somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নতুন শতাব্দীতে বাংলা সিনেমার হালচাল, ৮

২৩ শে মে, ২০০৯ রাত ৮:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্ব: Click This Link

নারী ও পুরুষের ইমেজ: প্রবল পুরুষ ও নর্তকী নারী

নায়ক ও নায়িকা নির্মাণের দিক থেকে সাম্প্রতিক সিনেমাগুলিতে প্রধান যে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় তা হলো, সনাতনী বৈশিষ্ট্যের বদল। সনাতনী বৈশিষ্ট্যে নায়ক ও নায়িকা ছিলেন 'যা কিছু ভালো' তার প্রতিভূ। নায়কের বিপরীতে 'যা কিছু খারাপ' তার প্রতিনিধিত্ব করতেন ভিলেন আর নায়িকার বিপরীতে ভ্যাম্প। বর্তমানে মাস্তানী কিংবা মদ্যসেবনের দিক থেকে নায়ক ও ভিলেন চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য করা দুস্কর। তেমনি নায়িকাও ভ্যাম্পকে ছাড়িয়ে দেহ প্রদর্শনে তৎপর।

সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রগুলোতে সেক্স ও ভায়োলেন্স ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নারী-চরিত্রগুলোর পরিসর আরও ছোট হয়ে গেছে। পূর্বের রোমান্টিক বা সামাজিক ধারার ছবিগুলোতে নায়িকার চরিত্রের বিস্তার বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে ছিল। কিন্তু বর্তমানের প্রতিশোধস্পৃহ নায়ককে পুরো ছবি জুড়ে শত্রুনিধনে ব্যস্ত থাকতে হয়, ফলে নায়িকার সঙ্গে রোমান্স করার জন্য তার সময় থাকে কমই। একটু আগে রিচার্ড ডায়ারের গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হলিউডি একশন ছবি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেসব ছবিতে নারী (নায়িকা) চরিত্রের ভূমিকার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলছেন, 'তার জন্য (কিয়ানু রিভস, স্পিড ছবির নায়ক) একটি মেয়ে (স্যান্ড্রা বুলক) আছে, কিয়ানু তাকে পায়ও, কিন্তু মেয়েটিকে পাবার ঘটনাও ঘটে দৌড়ের ওপরে, ছবির শেষে ক্ষণিক সময়ের জন্য' (ডায়ার, ২০০০: ১৭)। ঢাকাই ছবিতেও তাই রোমান্সপর্বে দুয়েকটি গান ছাড়া, নায়িকাকে জোরালো ভূমিকায় তেমন দেখা যায় না। সাম্প্রতিক ভায়োলেন্ট ও পর্নোগ্রাফিক ছবিগুলোতে কেবল নৃত্যগীত পরিবেশনায় ব্যবহৃত হবার কারণে, গুরুত্বের নিক্তিতে, নায়িকার ভূমিকা নর্তকীর কাছাকাছি নেমে এসেছে।

সিনেমাটোগ্রাফি পুরোপুরি আবিষ্কারের পূর্বেই সেই ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইংরেজ-আমেরিকান আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড মেব্রিজ যখন স্থিরচিত্রমালাকে পরপর প্রদর্শনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চলমান চিত্রের আবির্ভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছেন সেই নিরীক্ষাকালে তার একটি সিরিজ ছিলো নগ্ন নারী ও পুরুষদের ওপরে। লিন্ডা উইলিয়ামস ১৯৮১ সালে এই সিরিজটির ওপরে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, মেব্রিজের ছবিতে নারীরা কিছুই করছে না, কেবল দ্রষ্টব্য (to be looked at) আকারে হাজির এবং পুরুষদের দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের কাজ করতে (পাথরের চাঁই টানছে, কাঠ চেরাই করছে, বেসবল খেলছে) (দেখুন ডায়ার, ১৯৯২: ২৭০)। চলচ্চিত্রের উন্মেষের দোরগোড়াতেই চলচ্চিত্রে নারী ও পুরুষের রূপায়ণ কেমন হবে তার নমুনার দেখা মিলেছিলো। লরা মালভি তার বিখ্যাত 'ভিস্যুয়াল প্লেজার ও ন্যারেটিভ সিনেমা' (১৯৭৫) প্রবন্ধে ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের সাহায্য নিয়ে হলিউডের মূলধারার চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে নারী হলো এসব ছবিতে দ্রষ্টব্য (to be looked at) এবং পুরুষ-দৃষ্টি (male gaze) তাকে গোপনে বা প্রকাশ্যে অনুসরণ করে তুষ্টি লাভ করে। কিন্তু বাংলা ছবিতে নারীচরিত্রের ভূমিকা এতই গৌণ যে নায়ক তার দিকে ফিরেও তাকায় না। এদেশের মূলধারার ছবি নায়কসর্বস্ব, গডফাদার-ভিলেনের ভূমিকাও এখানে নায়িকার চাইতে অনেক বেশি থাকে। বাঘের বাচ্চা কিংবা বিদ্রোহী সালাউদ্দিন ছবির জন্য একথা পুরোপুরি প্রযোজ্য।

