somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বপ্ন শহরের রাজপুত্র শামসুর রাহমান

১২ ই নভেম্বর, ২০১০ বিকাল ৩:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



দিনটা হরতালের। তাতে কী, ফুল-পাখি-গাছপালা-প্রজাপতি সকলেই তো দিব্যি নিজ নিজ কাজ করে যাচ্ছে, তাদের তো কোনো হরতাল নেই; তাহলে আমার থাকবে কেন? প্রতিদিনকার মতো আজও আমার কাছে ভোরবেলাটা মিষ্টি, দুপুরটা উত্তপ্ত রোদের মধ্যেও কমলা রঙের আর বিকালটা অবশ্য সবুজ লালের মিলিত বর্ণের।
এর মধ্য থেকেই যেন একটি মুহূর্তকে বেছে নিয়ে শহরের নির্জন বা হৈ-হল্লা মুখর গলি দিয়ে রিক্সার টুংটাং বেল শুনতে শুনতে যাত্রী হয়ে কোথাও যাচ্ছি। এমন সময় চোখে পড়লো : রাস্তার পাশে একটা গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো কিন্তু গাছটার মাথার ডালপালা অনেকখানি কেটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কী কারণে কাটা হলো, এটা একটু মন দিয়ে তাকালেই টের পাওয়া যায়। কারণটা হলো : ওই গাছটা বেড়ে ওঠায় একটা পণ্যের বিজ্ঞাপন তার মুখ দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছিলো।
কিন্তু গাছতো প্রতিবাদহীন; গাছ যেন যীশুখ্রিস্ট বা মহাত্মা গান্ধির মতো নীরবে মানুষের সমস্ত পাপের শাস্তি একাই হজম করে কর্পোরেট পৃথিবীর মানুষদের মুক্ত করতে চাইছে। গাছের এ কর্তন আমি বা আমরা কি মেনে নিতে পারি?
আমরা তো স্বপ্ন দেখি সুন্দর একটা শহরের, যেখানে গাছ থাকছে তার নিজস্ব অধিকার নিয়ে। কেমন সে শহর, তা নিয়ে ভাবতে গেলেই মনে পড়ে যায় শামসুর রাহমানেরই কবিতার কয়েক লাইন-

হেঁটে যেতে যেতে
বিজ্ঞাপন এবং সাইনবোর্ডগুলো মুছে ফেলে
সেখানে আমার প্রিয় কবিতাবলীর
উজ্জ্বল লাইন বসালাম;
প্রতিটি পথের মোড়ে পিকাসো মাতিস আর ক্যান্ডিনিস্কি দিলাম ঝুলিয়ে।
[ হরতাল ]

২.
শামসুর রাহমান একসময় লিখেছিলেন ‘যদি বেঁচে যাই একদিন আরো/লিখবো’। তিনি সত্যি সত্যি লিখে গেছেন সারা জীবন। কবে প্রথম তার নাম শুনেছিলাম এটা ঠিক মনে করতে পারি না। তবে এইটুকুন বলতে পারি তার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল একটি ছোটকাগজকে উপলক্ষ্য করেই।
পলাশ দত্ত, আমি ও সাইফুল শামীম একটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করতাম। নাম প্রাণ-স্রোত। এর দ্বিতীয় সংখ্যায়ই আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম আবুল হাসানকে নিয়ে একটি সংখ্যা করার। তখন আবুল হাসানের কবিতা সমগ্র ঘাটতে গিয়ে আমাদের চোখে পড়ে, ওই বইয়ের শুরুতেই শামসুর রাহমানের দু’পৃষ্ঠার একটি ভূমিকা। পলাশ আর আমি সিদ্ধান্ত নেই শামসুর রাহমানের আবুল হাসান বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়ার। পরে ১৯৯৮ সালের কোনো একদিন আমরা সদ্য কৈশোর পেরুনো দুই তরুণ হাজির হই প্রথমবারের মতো শামসুর রাহমানের শ্যামলির বাসভবনে। সেই যে প্রথম যাওয়া, এরপর বহুবার গিয়েছি তার বাসায়।
মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রথম দিকে তিনি আমাকে আপনি আপনি বলে সম্বধন করতেন। তার এই অতি বিনয়ী আচরন, আমার জন্য খুবই অস্বস্তিকর ছিল। আমি একদিন যখন বললাম ‘রাহমান ভাই, আমাকে তুমি করে বইলেন।’ এরপর মুচকি এক হাসি দিয়ে তিনি আমাকে তুমি করে বলতে শুরু করেন।

শামসুর রাহমানের সাথে একটা বিষয়ে আমার মিল আছে, তা হচ্ছে আমাদের উভয়েরই জন্মদিন ২৩ অক্টোবর। আমার জন্মেরও ৪৮ বছর আগে ১৯২৯ সালে তিনি এ পৃথিবীতে এসেছেন। রাহমান ভাইয়ের জীবদ্দশায় দেখতাম তার জন্মদিনটা বেশ ঘটা করেই বিভিন্ন দৈনিকের সাময়িকীগুলো পালন করতো। ওই বছরগুলিতে আমি আমার জন্মদিনটা কাটাতাম বেশিরভাগ সময় শহরের রাস্তায় কিংবা চিড়িয়াখানায় একা একা ঘুড়ে। আমার কেন যেন তখন রাহমান ভাইয়ের কথাই মনে পড়তো।

মনে পড়ে একদিন সকাল সাড়ে দশটা কি এগারোটায় তার বাসায় বসে আছি, তিনি হঠাৎ জানতে চাইলেন নতুন কোনো কবিতা আছে কিনা। আমি পকেট থেকে কয়েকটি কবিতা বের করে তাকে শোনাচ্ছিলাম, পরে তিনি আমার হাত থেকে কবিতাগুলি নিয়ে দেখছিলেন। কবিতায় আমার কয়েকটি বানান ভুল ছিল, তিনি তা ঠিক করে দিচ্ছিলেন। এমন সময় তার এক ভক্ত তরুনী এসে হাজির। তরুণীটি সম্ভবত রাজশাহীতে বাস করতেন। তার ইচ্ছা ছিল রাহমান ভাইকে কবিতা দেখানোর। তরুনীটি যেই কবিতা বের করলেন, রাহমান ভাই সাথে সাথে বললেন, ওকে দেখাও। ও ভালো কবিতা লেখে, আমার চেয়েও ভালো কবিতা বোঝে...।’ আমি সেদিন খুব বিস্মিত হয়েছিলাম, আচমকা তার এই মন্তব্য শুনে।


[কালের খেয়া, ২২ অক্টোবর ২০১০]
















৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×