মানুষ যাই বলুক এদেশে আসলে রাজনৈতিক মতবাদ দুইটা। আওয়ামী মতবাদ আর জাতীয়তাবাদী মতবাদ। দুই মতবাদেই একটা জিনিস প্রবল, সেটা হচ্ছে শ্লোগানপ্রীতি। একদলের স্লোগান জয় দিয়ে শুরু, আরেক পক্ষের জিন্দাবাদ দিয়ে শেষ। আমার নিজের জিন্দাবাদ পছন্দ। কেন পছন্দ এটার পিছনের ইতিহাস এদেশের রাজনীতির মতই হাস্যকর। যখন ছোট ছিলাম তখন দেশে ক্ষমতায় আসলো বিএনপি। ক্লাস ওয়ানেও উঠিনি মনে হয়। আরো অল্প পরে এইসব দলাদলির ব্যাপারটা প্রথম বুঝি। বুঝি যে দেশে দুইটা ভাগ আছে। একটা 'জয় বাংলা' আরেকটা 'বাংলাদেশ জিন্দাবাদ'। সেই সময় টিভিতে জিয়াকে অনেক অনেক দেখানো হতো। দেখতে ভালোই, তার উপর নাকি আবার আর্মি। আমার ছুরি কাচির বটি বন্দুক পিস্তল সবই ভালোলাগতো। সৈন্য জিয়াকে নিয়ে টিভিতে দেখানো এটা সেটা মুগ্ধ হয়েই দেখতাম। আর খালেদার চেহারাও ভালো ছিলো, হাসিনার চেহারা শুকনা কাক মার্কা মনে হতো পিচ্চিকালে।
যাইহোক, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগানপ্রীতির পিছনে আসল কারন ছিলো ৭ মার্চ, ১ আগস্ট এমন কিছু দিন। এসব দিনের আগেরদিন রাত থেকে শুরু হতো মাইকের কর্কশ গর্জন। সে কি গর্জন রে ভাই!! সারাদিন একই ভাষন আর একই শেখ মুজিব শেখ মুজিব। কান ঝালাপালা হয়ে যেতো। তখন থেকেই এই জয়বাংলা, শেখ মুজিব এসব নামে বিরক্তি শুরু হয়। অন্য কোন কারন জানা নাই, আসল কারনটা মনে হয় এটাই। নাহলে ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী বাবা মায়ের ঘরে একটা বিশেষ স্লোগান পছন্দ করার কোনো কারন নেই, দুটাই পছন্দ করার কথা। কারন ওই পিচ্চিকালে বাবামার কেউ তাদের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায়নি, কোনোদিনই চায়নি।
এখন ভাবি এসব, আমার এখনো বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগান পছন্দ। জয় বাংলা নিয়া ৭১ এ যত আবেগই থাক, আমাকে সেটা টানেনি সেভাবে। আমার জন্ম তো আর ৭১ এ না। আমি রক্ত গরম করা জয় বাংলা শুনিনি ৭১ এ। আমার জয় বাংলা শ্লোগানের প্রতি প্রেম কমই থাকতে পারে। ভাবলে হাসি পায় যে এইদেশে স্লোগানেরও দলীয়করন সম্ভব। বড় হওয়ার পরেও অনেকদিন ৭ই মার্চের ভাষন শুনলে বিরক্তি লাগতো। লেবু বেশি কচলাইলে যেমন তিতা হয়, এরকম অতি আওয়ামী ভক্তরা ভাষন বেশি গেলাতে গিয়ে অভক্তি এনে ফেলেছিলো। এই অভক্তি ধরানোর প্রচেষ্টা এখনো বর্তমান।
তবে একটু পরিনত হওয়ার সাথে সাথে এটা বুঝেছি যে এসব হলো বাইরের শো অফ। আসল দেশপ্রেম স্লোগান দিয়ে মার্কা মেরে দেয়া যায়না। ৭ই মার্চের ভাষন এখন ভালোলাগে। নিজের যুক্তি বিচার এইসব কাজ করতে শুরু করার সাথে সাথে ধারনাও চেঞ্জ হয়। তবে কোন স্লোগান আর মুখ দিয়ে বের করতে পারিনি জীবনেও। আমৃত্যু মনে হয় এই দুই শ্লোগানের কিছুই দেয়া সম্ভব হবেনা। আপনারা দুইদল মিলে দেশের একজন নাগরিকরে অন্তত শ্লোগানবিদ্দ্বেষী করতে পেরেছেন।
প্রশ্ন তো মনে অনেকই আসে। উত্তর দেবে কে? খালেদা তো মনে হয় উনার স্বামী হত্যার বিচারই চাননা। মনে প্রশ্ন জাগে উনি কি সব জেনেও ভয়ে চুপ? কার এতো ক্ষমতা যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও উনি চুপ ছিলেন? জিয়া হত্যার বিচারের অগ্রগতি কি? থাক, এসব জিজ্ঞেস করা অর্থহীন, অনধিকার চর্চা। যার কিংবা যাদের মাথা ব্যথা থাকার কথা তাদেরই নেই, আমার কি ঠ্যাকা? জামাতের লোকজন উনার দলের কারনেই এইদেশের সংসদে ঢুকতে পেরেছে। রাজাকারও হয়ে গেছে মন্ত্রী। উনি যদি বলেন