তবে স্টিভ নিল মনে করেন (হলিউডের) মূলধারার চলচ্চিত্র পুরুষের অনুমান, দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরী হয় বলে রহস্যময়ী নারী-ইমেজের ওপরেই সব অনুসন্ধান, তদন্ত ও আগ্রহ কেন্দ্রীভূত থেকেছে; নারী হলো একটা সমস্যা, উদ্বেগের কারণ, আবিষ্ট অনুসন্ধানের বস্তু; পুরুষ এরকম কিছু নয়, পুরুষত্বের সবকিছুই স্বাভাবিক, আপনার-আমার জানা আছে। আর নারীত্ব হলো একটা রহস্য। পুরুষ-ইমেজের বিষয়টি পর্দার ভেতরে ও বাইরে সমালোচকদের কাছে আলোচনা, অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের বিষয় হিসেবে খুব কমই উঠে এসেছে। (দেখুন নিল, ১৯৯২: ২৮৬)

এদিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আলোচনায় শেখ মহমুদা সুলতানা (২০০২) বলছেন সাম্প্রতিক বাংলা ছবিতে পুরুষ হলো 'দানব', 'দেবতা' ও 'পতি' এবং নারী হলো 'নষ্টা', 'এক্সট্রা' ও 'সতী'। গীতি আরা নাসরীন (২০০৩) বর্তমানের পুরুষ-ইমেজকে 'উন্মাদ' আখ্যা দিয়েছেন। তিনি রাজ্জাক অভিনীত ষাট-সত্তর দশকের ছবিগুলোতে পুরুষ-ইমেজকে 'ভাবপ্রবণ' বলছেন, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের মান্না-অভিনীত চরিত্রগুলো 'উন্মাদ' ছাড়া যেন আর কিছুই নয়।

সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রগুলোতে নারীর ভূমিকা খুবই গৌন, ছবির কাহিনী এগিয়ে চলে 'পুরুষ' নায়ককে ঘিরে। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা এসব ছবির স্বাভাবিক উপাদান। পুরুষ চরিত্রগুলো তেজী, বলবান, সশস্ত্র, সহিংস, বিক্ষুব্ধ, কামুক। নারী চরিত্রগুলো ছবির কাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, অল্প কয়েকটি পরিচয়ে সে ছবিতে উপস্থাপিত হয়। মমতাময়ী মা -- সন্তানকে ঘিরে যার যাবতীয় ভাবনা (বিদ্রোহী সালাউদ্দিন), লাস্যময়ী প্রেমিকা-স্ত্রী (মূল নায়িকা) -- নায়কের সঙ্গে সাক্ষাৎ, প্রেম ছাড়া আর কোনো ভূমিকা নেই (বাঘের বাচ্চা, বিদ্রোহী সালাউদ্দিন); যৌনাবেদনময়ী প্রেমিকা (দ্বিতীয় নায়িকা) Ñ দ্বিতীয় নায়কের প্রেম-প্রার্থনা ও তাকে বিরক্ত করাই তার একমাত্র কাজ (বাঘের বাচ্চা, বিদ্রোহী সালাউদ্দিন) এবং এই প্রেম-প্রার্থনা সে করে স্বল্পবাসে ও যৌনাবেদনময়ী নৃত্যগীতের মাধ্যমে। আরও এক ধরনের নারী চরিত্র থাকতে পারে যে হতে নায়কের বোন, যাকে ছবিতে হাজির করা হয় নায়ককে সশস্ত্র ও সহিংস হয়ে ওঠবার কার্যকারণ হিসেবে (বিদ্রোহী সালাউদ্দিন)। ভিলেনরা তাকে ধর্ষণ করে এবং তার অবধারিত মৃত্যু বা আত্মহত্যার পরে নায়ক বিদ্রোহ ঘোষণা করে -- সারা ছবি জুড়ে হামলা-পাল্টা হামলা চলতে থাকে। আর বাকি চরিত্রগুলো হয়ে থাকে নর্তকীর, ভিলেনদের সঙ্গে স্বল্প ও স্বচ্ছ পোশাকে নানা যৌন-অঙ্গভঙ্গি করাই তাদের একমাত্র কাজ।

