somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নতুন শতাব্দীতে বাংলা সিনেমার হালচাল, ৭

২২ শে মে, ২০০৯ রাত ৯:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্ব: Click This Link

সহিংসতার স্বরূপ
আমাদের সাম্প্রতিক বাংলা-ছবিগুলো দেখে মনে হয়েছে এগুলো যতটা 'অশ্লীল' তার চাইতে বেশি সহিংস। কেননা, যৌনতার মোড়কেও এখানে উপস্থিত হয় সহিংসতা, এর সবর্জনবিদিত উদাহরনটি হলো ধর্ষণ। ধর্ষণের মতো একটি সহিংস আচরন যৌন-উত্তেজক উপাদান হিসেবে এই ছবিগুলিতে একাধিকবার ব্যবহৃত হয়। সিনেমার নামগুলিও নিদের্শ করে এতে কতখানি সহিংস উপাদান রয়েছে। ধর শয়তান, ওরে বাবা, টপ মাস্তান, গ্যাং স্টার, ওরা সোলজার, জোর যার মুল্লুক তার, প্রেমিকা ছিনতাই, কিংবা আঘাত পাল্টা আঘাত ইত্যাদি নাম প্রমাণ করে সহিংসতা এসব ছবির মূল বিষয়বস্তু।

নির্বাচিত তিনটি ছবির প্রতিটিতেই ব্যাপক সহিংসতা দেখা গেছে। বাঘের বাচ্চা ছবিতে কিছুক্ষণ পরপরই নায়ক ও প্রতিপক্ষের মধ্যে মারামারি দেখা গেছে। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর প্রতিপক্ষের লোকজন খুন-ধর্ষণ ইত্যাদি করে আর বস্তির রক্ষক নায়ক সংঘাত ও খুনের মাধ্যমে তার জবাব দিয়ে চলে -- এই সরলরৈখিক কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তাই ঘন ঘন সহিংসতার দৃশ্য দেখা গেছে। গুলিবিদ্ধের বা চাপাতি-আক্রান্তের ছিটকে পড়া রক্তের কুশলী চিত্রয়াণ বীভৎসতার চূড়ায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ভিলেন কোকা শেঠকে এক দৃশ্যে দেখা গেছে 'তার ভাইকে নায়ক সম্রাট গুরুতর আহত করেছে' -- এই বার্তা বহনকারীকেই ক্ষেপে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে, কারণ সে খারাপ খবর নিয়ে এসেছে। আরেক দৃশ্যে এক হস্তরেখাবিদের দুই হাত একে একে কেটে ফেলে কারণ সে ভবিষদ্বাণী করে যে কোকা শেঠের সামনে এক বিপদ রয়েছে। অন্য আরেকটি দৃশ্যে এক অনুচরের গলায় কামড়ে কণ্ঠনালী ফুসফুসসমেত বের করে আনে এবং সাঙ্গ-পাঙ্গরা পানি দিয়ে তার মুখ ধুইয়ে দিলেই কেবল সে শান্ত হয়। বীভৎসতা-নির্মাণে নায়কও পিছিয়ে নেই। শত্রুপক্ষের একজনকে সে চেইন দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে, আরেকজনকে পুড়িয়ে মারে। প্রতিটি সহিংস, বীভৎস দৃশ্যে সাউন্ড ট্র্যাকে প্রয়োজনীয় শব্দ দিয়ে চিত্রায়ণকে চূড়ায় নেবার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন নায়ক যখনই কোনো 'এ্যাকশন'-এ যাচ্ছে তখনই সম্মিলিত পুরুষকণ্ঠের প্রতিধ্বনিত সাউন্ড-ট্র্যাক আওয়াজ করে ওঠে 'বাঘে-ঘ-র-বাঘে-ঘ-র বাচ্চা...'।

বিদ্রোহী সালাউদ্দিন ছবি জুড়ে সহিংসতা। বস্তুত প্রতিশোধস্পৃহ নায়কের সঙ্গে ভিলেনদের সংঘর্ষই এই ছবির প্রধান উপজীব্য। নায়ক বিশাল এক ছোরা দিয়ে বিশ্বাসঘাতকতাকারী বন্ধুকে আঘাত করে আর তার রক্ত নায়কের মুখে এসে ছিটকে পড়ে। নায়ক রবিনহুড স্টাইলে বিশাল এক বাহিনী গড়ে তুলেছেন যারা ডাকাতি করলেও আসলে লুণ্ঠনকৃত মালামাল গরীব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়। অন্যদিকে তার শত্র“র তালিকা এত বড়ো যে তাকে অনেকগুলো এ্যাকশনে নামতে হয়েছে। মোকাবিলা করতে হয়েছে পুলিশকেও। তাই সহিংসতাই ছবির উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নায়ক তার এক অনুচরের গাল আগুনে পুড়িয়ে দেয়, কারণ সে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়েছিল। আর সেই সাবেক অনুচর নায়কের সন্তানকে আগুনে পুড়িয়ে মারার আয়োজন করে। এভাবে সহিংসতা বীভৎসতায় রূপ নেয়।

