somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রীয় নক্ষত্র - চন্দ্রনিবাস

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০২৫ সকাল ৯:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চন্দ্রনিবাস
ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বৈদিকদের জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে নক্ষত্র হল চন্দ্রপথের ২৮টি ভাগ যেগুলো চন্দ্রনিবাস হিসাবে পরিচিত। সূর্যের গতিপথকে যেমন ১২ ভাগে ভাগ করে, প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে রাশি। তেমনি চন্দ্রপথকে ২৮ ভাগে ভাগ করে প্রতি ভাগের নাম রাখা হয়েছে নক্ষত্র।
বিভিন্ন দেশে চন্দ্রনিবাস -এর নাম বিভিন্ন। ভূমধ্যঞ্চলীয় আরবে ও পূর্বাঞ্চলীয় চীনে সময় পরিমাপের এ প্রাকৃতিক ঘড়িটিকে ২৮ ভাগেই ভাগ করে নিয়েছে। আরবরা একে বলে 'মঞ্জিল'। চীনাদের কাছে 'সিউ' নামে পরিচিত। মিশরেও এমন এক আকাশ বিভাজন পাওয়া যায়, যা ৩৬ ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি বিভাগ 'দোকান' নামে পরিচিত।

যোগতারা ভোগ
চাঁদ প্রত্যেক তিথিতে একেকটি নক্ষত্রের সীমানায় অবস্থান করে। পূর্ণিমার দিন চাঁদ যে নক্ষত্র অবস্থান করে, তদানুসারে মাসের নাম বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ় ইত্যাদি রাখা হয়েছে। প্রত্যেক নক্ষত্রের আকাশস্থানের পরিমাণ (৩৬০/২৮=১২ ডিগ্রী ৮৬ মিনিট)। প্রতিটি নক্ষত্রের একটি বিশেষ তারাকে (সাধারণত উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে) নির্দিষ্ট করা হয় যাকে যোগতারা বলে। কোন নক্ষত্রের আদিবিন্দু থেকে ঐ নক্ষত্রের যোগতারা পর্যন্ত ভূকক্ষের অংশকে উক্ত নক্ষত্রের ভোগ বলে।
শাস্ত্রে নক্ষত্রের অবস্থান এবং যোগতারা নির্দিষ্ট করা আছে। তাই প্রত্যেক নক্ষত্রের ভোগ নির্দিষ্ট। এর কোন পরিবর্তন হয় না।

Western Astrology
পাশ্চাত্য জ্যোতিষে constellation বা fixed star এর আলাদা নাম আছে, কিন্তু সেগুলো ভারতীয় ২৭টি নক্ষত্রের একে অপরের সাথে mapping নয়। অর্থাৎ পাশাত্য জ্যোতিষশাস্ত্রে ভারতীয় বৈদিক ২৭টি নক্ষত্রের কোন সমতুল্য নেই। বৈদিক জ্যোতিষে যেখানে চন্দ্রপথ ভিত্তিক ২৭টি নক্ষত্র ব্যবহৃত হয়, পাশাত্য জ্যোতিষে মূলত ১২টি রাশি (Zodiac Signs) এবং ৮৮টি আধুনিক নক্ষত্রপুঞ্জ
(Constellation) ব্যবহৃত হয়, যা একেবারে আলাদা একটি গণনা।

বৈদিক নক্ষত্র (Indian Astrology) অনুযায়ী প্রচলিত (উদাহরণঃ Ashwini, Bharani ইত্যাদি) এবং পাশ্চাত্যেও সেভাবেই ব্যবহৃত হয়।পাশ্চাত্যে মূলত ১২টি Zodiac sign যেমন, (Aries, Taurus, Gemini, Cancer, Leo, Virgo, Libra, Scorpio, Sagittarius, Capricorn, Aquarius, Pisces)

প্রতিটি নক্ষত্রের নিজস্ব পাত্র, শক্তি, চরিত্র ও প্রভাব রয়েছে, যা বৈদিক জন্মকুন্ডলীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো চন্দ্রের গতিপথ অনুসারে বিভক্ত এবং প্রতিটি নক্ষত্র প্রায় ১৩ ডিগ্রী ২০ মিনিট করে অবস্থান করে। এ নক্ষত্রগুলোর প্রতিটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, শক্তি, প্রতীক ও দেবতা দ্বারা চিহ্নিত। ২৭টি নক্ষত্রের তালিকাঃ
১. অশ্বিনী
২. ভরণী
৩. কৃত্তিকা
৪.রোহিণী
৫. মৃগশিরা
৬.আর্দ্রা
৭.পুনর্বসু
৮.পুষ্য
৯.আশ্লেষা
১০.মঘা
১১. পূর্ব ফল্গুনী
১২. উত্তর ফল্গুনী
১৩. হস্ত
১৪.চিত্রা
১৫. স্বাতি
১৬. বিশাখা
১৭. অনুরাধা
১৮. জ্যেষ্ঠা
১৯. মূলা
২০. পূর্বাষাঢ়া
২১. উত্তরাষাঢ়া
২২. শ্রবণা
২৩.ধনিষ্ঠা
২৪. শতভিষা
২৫.পূর্বভাদ্রপদ
২৬. উত্তরভাদ্রপদ
২৭. রেবতী

১. অশ্বিনী
দেবতাঃ অশ্বিনী কুমার
প্রতীকঃ ঘোড়ার মাথা
বৈশিষ্ট্যঃ চটপটে, দ্রুত কর্মক্ষম

অশ্বিনীকুমার - স্বর্গের চিকিৎসিক
অশ্বিনীকুমারদ্বয় মূলত বৈদিক দেবতা। তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সবিত (সূর্যদেব) ও শরণ্যু , নামান্তরে সংজ্ঞা, দেবীর যমজ পুত্রদ্বয় হিসাবে উল্লিখিত ও পরিচিত। ঋগবেদে এই যমজ দেবতাদের ভিষক ও চিকিৎসক হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

জন্মকাহিনী
সূর্য ও সংজ্ঞা অশ্বরূপে সংগম করার ফলে এই যমজ পুত্রের জন্ম হয়েছিল। সূর্যের প্রচন্ড উত্তাপ সহ্য করতে না পেরে সংজ্ঞা পিত্রালয়ে পলায়ন করে এবং ঘোটকীর রূপ ধারণ করে ভ্রমন করতে থাকে। পরে সূর্য যোগবলে সকল কথা জানতে পেরে অশ্বের রূপ ধারণ করে সেই স্থানে আসেন। এবং তার গর্ভে সূর্যের ঔরসে অশ্বরূপী যমজ দুই পুত্রসন্তানের জন্ম।
বহু মূর্তিতেই অশ্বিনী কুমারদের তাই অশ্বমুখ দেখা যায়। এঁদের ভেতর যিনি অগ্রজ, তার নাম নাসত্য। যিনি অনুজ তার নাম দস্র।

বিশেষত্ব
তারা চিকিৎসাবিদ্যায় সুপণ্ডিত হয়ে স্বর্গে চিকিৎসা করায় "স্বর্গবৈদ্য" উপাধি পান। তারা মাদ্রীসুত নকুল ও সহদেবের জনক।
বেদ অনুসারে দেবতাগণ মোট ৩৩ প্রকার - ৮ প্রকার বসু, ১১ প্রকার রুদ্র, ১২ প্রকার আদিত্য এবং ২ জন অশ্বিনীকুমার।
অশ্বিনীকুমারদ্বয় হলেন চিরযৌবন ও চিরায়ুর প্রতীক এবং সকল চিকিৎসকের আরাধ্য দেবতা।

২. ভরণী (Bharani)
দেবতাঃ যম
প্রতীকঃ যোনি
বৈশিষ্ট্যঃ শক্তি, সহনশীলতা
ভরণী নক্ষত্রঃ ভরণী ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে ২৮টি নক্ষত্রের দ্বিতীয় সদস্যা। প্রাচীন ঋগ্বেদের ঋষিরা একে ডাকতো 'যম', 'সংযম', 'সংবরন বা 'বিবস্বান নামে।
ভরণী নাক্ষত্রের দেবতা "যম", মৃত্যুর দেবতা, নিঃস্বাস, প্রশ্বাসের দেবতা। যম স্বার্থ ত্যাগ, নিয়মানুবর্তিতা, এবং সততার দেবতা।
ভরণী শব্দের অর্থ যা ভরণযোগ্য, পোষ্য, চাকর আশ্রিত বা যাহা দ্বারা ভরণ করা যায় অর্থাৎ জীবিকা অর্জন করা যায়। এই নক্ষত্র একদিকে ঐশ্বর্য্য, ভোগ, সাহস, উৎসাহ, বলবীর্যের কারক আর একদিকে যা কিছু শুভ, শুদ্ধ, সাধু, সত্যতার কারক।

যমদেব - মৃত্যু ও ন্যায়বিচারের দেবতা
যম বা যমরাজ বা কাল বা ধর্মরাজ হলেন মৃত্যু ও ন্যায়বিচারের হিন্দু দেবতা, এবং তাঁর বাসস্থান যমলোক বা যমপুরী।

