
.
আজ জরুর কুছ মিলেগা, গাইতে গাইতে (আনন্দ হলেই কেন জানি না আমার মনের মধ্যে হিন্দির বুদবুদ ওঠে) আমি বাজারের থলি নিয়ে বাজারের দিকে সাঁইসাঁই পা বাড়ালাম।
.
একটা লটারির টিকিট কাটা আছে, ফার্স্ট প্রাইজ পঞ্চান্ন লাখ টাকা, সেটাই পাব নাকি? আর কী কী "প্রাপ্তিযোগ" থাকতে পারে ভাবতে ভাবতে উড়তে উড়তে বাজারে পৌঁছে গেলাম।
.
ঢোকার মুখেই দেখা হয়ে গেল নরোত্তমবাবুর সঙ্গে। উরি ত্তারা! এই সত্তর প্লাসেও বুকে 'ট্র্যাপ' লেখা টাইট গেঞ্জি, কুচকুচে কালো কলপ মারা চুল, টগবগ করে টাট্টু ঘোড়ার মতো হাঁটছেন!
কাছে গিয়ে বললাম, "ভাল আছেন?"
ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ও তুমি! তা ভাল না থাকলে বাজার এলাম কী করে? গাধার মতো প্রশ্ন করছ কেন?"
আমি আমতা আমতা করে বললাম, "ও ভালই আছেন তাহলে। আচ্ছা আসি।"
নরোত্তমবাবু গর্জে উঠলেন, "দাঁড়াও দাঁড়াও। আচ্ছা তুমি কি ভাবতে পারনি আমি ভাল থাকতে পারি? "
আমার তখন ওই ধরণী থুড়ি পিচ-রাস্তা দ্বিধা হও অবস্থা! মরতে কেন যে জিগ্যেস করতে গেলাম!
বললাম, "এ বাবা, ছি ছি তা আমি ভাবতে পারি? আপনি ভাল থাকুন আমি সর্বস্বান্ত না না সর্বান্তঃকরণে চাই।"
নরোত্তমবাবু বললেন, "হুম মনে পড়েছে। অফিসে একবার না বলে ডুব মারার জন্য তোমায় ধমক দিয়েছিলাম! তা সেই কবেকার রাগ পুষে রেখেছ?"
আমি বললাম, "বিশ্বাস করুন আমার মনেই ছিল না সে কথা। জাস্ট আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছে তাই এমনি এমনি জিগ্যেস করেছি। আমি আসছি। অফিসের দেরি হয়ে যাবে।"
-- "দাঁড়াও দাঁড়াও তুমি ভেবেছিলে আমি ভাল নেই, তাই তো? কেন ভেবেছিলে? আচ্ছা কাল রাত্রে যখন দোকান থেকে ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরছিলাম তখন একটা পাথরের টুকরো উড়ে এসে আমার পাশে পড়েছিল। আর একটু হলেই মাথায় পড়ত। তুমিই ছুঁড়েছিলে নাকি হে?"
.
হায় হায় এ কী ঝামেলায় পড়লাম রে বাবা! এবার তো পুরো পুলিশ কেস!
এটেম্পট্ টু মার্ডার। সেকশান ৩০৭ আইপিসি। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
কেন মরতে যে জিগ্যেস করলাম! সব শালা ওই রাশিফলের জন্য। ড্যাশের প্রাপ্তিযোগ!
বললাম, "মা কালির দিব্যি বলছি, বিশ্বাস করুন আমি ঢিল মারিনি। আচ্ছা আপনি এই চিনলেন আমায়? আমি কাউকে ঢিল মারার মানুষ? বউ বলে আমার মতো ভীতুর ডিম পৃথিবীতে দুটো নেই.."
.
আমার চোখের সামনে সাদা-কালো স্ট্রাইপ দেওয়া জেলের কয়েদিদের পোশাক ভেসে উঠল, করুণ স্বরে বললাম, "আমি এমন ভীতু যে নাগরদোলায় উঠতে ভয় পাই। ষাঁড় যদি রাস্তায় থাকে তাহলে সেই রাস্তায় যাই না আর আপনাকে গিয়ে ঢিল মারব?'
-- "মানে? তুমি আমাকে ষাঁড় বললে? আমি ষাঁড়?"
.
এ তো মহা মুস্কিল! বললাম, "না না সেকি কথা! আমি আপনাকে কেন ষাঁড় বলব?"
-- "বিয়ে করিনি আর কিছু বদমাশ আমার নামে মেয়েদের নিয়ে স্ক্যান্ডাল ছড়িয়েছে সেইসব শুনে তুমি আমায় ষাঁড় বলে ইনসাল্ট করলে? এতবড় সাহস তোমার? তোমার থেকে বয়সে এত সিনিয়ার একজনকে ষাঁড় বলতে লজ্জা করল না তোমার? পাথর মারছ, ষাঁড় বলছ... ভেবেছ কী? দেশে আইন-কানুন নেই?"
.
ইতিমধ্যে পাব্লিক জড়ো হতে শুরু করেছে।
ক্যাচালপ্রেমী পাব্লিকে ভরে আছে আমাদের রাস্তাঘাট। একটু গন্ধ পেলেই হল!
একজন নরোত্তমবাবুকে বলল, "কী হয়েছে? আপনাকে মেরেছে? কোথায় লেগেছে? ব্লিডিং-ফ্লিডিং হচ্ছে নাকি?"
তারপর আমার দিকে ফিরে, "আরে মশাই দেখে তো জেন্টিল জেন্টিল মনে হচ্ছে। তাও ঝাড়পিট করছেন?"
.
আমি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি হয়ে গেছি। মনে হচ্ছে বাকি জীবন এখানেই রাস্তার সঙ্গে চিপকে দাঁড়িয়ে থাকব।
শেষমেষ ওই ষাঁড়ই আমায় বাঁচাল। একটা ম্যাগনামাকার ষাঁড় ফল দোকানের কলা খেতে গিয়ে তাড়া খেয়ে হুড়ুদ্দুম করে আমাদের দিকে দৌড়ে এল। ক্যাচালপ্রেমী পাব্লিকগণ ও নরোত্তমবাবু নিমেষে হাওয়া...
.
আর আমি? দুশো মিটার দৌড়ের কমনওয়েলথ, এশিয়ান, অলিম্পিক রেকর্ড ভেঙে চুরচুর করে বাড়ি পৌঁছে হাঁপাতে হাঁপাতে বউকে বললাম, "মাথা ঘুরছে, বাজার করতে পারিনি, খিচুড়ি বসাও..."
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুন, ২০২০ রাত ১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


