
সে তো যাইহোক হল। রাতের ট্রেন। থ্রি টিয়ার। সর্বদাই যেমন হয় এবারেও আমার স্থান তেতলায়।
.
ট্রেনে ভ্রমণের জন্য স্লিপার ক্লাস শ্রেষ্ঠ। হকারের চিৎকার... মানুষের দৌড়াদৌড়ি... ইচ্ছে হলে কোনও স্টেশনে জানলা থেকে হাত বাড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা চা কিনে খাওয়া।
এসিতে সেসব নেই। নিরাপত্তার কারণেই বাধ্য হয়ে এসিতে ভ্রমণ। পরিচ্ছন্ন বটে তবে এসিতে প্রবেশ মানে এক শব্দহীন বাতাসশূন্য বদ্ধ ঘরে নির্বাসিত হওয়া।
খাওয়া তো আগেই হয়ে গেছে। তাই সুটকেস-ব্যাগেদের সীটের নিচে শুইয়ে দিয়ে, আলো নিভিয়ে, আমি স্বর্গারোহণ থুড়ি আপার বার্থে চড়ে পড়লাম। আমাদের উল্টোদিকে এক মাঝবয়েসি দম্পতি। ভদ্রলোকের মাথায় পনেরোটা সোনালি পাঁচটাকার কয়েন একত্র করলে যেমন হয় সেইরকম আয়তনের চকচকে টাক।
তাঁর আরও গুণাবলি প্রকাশ পেল শুয়ে পড়ার পর। ডিজের আওয়াজ হার মেনে যাবে এমন নাকের গর্জন। নিস্তব্ধ এসির কাঁচের জানলায়-দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে তা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
কী আর করা, আমি সন্দীপনের উপন্যাস "কুকুর সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমি জানি" তে ডুবে গেলাম।
.
মাঝ রাতে চোখ দুটো একটু লেগেছে এমন সময় দেখলাম আলো জ্বলে উঠল। আমার উনিই জ্বালিয়েছেন। কী হল আবার? উল্টোদিকের নাকডাকিয়েকে ততক্ষণে ঠেলে তুলেছেন উনি।
নাক ডাকা থেমে যেতেই পৃথিবীতে অপার শান্তি নেমে এলো।
তাঁকে তুলে উনি বললেন, "একটু দেখুন না, আমার কানের একটা দুল কোথায় পড়ে গেল। খুঁজে পাচ্ছি না।"
ভদ্রলোক উঠলেন। খুব অসভ্য বর্বর না হলে এক নারীর আবেদন অগ্রাহ্য করা যায় না।
তিনি উঠে খোঁজা শুরু করলেন। চাদর-বালিশ কম্বল দিয়ে শুরু হল। তারপর লাগেজ সরিয়ে মেঝে।
.
আমি বুঝলাম সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। কানের দুল মানে সোনার গয়না হারানো যে কী ভয়াবহ অমঙ্গলের সেতো বাড়ির বড়দের কাছে সহস্রবার শোনা। অতএব বউয়ের মেজাজ গরম হবে। ফলত এবারের বেড়ানোটাই মাটি হল। আমি আরও বিষণ্ণ হয়ে নামতে গেলাম। বউ আমার দিকে এমন কটমট করে চাইল যে থমকে গেলাম। বলল, "তুমি এলে কাজের কাজ কিছুই হবে না মাঝখান থেকে হয় মাথা ঠুকে নেবে বা চোখে খোঁচা খাবে। তার চেয়ে যেমন আছ তেমনই থাকো।"
.
ঘন্টা খানেকের চেষ্টাতেও দুল খুঁজে পাওয়া গেল না। এই এসির ঠান্ডাতেও পরিশ্রমে ভদ্রলোকের টাক ঘামে সপসপে হয়ে গেছে। ভুবনেশ্বর আসতে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা নেমে পড়ে বাঁচলেন। তাঁরা নেমে যেতে আমিও তেতলা থেকে নামলাম।
বউ বলল, "বেশ তো শুয়েছিলে, নামলে কেন?"
বললাম, "বাথরুম যাব। এসে আমিও একটু চেষ্টা করে দেখব।"
বাথরুম থেকে ফিরে আসতে বউ বলল, "আমি আলো নিভিয়ে দিচ্ছি। শুয়ে পড়ো। আমিও একটু শুই।"
.
আমি অবাক হয়ে তেনার দিকে তাকাতেই তিনি টপ করে হ্যান্ড ব্যাগ খুলে একটা কানের দুল বের করে ফেললেন।
খালি কানে দুলটা পরতে পরতে বললেন, "নাক ডাকার চোটে আমার মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বাপরে এমন নাক ডাকা যেন দশখানা শাঁখ, কারখানার সাইরেন সব একসঙ্গে বাজছে। থামানোর আর কোনও উপায় ছিল না.. তাই নেহাত বাধ্য হয়েই মিথ্যে বলতে হল..."
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০২০ রাত ২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