বেশিরভাগ নারীচরিত্রের কোনো পেশা থাকছে না। তিন ছবিতে তিনজন পেশাজীবী নারীকে পাওয়া গেছে, দু’জনই দুই ছবির মূল নায়িকা। বাঘের বাচ্চা ছবিতে নায়িকা একজন স্কুলশিক্ষক, কিন্তু তাকে কর্মস্থলে কখনোই দেখা যায় না। তবে রঙ্গীন চশমা ছবিতে প্রথম নায়িকা একজন পুলিশ অফিসার, তাকে শত্রুর পিছু ধাওয়া করতে দেখা গেছে। দ্বিতীয় নায়িকা পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার। প্রথম নায়িকাকে পুলিশের পোশাকে দীর্ঘক্ষণ দেখা গেলেও দ্বিতীয় নায়িকাকে কর্মক্ষেত্রে একবারই দেখা গেছে। তবে লক্ষ্যণীয় যে, এই দুই চরিত্রকে সৃষ্টি করা অপরাধ-সংশ্লিষ্টতার জন্য এবং আঁটোসাটো পোশাকে সহিংসতা বা মারপিটের দৃশ্যে অংশ নেবার জন্যই এদের এরকম পেশায় দেখানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো তারা মারপিটে পারদর্শী হিসেবে ছবির প্রথম পর্যায়ে দেখা গেলেও, ছবির পরবর্তী পর্যায়ে অপরাধীদের দ্বারা তাদের আক্রান্ত হতে দেখা গেছে এবং তাদের উদ্ধার করতে নায়কদের হাজির হতেই হয়। আপাতভাবে আগ্রাসী হলেও নায়কের উপস্থিতিতে তারা ভীষণ 'মেয়েলি' -- এমনকি নায়ক-কর্তৃক উদ্ধারকার্যের সময় তারা ভীতচোখে দাঁড়িয়েই থাকে, মারপিটে অংশ নেবার কথা তারা ভুলে যায়। অথচ অন্য দৃশ্যে আমরা তাদের মারপিটে অংশ নিতে দেখেছিলাম।

বাংলা ছবিতে নারী প্রায়ই সহিংসতার শিকার হয়। বিশেষত ধর্ষণের মাধ্যমে এই সহিংসতা নিয়মিত এক রূপ পায় (বিদ্রোহী সালাউদ্দিন, বাঘের বাচ্চা)। তবে মূল নায়িকাকেও যখন নায়কের কাছে সহিংসতার শিকার হতে হয়, তখন নারীর কোনো মর্যাদাই অবশিষ্ট থাকে না (বাঘের বাচ্চা, বিদ্রোহী সালাউদ্দিন)। ছবিগুলো হয়ে ওঠে ধর্ষকামিতাসর্বস্ব একেকটি ন্যারেটিভ। নায়িকার কোনো 'বেয়াদবী'র কারণে নায়ক কর্তৃক প্রহৃত হয়, যদিও পরবর্তী সময়ে নায়কের কোনো মহানুভবতা দেখে সে নায়কের প্রেমেও পড়ে যায়। এভাবে নারীর প্রতি সহিংসতার বৈধকরণ ঘটে।

বাঘের বাচ্চা ও বিদ্রোহী সালাউদ্দিন এই দুই ছবিরই নায়ক হলেন সহিংস ছবির আইকন-অভিনেতা মান্না। দু'টি ছবিতেই এই জনদরদী ও বিদ্রোহী নায়কের বিরুদ্ধে নায়িকারা প্রথম পরিচয়ে 'বেয়াদবী' করে। নায়ক বেয়াদব ঐ নারীকে 'তুলে' নিয়ে যায় এবং একটি ছবিতে বেত্রাঘাত করে (বিদ্রোহী সালাউদ্দিন ) ও আরেকটিতে ধর্ষণের মাধ্যমে তার গর্ভে 'বাস্টার্ড'-এর জন্ম দিতে চায়, কারণ প্রথম পরিচয়েই নায়িকা তাকে বাস্টার্ড বলে গালি দিয়েছিল (বাঘের বাচ্চা)। বাঘের বাচ্চা ছবিতে 'বেয়াদব' নায়িকার সঙ্গে রাগী-আগ্রাসী-সাইকোপ্যাথ নায়কের সংলাপ ছিল এরকম:

নায়ক: পুরুষমানুষ হলে তোমার চেহারা আমি বদলে দিতাম। তুমি মেয়েমানুষ, তোমাকে আমি অন্যরকম শাস্তি দেবো।
নায়িকা: শাস্তি?
নায়ক: হ্যাঁ আমি শাস্তি দেবো। তোমাকে আমি একটা বাস্টার্ডের মা বানাবো।
(নায়িকার শাড়ি খুলে ফেলা হয়, নায়ক সম্ভাব্য ধর্ষণের কথা ভেবে কামুকের হাসি দিতে থাকে।)
নায়ক: আর তোমার সঙ্গে এমন একটা কাজ করবো যাতে তোমার গর্ভে সন্তান তৈরী হয়। ... একটু একটু করে তোমার পেটে সন্তান বড়ো হবে। তুমি বুঝবে বাস্টার্ড কাকে বলে।
নায়িকা: না না ...
নায়ক: কুমারী মা হবে তুমি, বাপের পরিচয় দিতে পারবে না। ... আজ তুমি আমাকে বাস্টার্ড বলে গালি দিয়েছো, তোমাকেও বাস্টার্ডের মা বলে গালি দিবে। ... সবাই আঙ্গুল তুলে তোমাকে বলবে ঐযে বাস্টার্ডের মা।
নায়িকা: ছেড়ে দিন, আমাকে ছেড়ে দিন ...

নায়িকাকে নায়ক এক পর্যায়ে ছেড়েই দেয়। সে দাবি করে কোনো নারীর গায়ে সে কোনোদিন হাত দেয়নি। কেবল তাকে কেউ বাস্টার্ড বললেই তার মাথা ঠিক থাকে না। বিদ্রোহী সালাউদ্দিন-এ ছিল নারীর বিরুদ্ধে শারীরিক সহিংসতা, কিন্তু এখানে যোগ হয়েছে পুরুষের তৈরি করা নারীর 'সর্বস্ব'-মিথ হরণের হুমকির মাধ্যমে মানসিক সহিংসতা। নারীরাই তার (পুরুষের) এই হত্যভাগ্য জীবনের জন্য দায়ী, যারা জন্ম দেয় কিন্তু দায়িত্ব নেয় না। সে নায়িকাকে তার অতীত কাহিনী জানায় এবং সব জেনেশুনে নায়িকা কাঁদতে শুরু করে। নায়িকার কান্না দেখে নায়ক জিজ্ঞেস করে, 'এই মেয়ে তুমি কাঁদছো কেন, আমিতো তোমাকে নষ্ট করিনি!' এই 'নষ্ট করা'র বিষয়টি সে একাধিকবার বলে। কিন্তু নায়িকা তাকে জানায় সে কাঁদছে আনন্দে, কারণ সে সত্যিকারের একজন মানুষের দেখা পেয়েছে, যে তাকে 'নষ্ট' করার হুমকি দিলেও আসলে সে জনদরদী, জনসেবামূলক একটি কাজ করতে গিয়েই না নায়িকার সঙ্গে তার এধরনের মোলাকাত হলো।

এই হলো বাংলা সিনেমার নারীর ইমেজ, পুরুষের হতভাগ্য জীবনের জন্য সমাজ নয়, নারীই দায়ী। আর নারীর কুমারিত্বই হলো প্রথম ও শেষ কথা, বিবাহবহির্ভূত কেউ তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে গেলেই তার সব শেষ, তার সর্বস্ব হরণ হয়ে গেল, সে 'নষ্ট' হয়ে গেল। নায়কের এই সাইকোপ্যাথ বৈশিষ্ট্য সে জন্মসূত্রেই অর্জন করেছে, কারণ সে জেনেছে যে তার মা তার জন্মের পরে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। তাই যেকোনো নারীর গর্ভে বাস্টার্ড জন্ম দেয়া সহজ ভাবনা ও ক্রোধের প্রকাশের মতো বিষয় হয়ে ওঠে। তবে জোরপূর্বক নির্জন স্থানে ধরে নিয়ে যাওয়া, শারীরিক লাঞ্ছনা, ধর্ষণ করার হুমকি ইত্যাদির বিপরীতে শেষ পর্যন্ত ধর্ষণ না-করা এবং নায়কের 'গরীবের বন্ধু' পরিচয় জেনে যাওয়া বড়ো হয়ে ওঠে -- নায়িকা নায়কের প্রেমে পড়ে যায়।

