somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজা রামমোহন রায় ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

১৪ ই আগস্ট, ২০২১ দুপুর ১২:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বলেছিলেন, ‘রাজা রামমোহন রায় যে কালে বিরাজ করেন সে কাল তেমনি অতীতে অনাগতে পরিব্যপ্ত, আমরা তার সেই কালকে আজও উত্তীর্ণ হতে পারিনি । ভারতের আধুনিক যুগপ্রবর্তক রাজা রামমোহন রায় তাঁর অসাধারণ মনীষা ও কর্মশক্তির প্রভাব ভারত-ইতিহাসে চির চিহ্নিত রেখে গেছেন । মধ্যযুগীয় ভারতকে তিনি হঠাৎ আধুনিক যুগের দ্বারদেশে এনে উপস্থাপিত করলেন , বহু বছরের সঞ্ছিত জড়ত্বের যবনিকা অপসারিত করে মুক্তিসূর্যের আলোকে চতুর্দিক প্রদীপ্ত করে তুললেন এবং অচলায়তনের অবরুদ্ধ বাতায়ন উন্মুক্ত করে বহির্বিশ্বের অবাধ হাওয়া তার মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিলেন । তাঁর অমরচিন্তা ও মননের সাক্ষ্য হয়ে আছে তাঁর সম্পাদিত সংবাদপত্র গুলো । তবে সাংবাদিকতায় রামমোহনের ভূমিকা সবচেয়ে তাৎপর্য পূর্ণ হয়ে উঠেছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার স্বপক্ষে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকায় । ১৮২৩ সালে সাংবাদিকতায় ভারতীয়দের অভিজ্ঞতার মেয়াদ মাত্র ৫ বছর । সেই প্রেক্ষাপটে রামমোহন ও তাঁর সহযোগীরা কীভাবে এই উন্নত চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে , প্রথম ভারতবর্ষে Prees freedom এর কথা বলেছিলেন তা ভাবতেই অবাক হতে হয় ।

ভারতবর্ষে তথা ইংরেজ আমলে ভারতের রাজধানী কোলকাতায় ব্রিটিশ ও ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীদের আমগন এবং সে সূত্রেই ভারতবর্ষ তথা কোলকাতায় আসা পাশ্চাত্য সভ্যতা, আর স্থানীয় প্রাচ্য সভ্যতার আঁচলে জড়ানো ধর্মীয় কুসংস্কার ও সংস্কারের মিশ্রণে অমৃত যেমন উঠেছিল, গরল-ও তেমনি উঠেছিল। বেড়েছে টানাপোড়েন-অনাচার-অসহিষ্ণুতা এবং উচ্ছৃঙ্খলতা । সবমিলিয়ে নৈতিক অবক্ষয়-এর চিত্ররূপ দেখা গিয়েছিল।অন্যদিকে পৃথিবীকে জানার ও শেখার বিরাট অঙ্গন-ও উন্মুক্ত হয়েছিল তৎকালীন ‘নেটিভ’-দের কাছে। দুয়ের দ্বন্দের মধ্যে থেকেই উঠে এল একটা পরিবর্তনের আবহাওয়া । যা পরবর্তীকালে বাংলার সর্বাঙ্গীন বিকাশের দ্যোতক। বাংলার সমাজজীবনে এই পরিবর্তন-এর আঁচ বা পটভূমি রাজা রামমোহন রায়ের জীবনে কতখানি প্রভাব ফেলেছির সেটা গবেষণার বিষয়। কিন্তু ১৭৮০ সালে হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ যখন প্রকাশিত হয় তখন রামমোহনের বয়স মাত্র আট বছর-সে বয়সে কোলকাতা থেকে অনেক দূরের একটি গ্রাম্য বালকের কাছে ভারতের প্রথম সংবাদপত্র সম্পর্কে জানা বা বোঝা সম্ভব ছিল না-এটা সহজ সত্য। তেমনি এটাও সত্য যে, তেজারতি ব্যবসার সূত্রে কোলকাতার অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণের সমাজজীবনের প্রভাব পরবর্তীকালে রামমোহনের লেখায় পড়েছিল, পড়েছিল তাঁর শিক্ষা-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবস্থানেও। রামমোহন ১৮১৪ সালে পাকাপাকিভাবে হুগলীর রাধানগর গ্রাম ছেড়ে কোলকাতায় চলে আসেন। তখন তাঁর বয়স ৩২ বছর। ইতিমধ্যে কোলাকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছ (১৭৮০ থেকে ১৮১৭ সাল পর্যন্ত) মোট এগারোটি (১১) সংবাদপত্র। যদিও তার সবই ছিল ইংরেজী মালিকানায় এবং ইংরেজী ভাষায়। দৈনিক পত্রিকা একটি ও ছিল না। ছিল ৭টি মাসিক এবং ৪টি সাপ্তাহিক পত্রিকা ।

