somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কলকাতা নাইট রাইডার্সঃ পরাজয়ের ময়না তদন্ত

০৪ ঠা মে, ২০০৯ রাত ৯:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০০৮ সালে যখন ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ আইপিএল এর পর্দা উন্মোচিত হয়, প্রথম ম্যাচেই আলো ছড়িয়ে ছিলো ব্র্যান্ডন ম্যাকালামের ব্যাট। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোর এর বিরুদ্ধে ম্যাকালামের ৭৩ বলে খেলা ১৫৮ রানের ইনিংসটি যেন পরিণত হয় টি ২০তে বিস্ফোরক ব্যাটিং এর আদর্শ উদাহরণ হিসেবে! সেই ম্যাকালাম এবারের মৌসুমে অধিনায়কের দ্বায়িত্ব পেয়েছেন, হারিয়েছেন ব্যাটিং এর ঔজ্জ্বল্য! ২০০৯ এর আইপিএল এ সাত ম্যাচে তার সংগ্রহ ৫০ রান, সেরা ২১! আর এবারো ম্যাকালামের ব্যাটিং যেন পুরো কলকাতা নাইট রাইডার্স দলেরই প্রতিচ্ছবি-ভংগুর, অস্থিতীশীল ও নৈরাশ্যজনক।

আইপিএল যতটা ক্রিকেটের আসর তারচেয়ে বড় ব্যবসা, ভারতের শিল্পপতি ও সিনে তারকারা বিভিন্ন দেশীয় ও বহুজাতিক সংস্থার সহায়তায় ক্রিকেটের মোড়কে প্রচার করছেন বিভিন্ন পন্যের বিজ্ঞাপণ। সেই কারণে ২০০৮ এর আসরে শীর্ষ চারে উঠতে না পারলেও সবচেয়ে লাভবান দলটির নাম কলকাতা নাইট রাইডার্স। এবারো খেলোয়াড়দের পোশাককে বিজ্ঞাপণের বোর্ড বানিয়ে টিভি পর্দায় হাজির আইপিএল। তাই এখানে যে ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞার চেয়ে ব্র্যান্ডিং প্রসার পাবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। তাই তো নতুন মিউজিক ভিডিও, বিজ্ঞাপণ আর মোহনীয় চিয়ার লীডারদের নিয়ে হাজির শাহরুখ ‘কিং’ খানের কলকাতা নাইট রাইডার্স। কিন্তু এই দলে ক্রিকেটের অবস্থান, একেবারে তলানীতে।
আইপিএল এ নেই কোন রেলিগেশন বা অবনমন। তাই দল খারাপ করলেও ব্যবসায়ীদের কিছু আসে যায় না! স্পন্সর, টিভি স্বত্ব আর বিলবোর্ড বিজ্ঞাপণ থেকে টাকা আসলেই হলো, ক্রিকেটের মান বাড়ানোর অনেক সময় আছে! আর সেই স্পন্সরদের চাপেই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায়!

