somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প: অটো সাজেশন

১৫ ই জুলাই, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বেড সুইচ চেপে আলো জ্বালতেই খাটের নিচ থেকে আসা অদ্ভুত শব্দটা থেমে গেল।

নীচ থেকে ভরাট কণ্ঠে কে যে বললো- লাইট অফ কর, দেখলে তো ভয় পাবি!

তিতলি সঙ্গে সঙ্গে আলোটা নিভিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো কিন্তু আর শব্দটা হলো না অনেকক্ষণ। জানলা দিয়ে সামান্য কিছু আলো ঢুকছে ঘরে যাতে অস্পষ্টভাবে নিজের অবয়ব দেখা যায়। সে আলোয় অন্য কাউকে দেখলো না। খাটের নীচ থেকে মাঝে মাঝে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আসছে। কেউ একজন নিশ্চিত আছে। কিন্তু বন্ধ ঘরে সে ঢুকলো কী করে!

রাত ভারী হচ্ছে অথচ ভয়ে সে ঘুমাতে পারছে না। বাথরুম চেপেছে কিন্তু খাট থেকে নামার সাহস হচ্ছে না। কেউ যদি পা টেনে ধরে! সাহস সঞ্চয় করে গলায় ভারিক্কি ভাব এনে বললো, কে আপনি? ওখানে কী করছেন?
ভরাট কণ্ঠটা বললো, আমি ভয়! এই যে দেখ-
অদ্ভুত শব্দটা আবার শুরু হলো। আবছা আলোতেও তিতলি স্পষ্ট দেখলো খাটের নীচ থেকে একজোড়া শীর্ণ-লম্বা হাত সড়সড় করে বের হয়ে আসছে। সে ভয়ে চিৎকার করলো কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। হাত দুটো লম্বা হতেই থাকলো, সাধারণ মানুষের হাতের চেয়ে অনেক লম্বা। ধীরে ধীরে বিছানার চাদর বেয়ে উঠে আসতে লাগলো। কণ্ঠটা চাপা স্বরে হা হা করে হাসছে।
তিতলি বেড সুইচ ধরার জন্য হাত বাড়ালো কিন্তু ধরতে পারলো না। সুইচটা সরল দোলকের মতো দুলতে লাগলো। হাত দুটো বিছানা বেয়ে উঠে আসছে। ও বিছানার চাদর খামচে ধরে উঠে বসার চেষ্টা করলো কিন্তু শরীর নড়লো না। যেন জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো।
শব্দটা থেমে গেল। শীর্ণ-লম্বা হাত দুটো থেমে গেল কিনা বোঝা যাচ্ছে না। তিতলি চোখ খোলার মতো সাহস পাচ্ছে না।

আজ বিকালে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।
সে বন্ধুদের সাথে নদীর পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিল। সাদা কাশবন দেখার লোভ সামলাতে পারেনি। কাশফুলের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে যা ওকে সবসময় আকর্ষণ করে। এলোমেলো বাতাসে চারপাশ ভেসে যাচ্ছিল, সে চুলের বাঁধন খুলে কোমর পর্যন্ত লম্বা চুলগুলোকে উড়তে দিল। ঠিক তখনি শুনতে পেলো অপরিচিত একটা কণ্ঠ বললো, এই মেয়ে চুল ছেড়েছিস কেন? জানিস না, নদীর পাড়ে শ্মশানঘাট আছে! ওখানে মড়া পোড়ায়!

আশে পাশে তাকিয়ে বন্ধুদের বাইরে অন্য কাউকে দেখলো না। নির্ঘাত ভুল শুনেছে। ব্যাপারটাকে গুরুত্ব না দিয়ে কাশফুলের সাথে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। হঠাৎ একটা দমকা বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেল। তখনি কণ্ঠটা আবারো ভেসে এলো, কি, কথা কানে যাচ্ছে না? এক্ষুণি চলে যা এখান থেকে নতুবা বিপদে পড়বি!
তিতলি ভয় পেয়ে গেল। যথারীতি আশেপাশে কেউ নেই। তাছাড়া বাতাসের শো-শো শব্দে সামান্য তফাতে থাকা বন্ধুদের কথাও ঠিক মতো কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে না। তাহলে কথাটা বললো কে?