এরপরেই ১৮১৮ সালটি বাংলা সংবাদত্রের ইতিহাসে সবিশেষ উল্লেখযোগ্য । প্রথমঃ এই সালেই ভারতের শাসন ক্ষমতায় বৃটিশ সাম্রাজ্যের চরম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। আর দ্বিতীয়তঃ এই ১৮১৮ সালেই ভারতীয়দের পরিচালনায়-সম্পাদনায় এবং খাঁটি ভারতীয় ভাষায় প্রথম ভারতীয় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় শিক্ষক গঙ্গাকিশোর ভট্টাচ্যার্যের ‘ বেঙ্গল গেজেট’ (সপ্তাহিক) প্রকাশনার মধ্য দিয়ে (যদিও প্রকাশকাল নিয়ে কিছু মতভেদ আছে)। অন্যদিকে, এই পত্রিকা প্রকাশের আগে রামমোহনের বন্ধু জেমস সিল্ক বাকিংহামের সম্পাদনায় ‘ক্যালকাটা জার্ণাল’ ভারতবর্ষ তথা বাংলার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি বলিষ্ঠ আদর্শের উদাহরণ হয়ে আছে। সংবাদপত্রের মান কিভাবে উন্নত স্তরে নিয়ে যাওয়া যায় তার নিজস্ব মান ধরে, তাঁর পত্রিকাটি পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অনন্য। সমালোচনার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র আক্রমণাত্মক নয়-এর বদলে দেখা গিয়েছে যুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনা এবং খুবই সামন্যভাবে হলেও এই প্রথম দেশবাসীর মনে স্বাধীন চেতনার উস্মেষ এর সঙ্গে স্বাধীনতা ও স্বরাজ্যের স্বপ্ন দেখার সূত্রপাত ঘটল। এমনি করেই ১৭৮৮ থেকে ১৮১৮-এই ৩৮ বছরের নানা ঘটনার , অভিজ্ঞতার আলোকে রামমোহন রায়ের ব্যক্তিত্ব্যও গড়ে ওঠেছে। ইংরেজী, ফার্সী, সংস্কৃত ভাষায় তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যে তাঁর নিবিড় পরিচয় ছিল তার উদাহরণ আমরা পেয়েছি পরবর্তীকালে তাঁর লেখায়। যে লেখার সূত্রপাত তৎকালীন সমাজভিত্তিক হিন্দুধর্মের গোঁড়ামী ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে। মাধ্যম ছিল সংবাদপত্র, যা তৎকালীন বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছোনোর একমাত্র বাহন। যে সংবাদপত্রের মাধ্যমেই বাংলা গদ্যসাহিত্য, সংবাদ-সাহিত্য, রস-রচনা, সমালোচনা পত্র, সাহিত্যের বিকাশ ও বিস্তার সম্ভবপর হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই রামমোহন সমকালীন সমাজকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র সাহিত্য চর্চায় নিমগ্ন হতে পারেনি। সমাজের ধর্ম ও সংস্কারকে কেন্দ্র করে যে বিরোধ গড়ে উঠেছে রামমোহন তাকে এগিয়ে নিতে না গিয়ে কলম ধরলেন, প্রতিবাদীর ভূমিকায় নেমে বাঁধা পড়লেন সংবাদপত্র জগতে উদারপন্থী হিসেবে। পরাধীন ভারতে রামমোহন-ই প্রথম চিন্তার মুক্ত প্রকাশের দাবি উচ্চারন করেন। আমাদের আলোচনায় এই পটভূমিকে জানা দরকার রামমোহনকে জানতে গেলে। কেননা রামমোহনের ব্যক্তিত্ব্য গড়ে উঠেছে এই পটভূমিতেই।

ভারত ব্রিটিশ রাজত্বে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনকালে মুদ্রণ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক আইন চালু ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে লর্ড হেষ্টিংস ভারতে গভর্ণর জেনারেলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দে এই আইনটি প্রত্যাহার করে নেন। হেষ্টিংসের উদারনীতির পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে এদেশের যে সব বুদ্ধিজীবিরা এগিয়ে এলেন তাঁদের মধ্যে রামমোহন রায় ছিলন অগ্রগণ্য। হিন্দুধর্মের প্রতি অযৌক্তিক আক্রমণের বিরুদ্ধে তিনি ১৮২১ এর সেপ্টেম্বরে প্রকাশ করলেন ইংরেজীতে-‘ Brahmanical Magazine’ এক পৃষ্ঠায়, আর অন্য পৃষ্ঠায় বাংলায় ‘ব্রাহ্মণ সেবধী’। ইংরেজীতে মূল রচনা-বাংলায় তারই অনুবাদ । শ্রীরামপুরের খ্রীষ্টান মিশনারী দ্বারা প্রকাশিত ‘সমাচার দর্পণ’-এর এক বিতর্কিত ও আপত্তিকর মন্তব্যকে নিয়ে তিনি একটি প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন। ‘সমাচার দর্পণ’-এর সম্পাদক প্রথম অংশ ছাপাতে রাজি হলেও, দ্বিতীয় অংশ না ছাপানোয় তিনি তার প্রতিবাদ করার জন্যই এই পত্রিকাটি প্রকাশ করলেন। যদিও এখানে লক্ষ্যনীয় যে রামমোহন সংবাদপত্রের জন্য সংবাদপত্র প্রকাশ করেননি-প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবেই এই প্রয়াস করেন তিনি-পরবর্তী পর্যায়ে সংস্কারমূলক রচনা ‘সতী’ প্রকাশের জন্য ব্যাপটিষ্ট মিশন থেকে প্রকাশিত ‘বেঙ্গল গেজেট’-এর দ্বারস্থ হয়েছিলেন-হয়ত বা তার একটি কারণ হতে পারে, তাঁর বন্ধু ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘আত্মীয় সভা’-র সদস্য হরচন্দ্র রায় ছিলেন তখন ‘বেঙ্গল গেজেট’-র সম্পাদক এবং এই পত্রিকাটি তখন কোলকাতার সমাজে খুবই জনপ্রিয় ছিল। এরপরেই সংবাদপত্রের জগৎ থমকে দাঁড়িয়েছে ১৮১৮ থেকে ১৮২১ সাল পর্যন্ত। যার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কারণ তৎকালীন সংবাদপত্রের ওপর প্রাক্-সেন্সর বিধি, ফলে কোন-ও সংবাদপত্র প্রকাশিতও হয়নি। রামমোহনের ইংরেজীতে-‘ Brahmanical Magazine’’ বা “ব্রাহ্মণ সেবধী’ বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। প্রাক্-সেন্সর বিধি-ও উঠে গিয়েছে ১৮১৯ সালে। কিন্তু বাংলা সংবাদপত্রের আকাল তখনও ঘোঁচেনি।