চার অধিনায়ক তত্ব, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সুনীল গাভাস্কার-শাহরুখ খানের বাদানুবাদ, অধিনায়ক পরিবর্তন, অজ্ঞাতনামা ব্লগারের ড্রেসিং রুমের গোমর ফাঁস, মাশরাফির সাথে চুক্তি নিয়ে জলঘোলা করা- সব মিলিয়ে হিন্দী সিরিয়ালের সব উপকরণই ছিলো নাইট রাইডার্স শিবিরে। শুধু ছিলোনা মানসম্মত ক্রিকেটার। আইপিএল এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ম্যাচে সর্বোচ্চ চারজন বিদেশী খেলোয়াড় খেলতে পারবে, অর্থাৎ বাকী সাতজনকে হতে হবে ভারতীয় খেলোয়াড়! এই সহজ সূত্রটাই বুঝতে পারেননি বুকানন-জয় ভট্টচার্যরা। ম্যাকালাম-গেইল-ব্র্যাড হজদের পাশে তাই আকাশ চোপড়া-সঞ্জয় বাঙ্গার –লক্ষীরতন শুক্লা- অজিত আগারকার। যারা জাতীয় দল থেকে ব্রাত্য হয়েছেন অনেক আগেই। ক্রিকেটে পরিসংখ্যান অনেক সময়েই মিথ্যা আবার কখনো সত্য। কারণ দিন শেষে হারজিতের যে অংক সে তো পরিসংখ্যান থেকেই আসা। এবারে নজর দেওয়া যাক কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যানের দিকে।
আকাশ চোপড়া-রঞ্জি ট্রফিতে দিল্লী দলের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান, ভারতীয় দলের জার্সী গায়ে ১০টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। সেখানে স্ট্রাইক-রেট ৩০ এর একটু বেশী। কখনো একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতীয় দলে ডাক পাননি। রান করার চেয়ে মাটি কামড়ে ক্রিজে পড়ে থাকার জন্য খ্যাতিমান এই খেলোয়াড়কে নেওয়া হয়েছে টুয়েন্টি ২০ একাদশে। তারপর তাকে টুর্নামেন্টের মাঝখানে আবার দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, ফিরে এসে আকাশ চোপড়া আবার ‘ম্যাক্স’ স্যাটেলাইট চ্যানেলে বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ম্যাচ বিশ্লেষণ করছেন! সত্যিই সেলুকাস! এমন আরেক খেলোয়াড় সঞ্জয় বাঙ্গার, ভারতীয় রেলওয়ের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ও বোলার। ভারতীয় দলের হয়ে ১২টি টেস্ট ম্যাচ ও ১৫টি একদিনের ম্যাচ খেলেছেন। বেশ কিছু টেস্ট ম্যাচে ওপেনার এর ভূমিকাও পালন করেছেন মনোজ প্রভাকরের আদর্শে অনুপ্রাণিত এই ‘অলরাউন্ডার’। গত বছর তিনি ছিলেন ডেকান চার্জার্স দলের সদস্য। আইপিএল ২০০৮ এ ডেকান চার্জার্স দলের অবস্থান ছিলো আট দলের মধ্যে অষ্টম। আর ২০০৯ এর আসরে এখন পর্যন্ত নাইট রাইডার্সের অবস্থানও তাই। এবং এই অবস্থান যে সহসা পরিবর্তন হবে এমনটাও মনে হচ্ছে না। নিজেকে নিশ্চয়ই লাকী চার্ম ভাবছেন না বাঙ্গার!
এবার আসা যাক নাইট রাইডার্স দলের বোলিং আক্রমণের ব্যাপারে। দলের একমাত্র বর্তমান ভারতীয় দলের সদস্য, বল হাতে ভারতের নতুন সেনসেশন ঈশান্ত শর্মা। তার সাথে আছেন অজিত আগারকার, লক্ষ্মীরতন শুক্লা ও অশোক দিন্দা। পরপর সাতটি ম্যাচে শুন্য রানে আউট হওয়ার কারনে মুম্বাই ডাক বা ০০৭ উপাধি পাওয়া এই ক্রিকেটার সর্বশেষ ওডিআই খেলেছেন ২০০৭ সালে। এরপর তার দলে ডাক না পাবার কারণ, খরুচে বোলিং। একদিনের ম্যাচে আগারকারের ইকোনমি রেট ওভার প্রতি ৫ রানের বেশী। টুয়েন্টি ২০ তে ইকোনমি রেট ৮ ছাড়িয়ে গেছে। লক্ষ্মী রতন শুক্লা সেই কবে ১৯৯৯ সালে তিনটে ওয়ানডে ম্যাচে খেলেছিলেন, তাতে শিকার মোটে ১ উইকেট আর ব্যাট হাতে সর্বমোট ১৮ রান। এই হলো শুক্লার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান। ইকোনমী ৫ এর কোঠায়। তারপর সংগত কারণেই আর ‘ইন্ডিয়া’ খেলা হয়নি এই অলরাউন্ডারের। প্রতিপক্ষের রান উৎসবে লাগাম পরানোটা তাই ঈশান্তের একার কাঁধে। তরুণ ঈশান্তের ওপর প্রত্যাশার চাপটা মনে হয় বেশীই হয়ে গেছে। প্রথম আসরের প্রতিশ্রুতিশীল বোলার আশোক দিন্দাও রানের বন্যায় বাঁধ দিতে পারছেন না। বরং ক্রিস গেইল, ভ্যান উইক কিংবা ব্র্যাড হজের মতো পার্ট-টাইমাররা অনেক ভালো ফল বয়ে নিয়ে আসছেন।
এবার বহুল আলোচিত বুকানন প্রসংগ। জন বুকানন, অস্ট্রেলিয়া দলের প্রাক্তণ কোচ। তার নেতৃত্বে অনেক সাফল্য আছে অসি দলে। কিন্তু এখানে এসে কি হলো বুকাননের, যে বলে বসবেন আইপিএল এর চাপ নিতে পারছেন না! বারবার নিজের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবেন। কারণ মাঠের পারফর্ম্যান্স। তার অধীনে অস্ট্রেলিয়া দলে ছিলো মার্ক ওয়াহ, স্টিভ ওয়াহ, ম্যাথু হেইডেন, ম্যাকগ্রা, গিলক্রিস্ট, মার্টিন দের মতো খেলোয়াড়। আর কেকেআর দলে আছে আকাশ চোপড়া -সঞ্জয় বাঙ্গার- অজিত আগারকারের মতো খেলোয়াড়। তাই তাদের কাছ থেকে আইপিএল এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে টুয়েন্টি ২০তে ভালো ফল আশা করা আর চৈত্রের গরমে তুষারপাতের আশা করা একই কথা। অবশ্য পাড়ার ক্রিকেট হলে ভিন্ন কথা!