একই ঘটনা ঘটে বিদ্রোহী সালাউদ্দিন ছবিতে। সালাউদ্দিন চোরাকারবারী 'সমাজের শত্রু' খানবাহাদুরে বাড়িতে ডাকাতি করতে যায়, সেদিন ছিল খানবাহাদুরের মেয়ের বিয়ে। মেয়ের বিয়ের খাতিরে খান সেদিন বিদেশ থেকে আনা ডায়মন্ডের সেটসহ সমুদয় অর্থ তার হাতে তুলে দেয়। ফেরার পথে বিয়ের আসরে নৃত্যগীতরত নায়িকাকে দেখে সালাউদ্দিন মুগ্ধ হয়, নায়িকার রূপ-গুণের প্রশংসা করে এবং যে-ডায়মন্ড সেট বিক্রি করে তার গরীবদের মাঝে বিলানোর কথা, সেটা নায়িকাকেই উপহার দিতে চায়। নায়িকা তা প্রত্যাখ্যান করে তার দিকেই ছুঁড়ে মারে। এই 'বেয়াদবী'তে সালাউদ্দিন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, মুহূর্তে গুণমুগ্ধতা বাতিল করে 'ওই নষ্টা নারী' বলে চিৎকার করে ওঠে এবং বিয়ের আসর থেকে তাকে 'তুলে' তার আস্তানায় নিয়ে যায়। আস্তানায় গিয়ে সাইকোপ্যাথ সালাউদ্দিন চিৎকার করে বলে: 'সালাউদ্দিন নারীদের অসম্মান করে না। তুই আমার সাথে বেয়াদবী করেছিস, শাস্তি তোকে পেতেই হবে।' এরপর বেত দিয়ে নায়িকাকে সে প্রচণ্ড প্রহার করে, নায়িকা অজ্ঞান হয়ে যায়।
জ্ঞান ফিরে নায়িকা সালাউদ্দিনের অনুচরের কাছে জানতে পারে যে-হাত দিয়ে তিনি তাকে আঘাত করেছেন, সেই হাতেই তার ক্ষতস্থানে তিনি মলম লাগিয়ে দিয়েছেন। আর তিনি 'ডাকাত সালাউদ্দিন' নন 'দাতা সালাউদ্দিন', আর তার জীবনের অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর জন্যই তিনি আজ এই রূপে। নায়িকা নিজ চোখে সালাউদ্দিনের ত্রাণকার্য দেখে এবং তার প্রেমে পড়ে যায়।

মান্নার এই যুগল সাইকোপ্যাথ চরিত্র আসলে নারীর ওপরে প্রাধান্যশীল পুরুষের রাজনৈতিক বিজয়ের ঘোষণা করে। নায়ক চাইলে নায়িকাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছনা করতে পারে। এরপরও, এমনকি সে উপেক্ষা করলেও নায়িকা তার প্রেমে পড়বে। আর নারীর প্রতি এই সহিংসতা কোনো দুর্বল চরিত্রের ওপরে নয়, খোদ নায়িকার ওপরে যখন করা হয়, উপরন্তু তাকে অত্যাচার করার পরও যখন নায়িকার প্রেম পেতে কোনো কসরৎই নায়কের করতে হয়না, তখন নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি আরও বেশি প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়।

চলবে ...

চিত্র: বিদ্রোহী সালাউদ্দিন ছবিতে 'বেয়াদব' নায়িকাকে (পূর্ণিমা) শাস্তি দিচ্ছে আগ্রাসী নায়ক (মান্না)।

দ্রষ্টব্য: গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক প্রণীত 'বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প: সঙ্কটে জনসংস্কৃতি' (শ্রাবণ, ২০০৮) গ্রন্থে এই ধারাবাহিকটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১৩টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×