১৮২১ সালের ৪ ঠা ডিসেম্বর প্রকাশিত হলো ‘সংবাদ কৌমুদী’, সাপ্তাহিক। সম্পাদক ছিলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশক তাঁরাচাদ দত্ত। অনেকের মতে রামমোহন ছিলেন এই পত্রিকার মূল শক্তি-সম্পাদনা তথা লেখায়। রামমোহন প্রতিষ্ঠিত ছাপাখানায় এই পত্রিকা ছাপা হতো। রামমোহন যদিও পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন না, কিন্তু তাঁরই নির্দেশিত নীতিতে পত্রিকাটি পরিচালিত হতো। স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুধর্মের গোঁড়ামী ও কুসংস্কার-বিরুদ্ধ মতের তথা প্রগতিবাদী মনোভাবের পৃষ্ঠপোষক রামমোহনের লেখা কৌমুদীর অন্যতম বিষয় হয়ে উঠল। ‘সংবাদ কৌমুদী’ প্রথমে মঙ্গলবার ও পরে প্রতি শনিবার প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্পর্কিত নানা আলোচনা ও সংবাদ, দেশের দৈনন্দিন ঘটনাবলীর সংবাদ, জ্ঞাতব্য তথ্য ও সমাজিক সমস্যা সম্পর্কিত পত্রাবলী ছাপা হয়। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য্যরে ‘বেঙ্গল গেজেট’-এর পর, ‘সংবাদ-কৌমুদী’-ই বাংলা ভাষায় সাপ্তাহিক বাঙালী সম্পাদিত সাময়িক পত্র। জনসাধারণের অভাব, অভিযোগের প্রতি শাসকদের ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। সংবাদপত্র-কে সঠিকভাবে গণমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ‘সংবাদ-কৌমুদী’-র ভূমিকা অনেকখানি সার্থক ছিল। স্বদেশবাসীকে উপযুক্ত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানালো, বিজ্ঞান ও কারিগরী চিকিৎসা ইত্যাদি বিভিন্ন পেশাদারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে দেশবাসীকে বোঝানোর জন্য এই পত্রিকায় লেখা হতো। পত্রিকার এই প্রচেষ্টা তথা রামমোহনের শিক্ষা-প্রসারের এই উদ্দেশ্য যে অনেকাংশে সার্থক হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখ্য প্রমাণ ছিল ১৮২২ খ্রীষ্টাব্দে ডক্টর জেমসনের অধীনে কুড়িজন ছাত্রকে বৃত্তি দিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

