'...অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিলো। কিন্তু রানির কপালে সুখ বেশি দিন সইল না। রাজ-চিকিত্সক জানাইল, রানির শরীরে ডায়াবেটিস নামক এক জটিল রোগ দানা বাঁধিয়াছে। যাহার ঔষুধ কেবল এক জায়গাতেই পাওয়া সম্ভব। সেটা হইল আমেরিকা রাজ্যের নিউইয়র্ক সিটির এক গোপন ল্যাবরেটরি। সেইখানে সদ্য এ রোগের চিকিত্সা আবিস্কৃত হইয়াছে। অগত্যা সেই ওষুধ আনিবার দায়িত্ব বর্তালো বোকাসোকা রাজপুত্র উজবুকের ঘাড়ে। জিনিসপত্র লইয়া পরদিনই সে রওনা দিল নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে।' বইতে যাই লেখা থাক না কেন, এনিমেশনের জগতে এখন এমন কাহিনীরই রমরমা বাণিজ্য। গতবাঁধা সুয়োরানি-দুয়োরানি, দৈত্য, জাদুকর, পরী, ভালো রাজা-খারাপ রাজা এই সবে এখন আর জমছে না। ত্রাণকর্তারূপী রাজপুত্রের জন্য অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করতে রাজি নয় এ যুগের সিন্ডারেলা। সত্যের জয়, মন্দের পরাজয় টাইপের নীতিবাক্যগুলোও বাক্সে তালাবদ্ধ। চাই আরো হিউমার, নতুন কিছু। কোটি ডলারের বাণিজ্য বলে কথা। রূপকথার রাজ্যে তাই পরিবর্তনে মরিয়া হলিউড।
এনিমেশন সিরিজ শ্রেক'কে মোটামুটি বৈপ্লবিক সূচনা বলা যায়। রূপকথার অনেক প্রাচীরই গুড়িয়ে দিয়েছে এই শ্রেক। শুধু কাহিনীই নয়, বাচনভঙ্গিতেও এনেছে আনকোরা স্টাইল, এনিমেশন জগতকে দিয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই শ্রেক-টু আয় করেছে ৭০ কোটি ডলার। বাণিজ্যিক সফলতার ধারায় এসেছে শ্রেক-থ্রিও। ব্লকবাস্টার মুভির চেয়ে এদের আবেদন কোনো অংশে কম নয়। একে একে এসেছে নিমো, ফাইন্ডিং নিমোর মতো আরো বেশকটি অনবদ্য নিয়মভাঙা রূপকথা।
ভুত মানেই সবসময় ভীতিকর কিছু নয়। ভুতের মধ্যেও থাকতে পারে মানবিকতা (মানুষ মরেই তো ভুত হচ্ছে)। তাই ভয় দেখাতে গিয়ে এক মানব শিশুকে ভালবেসে ফেলে এক ভুত। তাতেই বাধে বিপত্তি। ভুতের জগতে তোলপাড়। মানবিক গুণসমৃদ্ধ ভুতটার জাত যাওয়ার দশা। এ নিয়েই তৈরি হয়েছে মনস্টার ইনকরপোরেশন। প্যারোডি ও শ্লেষাত্মক ফেভারের সঙ্গে কিছুটা পপ কালচার ও ফিকশন উপকরণ মিশিয়েই মূলত নির্মাতারা এক রূপকথার রাজ্য তৈরি করে যাচ্ছেন।
সেই ডিজনির সিন্ডারেলাকে একহাত দেখিয়েছে এ বছর রিলিজ পাওয়া হ্যাপিলি এন্ড এভার আফটার। সিন্ডারেলার সেই সত্ মায়ের কথা মনে আছে? তিনিই এ গল্পের শাষণকর্তা। জাদুর বলে মন্দ লোকদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে এক ভালো পরী গড়ে তুললেন পুরোদস্তুর এক কোম্পানি। যার নাম, ডিপার্টমেন্ট অফ ফেয়ারি টেল ল্যান্ড সিকিউরিটি। জাদুর মাধ্যমে দুষ্টদের হাত থেকে বাঁচার কনসালটেন্সি ও টেকনিকেল সাপোর্ট দেয়াই ওই কোম্পানির কাজ।
রূপকথার বইগুলো কিন্তু আগের মতোই আছে। তাতে পরিবর্তন আসুক এটা অনেকেই চাচ্ছে না। শত হলেও হাজার বছর ধরে চলে আসছে ওই গল্পগুলো। কিন্তু এনিমেশনের দিকে সাহস করে মুখ তুলে চাইতে পারছে না রূপকথার বই। পেছনে মার্কেটিং নামের ইঞ্জিনটা নেই বলেই হয়তো।
এও সত্য যে শিশুর মানসিক বিকাশ ও কল্পনাশক্তি বৃদ্ধির নেপথ্যে জাদুর কাঠি নাড়াতে পারে রূপকথাই। অজান্তে শেখাতে পারে অনেক কিছুই। তাই এতে জাদুর জগত ও দৈত্য-দানবের পাশাপাশি আংশিক বিজ্ঞান ও আধুনিকতার প্রবেশ অবশ্যই দোষের নয়। আর আমাদের দেশে এখনো যেহেতু এনিমেশন শিল্প এখনো সেই উচ্চতায় পৌঁছায়নি তাই নজর দিতে হবে মলাটবদ্ধ বইয়ের দিকেই। ডাইনি বুড়ি, রাস আর দৈত্যের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া রাজপুত্রকে ঘুরে ফিরে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চাপিয়ে দিলে চলবে না। দুচারটে মোটর সাইকেল কিংবা জেট বিমানও রাখতে হবে। আর সাত সমুদ্র পাড়ি দিতে সাবমেরিন তো আছেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