জন্ম ও পরিচয়ঃ বিভিন্ন পুরাণ তাঁকে সূর্য দেবতা (বা বিবস্বান) এবং সংজ্ঞার পুত্র এবং যমী (যমুনার) যমজ ভ্রাতা বলে বর্ণনা করে। বৈদিক মতবাদ অনুযায়ী ধারনা করা হয় যে, যম হচ্ছেন প্রথম নশ্বর ব্যক্তি যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং স্বর্গীয় আবাসে গমন করেছিলেন; যার ফলে তিনি মৃত্যুর দেবতায় উত্তীর্ণ হন।

রূপ ও বাহনঃ যম দশ দিকপালের অন্যতম ও দক্ষিণ দিকের রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত, তাঁর নামানুসারেই দক্ষিণদিক যাম্য নামে পরিচিত। যম কৃষ্ণবর্ণ, খর্বকায়, খঞ্জ, মহিষবাহন এবং তিনি আত্মাকে দেহ হতে নিষ্কাশন করার জন্য একটি পাশ ও একটি দণ্ড (কালদণ্ড) বহন করেন।

ঋগ্বেদে যমঃ ঋগ্বেদ-এর ১০ম মন্ডলস্থ ১০ম সূক্তে যমকে ঋষি হিসেবে পাওয়া যায়। এ সূক্তে সহঋষিকা ও সহোদরা যমীর সাথে যম এক-থেকে-বহু মানব/মানবী সৃজনের প্রাথমিক সমস্যা নিয়ে তর্কান্তে সহোদরার সন্তানার্থে সহবাস প্রার্থণা প্রত্যাখ্যান করে।

সহকারী ও কাজঃ তাঁর সহকারী চিত্রগুপ্ত, পাপ-পুণ্যের হিসাব রক্ষক দেবতা। ঋগ্বেদে তার সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি মানবজাতিকে বাস করার জন্য একটি জায়গা খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছেন, এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তাদের পছন্দমত পথ বেছে নেবার বা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা প্রদান করেছেন।
যম শুধুমাত্র মৃত্যুর দেবতা নন, তিনি ন্যায়বিচার, নিয়মানুবর্তিতা এবং ধর্মের প্রতীক হিসেবেও পূজিত।

৩. কৃত্তিকা (Krittika)
দেবতাঃ অগ্নি
প্রতীকঃ ছুরি
বৈশিষ্ট্যঃ তেজস্বী, কঠোর
কৃত্তিকা নক্ষত্র
নীলাম্বরী কৃত্তিকা (Pleiades) গুচ্ছনক্ষত্র। আন্তর্জাতিকভাবে এর পরিচিতি Pleiades নামে। ঋগ্বেদের ঋষিরা চিনতেন অগ্নি (দিক) বলে আর সিদ্ধান্তজ্যোতিষ-এ এটি কৃত্তিকা নামে পরিচিত।

কৃত্তিকা দেবতা অগ্নি। ভগবান অগ্নি নিজেকে পুড়িয়ে খাবার, আলো, উত্তাপ সৃষ্টি করে অপরের সেবায় ব্যবহার হয়।
কৃত্তিকা নক্ষত্র নেতিবাচকতাকে পুড়িয়ে দেয়, যা মিশ্রিত হয় তা শুদ্ধ করে, এবং যা এখনও পাকা হয়নি তা রান্না বা প্রস্তুত করে। এই নক্ষত্র যুদ্ধ, যুদ্ধ এবং বিবাদের নিয়ম করে।

ঋগ্বেদে অগ্নিঃ পুরো ঋগ্বেদ জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে অগ্নি নামধারী কৃত্তিকার প্রতি অজস্র প্রার্থনা। পৃথিবী থেকে খালি চোখে অগ্নিকুণ্ডলীর মত দেখায় তাই ঋষিদের মননে এ অগ্নি বহু নামে অভিহিত।

অগ্নির বিভিন্ন নামঃ জাতবেদা (জীবনশক্তি বিদিত/জ্ঞাত), হুতাশন (যজ্ঞাহুতি ভক্ষক), বহ্নি (যজ্ঞের হবি বাহক), তনুনপাৎ (জীবদেহের উত্তাপরূপী অগ্নি), নরাশংস (মানব প্রশংসিত), দাবানল (বনের আগুন), শম্পাৎ (বিদ্যুতাগ্নি), বারবানল বা বড়বা (সমুদ্র-বারিতে প্রজ্বলিত অগ্নি), শমী (বনস্পতির দহন), জমদগ্নি (ক্রোধাগ্নি), চিত্রভানু (সূর্যরশ্মি)।

অগ্নিদেব - আগুনের দেবতা
অগ্নি হলো একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ হলো আগুন । তিনি দশদিকপাল দেবতার অন্যতম অগ্নিকোণস্থ দেবতা।
অগ্নি আগুনের দেবতা এবং যজ্ঞের গ্রহীতা। অগ্নিকে দেবতাদের বার্তাবহ মনে করা হয়। তাই হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, যজ্ঞকালে অগ্নির উদ্দেশ্যে আহুতি প্রদান করলে সেই আহুতি দেবতাদের কাছে পৌঁছে যায়।
অগ্নি চিরতরুণ, কারণ আগুন প্রতিদিন নতুন করে জ্বালানো হয় এবং তিনি অমর। তার দুই বা তিনটি মুখ। তার চার হাত। তার অস্ত্রের নাম আগ্নেয়াস্ত্র।

বৈদিক গুরুত্বঃ ঋগ্বেদের ৩৩ জন দেবতার মধ্যে দেবতাদের রাজা 'ইন্দ্র'-কে শক্র বলা হয়। তিনি এই ৩৩ দেবতার সর্বপ্রথম জন। তাঁর পরেই রয়েছেন অগ্নি। পৌরাণিক যুগে দেবতাদের বৈশিষ্ট্যে বিবর্তন দেখা যায়। সে যুগে ইন্দ্র, অগ্নির প্রাধান্য হ্রাস পেয়ে অপ্রধান দেবতা যেমন বিষ্ণু, শিব প্রভৃতির প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়।

পৌরাণিক বর্ণনাঃ মার্কণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে: "হে পাবক, তোমার দ্বারাই সব কিছু সৃষ্ট হয়, তোমার দ্বারাই বর্ধিত হয়, তোমাতেই সকলের উদ্ভব, অন্তকালে তোমাতেই লীন হয়"।
অগ্নি শুধুমাত্র আগুনের দেবতা নন। তিনি পবিত্রতা, শুদ্ধিকরণ –এর দেবতা। অগ্নি যজ্ঞের মাধ্যমে দেবতা ও মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী হিসেবে বৈদিক ধর্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন।

৪. রোহিণী (Rohini)
দেবতাঃ ব্রহ্মা
প্রতীকঃ গরু
বৈশিষ্ট্যঃ সৃষ্টিশীল, আকর্ষণীয়

রোহিণী নক্ষত্রঃ
রোহিণী আকাশের ১৪তম উজ্জ্বল প্রভার নক্ষত্র। এটি সূর্য থেকে ৬৫ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত বৃষরাশির উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ভারতীয়
বৈশিষ্ট্য
রোহিণী একটি লোহিত দানব, যা সূর্যের থেকেও ঠান্ডা। রোহিণীপৃষ্ঠের উষ্ণতা ৩৯০০K। এটির আয়তন সূর্র্যের প্রায় ৪৪ গুন্। নিজের অক্ষের চারদিকে একবার পাক খেতে রোহিণী ৫২০ দিন সময় নেয়।
স্পেস প্রোব পায়োনীয়ার ১০ রোহিণীর দিকে ধাবমান, যা আনুমানিক ২০ লক্ষ বছর পর রোহিণীর কাছাকাছি আসতে পারে।
আকাশে অবস্থান
বৃষ রাশি নক্ষত্রমন্ডলভুক্ত রোহিণী পৃথিবী থেকে উজ্জ্বল দেখালেও দূরত্ব ১৩০ আলোকবর্ষ আর দীপ্তি সূর্যের ৯০ গুণ। আকাশমন্ডলের ৩৬০ অংশের ৪০ থেকে ৫৩ অংশ ২০ কলা(কোণ পরিমাপ একক) পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।
ঋগ্বেদ অনুসারেঃ
জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে ২৮ নক্ষত্রের ৪র্থ এ সদস্যার প্রাচীন তথা ঋগ্বেদের ঋষিদের দেয়া নাম বিধাতা, প্রজাপতি, ব্রহ্মা, স্বপস্যমান বা স্বয়ম্ভূ, সূনুর্দ্দাধার (সূনু=সৃষ্টি+দায়+আধার) ইত্যাদি, সৈন্ধান্তিকরা যাকে রোহিণী নামে চিহ্নিত করছে।
ধারণা করা হয় রোহিণী নক্ষত্র প্রজাপতি ব্রহ্মার বাসস্থান।
নামকরণের কারণঃ
রোহ শব্দের অর্থ বৃদ্ধি, বিকাশ, উচ্চ তাপমাত্রা অর্জন। রোহিণীর আভিধানিক অর্থ লাল গরু এবং এই নক্ষত্রের দেবতা হলেন ভগবান ব্রহ্মা।
রোহণ শব্দ থেকে রোহিনী। রোহণ অর্থ উত্থান, উঠা, সৃষ্টি। কাজেই সৃষ্টির জন্য যা কিছু দরকার সব বস্তু ও জীব এই নক্ষত্রের কারক। যেমন পশু, পাখি, মানুষ।
রোহিণী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম নক্ষত্র। এই নক্ষত্রের দেবতা হলেন ভগবান ব্রহ্মা, যিনি প্রকৃতির স্রষ্টা। রোহিণী নক্ষত্রের সম্পর্ক কৃষি ও সভ্যতার বিকাশের সঙ্গেও জড়িত।