সামাজিক নানা বিষয়ে অসুবিধার কথা যেমন-হিন্দুদের মৃতদেহ সৎকারের জন্য শ্মশানঘাট, বিধবা বিবাহ, কৌলিন্য প্রথা, শিশুহত্যা, সতীদাহ ইত্যাদি নানা কুসংস্কার ও সামাজিক সমস্যা নিয়ে পত্রিকায় আলোচনা ও চিঠিপত্র-ও ‘সংবাদ-কৌমুদী’-তে প্রকাশিত হতো । এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য-ও বলা হতো । দেশবাসীর মানসিক ও নৈতিক উন্নতির জন্য পত্রিকায় হিন্দুর সম্পত্তি অধিকার আইনের সংশোধন চাওয়া হয়েছে, অপরিণত বয়ষ্কদের সম্পত্তির অধিকার দান নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে বিদেশী শাসনের একপেশে অন্যায় নীতি যেমন-স্বদেশীয়দের নিরাপত্তাহীনতা, তাদের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক ব্যবহার, অন্যায়-বিচার ব্যবস্থা, দুর্ব্যবহার এবং এর বিরুদ্ধে জনগণের অসস্তোষ ও অভিযোগ পত্রিকায় সংবাদ-আলোচনা-পত্রাদির মাধ্যমে জনমক্ষে তুলে ধরা হয়। উনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় রামমোহন প্রবর্তিত কাগজেই আমরা জাতীয়তাবাদের প্রথম স্ফুরণ দেখতে পাই। দুরদর্শী রামমোহন দেশের অর্থনৈতিক পরাধীনতা নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করেছেন, যার প্রতিফলন তাঁর পত্রিকায়ও দেখতে পাওয়া যায়। দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে পত্রিকার মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে সজাগ করার চেষ্ঠা করা হয়েছে। তবে শুধু শাসনকর্তাদের নয়, রামমোহন দেশবাসীকে-ও দায়িত্বশীল হতে পত্রিকায় নির্দেশ দিয়েছেন। উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ পরাধীন একটি জাতির মুখপত্ররূপে সংবাদ-কৌমুদী ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষায়, সামাজিক উন্নয়নে, স্বাদেশিকতা প্রচারে যেভাবে সোচ্ছার হয়েছে ভারতীয় সংবাদপত্রের ইতিহাসে তার অবদান অবিস্মরণীয়। সমাজ-সংস্কারে সংবাদ-কৌমুদীর ভূমিকা সমাজের রক্ষণশীল ব্যক্তিদের অসন্তোষের কারণ হয়েছিল। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও রামমোহনের সামাজিক সংস্কার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাই ‘সংবাদ-কৌমুদী’-র ১৩টি সংখ্যার পর তিনি পত্রিকা ছেড়ে দিলে রামমোহন তার দায়িত্ব নেন (১৮২২ সাল)। এর শেষ পর্যায়ে সম্পাদক ছিলেন রামমোহন পুত্র রাধাপ্রসাদ রায়। ‘সংবাদ-কৌমুদী’-কে কেন্দ্র করেই রামমোহনের প্রত্যক্ষ এবং সচেতনভাবে সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ। তাঁর পত্রিকা পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায় ও দায়িত্ব বাংলার সংবাদপত্রের বিকাশে এক নতুন মাত্রা এনে দিল (উল্লেখ্য, ১৮৩৪ সাল পর্যন্ত ‘সংবাদ-কৌমুদী’ প্রকাশিত হতো)।

অবশ্য রামমোহন ১৮০৩ সালে, একটি পার্শীয়ান সংবাদপত্র প্রকাশ করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘তাহাফত-উল হুয়াহহিদ্দিন’ (একেশ্বরবাদীদের জন্য প্রদত্ত উপহার), যেটা সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে সরব ছিল।
রামমোহনের সময় এদেশে শিক্ষিত মহলে ফার্সী ভাষাতেই বিদ্যাচর্চা করা হতো। রামমোহন এইসব শিক্ষিতদের জন্য ফার্সী ভাষায় একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করার সংকল্প করেন। ১৮২২ সালের ১২-ই এপ্রিল ‘মিরাৎ-উল্-আখবার’ (সংবাদের দর্পণ) নামে রামমোহন রায় সম্পাদিত ফার্সী ভাষায় এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। প্রতি শুক্রবার পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকা দেশবাসীকে তাদের সামাজিক অবস্থার উন্নতির জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করবে; এই পত্রিকা শাসকশ্রেণীকে তাদের প্রজাদের প্রকৃত অবস্থা কী তা জানতে সাহায্য করবে এবং প্রজারাও সরকারি আইন ও নিয়মাবিধির সঙ্গে পরিচিত হতে থাকবে। এর ফলে শাসকশ্রেণী সহজেই জনগণের অভাব-অভিযোগ এবং তাদের অসন্তোষের প্রতিকার করতে পারবে। অন্যদিকে শাসকপক্ষ কীভাবে জনগণের নিরপত্তারক্ষা তথা তাদের কষ্টলাঘব করতে পারে সে বিষয়েও জনসাধারণ স্যমকভাবে ধারণা লাভ করবে। সুতরাং বলা যায় রামমোহন-ই প্রথম তৎকালীন একমাত্র গণমাধ্যম সংবাদপত্রের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন।
‘মিরাৎ’ পত্রিকায় জাতীয় সংবাদের পাশাপাশি নানা ধরণের আন্তর্জাতিক সংবাদ-ও গুরুত্ব সহকারে ছাপানো হতো। এই পত্রিকায় রাজনৈতিক আলোচনা যথেষ্ট প্রাধান্য পেয়েছে এবং রামমোহন তার রাজনৈতিক মতবাদ সুস্পষ্টভাবে যেকোনো আলোচনা প্রসঙ্গে ব্যক্ত করেছেন। ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির কোনো বিরোধ তিনি মানতেন না। এই কারণে ধর্ম ও রাজনীতি সম্পর্কিত রামমোহনের মতাদর্শ এই পত্রিকায় একইসঙ্গে প্রচারিত হয়েছে।