বন্ধুদের বলতে পারলো না বিষয়টা, ওরা অহেতুক হাসাহাসি করবে। দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে ফেরার তাগাদা দিল সে। ফেরার পথে দেখলো কাশবনের উল্টোদিকের শ্মশান থেকে ধোঁয়া ভেসে আসছে, সম্ভবত মড়া পোড়ানো হচ্ছিল।

পঁচা একটা দুর্গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
চোখ খুললো তিতলি।
শব্দটা আবার শুরু হলো। শীর্ণ হাত দুটো বিছানা বেয়ে পায়ের কাছাকাছি চলে এসেছে। সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেললো কিন্তু এবার শব্দটা থামলো না। চাপা স্বরের হাসিটা আরো জোড়ালো হলো।

তিতলি আবারো চিৎকার করলো কিন্তু কোনো আওয়াজ হলো না। স্পষ্ট অনুভব করলো, হাত দুটো ওর একটা পা চেপে ধরেছে। অসম্ভব ঠাণ্ডা আর ভারী হাত। অনেকটা মৃত মানুষের শরীরের মতো। আতংকে দম আটকে যাবার উপক্রম হলো। হাত-পা ছুড়াছুড়ি করলো। অন্য পা'টা দিয়ে হাত দুটো সরানোর চেষ্টা করলো। হাত দুটো আরো জোড়ে চেপে বসলো।

এসময় হঠাৎ বেডসুইচটা হাতে এসে গেল। কিন্তু সে আলো জ্বাললো না। আলো জ্বালার পর সত্যি যদি অদ্ভুত কিছু একটা দেখে তাহলে কী হবে? তিতলির হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়লো। সম্ভবত গোলাম দস্তগীর স্যারের ফার্স্ট ইয়ারের পড়ানো কোর্সের কোনো একটা লেকচারের কথা! আচমকাই সে বদলে গেল। মনে মনে বলতে লাগলে, সব আমার মনের ভুল। আমার সাথে কিছু ঘটছে না। সব মনের ভুল। কিছু শুনছি না। আমি বিশ্বাস করি, জ্বীন-ভূত বলে কিছু নেই।

শব্দটা থেমে গেল। হাত দুটোও হারিয়ে গেল। তিতলি পা নাড়াতে পারলো সহজেই। তবু সে থামলো না, নিজেকে বলেই চলেছে, আমি বিশ্বাস করি আমার সাথে কিছু ঘটছে না। সব আমার মনের ভুল।

আলো জ্বেলে চোখ খুলে তাকালো। নেই, অস্বাভাবিক কিছু নেই। এখন সাহস করে খাটের নীচটা একবার দেখতে হবে। সে জানে খাটের নীচেও কিছু নেই, তারপরও দেখতে হবে। ভয়টাকে পুরোপুরি দূর করতে হবে। বুক ভরে দম নিয়ে খাটের নীচে উঁকি দিল। নাহ, কিচ্ছু নেই। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অনুভূতি হলো।

বাথরুমে যাবার জন্য মেঝে পা নামাতেই লক্ষ্য করলো, যে পায়ে শীর্ণ হাতদুটো ধরেছিল সেখানে একগাদা ছাই লেগে আছে।

ছবি: গুগল মামা।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২৪
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ সম্পদ কি?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২১



এই মুহুর্তে আমি গাজীপুর যাচ্ছি।
সময় সকাল দশটা। রবিবার। রাস্তায় জ্যাম যেতে অনেক সময় লাগবে। লাগুক। সমস্যা নেই, হাতে অনেক সময় আছে। আজ আমার কোনো কাজ নেই। বউ বাচ্চা বাসায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাসিত নক্ষত্রের শহর !

লিখেছেন দানবিক রাক্ষস, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯



রাতের শেষে যে শহর জেগে থাকে
তার ভাঙা নীয়ন আলোয়
আমি দেখেছি মানুষের মুখ—
অথচ দেখিনি মানুষ ।
দেখেছি ক্লান্ত আত্মারা,
ধীরে ধীরে আত্মহুতি দেয় প্রতিরাতে।

চারদিকে শব্দ ছিল,
হাজার কথার বিষাক্ত ভিড় ছিল,
কর্পোরেট... ...বাকিটুকু পড়ুন

"তোমরা আমাদের মানুষদের কেন খুন করলে?"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:০১

জাপানের মানুষেরা আজও বুঝতে পারে নাই, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের এভাবে হত্যা করা হলো। সেই দেশের মুরুব্বীরা এখনো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরেন। আক্ষেপ করেন। আমার বোনের জামাই জাপানে পোস্ট ডক... ...বাকিটুকু পড়ুন

শত্রুর শত্রু

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:১৪

উগ্রবাদী আর উদারবাদী, দুটি ইসলামই একই রাজনীতি করে। তাবলীগ জামাতের লোকটি মাঠে এসে বলে মেয়েদের ফুটবল হারাম। তারপর বিশ্বকাপে সৌদি আরবকে সমর্থন করে রাস্তায় নামে। এই দুটি আচরণ পরস্পরবিরোধী নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৬ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৩



বিয়ের মঞ্চে বসে আছি। মঞ্চ বলতে চকির মতো একটা খাট, তার সম্ভাবত এক পা ছোট বা নাই, কারন সামান্য নাড়াচাড়ায় খাটা টালমাটাল হয়ে একদিকে কাত হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×