রঙ্গীন চশমা ছবিতেও সহিংসতা প্রচুর পরিমাণে দেখা গেছে। ভিলেনের লোকজন ও দুই নায়ক ছাড়া দুই নায়িকাও মারপিটে পারঙ্গম। ফলে প্রচুর মারপিটের দৃশ্য দেখা গেছে। বস্তুত ছবির গল্প খুব সামান্য, ছবির বেশিরভাগ সময় কেড়ে নিয়েছে অশ্লীল গান ও অকারণ মারপিট। টাইটেল কার্ডে যখন ছবির কুশীলবদের নাম দেখানো হয় তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে মারামারি, গোলাগুলির দৃশ্য দেখানো হয়। ছবিতে সহিংসতার গুরুত্ব কতখানি এথেকেই তা বোঝা যাচ্ছে।

বাঘের বাচ্চা ছবির মোট দৈর্ঘ্যরে ১৫% অংশ জুড়েই রয়েছে সহিংসতা। এবং সহিংস দৃশ্যের সংখ্যা ১৬টি -- ১০ সেকেন্ডের সংক্ষিপ্ত দৃশ্যের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ২ মিনিট ২০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যরে দীর্ঘ দৃশ্যও রয়েছে। আর দৃশ্যগুলো কেবল সহিংসই নয়, বীভৎসও। ধর্ষণ করে হত্যা, চেইন দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা, কামড় দিয়ে ফুসফুসসমেত শ্বাসনালী বের করে আনা, পুড়িয়ে হত্যা, হাত কর্তন, গুলি করে হত্যা -- সব ধরনের সহিংসতার দেখা মেলে এই ছবিতে। বিশেষ করে কামড় দিয়ে ফুসফুসসমেত শ্বাসনালী বের করে আনা আইডিয়া হিসেবে অনন্য, হলিউডি বা অন্য কোনো ছবিতে সহিংসতার এই রূপ দেখা যায়নি। আর সময়সীমার হিসেব কষেও বাংলা ছবির সহিংসতার মাত্রা পরিমাপ করা যাবে না। ৫-৭টি গান আর কয়েকটি কাটপিস দৃশ্য যদি অশ্লীলতার অবলম্বন হয়, তবে সময়ব্যাপ্তি হিসেবে পর্নোগ্রাফি সহিংসতার চাইতে এগিয়ে। কিন্তু ছবির থিম বিচার করলে দেখা যাবে সহিংসতাই এসব ছবির কেন্দ্রীয় ভাবনার বিষয়। অন্যদিকে বাঘের বাচ্চা ছবির টাইটেল কার্ড যখন দেখানো হচ্ছে, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখানো হচ্ছে ছবিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ভায়োলেন্স-দৃশ্য। এভাবেই স্পষ্ট হয় যে ঢাকাই ছবির প্রধান ঝোঁক এখন সহিংসতার দিকে।

রিচার্ড ডায়ার হলিউডের সাম্প্রতিক সহিংস (এ্যাকশন) ছবিগুলোর বিশ্লেষণ জন্য জ্যান ডি বন্ট পরিচালিত স্পিড ছবিটিকে বেছে নিয়েছেন। এখানে স্পিড শব্দটি দ্ব্যর্থক -- সাম্প্রতিক হলিউডি ছবির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গতি এবং স্পিড ছবিটির ভেতরেই এসব ছবির সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি বলছেন, 'এই ছবিটি হলো রোলারস্কেটারের মতো: কেবলই অ্যাকশন ও কোনো কাহিনী নেই বললেই চলে।' (ডায়ার, ২০০০: ১৭) বাংলাদেশের ছবির ব্যাপারেও রিচার্ড ডায়ারের কথাটি খাটে -- কোনো কাহিনী নেই, কেবলই গোলাগুলি, হত্যা, রক্তপাত। তিনি আরও বলছেন, 'কতজন মৃত্যুবরণ করলো, স্পিড আমাদের সেটা গণনা করারও সময় দেয় না।' (ডায়ার, ২০০০: ১৯) অসংখ্য হত্যার এই ব্যবহার ঢাকাই ছবিতেও দৃশ্যমান। ব্রাশফায়ারে অগণিত হত্যা, কথায় কথায় হত্যা, সামান্য কারণে হত্যা -- ঠিক কতজন মৃত্যুবরণ করলো দর্শকের পক্ষে তা মনে রাখা খুবই কঠিন।

চলবে ...


চিত্র: বাঘের বাচ্চা ছবির একটি সহিংসতাপূর্ণ দৃশ্য। কামড় দিয়ে শ্বাসনালীসমেত ফুসফুস বের করে নেয়া হচ্ছে।

দ্রষ্টব্য: গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক প্রণীত 'বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প: সঙ্কটে জনসংস্কৃতি' (শ্রাবণ, ২০০৮) গ্রন্থে এই ধারাবাহিকটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

১২টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×