গণতন্ত্রকে সমর্থন করলেও, অনভিজ্ঞ জনগণের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রকে তিনি সমর্থন করেননি। মুসলিমদের সম্পর্কে বিদেশীদের যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল তা দুর করার জন্য রামমোহন হাফিজের বয়ান অনুদিত করে মুসলিমদের উদার ধর্মবাদ সুফী ধর্মীয় নীতিগুলিকে পত্রিকা মারফত প্রচার করেন। এই পত্রিকা মারফত রামমোহন দেশের শিক্ষিত অংশকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে এবং শাসকশ্রেণীকে দেশের সামাজিক-ধর্মীয় অবস্থার সম্পর্কে অভিজ্ঞ করার চেষ্টা করেছে। দেশ-বিদেশের যে কোনো ঘটনার সংবাদ ও সে সম্পর্কে তাঁর মতামত নির্ভিকভাবে প্রকাশ করে রামমোহন যথার্থ্য সাংবাদিকের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। ‘সংবাদ-কৌমুদী’ ও ‘মীরাৎ-উল্-আখবার’-এ রামমোহনের মুক্ত চিন্তার এবং গণচেতান জাগানোর জন্য তাঁর পত্রিকার ভূমিকা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের শাসন, কর্তৃপক্ষের অসন্তোষের কারণ হয়েছিল। কিন্তু কিছু উদারনৈতিক ইংরেজের সমর্থন-ও রামমোহন পেয়েছিলেন। ইংরেজ সম্পাদিত এদেশের সংবাদপত্রগুলিতে ‘সংবাদ-কৌমুদী’ ও মিরাৎ-এ প্রকাশিত সংবাদ ও আলোচনা অনুদিত ও পূর্ণমুদ্রিত হয়েছে। এদেশের সংবাদপত্রের জন্মলগ্নে রামমোহন রায়ের অবদান অপরিসীম, এবং তাঁর পরিচালিত দু’টি পত্রিকাই ঐতিহাসিকদের কাছে তথ্য-সম্পদরূপেই চিহ্নিত।

‘মিরাৎ-উল্-আখবার’-এর অনেকে লেখাই সরকার আপত্তিকর মনে করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোলকাতার বিশপ ড: মিলটনের মৃত্যুতে কাগজে প্রকাশিত শোক সংবাদের সঙ্গে খ্রিষ্টীয় ত্রিত্তবাদ নিয়ে কিছু মন্তব্য, পারস্যের রাজকুমারের সঙ্গে বড়লাটের সাক্ষাৎকার নিয়ে সরকারি মতে কিছু অতিরঞ্জিত সংবাদ ইত্যাদি। তাই ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দের অ্যাডামের ব্যক্তি-স্বাধীনতা হরণকারী মুদ্রণ-নিয়ন্ত্রণ আইনের কবলে, ‘মিরাৎ-উল্-আখবার’ও পড়ল। কিন্তু রামমোহন ব্যক্তি-স্বাধীনতার বরাবরই বিশ্বাসী ছিলেন। দেশের শিক্ষিত জনগণের প্রতি অবমাননাকর এই আইন রোধ করেন, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও দেশবাসীর নায্য অধিকার অক্ষুন্ন রাখতে তিনি এগিয়ে এলেন। সরকারি প্রস্তাবটি সুপ্রীম কোর্টে গৃহীত হয়ে আইনে তিনি একটি আবেদনপত্রে পেশ করেন। এত অল্প সময়ে আবেদন পত্রটি প্রস্তুত করা হয় যে বেশি লোকের লোকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরচন্দ্র ঘোষ, গৌরীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসন্নকুমার ঠাকুর-এর নাম, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব্য। রামমোহনের এই আবেদনপত্র ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা। যদিও তার ‘ব্রাহ্মণ সেবধী’-কে সংবাদপত্র বলা যায় কিনা তা বিতর্কের বিষয়। আর ‘মিরাৎ-উল্-আখবার’-এর মধ্যে সংবাদ কতখানি প্রতিফলিত হয়েছিল তাও বলা কঠিন। কেননা তার কোন মূল কপি পাওয়া যায়নি। তবে অ্যাডামসের এই ‘কালা-কানুন’-এর প্রতিবাদে তাঁর ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রনিধানযোগ্য। তিনি এর প্রতিবাদ করতে গিয়েই লেখেন-“হৃদয়ের শত শত ফোঁটা শোণিতের বিনিময়ে অর্জন করেছো যে অমূল্য সম্মান, প্রিয় মোর তুচ্ছ দারোয়ানের অনুগ্রহ পাবার আশায় তাঁকে করোনা বিক্রয়” এবং ‘মীরাৎ-উল্-আখবার’ বন্ধ করে দেন। পত্রিকা বন্ধ হলেও দিনের আলোয় প্রকাশিত হলো সেই উপলব্ধি যে, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা কোন কারণেই বিক্রি করা যায় না। ব্রিটিশ রাজত্বে মুদ্রণ ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে স্বাধীন মতামত প্রকাশে নায্য অধিকার রক্ষায় আমাদের দেশের সংবাদপত্রসেবীরা যে অনলস প্রয়াস চালিয়েছিলেন রামমোহনের আবেদনের মধ্য দিয়েই তার ভিত্তি-প্রস্তরটি স্থাপিত হয়। তাই রামমোহনের জীবনীকার মিস কলেট এই আবেদনপত্রটিকে ভারতীয় ইতিহাসের ‘অ্যারিওপ্যাগিটিকা’ রূপে অভিহিত করেছেন। সর্বোপরি যে উপলব্দি আজ থেকে ১৭৭ বছর আগে ঘটেছি, তাত যে ভারতীয় স্বাধীনচেতা সাংবাদিকতার এক অনন্য সাধারণ উদাহরণ, তা মেনে নিতে কোন দ্বিধা থাকার কথা নয়। ‘মীরাৎ- উল্-আখবার’-এর পাশাপাশি রামমোহন রায় আরেকটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতেন, যার নাম ছিল ‘জান-ই-জাহাপনামা’, সাল ১৮২২ এর মার্চ। এটি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাই ছিল। ১৮২২-এর ১২ই মে থেকে এটির অষ্টম সংখ্যায় ভারতীয় সংবাদপত্র হিসেবে তার উর্দু এবং পার্শীয়ান ভাষায়ও প্রকাশ হতে শুরু করে।

