somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্য রচনা : লকডাউন ও ভুমিকম্প

২৬ শে এপ্রিল, ২০২০ রাত ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লকডাউনের ফলে রোজকার রুটিন চৌপট হয়ে গেছে। ঘুম ভাঙছে বেলা দশটায়। ব্রেকফাস্ট এগারোটায়। দুপুরের খাবার খেতে খেতে তিনটে বেজে যাচ্ছে। এই দেরির কারণে কাল যা রুদ্ধশ্বাস কাণ্ড ঘটল!
.
দুপুরে এখন সবার দিবানিদ্রার অভ্যেস হয়ে গেছে। কাল দুপুর তিনটেয় খাওয়া সেরে চারটার দিকে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। বউও কখন এসে শুয়ে পড়েছে জানি না।
.
ঘুম ভাঙল বাথরুমের তাড়নায়। ধড়মড় করে উঠে আলো জ্বাললাম। তারপর ঘড়ির দিকে চোখ যেতে ভিরমি খেলাম। সাড়ে বারোটা বাজে। বউও পাশে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
তাড়াতাড়ি ডেকে তুললাম। কিছুক্ষণ সময় লাগল বউয়ের ধাতস্থ হতে। জোর করে ঘুম ভাঙিয়ে দিলে যা হয় আরকি!
ধাতস্থ হয়ে বউ মাথা চাপড়ে বলল, "ইস সন্ধ্যে পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। যাই আগে সন্ধ্যেটা দিয়ে দিই। তারপর রুটি করি।"
আমি বললাম, "এই মাঝরাতে আর সন্ধ্যে দিয়ে কাজ নেই।"
বউ বলল, "তা হয় নাকি!"
অতঃপর বউ গিয়ে সন্ধ্যে দিল। অর্থাৎ ধুপ প্রদীপ জ্বেলে তিনবার শাঁখ বাজাল।
.
রেওয়াজ আছে ভূমিকম্প হলে শাঁখ বাজিয়ে অন্যদের সতর্ক করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। বাড়ির বয়স্করা জানেন।
আমাদের ঘরে শাঁখ বাজার পরেই পাশের মিত্তিরদের বাড়িতে বাজল। তারপর শর্মাদের বাড়িতে। তারপর মন্ডলদের বাড়িতে। তারপর পাড়ার সব বাড়িতে শাঁখ বাজতে শুরু করল।
.
হঠাৎ এই সম্মিলিত শঙখধ্বনিতে মধ্যরাতে যেন কী একটা হইহই রইরই ব্যাপার শুরু হয়ে গেল।
আমার বউয়ের মাঝরাতে সন্ধ্যে দেওয়ার ইরাদায় ব্যাপারটা যেদিকে গড়াল তার গুরুত্ব বুঝে ওর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল। আমারও অবস্থা তথৈবচ।
.
পাড়ার সবাই বোধহয় ভূমিকম্পের কারণে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমরা ঘরে বসে ঠকঠক করে ভয়ে কাঁপছি।
হঠাৎ দরজায় জোর ধাক্কা। ভজহরিদার গলা শুনতে পেলাম, "বেরিয়ে এসো, ভূমিকম্প হচ্ছে।"
বউ ভয়ে আমার হাত ধরে বলল, "এখন কী হবে?"
আমি বললাম, "স্বাভাবিক থাকতে হবে এখন। চলো বেরোই, নইলে সবাই বুঝতে পেরে যাবে যে আমরাই প্রথম বাজিয়েছি। আর তার পরিণাম কী হবে বুঝতেই পারছ!"
আমরা মুখে মাস্ক পরে দুরু দুরু বক্ষে বাইরে বেরোলাম। বেরিয়ে আমাদের পিলে চমকে গেল। সারা পাড়া রাস্তায় নেমে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। কয়েকজন ভলান্টিয়ার হয়ে সবাইকে দূরে দূরে সরে দাঁড়াতে বলছে। সোশ্যাল ডিসটেন্সিং মেনটেন করতে বলছে।
.
একটু পরেই পুলিশের গাড়ি এল। এক অফিসার ভ্যান থেকে নামলেন হ্যান্ড মাইক নিয়ে।
মাইকে বললেন, "বাইরে এত ভিড় কেন? সবাই ঘরে চলে যান। এক্ষুনি।"
কেউ একজন বলল, "ভূমিকম্প হচ্ছে যে। কেউ শাঁখ বাজিয়ে এলার্ট করেছে।"
অফিসার মাইকে গর্জন করলেন, "ভূমিকম্প-টম্প কিচ্ছু হয়নি। কেউ বদমায়েশি করে শাঁখ বাজিয়ে দিয়েছে। আপনারা এক্ষুনি সবাই ঘরে যান।"
ভজহরিদা কোথায় ছিলেন কে জানে, হঠাৎ কোথা থেকে এসে পুলিশ অফিসারকে কিছু বললেন। তারপরেই একজন কনস্টেবল লাঠি দিয়ে ধাঁই করে মেরে দিল ভজহরিদাকে।
আমরা উদ্বিগ্নচিত্তে দৌড়ে ঘরে ঢুকে গেলাম।
.