ব্রহ্মা - সৃষ্টিকর্তা দেবতা
ব্রহ্মা সাধারণত চতুর্মুখ ও চতুর্বাহু বিশিষ্ট, শ্মশ্রুমণ্ডিত, রক্তাভ বা স্বর্ণাভ দেহধারী হিসেবে বর্ণিত হন। তার চার হাত চারবেদ এবং চার দিককে প্রকাশ করে। তিনি রক্তপদ্মে অবস্থান করেন এবং হংস (হাঁস, রাজহাঁস বা সারস) তার বাহন।
সাধারণত, দেবী সাবিত্রী ব্রহ্মার স্ত্রী হিসেবে উল্লেখিত হন এবং ব্রহ্মার সৃজন শক্তি ও ব্রহ্মার জ্ঞান-এর নারীরূপ তিনি।

ত্রিমূর্তিতে ব্রহ্মার স্থান
ব্রহ্মা হিন্দুধর্মের প্রধান তিন দেবতার একজন; অন্য দুজন বিষ্ণু ও শিব। বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা 'প্রজাপতি' নামেই তিনি সমধিক পরিচিত।
তার প্রতিটি মুখ চারটি দিককে নির্দেশ করে। তার চারমুখ থেকে চার বেদের সৃষ্টি। তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, বরং তিনি জ্ঞান মুদ্রা এবং সৃষ্টি মুদ্রা ধারণ করেন।

সৃষ্টিতত্ত্ব
প্রাচীন পুরাণগুলো বর্ণনা করে যে, তখন কিছুই ছিল না, কারণ সমুদ্র ছিল। যেখান থেকে হিরণ্যগর্ভ নামে স্বর্ণডিম্ব নির্গত হয়। ডিম্বটি ভেঙে উন্মুক্ত হলো ব্রহ্মা, যিনি নিজেকে এর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন, প্রকাশিত হয়েছেন (স্বয়ম্ভু নাম লাভ করেছেন)।
ভাগবত পুরাণে উক্ত হয়েছে যে, ব্রহ্মা "হরি" (বিষ্ণু) এর নাভিকমল হতে কাল এবং মহাবিশ্বের জন্ম মুহূর্তে আবির্ভূত হন।

বর্তমান অবস্থা
বর্তমান যুগে হিন্দুধর্মে, ব্রহ্মা তেমন জনপ্রিয় দেবতা নন। ত্রিমূর্তির অন্য দেবতা থেকে তার গুরুত্ব কম। প্রাচীন শাস্ত্রসমূহে ব্রহ্মার উল্লেখ থাকলেও, ভারতবর্ষে ব্রহ্মা প্রধান দেবতা হিসেবে খুব কমই পূজিত হন। ভারতে খুব কমই দেবতা ব্রহ্মার মন্দির রয়েছে, তবে রাজস্থানের পুষ্করের ব্রহ্মা মন্দির খুব প্রসিদ্ধ।

রোহিণী নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্য
রোহিণী নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তি প্রকৃতি প্রেমী এবং প্রকৃতির উপাসক। এই নক্ষত্রের মানুষের চোখ খুব সুন্দর হয়। সুন্দর হওয়া ছাড়াও রোহিণী নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীরা মুখে মাধুর্য মিশিয়ে কথা বলেন। রোহিণী নক্ষত্রের মানুষ কল্পনাপ্রবণ ও সৃজনশীল প্রকৃতির হয়।
ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে রোহিণী নক্ষত্রের সাথে গভীরভাবে যুক্ত । এই নক্ষত্র সৃষ্টি, বৃদ্ধি, উন্নতি ও নেতৃত্বের প্রতীক।


৫. মৃগশিরা - মৃত্যু (Mrigashira)
দেবতাঃ সোম (চন্দ্র)
প্রতীকঃ হরিণের মাথা
বৈশিষ্ট্যঃ অনুসন্ধানী, কৌতূহলী

মৃগশিরা নক্ষত্র
পরস্পর একান্ত কাছাকাছি ক্ষীণপ্রভ ৩টি তারকা মিলে গঠন করেছে ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের ২৮ নক্ষত্রের ৫ম এ সদস্যাকে। ঋগ্বেদের ঋষিদের দেয়া নাম যজ্ঞসোম,সৈন্ধান্তিকরা যাকে মৃগশিরা নামে চিহ্নিত করছে।

ঋগ্বেদীয় দেবদেবী ইন্দ্র, অগ্নি, সোম, বিশ্বদেব, অশ্বিদ্বি, মরুৎগণ, বরুণ প্রমুখ দেবতা সূক্ত-দ্রষ্টা ঋষিদের মননে যথাক্রমে জ্যেষ্ঠা, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, উত্তরাষাঢ়া, অশ্বিণী, শতভিষা, স্বাতী প্রভৃতি।

সোম বা চন্দ্র দেবতা
চন্দ্র হলেন একজন দেবতা যিনি চাঁদের অধিপতি। তিনি সুদর্শন, সুপুরুষ, দ্বি-বাহুযুক্ত । তার এক হাতে অস্ত্র ও অন্য হাতে পদ্ম রয়েছে। তিনি তার দশটি শ্বেত ঘোড়ার রথে চড়ে রাত্রে আকাশে উদিত হন।
তিনি আরও অনেক নামে পরিচিত, যেমনঃ সোম, ইন্দু (উজ্জ্বল বিন্দু), অত্রিসুত (অত্রির পুত্র), শচীন, তারাধিপতি (নক্ষত্রের প্রভু), বজ্রজ্বালাপতি (অরুণাসূরের অসুরা বোনের স্বামী) ও নিশাকর (রাত নির্মাণকারী)। তার নামানুসারে সপ্তাহের একটি দিন হল সোমবার।

পৌরাণিক কাহিনী
হিন্দু পুরাণ অনুসারে চন্দ্র অত্রির পুত্র ও সপ্তবিংশতী নক্ষত্রের ও বজ্রজ্বালা নামক অসুরার স্বামী। দক্ষের ২৭টি কন্যা ও অরুণাসূরের অসুরা বোনকে ইনি বিবাহ করেন। এর মধ্যে রোহিণী ছিলেন তাঁর প্রিয়তমা পত্নী। এই কারণে দক্ষের অন্যান্য কন্যারা দক্ষের কাছে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। দক্ষ প্রথমে চন্দ্রকে এরূপ পক্ষপাতিত্ব থেকে বিরত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে ব্যর্থ হয়ে চন্দ্রকে পুত্রকন্যাহীন ও যক্ষ্মারোগাগ্রস্ত হওয়ার অভিশাপ দেন। এই অভিশাপে ভীত হয়ে কন্যারা পিতাকে অভিশাপ ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করলে দক্ষ বলেন যে, চন্দ্র একপক্ষে ক্ষয়প্রাপ্ত হবেন এবং অন্য পক্ষে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়ে আগের রূপ পাবেন। চাঁদের এই দুই পক্ষ কৃষ্ণ ও শুক্ল নামে পরিচিত।

বৈদিক গুরুত্ব
দেবতাদের রাজা 'ইন্দ্র'-কে শক্র বলা হয়, তিনি এই ৩৩ দেবতার সর্বপ্রথম জন। তাঁর পরেই রয়েছেন অগ্নি। এই দুই দেবভ্রাতার জোড়কে সাধারণত ইন্দ্র-অগ্নি, মিত্র-বরুণ ও সোম-রুদ্র বলা হয়।
চন্দ্র বা সোম (চাঁদের দেবতা) হিসেবে তিনি বৈদিক দেবমণ্ডলীতে বিশেষ স্থান অধিকার করেন।

জ্যোতিষশাস্ত্রে সোম
হিন্দু ক্যালেন্ডারে সোমবার শব্দের মূল হল সোম। সোম হল রাশিচক্র ব্যবস্থার নবগ্রহের অংশ। চাঁদের দেবতা এবং এর জ্যোতিষশাস্ত্রীয় তাত্পর্য বৈদিক যুগের প্রথম দিকে ঘটেছিল এবং বেদে লিপিবদ্ধ হয়েছিল।

সোমনাথ মন্দির
সোমনাথ শব্দটির অর্থ "চন্দ্র দেবতার রক্ষাকর্তা"। চন্দ্র তাঁর স্ত্রী রোহিণীর প্রতি অত্যধিক আসক্তি বশত তাঁর অন্য ছাব্বিশ স্ত্রীকে উপেক্ষা করতে থাকেন। এই কারণে দক্ষ তাঁকে ক্ষয়িত হওয়ার অভিশাপ দেন। প্রভাস তীর্থে চন্দ্র, শিবের আরাধনা করলে শিব তাঁর অভিশাপ অংশত নির্মূল করেন। এরপর ব্রহ্মার উপদেশে কৃতজ্ঞতাবশত চন্দ্র সোমনাথে একটি স্বর্ণ শিবমন্দির নির্মাণ করেন।

সোম বা চন্দ্র দেবতা শুধুমাত্র চাঁদের অধিপতি নন, তিনি সময়, জোয়ার-ভাটা, কৃষি এবং মানুষের মনের উপরও প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে বৈদিক ও পৌরাণিক সাহিত্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেন।