রামমোহন রায় ‘বেঙ্গল হেরান্ড’ নামে আরেকটি পত্রিকার মালিক-ও ছিলেন। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮২২-এর ১০ই মে, যার সম্পাদক ছিলেন মন্টেগো মেরি মারলিন। এই সংবাদপত্রটি চারটে ভাষায় প্রকাশিত হতো।

রাজা রামমোহন রায় একজন সমাজ-সংস্কারক হিসেবেই স্বাধীন প্রেসের জন্য লড়াই করে গেছিলেন। তিনি বিশ্বের সত্য সম্পর্কে চিন্তা করতেন, তা খুঁজতেন। তার লেখনীর ধারা না ছিল দেশী, না ছিল বিদেশী। তা ছিল সমাজের সর্ববন্ধন মুক্তির প্রয়াস। মূলত তাতে ছিল যেমন বিতর্কের ছোঁয়া, তেমনি থাকত যুক্তির মাধ্যমে বলিষ্ঠ বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীন চেষ্টা। নতুন বিশ্বের আলোচনায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাথে হিন্দু সমাজের ও সমাজব্যবস্থার এক সার্থক সমন্বয়ের প্রয়াস তাকে সেই সমাজ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এক অনবদ্য ভূমিকায় তুলে ধরেছে। যে সমাজ-ব্যবস্থায় ব্যাক্তি-স্বাধীনতার কোন মূল্য নেই সেখানে যে গোষ্ঠী স্বাধীনতার কোন মূল্য থাকবে না, তাতে তিনি একরকম নিঃসন্দিহান ছিলেন। আর এই পরাধীনতা যে দেশের স্ব-নির্ভরতার পথে বাধা তাও তিনি জানতেন। সেইজন্য তিনি ব্যাক্তি-স্বাত্যন্ত্রের প্রতি জোর দিতে গিয়ে সংবাদপত্রকেই বেঁচে নিয়েছিলেন, তাঁর স্বাধীন বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে। সেখানে জাতি-ধর্ম-ভাষার প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতেও তিনি সচেষ্ট ছিলেন। যদিও এখানে উল্লেখ করা যায়, রামমোহন ১৮৩০ সালের ১৫ই নভেম্বর বিলেত যান এবং সেখানে তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৩৩ সালের ২৭ শে সেপ্টেম্বর। অর্থাৎ তাঁর ধর্ম ও কর্মজীবন এদেশে মাত্র ১৫ বছরের, ১৮১৮ সাল থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত। আর সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাত্র ৯ বছর, ১৮২১ থেকে ১৮৩০ সাল পর্যন্ত। কিন্তু আমরা, আজকের যে সংবাদপত্রের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত, ১৮২১ সালে সেই চেহারা আশা করা যায় না, উচিতও নয়। তাই সম্পাদক হিসেবে রামমোহনের ভূমিকা ও অবদান যতখানি, সাংবাদিক হিসেবে সেই ভূমিকা ঠিক ততখানি নয়, কারণ তৎকালীন গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সামাজিক, ধার্মিক কিংবা অর্থনৈতিক চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন কিংবা প্রতিরূপ ‘সংবাদ-কৌমুদী’ বা অন্য কোন কাগজে প্রতিফলিত হয়নি। সেকালের সমস্ত সংবাদপত্র কিংবা সাময়িকপত্র কোলকাতা নির্ভর ইংরেজ কর্মচারী, সামান্য ইংরেজী জানা বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আর ব্যবসায়ী বাঙালী ও ইংরেজ নির্ভর। ফলে সংবাদপত্রের বিকাশ ও অগ্রগতি সেই শ্রেণীর প্রতিনিধিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল তখন। সূত্র অবশ্যই ছিল-সেটা তৎকালীন ধর্মীয় সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে প্রাচীনপন্থীদের মধ্যে বাদ-প্রতিবাদ, রামমোহনের সাংবাদিকতা, এই সূত্র ধরেই বিকাশ লাভ করেছে-সেখানে তাঁর আগ্রহ, প্রচেষ্টা কিংবা উৎসাহের কোন ত্রুটি ছিল না। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি তৎকালীন যুগাবয়বে প্রকাশনা ও সাংবাদিকতাকে সামাজিক ও ধার্মিক ভাবনাকে, জনমত সংগঠনায় প্রয়োগ করেছিলেন।