তাই ভূলটা বুকাননের নয়, খেলোয়াড়দের ভূল নয়, আমাদের নিজেদের, দর্শকদের। আমরা যারা প্রতিবেশী অংগরাজ্য বলে, বাংলা ভাষা- ভাষী বলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের সমর্থক বনে যাই, মাশরাফীকে ওদের দলে টানা নিয়ে বেলুন ওড়াই। কিন্তু ভুলে যাই ওদের কাছে ক্রিকেট মানে ব্যবসা, ক্রিকেটাররা এখানে সিনেমার জুনিয়র আর্টিস্টদের মতোই নগন্য আর নায়ক-নায়িকার আসনে স্পন্সর গোষ্ঠী। যারা আকাশ চোপড়া-আগারকার-বাঙ্গারকে টি ২০দলে ভেড়ায় তাদের ক্রিকেটীয় প্রজ্ঞা আর মেধার দৌড় কত টুকু তা বুঝতে আর বাকী নেই। মাশরাফীকে দলে নেওয়াটাও ছিলো বাংলাদেশের মানুষের জনসমর্থন আদায়, এখানকার বাজারে বিজ্ঞাপণ প্রচারের এক নয়া ফন্দি। মাশরাফীর ক্রিকেট যোগ্যতা সেখানে মুখ্য নয়,তাইতো দক্ষিণ আফ্রিকার ‘আইপিএল’ এ মাশরাফী অকেজো। তাই হেনরিকসরা খারাপ করেও দলে থাকেন আর মাশরাফি পানির বোতল টানেন!
দিনের শেষে তাই রানরেট আর ওভাররেটের বদলে এয়ারটাইম রেট আর বিলবোর্ড রেটের হিসেব। দল হারুক কি জিতুক, কিং খান আছেন, তার ভক্তরা আছেন। স্পনসররা আছে, টাকা আসছে। ম্যাচ জিতে কি হবে?


















































































০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×