Note:
সূক্ত-দ্রষ্টা ঋষি
সূক্ত-দ্রষ্টা ঋষি হলেন সেই মহান ঋষিগণ যাঁরা বৈদিক মন্ত্র বা সূক্তগুলি "দর্শন" বা উপলব্ধি করেছিলেন।

মূল অর্থ:
সূক্ত = বৈদিক স্তোত্র বা মন্ত্র
দ্রষ্টা = যিনি দেখেন, উপলব্ধি করেন
ঋষি = জ্ঞানী মুনি

বৈশিষ্ট্যঃ
১. রচয়িতা নন
দ্রষ্টাঃ হিন্দু দর্শন অনুসারে বেদের মন্ত্রগুলি কোনো মানুষের রচনা নয়। এগুলি অনাদি, শাশ্বত সত্য ঋষিগণ এই মন্ত্রগুলি গভীর ধ্যানে "দেখেছেন" বা উপলব্ধি করেছেন।
২. দিব্যদৃষ্টিঃ তাঁরা তপস্যা ও ধ্যানের মাধ্যমে দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বৈদিক সত্য উপলব্ধি করেছিলেন
৩. বেদের সংরক্ষকঃ তাঁরা এই মন্ত্রগুলি মুখে মুখে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রচার করেছেন। শ্রুতি পরম্পরায় বেদ সংরক্ষিত হয়েছে

প্রধান সূক্ত-দ্রষ্টা ঋষিগণঃ
সপ্তর্ষি (সাত মহান ঋষি)ঃ বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র, জমদগ্নি, ভরদ্বাজ, গৌতম, কশ্যপ, অত্রি, অঙ্গিরা, ভৃগু, কণ্ব, গৃৎসমদ প্রমুখ ঋগ্বেদের বিভিন্ন মণ্ডল বিভিন্ন ঋষি পরিবার দ্বারা দৃষ্ট।

গুরুত্বঃ এই ঋষিগণ শুধুমাত্র মন্ত্রদ্রষ্টাই নন, তাঁরা ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছেন।
দেবতাদের সাথে মানুষের সংযোগ স্থাপন করেছেন।
জ্ঞান, ধর্ম ও নৈতিকতার পথ প্রদর্শক, অর্থাৎ সূক্ত-দ্রষ্টা ঋষিরা হলেন সেই মহান আত্মাগণ যাঁরা দিব্যদৃষ্টির মাধ্যমে বৈদিক জ্ঞান উপলব্ধি করে মানবজাতির কাছে তা প্রচার করেছেন।

৬. আর্দ্রা (Ardra)
দেবতাঃ রুদ্র
প্রতীকঃ জলবিন্দু বা অশ্রুবিন্দু, কখনও হীরক
বৈশিষ্ট্যঃ আবেগপ্রবণ, পরিবর্তনশীল
অধিপতি গ্রহঃ রাহু
রাশিঃ মিথুন রাশি
যোগতারাঃ বেটেলজিউস
"আর্দ্রা" শব্দের অর্থ "ভেজা" বা "আর্দ্র" - যা বৃষ্টি, অশ্রু এবং পরিশুদ্ধির প্রতীক। এই নক্ষত্র জীবনের ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধি ও বৃদ্ধির প্রতীক।
মূল তথ্যঃ রুদ্র (ঝড়ের দেবতা, শিবের বৈদিক রূপ)।রুদ্র হলেন একজন ঋগ্বৈদিক দেবতা, যিনি বায়ু বা ঝঞ্ঝার দেবতার সাথে সংযুক্ত, এবং শিকারের দেবতা। 'রুদ্র' নামটিকে অনুবাদ করলে দাঁড়ায় 'গর্জনকারী'। ঋগ্বেদে, রুদ্রকে "অমিত ক্ষমতাশালী" হিসাবে অর্চনা করা হয়েছে।
একাদশ রুদ্রঃ
একাদশ রুদ্র দ্বারা হিন্দু দেবতা রুদ্রের (শিব) অনুসারী এগারো দেবতাকে বোঝায়। তাদেরকে কখনও কখনও মরুত (শিবের পুত্রগণ) বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে এবং কখনও কখনও সম্পূর্ণ আলাদা রূপে উপস্থাপন করা হয়।

বৈশিষ্ট্যঃ আবেগপ্রবণতা: গভীর অনুভূতিশীল। তীব্র আবেগ প্রকাশ করে। সহানুভূতিশীল প্রকৃতির।
পরিবর্তনশীলতাঃ জীবনে আকস্মিক পরিবর্তন, ঝড়ের মতো উত্থান-পতন, রূপান্তরের ক্ষমতা

অন্যান্য গুণাবলীঃ বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল, গবেষণা ও অনুসন্ধানী মনোভাব, কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা, নতুন শুরু করার সাহস
রুদ্রের প্রভাবঃ রুদ্র হলেন ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের দেবতা। তাই আর্দ্রা নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীরা পুরাতনকে ভেঙে নতুন সৃষ্টি করতে পারে। সংকটের মধ্যেও শক্তি খুঁজে পায়। গভীরভাবে আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী।

৭. পুনর্বসু (Punarvasu)
• দেবতা: অদিতি (দেবমাতা, অসীমতার দেবী)
• প্রতীক: ধনুক বা তীর-তূণীর, কখনও ঘর/বাসস্থান
• অধিপতি গ্রহ: বৃহস্পতি (গুরু)
• রাশি: মিথুন ও কর্কট রাশি
• যোগতারা: পোলাক্স ও ক্যাস্টর (Pollux & Castor)
"পুনর্বসু" = পুনঃ + বসু = "পুনরায় ভালো হওয়া" বা "আবার আলো ফিরে আসা"
বৈশিষ্ট্যঃ
১. পুনর্জন্ম ও পুনরুদ্ধারঃ হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার ক্ষমতা, ব্যর্থতার পর পুনরায় উঠে দাঁড়ানো, জীবনে নতুন শুরু করার শক্তি, রোগ থেকে সুস্থতা লাভ
২. আশাবাদী প্রকৃতিঃ সর্বদা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, কঠিন পরিস্থিতিতেও আশা হারায় না, অন্যদের উৎসাহিত করার ক্ষমতা, জীবনে আলোর সন্ধান করে
৩. অন্যান্য গুণাবলীঃ উদার ও দয়ালু হৃদয়, পরিবার ও গৃহের প্রতি আসক্তি, সন্তুষ্ট ও শান্তিপ্রিয়, ধৈর্যশীল ও ক্ষমাশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সামাজিক

অদিতির প্রভাবঃ অদিতি সকল দেবতার মাতা (১২ আদিত্যের জননী)। অদিতি অসীমতা ও মুক্তির প্রতীক। মাতৃত্ব, পরিচর্যা ও সুরক্ষার দেবী। সীমাহীন করুণা ও ক্ষমার প্রতীক।
তাই পুনর্বসু নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীরা মাতৃসুলভ স্নেহশীল, রক্ষণশীল ও যত্নশীল। তারা মুক্তি ও স্বাধীনতা পছন্দ করেন। অন্যদের সাহায্য করতে আগ্রহী করেন।
বিশেষ উল্লেখ: শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ উভয়েই পুনর্বসু নক্ষত্রে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে কিছু মত অনুসারে জানা যায়, যা এই নক্ষত্রের শুভত্ব ও পবিত্রতার প্রমাণ।
প্রতীকের তাৎপর্যঃ
• ধনুক: লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষমতা, পুনরায় চেষ্টা করার শক্তি
• ঘর: নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, পরিবারে ফিরে আসা
এই নক্ষত্র আশা, পুনর্জীবন এবং অন্ধকারের পর আলো ফিরে আসার প্রতীক।

৮. পুষ্য (Pushya)
• দেবতা: বৃহস্পতি (দেবগুরু, জ্ঞান ও ধর্মের দেবতা)
• প্রতীক: ফুল, গোধন (গরুর স্তন), বা তীরের ফলা
• অধিপতি গ্রহ: শনি
• রাশি: কর্কট রাশি
• যোগতারাঃ ডেল্টা ক্যান্সারি (Delta Cancri)
পুষ্য" = "পুষ্টি দেওয়া", "লালন-পালন করা", "বৃদ্ধি করা"
বৈশিষ্ট্যঃ
১. পুষ্টিদাতা ও পালনকারীঃ • অন্যদের বৃদ্ধি ও উন্নতিতে সহায়তা করে, লালন-পালনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, পরিচর্যা ও যত্নশীল প্রকৃতি, খাদ্য, শিক্ষা ও জ্ঞান প্রদান করে
২. শুভত্ব ও পবিত্রতাঃ সর্বাধিক শুভ নক্ষত্রগুলির একটি, শুভ কাজের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত, আধ্যাত্মিক বৃদ্ধির জন্য আদর্শ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য পবিত্র
৩. অন্যান্য গুণাবলীঃ ধৈর্যশীল ও সহনশীল, দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য, ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধে বিশ্বাসী, বিনয়ী ও শান্তিপ্রিয়, জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান, সমাজসেবী মনোভাব
বৃহস্পতির প্রভাবঃ বৃহস্পতি (গুরু) হলেন দেবতাদের গুরু ও পুরোহিত। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ধর্মের দেবতা। তিনি শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক। তিনি ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার প্রতীক।
তাই পুষ্য নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীরা শিক্ষক, পরামর্শদাতা বা গুরু হিসেবে উৎকৃষ্ট। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে থাকেন । এদের নৈতিক মূল্যবোধে দৃঢ়। এরা জ্ঞান বিতরণে আগ্রহী ।
শুভত্বের কারণঃ
পুষ্য নক্ষত্রকে "সর্বশ্রেষ্ঠ শুভ নক্ষত্র" বলা হয় কারণ:
• এই নক্ষত্রে শুরু করা কাজ সফল হয়
• বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য আদর্শ
• আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত
• এই দিনে দান-ধর্ম করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায়
প্রতীকের তাৎপর্যঃ
• ফুলঃ সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ভক্তি
• গোধন/স্তনঃ পুষ্টি, মাতৃত্ব, লালন-পালন, সমৃদ্ধি
• তীরের ফলাঃ লক্ষ্যভেদ, সুরক্ষা
বিশেষত্বঃ
পুষ্য যোগঃ যখন বৃহস্পতি কর্কট রাশিতে থাকে এবং চন্দ্র পুষ্য নক্ষত্রে থাকে, তখন এটি অত্যন্ত শুভ সময় বলে বিবেচিত হয়।