রামমোহন মাত্র ৯ বছর ‘ সংবাদ-কৌমুদীর’-র সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন, এছাড়া ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’ বা ‘বঙ্গদূত’ পত্রিকার সঙ্গে তিনি কতখানি ও কিভাবে জড়িত ছিলেন-তাও পরিস্কার নয়। ফলে রামমোহন-এর সম্পাদকের ভূমিকা মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি হওয়া উচিত, সে যুগের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ও পটভূমিতে বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তাঁর বিভিন্ন রচনা বা লেখাই। এইখানেই প্রতিবাদী চরিত্রে রামমোহনের সাংবাদিকতার স্বরূপ পথিকৃতের দাবী করতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, মতাদর্শগত সংঘাত এদেশে, সাংবাদিকতাকে মানুষের স্বার্থের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছে-সাংবাদপত্রকে গুরুত্ব দিয়েছে-এইখানই রামমোহনের অবদান অনস্বীকার্য। এবং তৎকালীন সীমাবদ্ধ সংবাদপত্র জগতে কোলকাতা ভিত্তিক মুদ্রণ শিল্পের হাত ধরে সাংবাদিকতার ক্রমবিকাশে রামোহনের মূল্যায়ণ করা উচিত সেই প্রেক্ষাপটেই।

উনিশ শতকের এই পূর্বে কোলকাতার সাংবাদপত্রে জন্য লড়াই কিংবা আবেদন-নিবেদন কোন একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের ভারতীয় প্রেস ব্যবস্থার পূর্ণজাগরণে সার্থক প্রচেষ্টাকারী ব্যক্তি, কারণ যেখানে এই একই শতকের প্রথমার্ধে এই মৃত্তিকার সন্তানদের বিনষ্ট করার প্রচেষ্টা ছিল, সেখানে দ্বিতীয়ার্ধে রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টাতেই মেধাবীদের উদ্বুদ্ধ হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছিল। যদিও তা ছিল পার্শ্ববর্তী পরিস্থিতির ঘটনার প্রভাবধারা অনুসারী। সমসাময়িক কালের ইউরোপে তা রেঁনেসাঁস, যা পরবর্তীকালের সাম্রাজ্যবাদী সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সঙ্গেই বিকশিত হয়েছে-ফরাসী দেশে, ইংল্যান্ডে, এমনকি আমেরিকাতেও। সামাজিক ও রাজনৈতিক সাম্য-মৈত্রী স্বাধীনতার উচ্চারিত আকাঙ্খার সঙ্গেই মানুষের অধিকারের অংশ হিসেবে পুষ্ট করেছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ধারণাকে। এমনই একটি ধারণা ও চেতনায় রামমোহন ও তৎকালীন সহযোগীরা কিভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন তা ভাবলে অবাক হতে হয়, বিশেষতঃ যেখানে সাংবাদিকতায় ভারতীয়দের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার প্রায় শূন্য। যদিও হিকি থেকে বাকিংহাম-এর সংবাদপত্র জগত রামমোহন ও তাঁর সতীর্থদের কাছে একটা প্রেক্ষাপট হিসেবে ছিল-ই, তাঁরা দেখেছিলেন হিকির কাগজ বন্ধ করে দেওয়া ও হেনস্থার ঘটনা-দেখেছিলেন প্রাক-সেন্সরশিপ আইনের বাধ্য-বাধকতা। ধারণা ছিল বলেই হয়তো বাঁধন ছেড়ার প্রচেষ্টাও ছিল প্রবল। রামমোহন সেই প্রচেষ্টার প্রথম পদাতিক। ১৮২৩ এর কুখ্যাত অ্যাডামস আইন এর বিরোধীতা থেকেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে তাঁর যত প্রতিবাদ-যত ক্ষোভ। অনেকটাই যেন সাম্রাজ্যবাদী উদারপন্থী মানসিকতার প্রতিষ্ঠান। অবশ্য এটাই ছিল স্বাভাবিক। উনিশ শতকের প্রথম দিকে যে সময়ে এই যুক্তি প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যখন ভারবর্ষের স্বাধীনতার আকাঙ্খার জন্ম হয়নি-তখন একটি পরাধীন দেশের সংবাদপত্রে স্বাধীনতার প্রশ্নটির মধ্যে একটি মৌলিক অসংগতি রয়েছে-এ সম্পর্কে কোম্পানীর কর্তারা যেমন সচেতন ছিলেন, তেমনি রামমোহন-ও ছিলেন সচেতন। তাই তিনি ভাবতে পারন ভারত ও ভারতবাসীর উন্নতির জন্য ব্রিটিশ শাসন যেমন প্রয়োজন, তেমনি লেখেন, যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই সেখানেই অসংখ্য বিদ্রোহ ও বিপ্লব ঘটে থাকে। কারণ স্বাধীন সংবাদপত্র না থাকায় প্রজাদের বিক্ষোভ প্রকাশের অন্য কোন পথ থাকে না।

