
আমায় মাসে একবার সেলুনে যেতেই হয়। কারণ আমার চুলগুলো কমপ্লান খাওয়া বাচ্চার মতো, "দেখ আমি বাড়ছি মামি" টাইপের, দ্রুত বৃদ্ধিশীল। টাক পড়ল না এখনও যার ফলে আমার টাকাও হল না।
.
সেলুনে ঢুকে আনন্দ হল কারণ সেলুন ফাঁকা। ধনা বলল, "দাদা একে কেটেই(!) আপনাকে কাটব।"
দেখলাম একটা কমবয়েসি ছেলে, সদ্য কৈশোর থেকে যুবক হয়েছে, সিংহাসনে বসে আছে গায়ে জোব্বা জড়িয়ে।
একদিক দিয়ে ভালই হল, তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে অর্থাৎ মানসিক নির্যাতন কম হবে। আমার দৃঢ় ধারণা ধনা অনেক ভেবে চিন্তেই দোকানে একগাদা সিনেমা ম্যগাজিন "আনন্দলোক" রাখে। আর খদ্দের এলেই তার হাতে ঝটপট ধরিয়ে দেয়। অনেকক্ষণ ধরে সলমান খান, হৃত্বিক রোশনদের দেখার পর আয়নায় নিজের মুখ দেখলে বেশির ভাগেরই প্রথমে প্রচণ্ড ডিপ্রেশন আসে। তারপর :
১. সে আয়নার দিকে না তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে(যেমন আমি),আর ধনা মনের সুখে সট্ করে যাইতাই কেটে দেয়।
অথবা
২. সে ফেসিয়াল-টেসিয়াল করে নিজের মুখ হিরোদের মতো করতে চায়।
.
ধনা যে ইতিমধ্যে বিউটিশিয়ান কোর্স করেছে তা আমার জানা ছিল না। সহসা একদিন সে যখন নানান রকম ক্রিম-ট্রিম সাজিয়ে দিয়ে দোকানের নাম পাল্টে 'হিরো সেলুন' থেকে 'হিরো বিউটি পার্লার' করে দিল তখনই জানতে পারলাম ধনা বিউটিশিয়ানও বটে।
.
শোনা কথা, প্রথমদিকে একদিন এক বর মানে যার আবার সেইদিনই বিয়ে,ফেসিয়াল করাতে এসেছিল। আর ধনা ভুল করে ফেসপ্যাকের বদলে গোটা মুখে হেয়ার রিমুভার লাগিয়ে দিয়েছিল। ফলে যা হল,পাত্রের ভুরু-টুরু উঠে গিয়ে মুখটা বীভৎস আকার ধারণ করেছিল। বিয়ে হয়েছিল কিনা খবর পাইনি, তবে ধনার দোকান বন্ধ ছিল অনেকদিন।
.
মানসিক অত্যাচার এড়াতে আমি আর আনন্দলোকের দিকে তাকালাম না।
আর ছেলেটার চুল কাটাও হয়ে গেল। আমি বসার জন্য উঠে দাঁড়ালাম। সেই সময় ছেলেটা বলল,"আমার ভুরু প্লাক করে দাও।"
ভুরু? যাকগে মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিলাম, সে আর কত সময় লাগবে!
ভুরু হল তারপর যুবক বলল," চুলটা হাইলাইট করে দাও।"
হাইলাইট হল। এইবার নিশ্চিত উঠবে! ও বাবা সে গুড়ে কাঁকর দিয়ে সদ্য-যুবক ছেলেটি বলল, "ফেসিয়াল করব। সবচেয়ে ভালটা করে দাও।"
ধনা গম্ভীর গলায় বলল,"তাহলে গোল্ড ফেসিয়াল কর,ওতে সোনাগুঁড়ো দেওয়া থাকে তাই মুখ সোনার মতো চকচক করে।"
.
ফেসপ্যাকেও সোনা? আমি বুঝলাম সোনার দাম দিন দিন এত বেড়ে যাচ্ছে কেন।
ততক্ষণে ঘন্টা দুয়েক পেরিয়ে গেছে। এবার আবার ফেসিয়াল! নির্ঘাত ঘন্টাখানেকের ধাক্কা। আমি ধনাকে ডেকে বললাম, "আজ যাই। কাজ আছে।"
ধনা বাইরে বেরিয়ে বলল, "আচ্ছা কাল আসুন দাদা। আজকের খরচ এর থেকেই তুলে নেব।"
--"ছেলেটা কে? "
--"এ পাড়ায় থাকে। কাল নাকি কোন মেয়ে ওকে বলেছে, আয়নায় মুখ দেখে তারপর ঝারি মারতে আসতে, তাই আজ ও মুখ ঝুঙ্কু করতে এসেছে। ওর বাবা তিন হাজার টাকা দিয়েছে ইলেকট্রিকের বিল জমা দেওয়ার জন্য। বিল না দিয়ে ওই টাকা নিয়ে আমার কাছে চলে এসেছে। পুরো টাকাটাই আমায় দিয়ে যাবে। আপনি কাল আসবেন কিন্ত দাদা।"
.
( লকডাউনের আগেকার লেখা )
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মে, ২০২০ রাত ২:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


