ্ছল্যের বিচারে আমার আসলে মেয়েকে স্কলাসটিকায় পড়ানো বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। দুই, আমি নিজে বাংলা মিডিয়ামে পড়া মানুষ। মেয়েকে কি না কি শেখায় এই চিন্তায় ছিলাম।
কিন্তু আজকে মেয়ের কথা শুনে ভাল লাগল। হীনমন্যতাবোধও কমলো অনেকখানি। মেয়ের ক্লাস-টিচার যে কে; কে জানে! তাকে মন থেকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে দিলাম।
শামীম আহমেদ
২৯ মে ২০১৪
নিকেতন, ঢাকা।
https://www.facebook.com/shamimahmedjitu

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