৯. আশ্লেষা (Ashlesha)
• দেবতাঃ নাগ বা সর্পদেবতা (সর্পরাজ)
• প্রতীকঃ কুণ্ডলী পাকানো সাপ, চক্র
• অধিপতি গ্রহঃ বুধ
• বৈশিষ্ট্যঃ রহস্যময়, বুদ্ধিমান
• রাশিঃ কর্কট রাশি
আশ্লেষা = "আলিঙ্গন", "জড়িয়ে ধরা", "সাপের কুণ্ডলী"।এটি সবচেয়ে জটিল ও শক্তিশালী নক্ষত্রগুলির মধ্যে একটি।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্যঃ আশ্লেষা নক্ষত্র কুণ্ডলিনী শক্তির সাথে যুক্ত। মানব দেহের মেরুদণ্ডের গোড়ায় সুপ্ত শক্তি নির্দেশ থাকে। আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতীক, যা গভীর ধ্যান ও তপস্যার মাধ্যমে জাগরিত হয়।
বৈশিষ্ট্যঃ ১. রহস্যময় প্রকৃতিঃ গভীর ও জটিল ব্যক্তিত্ব, গোপনীয়তা পছন্দ করে, অন্তর্মুখী ও সংরক্ষিত, মনের গভীর রহস্য বুঝতে পারে, তান্ত্রিক ও গুহ্য বিদ্যায় আগ্রহ
২. তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তাঃ অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও চতুর, মনোবিজ্ঞান বুঝতে পারদর্শী, কৌশলী ও পরিকল্পনাকারী, বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রখর, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম
৩. অন্যান্য গুণাবলীঃ তীব্র অন্তর্দৃষ্টি, প্রতিরক্ষামূলক প্রবৃত্তি, আত্মনির্ভর ও স্বাধীনচেতা, সন্দেহপ্রবণ কিন্তু সতর্ক, প্রতিশোধপরায়ণ হতে পারে, গভীর আবেগ লুকিয়ে রাখে
নাগ দেবতার প্রভাবঃ
• নাগ বা সর্পদেবতা কুণ্ডলিনী শক্তি ও আধ্যাত্মিক জাগরণ প্রতিনিধিত্ব করে। কুণ্ডলিনী শক্তি ও আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও রহস্য, পুনর্জন্ম ও রূপান্তর (খোলস ত্যাগ), বিষ ও ঔষধ উভয়ই, সুরক্ষা ও ধ্বংস উভয় ক্ষমতা।
তাই আশ্লেষা নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীরাঃ শক্তিশালী অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন, আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়। নিজেকে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা রাখে। এরা সুরক্ষামূলক কিন্তু বিপদে আক্রমণাত্মক।
দ্বৈত প্রকৃতি --- আশ্লেষা নক্ষত্রের দুটি দিকঃ
ইতিবাচক দিকঃ গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, নিরাময় ও চিকিৎসার ক্ষমতা, সুরক্ষা প্রদান করে, আধ্যাত্মিক শক্তি, মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি নেতিবাচক দিকঃ অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা, প্রতিশোধপরায়ণতা, ম্যানিপুলেটিভ হতে পারে, অতিরিক্ত গোপনীয়তা, বিশ্বাস করতে অসুবিধা।
প্রতীকের তাৎপর্যঃ কুণ্ডলী পাকানো সাপঃ শক্তি সঞ্চয়, সতর্কতা, সুরক্ষা
• সাপের খোলস ত্যাগঃ পুনর্জন্ম, রূপান্তর, পুরাতন ত্যাগ করা
• বিষঃ ক্ষতি করার ক্ষমতা কিন্তু ঔষধও হতে পারে

১০. মঘা (Magha)
দেবতাঃ পিতর
প্রতীকঃ সিংহাসন
বৈশিষ্ট্যঃ নেতৃত্ব, ঐতিহ্য
অধিপতি গ্রহঃ কেতু (Ketu)
রাশিঃ সম্পূর্ণ নক্ষত্রটি সিংহ রাশিতে অবস্থিত।
উপযুক্ত পেশাঃ সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, প্রত্নতাত্ত্বিক বা পারিবারিক ব্যবসার পরিচালক।
মঘা (Magha) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ১০ম নক্ষত্র। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও রাজকীয় মর্যাদা এবং পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার বহনের ক্ষেত্রে এই নক্ষত্রকে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে গণ্য করা হয়।
নিচে এর দেবতা, প্রতীক ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:
১. অধিষ্ঠাত্রী দেবতাঃ পিতর (Pitris)
পরিচয়ঃ মঘা নক্ষত্রের দেবতা হলেন 'পিতর' বা পূর্বপুরুষগণ।
প্রভাবঃ পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদের ফলে এই নক্ষত্রের জাতকরা বংশগত ঐতিহ্য, সম্পদ এবং বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হন। এরা সাধারণত নিজের শিকড়, বংশীয় মর্যাদা এবং পারিবারিক রীতিনীতি বজায় রাখতে খুব পছন্দ করেন।
২. প্রতীকঃ রাজকীয় সিংহাসন (The Royal Throne)
ক্ষমতা ও মর্যাদাঃ সিংহাসন উচ্চ পদমর্যাদা, ক্ষমতা এবং রাজকীয় আভিজাত্যের প্রতীক।
কর্তৃত্বঃ এটি জাতকের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার সহজাত ক্ষমতা এবং অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের নির্দেশ করে।
সাফল্যঃ এটি জীবনের লক্ষ্য অর্জন এবং সমাজে একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরির আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তোলে।
৩. বৈশিষ্ট্যঃ নেতৃত্ব ও ঐতিহ্য (Leadership & Tradition)
নেতৃত্বদানকারীঃ মঘা নক্ষত্রের জাতকরা জন্মগতভাবে নেতা যেকোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অন্যকে পরিচালনা করতে দক্ষ। [
ঐতিহ্য রক্ষাঃ এরা প্রাচীন রীতি, ইতিহাস এবং পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া আদর্শের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হন।
অহংকার ও আত্মসম্মানঃ এদের মধ্যে প্রবল আত্মসম্মানবোধ থাকে। তবে কেতুর (Ketu) অধিপতিত্বের কারণে মাঝে মাঝে এদের মধ্যে কিছুটা অহংকারী ভাব দেখা দিতে পারে।
সাহস ও দয়াঃ এরা যেমন সাহসী ও প্রভাবশালী, তেমনি অভাবী বা অনুগতদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু এবং উদার হন।

১১. পূর্ব ফল্গুনী (Purva Phalguni)
দেবতাঃ ভগ
প্রতীকঃ দোলা
বৈশিষ্ট্যঃ আনন্দপ্রিয়, সৃজনশীল
পূর্ব ফল্গুনী (Purva Phalguni) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ১১তম নক্ষত্র, যা মূলত আরাম, প্রেম এবং সৃজনশীল শক্তির বহিঃপ্রকাশ। ২ এই নক্ষত্রকে বৈষয়িক সুখ ও নান্দনিকতার অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়।

অধিষ্ঠাত্রী দেবতাঃ ভগ (Bhaga)
পরিচয়ঃ দ্বাদশ আদিত্যের অন্যতম হলেন 'ভগ'। তাকে সৌভাগ্য, উত্তরাধিকার এবং কামনাসিদ্ধির দেবতা বলা হয়।
প্রভাবঃ ভগের আশীর্বাদে এই নক্ষত্রের জাতকরা জীবনে প্রচুর বৈষয়িক সুখ, সম্পদ এবং বৈবাহিক আনন্দ লাভ করেন। তিনি মূলত জীবনের সেই আনন্দদায়ক দিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেন যা মানুষকে সন্তুষ্টি দেয়।