আমি জানতামনা গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহিদ রাজাকার ছিলো, তাহলে বিএনপি সত্যিই ইতিহাসের কাল্পনিক অধ্যায় গেলাতে চাচ্ছে। এটা বিএনপির সমর্থকদের জন্যও তীব্র অসস্তির কারন, কিন্তু নেত্রী সহ দলের মাথাদের এই ব্যাপারে কোনদিন মাথা ব্যথা ছিলোনা। অবশ্য খালি খালেদার দোষ দেই ক্যান? হাসিনাও যে গোলাম আজমের সাথে একই মঞ্চে বসে খালেদার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন ওটার ছবিও তো এখনো আছে। নীতির বিসর্জন সবাই দিয়েছে এই দেশে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে, আর জামাতের ঘাতক শক্তির কথা কেই বা না জানে?? সহিংস হরতালে জামাত সেরা। জামাতের নামেই এখনো হরতাল হয়, বিএনপির হরতাল কে ভয় পায়? আওয়ামী হরতাল আবার ভাংচুরের জন্য বিখ্যাত ছিলো, তাদের আছে নিবেদিতপ্রান পিকেটার বাহিনী, তবে পেট্রলের মজা উনারা তখনো পাননাই, এরপর কি হবে জানিনা। এইদেশে একটা কিছু শুরু হইলে আর শেষ হয়না।
ইদানিং হাসিনাও তার পিতার হত্যাকারী কে এই সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। আগে মনে হয় উনি এতটা নিশ্চিত ছিলেননা। হতেই পারে, মানুষ বয়সের সাথে সাথে আরো পরিনত হয়, বুঝতে শেখে, দুই এ দুই এ চার মেলাতে শেখে। উনি আগে এটা জানতেননা। তাই উনি তার হত্যাকারীর সন্তানের বিয়েতে দাওয়াতী হয়ে গেছেন, ভালো গিফটও দিয়েছিলেন মনে হয়। আবার পরে একই সোফায় পাশাপাশি বসে হাসাহাসির অনেক ছবিই দেখা যায়। তখনও জানতেননা মনে হয় কিছুই। এই যেমন এখনো জানেননা উনার খুব কাছের লোক এইচটি ইমাম মোশতাক সরকারের খাস তাবেদার ছিলেন এবুং মোশতাকের শপথ গ্রহন থেকে শুরু করে সকল কাজে অগ্রনী ভুমিকা পালন করেন। ব্যাপারনা, নাই জানতে পারেন। অতীত কি এতো মনে রাখতে হয় নাকি?
কয়দিন আগে উনি বিবৃতি দিলেন, টিভিতে শুনেছি, "ওই জিয়া আমার বাবাকে হত্যা করেছে। কি নিকৃষ্ট মনের মানুষ এই বিএনপি নেত্রী দেখেন, এরা ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করে।" বাইরে বাইরে এমন বললেও উনি ভেতরে ভেতরে ভীষন মমতা ধারন করেন জিয়া পরিবারের প্রতি। তাই কোকোর মৃত্যুর পর গুলশানে গিয়ে অপেক্ষা করেন। ইফতার পার্টিতে দাওয়াত দেন। খুবই মহত্বের লক্ষন। এতটা মহৎ হওয়া কি ভালো যদি আপনি বিশ্বাস করেন আপনার বাবার হত্যার সাথে তারাই জড়িত ছিলো?
আবার এই দেশের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচার নাকি এরশাদ। কিন্তু কাকুরে আমাদের দুই নেত্রীই যে কেন এতো পছন্দ করেন বুঝতে পারিনা। উনারা চাইলে এরশাদ এই দেশে ধুলা হয়ে যায়। উনাদের দুইজনের চোখেই তো এরশাদ বড়ো মাপের কুলাংগার, ছিল মারা কালপ্রিট। কিন্তু হাসি লাগে যখন দেখি সকল বিপদে উনারা ভরসা হিসেবে এই স্বৈরাচারকেই পাশে চান। তখন কই যায় আগের সেইসব আন্দোলনের চেতনা? কই যায় নীতি? এখন তো আরো একধাপ এগিয়ে গেছেন হাসিনা, এরশাদ নাকি উনার বিশেষ দুত!! একটা দুষ্ট প্রকৃতির লোককে বিশেষ দুত করে উনি কি বার্তা দিতে চান? এরশাদরে সরাসরি নিউট্রালাইজ করার হ্যাডম উনার দলের ছিলোনা? এটাই হলো রাজনীতি, যার মধ্যে আসলে কোন নীতি নাই।
অনেকগুলা প্রশ্ন করলাম নিজের কাছেই। প্রশ্নগুলা খুবই সহজ, উত্তরগুলাও আমাদের সবারই জানা এবং পরিনতিটাও স্বেচ্চায় মানা।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে মে, ২০১৬ দুপুর ১২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