বউ ভয়ে চুপ করে বসে আছে। বলল, "আমারই দোষে এই কেলেংকারিটা হল! আসলে মা মারা যাওয়ার আগে বলেছিল, 'আমার ছেলেটা তো কিছুই মানে না, তুমি যেন রোজ সন্ধ্যেটা অন্তত দিও'।"
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম এমন সময় ফোন বেজে উঠল। ভজহরিদার ফোন। ধরতে বললেন, "আচ্ছা তুমি জানো কোন নচ্ছার প্রথম শাঁখটা বাজিয়েছিল?"
আমি আকাশ থেকে পড়ে বললাম, "না না আমি জানি না দাদা।"
ভজহরিদা বললেন, "শালা বেফালতু পুলিশের ডান্ডা খেলাম। কী ব্যথা মাইরি! একেই মাল খেতে পাচ্ছি না বলে দিমাগ গরম হয়ে আছে তার মধ্যে শালা এইসব ক্যাওড়ামি! তোমাদেরকে ডেকে দিয়েই আমি সোজা চলে গিয়েছিলাম ফরেন লিকার দোকানটার কাছে। যদি ভূমিকম্পে ঘরটা ভেঙে পড়ে তাহলে আগে কটা বোতল নিয়ে সটকে যাওয়ার প্ল্যান ছিল। উল্টে...যদি জানতে পারি কে এটা করেছে তাহলে তাকে উল্টো গাধায় চড়াব।"
যদিও আমি বুঝতে পারলাম না এখন গাধা কোথায় পাবে ভজহরিদা। শুধু বললাম, "ব্যথায় কিছু লাগিয়েছেন দাদা? ভোলিনি টোলিনি কিছু?"
ভজহরিদা বললেন, "হ্যাঁ বউ চুন-হলুদ গরম করছে। লাগিয়ে দেবে। আচ্ছা তোমাদের বেরোতে এত দেরি হল কেন বলোতো?"
সেরেছে, ধরা পড়ে গেলাম নাকি! আমি তাড়াতাড়ি বললাম, "মানে ওই মাস্ক খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাই।"
আমি কথা ঘোরানোর জন্য বললাম, "আচ্ছা কী বলেছিলেন পুলিশ অফিসারকে, যে আপনাকে ঠেঙাল?"
ভজহরিদা গভীর দুঃখের সঙ্গে বললেন, "আমি শুধু বলেছিলাম, 'স্যার মদের দোকান বন্ধ করে রেখেছেন, ভূমিকম্প তো হবেই!' তখন অফিসার , 'এই ব্যাটাই শাঁখ বাজিয়ে ঝামেলা পাকিয়েছে' বলে কেলিয়ে দিল!"
ফোন কেটে দিলেন ভজহরিদা। কালশিটেতে লাগানোর জন্য চুন-হলুদ বোধহয় রেডি হয়ে গেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০২০ রাত ১২:২৫
৬টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নায়িকা যিনি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১২



একদিন যে বিয়েকে ঘিরে ছিল পাঁচতারকা হোটেলের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ আর শত মানুষের করতালি, সেই সংসারের আকাশেই কয়েক বছরের মধ্যে জমেছিল বিচ্ছেদের মেঘ। ১৯৮৭ সালের মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়াঘর: কেস ফাইল #১৯৯৬ (দ্য লাস্ট রিল)

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২২


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ৯০-এর দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে জনমনে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আলোচনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার । গল্পে উল্লেখিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারখানা বাঁচাতে পারিনি, তাই মানুষকে অটো চালাতে হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৪


বাংলাদেশে এখন এমন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকট চলছে, যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় বিদ্যুৎ না পেয়ে চাকরি হারিয়ে অটো রিকশা চালাচ্ছেন। সেই অটো আবার চার্জ দিতে বিদ্যুৎ খাচ্ছে। যে বিদ্যুৎ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা কে রাখলে এমনি হবে...দাদা, যতদিন পারেন রাখেন

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২



২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে (Hindon Air... ...বাকিটুকু পড়ুন

×