প্রতীকঃ দোলা বা দোলনা (Swinging Hammock)
বিশ্রাম ও আরামঃ দোলনা মূলত ক্লান্তি দূর করা এবং আয়েশ করার প্রতীক। এটি নির্দেশ করে যে এই জাতকরা কঠোর সংগ্রামের চেয়ে জীবনের সহজ ও আনন্দদায়ক পথ পছন্দ করেন।
পুনর্গঠনঃ এটি বিশ্রামের মাধ্যমে সৃজনশীল শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার সংকেত দেয়।
অন্য প্রতীকঃ অনেক ক্ষেত্রে খাটিয়ার সামনের দুটি পায়া এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা আরামদায়ক ঘুমের ইঙ্গিত দেয়।

বৈশিষ্ট্যঃ আনন্দপ্রিয় ও সৃজনশীল
সৃজনশীল প্রতিভা: শুক্র (Venus) এই নক্ষত্রের অধিপতি গ্রহ হওয়ায় এদের মধ্যে শিল্পকলা, সংগীত, নৃত্য বা সাজসজ্জার প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকে। এরা যেকোনো কাজকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন।
সামাজিক ও রোমান্টিকঃ এরা অত্যন্ত মিশুকে এবং রোমান্টিক স্বভাবের হন। বন্ধু মহলে এদের জনপ্রিয়তা থাকে এবং এরা প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ককে খুব গুরুত্ব দেন।
নেতৃত্ব ও আভিজাত্যঃ সিংহ রাশিতে অবস্থানের কারণে এদের মধ্যে এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য এবং নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ থাকে।
দুর্বলতাঃ অত্যাধিক আনন্দপ্রিয়তার কারণে এদের মধ্যে মাঝেমধ্যে অলসতা বা বিলাসিতার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক তৈরি হতে পারে।


১২. উত্তর ফল্গুনী (Uttara Phalguni)
দেবতাঃ অর্যামান
প্রতীকঃ বিছানা
বৈশিষ্ট্যঃ সহানুভূতিশীল, বন্ধুত্বপূর্ণ
অধিপতি গ্রহঃ রবি (Sun)
রাশিঃ এই নক্ষত্রের প্রথম চরণ সিংহ রাশিতে এবং বাকি তিনটি চরণ কন্যা রাশিতে অবস্থিত।
উপযুক্ত পেশাঃ সমাজসেবক, চিকিৎসক, কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসক বা বড় কোনো সংস্থার জনসংযোগ কর্মকর্তা।
উত্তর ফল্গুনী (Uttara Phalguni) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ১২তম নক্ষত্র।

অধিষ্ঠাত্রী দেবতা: অর্যামান (Aryaman)
পরিচয়ঃ অর্যামান হলেন দ্বাদশ আদিত্যের একজন, যাকে 'আতিথেয়তা' এবং 'মহৎ সম্পর্কের' দেবতা বলা হয়। [৭.৩.১]
প্রভাবঃ তাঁর আশীর্বাদে এই নক্ষত্রের জাতকরা খুব ভালো বন্ধু এবং আদর্শ জীবনসঙ্গী হন। [৭.৩.৩] তিনি সামাজিক নিয়ম-কানুন, বিবাহ এবং বংশগত প্রথা রক্ষার দেবতা হিসেবেও পরিচিত।

প্রতীকঃ বিছানার পিছনের দুটি পায়া (The Back Legs of a Bed)
বিশ্রাম ও নিরাময়ঃ বিছানা মূলত শান্তি, বিশ্রাম এবং পুনরুজ্জীবনের প্রতীক। এটি কঠোর পরিশ্রমের পর অর্জিত আরামকে নির্দেশ করে।
স্থায়িত্বঃ এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও স্থায়ী সাফল্যের প্রতীক।

বৈশিষ্ট্যঃ সহানুভূতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ (Compassionate & Friendly)
সহানুভূতি ও সেবাঃ উত্তর ফল্গুনীর জাতকরা অত্যন্ত দয়ালু এবং পরোপকারী হন। অন্যের কষ্টে এগিয়ে আসা এবং সমাজসেবামূলক কাজে এদের আগ্রহ থাকে।
সামাজিক যোগাযোগঃ এরা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের অধিকারী হন। এদের বিশাল বন্ধু সার্কেল থাকে এবং এরা একা থাকার চেয়ে মানুষের সাথে মিশতে বেশি পছন্দ করেন।
দায়িত্বশীলতাঃ রবির (Sun) প্রভাবে এদের মধ্যে প্রবল আত্মমর্যাদা এবং দায়িত্ববোধ থাকে। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে এরা অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত হন।
নেতৃত্ব: এদের ব্যক্তিত্বে এক ধরণের আভিজাত্য থাকে, যা এদেরকে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্বের আসনে বসায়।


১৩. হস্ত (Hasta)
দেবতাঃ সাভিতৃ /সাবিত্রী
প্রতীকঃ হাত বা বন্ধ মুষ্টি (The Hand or Fist)
বৈশিষ্ট্যঃ দক্ষ, চতুর
অধিপতি গ্রহ: চন্দ্র (Moon)
রাশি: সম্পূর্ণ নক্ষত্রটি কন্যা রাশিতে অবস্থিত
উপযুক্ত পেশা: হস্তশিল্পী, লেখক, ব্যবসায়ী, জ্যোতিষী, জাদুকর বা আইটি বিশেষজ্ঞ

হস্ত (Hasta) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ১৩তম নক্ষত্র।
অধিষ্ঠাত্রী দেবতা: সাভিতৃ /সাবিত্রী
পরিচয়ঃ সাভিতৃ হলেন সূর্যের একটি রূপ, যিনি ভোরের প্রথম আলো এবং জীবনী শক্তির প্রতীক। [৮.৩.১]
প্রভাব: সাভিতৃর প্রভাবে এই নক্ষত্রের জাতকরা অত্যন্ত সৃজনশীল এবং প্রাণশক্তিতে ভরপুর হন। [৮.৩.৩] তিনি সঠিক পথে চলার বুদ্ধি এবং অন্ধকারের মধ্যে আলোকবর্তিকা দেখানোর ক্ষমতা প্রদান করেন। [৮.৩.৫]

কর্মদক্ষতাঃ মানুষের হাত কর্মের প্রতীক। এটি হাতের কাজের নৈপুণ্য, কারিগরি দক্ষতা এবং সৃজনশীলতাকে নির্দেশ করে।

নিয়ন্ত্রণঃ বন্ধ মুষ্টি শক্তি এবং কোনো কিছুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা বোঝায়। [৮.৪.৩]
ভাগ্যঃ অনেকের মতে, হাতের রেখা ভাগ্যের প্রতীক, তাই হস্ত নক্ষত্রের জাতকরা নিজের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য গড়তে বিশ্বাসী।

বৈশিষ্ট্যঃ দক্ষ ও চতুর (Skilled & Clever)
হাতের কাজে নিপুণতাঃ এরা হস্তশিল্প, চিকিৎসা (বিশেষ করে শল্যচিকিৎসা), টাইপিং, আঁকা বা যান্ত্রিক কাজে অত্যন্ত দক্ষ হন।
বুদ্ধিমত্তা ও চতুরতাঃ এদের বুদ্ধিমত্তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। এরা খুব দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারে এবং চতুরতার সাথে যেকোনো সমস্যার সমাধান বের করতে পারে।
হাস্যরসঃ এদের মধ্যে চমৎকার রসবোধ এবং কথা বলার জাদুকরী ক্ষমতা থাকে, যা দিয়ে এরা সহজেই মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে।
চন্দ্রের প্রভাবঃ অধিপতি গ্রহ চন্দ্র (Moon) হওয়ার কারণে এরা মানসিকভাবে খুব সংবেদনশীল কিন্তু একইসাথে চঞ্চল প্রকৃতির হতে পারেন।


১৪. চিত্রা (Chitra)
দেবতাঃ বিশ্বকর্মা
প্রতীকঃ মুক্তা
বৈশিষ্ট্যঃ রূপসজ্জা, নান্দনিকতা
রাশিঃ এই নক্ষত্রের প্রথম দুই পদ কন্যা রাশিতে এবং শেষ দুই পদ তুলা রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহঃ এই নক্ষত্রের শাসক গ্রহ হলো মঙ্গল, যা এই নক্ষত্রের জাতকদের উদ্যমী এবং সাহসী করে তোলে।
ব্যক্তিত্বঃ তারা সাধারণত স্বাধীনচেতা এবং ন্যায়পরায়ণ হন। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, এরা ভ্রমণে আগ্রহী এবং কারিগরি বিদ্যায় দক্ষ হয়ে থাকেন।
বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে চিত্রা হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে চতুর্দশ (১৪তম) নক্ষত্র।
দেবতা (বিশ্বকর্মা)ঃ চিত্রা নক্ষত্রের অধিপতি দেবতা হলেন স্বর্গীয় স্থপতি বিশ্বকর্মা। এর ফলে এই নক্ষত্রের জাতক-জাতিকাদের মধ্যে সৃজনশীলতা, নির্মাণকৌশল এবং কোনো কিছু নতুন করে গড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে। তারা প্রায়ই প্রকৌশল, স্থাপত্য বা চারুকলার প্রতি আগ্রহী হন। চিত্রা নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে আরও জানুন।