মনে হওয়া স্বাভাবিক রামমোহনের কাছে সম্ভবতঃ দেশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সমার্থক ছিল না। থাকলে তার বিপরীত বোধ থাকত না। আসলে তৎকালীন যুগ ও সমাজ চেতনার সীমাবদ্ধতায় ঘুরে বেড়িয়েছে তাঁর চিন্তাধারা। এই সীমাবদ্ধতার একমাত্র মুক্তি সম্ভবত ঘটেছে মত প্রকাশের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবাদী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে, বাহন ছিল সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র, বই সমালোচনামূলক লেখা আর স্মারকলিপি। এখানেই রামমোহনের ভূমিকা কিংবা অবদা এক পথিকৃতের।
রামমোহন তাঁর সময়ে ব্যক্তি-স্বাধীনতা রক্ষার যে প্রচেষ্টা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। রামমোহন যখন তাঁর সংগ্রাম শুরু করেন আমাদের জাতীয়তাবাদ তখন মাতৃগর্ভে, দেশের লোক, রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ও নিস্পৃহ। মুষ্টিমেয় শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিরা উদীয়মান রাজশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার পক্ষে সাহসী নয়। ব্যক্তি-স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের দাবি তখন সাধারণের কাছে অলীক কল্পনা। আবেদনের ভঙ্গিতে ক্ষমতাশীল ব্রিটিশ সরকারের কাজের সমালোচনা করা ধৃষ্টতা। যদিও আমাদের দেশে সংবাদপত্রসেবীদের স্বাধীনতা আন্দোলন সূচনাতেই মহান পরাজয় বরণ করেছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভারতে রাজনৈতিক অধিকার লাভের জন্য নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রথম সূত্রপাত ঘটে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তাই যথার্থ্যই রামমোহনকে ভারতের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের জনকরূপে অভিহিত করেছেন।

উল্লেখ্য, অষ্টাদশ ও উনিশ শতকের যথাক্রমে শেষ ও শুরুর পর্বের সম্পর্কে, বাংলার ক্ষেত্রে অন্তত যে প্রসঙ্গে-ই আলোচনা করা হোক না কেন প্রত্যেক বা পরোক্ষভাবে রাজা রামমোহনের নাম আসতে বাধ্য। হয়তো অনেকেই এক্ষেত্রে অনেকভাবে রামোহনকে তুলে ধরতে চেয়েছেন, নানা প্রসঙ্গে-নানাভাবে ও নানারূপে। সেখানে দ্বিধা-দ্বন্ধের, বিতর্কের অবকাশ আছে একথা মেনে নিয়ে একজন স্বাধীনচেতা মানুষ হিসেবে সংবাদপত্র জগতে তাঁর যে পদাচারণামূলক ভূমিকা তাতে বিতর্কের অবকাশ নেই বললেই চলে। যে সীমাবদ্ধতা জায়গা আছে তাতে কালের প্রেক্ষাপটে রাখলে তাঁর অনন্যতার জায়গা আমাদের কাছে ধরা পড়ে। এবং এখানেই তাঁর উত্তরণও বটে।

সহায়ক গ্রন্থাবলীঃ
১। সাংবাদিক রামমোহন ও ভারতীয় ইতিহাসের “অ্যারিও প্যাগিটিকা”, পশ্চিমবঙ্গ গণমাধ্যম সপ্তম সংখ্যা।
২। রামমোহন রচনাবলী
৩। The struggle for the freedom of the Press (1819-1832)



সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০২১ দুপুর ১২:০৬
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গঞ্জিকা সেবনকারীরাই পঞ্জিকা লিখে....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৯:৪৫

গঞ্জিকা সেবনকারীরাই পঞ্জিকা লিখে....

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যাহিক জীবনে পঞ্জিকা একটি অপরিহার্য বিষয়। তাদের পুজো, বার-তিথি-নক্ষত্র দেখা ছাড়াও পঞ্জিকার গুরুত্ব আছে বাংলা সাহিত্যে। আমার মতে, পঞ্জিকার মতো নির্মল হাস্যরসের ভাণ্ডার বাংলা সাহিত্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতা লেখা, কবি হওয়া ও নিজস্ব কিছু চিন্তাধারা

লিখেছেন নীল আকাশ, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ৯:৫০



কবিতা লেখা একটা গুণ। একটা বিশেষ গুণ। ইচ্ছে করলেই সবাই কবিতা লিখতে পারে না। কবিতা লেখার জন্য বুকের ভিতরে ‘কবি কবি’ একটা মন থাকতে হয়। বাংলা সাহিত্যে বহু বছর ধরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ কতটা উন্নতি করলো?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:৫১

ছবিঃ আমার আঁকা।

গত ৫০ বছরে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে বলা যাবে না।
যতদূর এগিয়েছে তার চেয়ে ত্রিশ গুণ বেশি এগোনো দরকার ছিলো। শুধু মাত্র দূর্নীতির কারনে আজও পিছিয়ে আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগার নতুন নকিবের গোপন এজেন্ডা

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৪:৩৮


আসসালামুয়ালাইকুম। আপনারা সবাই ব্লগার নতুন নকিবকে চেনেন। তাকে আমার খুব পছন্দ ছিলো। কারণ সে ইসলামী ভালো ভালো পোস্ট দেয়। কিন্তু হঠাৎ করে এক পোস্টে তার মুখোশ খুলে গেছে। দেখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্নানঘরের আয়না

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২২ শে জানুয়ারি, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:৪৯



দিনের শেষে প্রিয়বন্ধু হয়ে থাকে একজন' ই
- স্নানঘরের দর্পণ
যে দর্পণে তুমি নিজে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী রাজকন্য হয়ে র'বে
কনে সাজে তুমি, অথবা মাতৃত্বের জ্বরতপ্ত বিষণ্ণ মুহূর্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×