প্রতীক (মুক্তা)ঃ এই নক্ষত্রের প্রতীক হলো 'উজ্জ্বল রত্ন' বা 'মুক্তা'। মুক্তা যেমন ঝিনুকের কঠোর আবরণের ভেতরে অত্যন্ত ধৈর্য ও নিপুণতার সাথে তৈরি হয়, তেমনি চিত্রা নক্ষত্রের ব্যক্তিরাও নিজেদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উজ্জ্বল ও পরিমার্জিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলেন। এটি স্বচ্ছতা এবং আধ্যাত্মিক গভীরতারও প্রতীক।

বৈশিষ্ট্য (সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য)ঃ চিত্রা নক্ষত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সাজসজ্জা, বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং পরিপাটি থাকা। এরা নান্দনিক বোধসম্পন্ন হন এবং যেকোনো সাধারণ জিনিসকে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলতে পারেন। এদের কথা বলা এবং উপস্থাপনার ভঙ্গি মানুষকে খুব দ্রুত আকর্ষণ করে।

১৫. স্বাতি (Swati)
দেবতাঃ বায়ু
প্রতীকঃ অঙ্কুর
বৈশিষ্ট্যঃ স্বাধীন, নমনীয়
রাশি: এই নক্ষত্রের চারটি পদই তুলা রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহ: স্বাতি নক্ষত্রের শাসক গ্রহ হলো রাহু। এটি জাতকদের কূটনীতি, চতুরতা এবং বাহ্যিক জগতের সাথে তাল মিলিয়ে চলার ক্ষমতা প্রদান করে।
ব্যক্তিত্ব: এরা সাধারণত মিষ্টভাষী, দয়ালু এবং ন্যায়পরায়ণ হন। ব্যবসা এবং সৃজনশীল কাজে এরা বিশেষ পারদর্শী হয়ে থাকেন। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এদের মধ্যে অদম্য শেখার আগ্রহ থাকে।

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী স্বাতি হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে পঞ্চদশ (১৫তম) নক্ষত্র। আপনার উল্লেখ করা তথ্যের ভিত্তিতে এই নক্ষত্রের বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:

দেবতা (বায়ু)ঃ স্বাতি নক্ষত্রের অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন বায়ু (বাতাসের দেবতা)। বায়ুর যেমন কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই এবং তা সর্বদা গতিশীল, তেমনি এই নক্ষত্রের জাতক-জাতিকারা অত্যন্ত শক্তিশালী, চঞ্চল এবং জীবনীশক্তিতে ভরপুর হন। বায়ুর প্রভাবে এরা যোগাযোগে দক্ষ এবং স্বাধীনচেতা প্রকৃতির হয়ে থাকেন। স্বাতি নক্ষত্রের বিস্তারিত বর্ণনা দেখুন।

প্রতীক (অঙ্কুর)ঃএই নক্ষত্রের প্রতীক হলো বাতাসের দোলায় দুলতে থাকা একটি কচি চারাগাছ বা অঙ্কুর। এটি নতুন জন্ম, সম্ভাবনা এবং নমনীয়তার প্রতীক। একটি অঙ্কুর যেমন প্রতিকূল পরিবেশেও নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বেড়ে ওঠে, স্বাতির জাতকরাও জীবনের কঠিন সময়ে টিকে থাকার ক্ষমতা রাখেন।

বৈশিষ্ট্য (স্বাধীন ও নমনীয়)ঃ
স্বাধীনঃ এরা অন্যের অধীনে থাকা বা কাজ করা পছন্দ করেন না। নিজস্ব চিন্তাধারা ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করা এদের প্রধান লক্ষ্য।
নমনীয়ঃ বাতাসের প্রভাবে এরা খুব সহজেই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। এরা মানসিকভাবে খুব স্থিতিস্থাপক (flexible) হন, যা এদের সামাজিক সাফল্যে সাহায্য করে।

১৬. বিশাখা (Vishakha)
দেবতাঃ ইন্দ্র-অগ্নি
প্রতীকঃ ধনুক
বৈশিষ্ট্যঃ উচ্চাকাঙ্ক্ষী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ
রাশিঃ এই নক্ষত্রের প্রথম তিন পদ তুলা রাশিতে এবং শেষ পদটি বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহঃ বিশাখা নক্ষত্রের শাসক গ্রহ হলো বৃহস্পতি। বৃহস্পতির প্রভাবে এদের মধ্যে অগাধ জ্ঞান, নীতিবোধ এবং বিচারবুদ্ধি থাকে। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, এরা খুব ভালো পরামর্শদাতা বা শিক্ষক হতে পারেন।
ব্যক্তিত্বঃ এরা অত্যন্ত উদ্যমী এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের অধিকারী হন। যদিও মাঝে মাঝে এদের মধ্যে কিছুটা ঈর্ষা বা একগুঁয়েমি দেখা দিতে পারে, তবে এদের বুদ্ধিমত্তা ও ধৈর্য এদের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে নিয়ে যায়।

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে বিশাখা হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে ষোড়শ (১৬তম) নক্ষত্র।
দেবতা (ইন্দ্র-অগ্নি)ঃ বিশাখা নক্ষত্রের দুইজন অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন ইন্দ্র (শক্তির দেবতা) এবং অগ্নি (শুদ্ধিকরণ ও দহনের দেবতা)। এই দ্বৈত শক্তির প্রভাবে জাতকদের মধ্যে অদম্য তেজ এবং কোনো কিছু অর্জনের তীব্র ইচ্ছা থাকে। এরা যেমন শক্তিশালী, তেমনি এদের মধ্যে লক্ষ্য পূরণের জন্য নিজেকে পুড়িয়ে খাঁটি করার মানসিকতা থাকে।

প্রতীক (ধনুক/তোরণ)ঃ এই নক্ষত্রের প্রতীক হলো সজ্জিত বিজয় তোরণ বা ধনুক। ধনুক যেমন লক্ষ্যভেদের প্রতীক, এই নক্ষত্রের জাতকরাও জীবনের লক্ষ্য স্থির করে তা অর্জনে একাগ্র থাকেন। তোরণ নির্দেশ করে যে, এরা দীর্ঘ সংগ্রামের পর শেষ পর্যন্ত জীবনে সাফল্য ও সম্মান লাভ করেন।

বৈশিষ্ট্য (উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ)ঃ
উচ্চাকাঙ্ক্ষীঃ এদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত ব্যাপক। ২০২৬ সালের এই প্রতিযোগিতামূলক যুগেও এরা সর্বদা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টা করেন এবং সাধারণ সাফল্যে সন্তুষ্ট হন না।
দৃঢ়প্রতিজ্ঞঃ এরা একবার কোনো লক্ষ্য স্থির করলে তা অর্জনে কঠোর পরিশ্রম করতে দ্বিধা করেন না। কোনো বাধাই এদের দীর্ঘক্ষণ থামিয়ে রাখতে পারে না।

১৭. অনুরাধা (Anuradha)
দেবতাঃ মিত্র
প্রতীকঃ পদ্মফুল
বৈশিষ্ট্যঃ বন্ধুত্বপূর্ণ, আনুগত্য
রাশিঃ এই নক্ষত্রের চারটি পদই বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহঃ অনুরাধার শাসক গ্রহ হলো শনি। শনির প্রভাবে এদের মধ্যে গভীর ধৈর্য, শৃঙ্খলা এবং কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকে। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এরা সাধারণত বিদেশে সাফল্য লাভ করেন।
ব্যক্তিত্বঃ এরা ভ্রমণপ্রিয় এবং সঙ্গীত বা শিল্পের প্রতি অনুরাগী হন। বাহ্যিক কঠোরতার অন্তরালে এদের একটি অত্যন্ত কোমল ও সংবেদনশীল মন থাকে। যুক্তি এবং আবেগের এক চমৎকার ভারসাম্য এদের চরিত্রে দেখা যায়।

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে অনুরাধা হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে ১৭তম নক্ষত্র।
দেবতা (মিত্র)ঃ অনুরাধা নক্ষত্রের অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন মিত্র, যিনি বন্ধুত্ব, ঐক্য এবং সৌহার্দ্যের দেবতা। এর প্রভাবে এই নক্ষত্রের জাতক-জাতিকারা অত্যন্ত সামাজিক হন এবং মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারদর্শী। তারা বিভেদ ভুলে সকলকে একত্রিত করার ক্ষমতা রাখেন।

প্রতীক (পদ্মফুল)ঃ এই নক্ষত্রের প্রতীক হলো পদ্মফুল। পদ্ম যেমন কাদার মধ্যে জন্মেও নিজেকে নির্মল ও সুন্দর রেখে পানির উপরে বিকশিত হয়, তেমনি অনুরাধার জাতকরাও জীবনের প্রতিকূলতা ও সংগ্রামের মাঝে ধৈর্য ধরে সাফল্য অর্জন করেন। এটি আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং পবিত্রতারও প্রতীক।

বৈশিষ্ট্য (বন্ধুত্বপূর্ণ ও আনুগত্য)ঃ
বন্ধুত্বপূর্ণঃ এরা খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারেন এবং বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পরিচিত হন। ২০২৬ সালের সামাজিক ও পেশাদার পরিমণ্ডলে এদের এই গুণটি অত্যন্ত সমাদৃত।
আনুগত্যঃ এরা আদর্শ, সম্পর্ক এবং কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত অনুগত থাকেন। একবার কাউকে কথা দিলে বা কোনো সম্পর্কে জড়ালে তারা শেষ পর্যন্ত তা রক্ষা করার চেষ্টা করেন।

১৮. জ্যেষ্ঠা (Jyeshtha)
দেবতাঃ ইন্দ্র
প্রতীকঃ কানঝুমকা
বৈশিষ্ট্যঃ কর্তৃত্ব, অভিজ্ঞ
রাশিঃ এই নক্ষত্রের চারটি পদই বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহঃ জ্যেষ্ঠার শাসক গ্রহ হলো বুধ। বুধের প্রভাবে এরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, কুশলী এবং তুখোড় বক্তা হয়ে থাকেন। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, এদের বিশ্লেষণ ক্ষমতা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ।
ব্যক্তিত্বঃ এরা নিজেদের পরিবার বা গোষ্ঠীর মধ্যে প্রধান হয়ে থাকতে চান। যদিও এরা কিছুটা খিটখিটে বা জেদি হতে পারেন, কিন্তু বিপদের সময় এদের ওপর নির্ভর করা যায়। এরা সাধারণত গোপন রহস্য উদ্ঘাটনে বা জটিল সমস্যার সমাধানে পারদর্শী হন।

বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে জ্যেষ্ঠা হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে ১৮তম নক্ষত্র।

দেবতা (ইন্দ্র)ঃ জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন দেবরাজ ইন্দ্র। ইন্দ্র যেমন দেবতাদের প্রধান এবং রক্ষক, তেমনি এই নক্ষত্রের জাতকদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার এবং অন্যদের রক্ষা করার এক সহজাত ক্ষমতা থাকে। তারা সাহসের সাথে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারেন।

প্রতীক (কানঝুমকা/ছাতা)ঃ এই নক্ষত্রের প্রতীক হলো কানঝুমকা (Earring) বা তিব্বতি অশুভ শক্তির বিনাশকারী ছাতা। কানঝুমকা আভিজাত্য, সম্পদ এবং উচ্চ সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। এটি নির্দেশ করে যে এই নক্ষত্রের ব্যক্তিরা সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে থাকতে এবং নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পছন্দ করেন।
বৈশিষ্ট্য (কর্তৃত্ব ও অভিজ্ঞ)ঃ
কর্তৃত্বঃ এদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করার এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষমতা প্রবল। ২০২৬ সালের আধুনিক কর্মক্ষেত্রেও এরা সাধারণত শীর্ষপদে বা পরিচালনার দায়িত্বে থাকতে পছন্দ করেন।
অভিজ্ঞঃ 'জ্যেষ্ঠা' শব্দের অর্থ হলো 'জ্যেষ্ঠ' বা 'বড়'। এরা বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিপক্ক এবং অভিজ্ঞ হন। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে এরা প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

১৯. মূলা (Mula)
দেবতাঃ নিরৃতি,
প্রতীক: গিঁট
বৈশিষ্ট্যঃ গভীর, অনুসন্ধানী
রাশিঃ এই নক্ষত্রের চারটি পদই ধনু রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহঃ মূলা নক্ষত্রের শাসক গ্রহ হলো কেতু। কেতুর প্রভাবে এদের মধ্যে বৈরাগ্য, মোক্ষ লাভের ইচ্ছা এবং তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি লক্ষ্য করা যায়। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এরা অনেক সময় রূঢ় সত্য বলতে দ্বিধা করেন না।
ব্যক্তিত্বঃ এরা অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। যদিও এদের জীবন কিছুটা চড়াই-উতরাইপূর্ণ হয়, তবুও শেষ পর্যন্ত এরা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অনেক জ্ঞান অর্জন করেন।

মূলা হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে ১৯তম নক্ষত্র।
দেবতা (নিরৃতি)ঃ মূলা নক্ষত্রের অধিষ্ঠাতা দেবী হলেন নিরৃতি, যাঁকে ধ্বংস বা পরিবর্তনের দেবী বলা হয়। এর ফলে এই নক্ষত্রের জাতকদের জীবনে প্রায়ই বড় ধরনের আমূল পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটে। এটি মূলত পুরনোকে ধ্বংস করে নতুনের পথ প্রশস্ত করার শক্তির প্রতীক। মূলা নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে আরও জানুন।

প্রতীক (গিঁট/গাছের মূল)ঃ এই নক্ষত্রের প্রতীক হলো একগুচ্ছ শিকড় বা গাছের মূল যা পরস্পর গিঁট পাকিয়ে থাকে। এটি কোনো বিষয়ের গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা এবং জটিল রহস্য উন্মোচনের নির্দেশক। গিঁট যেমন খোলা কঠিন, তেমনি এই নক্ষত্রের জাতকরাও জীবনের কঠিন রহস্য সমাধানে পারদর্শী হন।

বৈশিষ্ট্য (গভীর ও অনুসন্ধানী)ঃ
গভীরঃ এরা ভাসাভাসা কোনো কিছু পছন্দ করেন না। যেকোনো বিষয়ের একদম গভীরে গিয়ে সত্য উদঘাটন করা এদের স্বভাব। আধ্যাত্মিকতা বা দর্শনের প্রতি এদের প্রবল টান থাকে।
অনুসন্ধানীঃ এদের মধ্যে সত্য অনুসন্ধানের এক সহজাত প্রবৃত্তি দেখা যায়। এরা খুব ভালো গবেষক, গোয়েন্দা বা বিজ্ঞানী হতে পারেন। কোনো লুকানো তথ্য বের করে আনতে এরা ওস্তাদ।

২০. পূর্বাষাঢ়া (Purva Ashadha)
দেবতাঃ অপ্সরা
প্রতীকঃ হাতির দাঁত
বৈশিষ্ট্যঃ নির্ভীক, আশাবাদী
রাশি: এই নক্ষত্রের চারটি পদই ধনু রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহ: পূর্বাষাঢ়ার শাসক গ্রহ হলো শুক্র। শুক্রের প্রভাবে এরা শিল্পমনা, সৌন্দর্যপ্রিয় এবং বিলাসবহুল জীবন পছন্দ করেন। এদের ব্যক্তিত্বে এক ধরনের আকর্ষণীয় শক্তি থাকে।
ব্যক্তিত্ব: এরা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং অন্যের পরামর্শের চেয়ে নিজের বুদ্ধিতে চলতে বেশি পছন্দ করেন। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী, এরা বাগ্মী এবং তর্কে অপরাজেয় হয়ে থাকেন।

পূর্বাষাঢ়া (২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে ২০তম) নক্ষত্র ।
দেবতা (অপঃ/জল)ঃ যদিও অনেকে অপ্সরাদের সাথে একে যুক্ত করেন, তবে এই নক্ষত্রের মূল অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন 'অপঃ' বা জল। জলের মতো এদের স্বভাবও স্বচ্ছ এবং প্রবাহমান। এরা যেকোনো পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, কিন্তু জল যেমন বাঁধ ভাঙলে অপ্রতিরোধ্য, এরাও লক্ষ্য অর্জনে তেমন সংকল্পবদ্ধ। পূর্বাষাঢ়া নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে আরও জানুন।

প্রতীক (হাতির দাঁত/কুলো)ঃ এই নক্ষত্রের অন্যতম প্রতীক হলো হাতির দাঁত। এটি আভিজাত্য, শক্তি এবং অপরাজেয় মানসিকতার পরিচয় দেয়। এ ছাড়াও 'কুলো' (Winnowing Basket) এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা সারবস্তু গ্রহণ করে অসারকে বর্জন করার ক্ষমতার নির্দেশক।

বৈশিষ্ট্য (নির্ভীক ও আশাবাদী)ঃ
নির্ভীকঃ এরা স্বভাবগতভাবে অত্যন্ত সাহসী। যেকোনো কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে এরা পিছপা হয় না। নিজের মতাদর্শে এরা অটল থাকে।
আশাবাদীঃ এদের জীবনদর্শন অত্যন্ত ইতিবাচক। ২০২৬ সালের এই সময়েও এদের মধ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ার এক সহজাত ক্ষমতা দেখা যায়। এরা বিশ্বাস করে যে "সবকিছুরই একটি ভালো দিক আছে"।

২১. উত্তরাষাঢ়া (Uttara Ashadha)
দেবতাঃ বিশ্বদেব
প্রতীকঃ হাতি
বৈশিষ্ট্যঃ বিজয়ী, স্থিতিশীল
রাশিঃ এই নক্ষত্রের প্রথম পদ ধনু রাশিতে এবং বাকি তিনটি পদ মকর রাশিতে অবস্থিত।
গ্রহঃ এই নক্ষত্রের শাসক গ্রহ হলো রবি (সূর্য)। সূর্যের প্রভাবে এরা অত্যন্ত তেজস্বী, আত্মবিশ্বাসী এবং তেজদীপ্ত ব্যক্তিত্বের অধিকারী হন। জ্যোতিষশাস্ত্রীয় সঠিক গণনা অনুযায়ী, এরা কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্মান ও উচ্চপদ লাভ করে থাকেন।
ব্যক্তিত্বঃ তারা পরোপকারী এবং ধার্মিক প্রকৃতির হন। কোনো কাজ একবার শুরু করলে তা শেষ না করে শান্তি পান না।
বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে উত্তরাষাঢ়া হলো ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে একবিংশ (২১তম) নক্ষত্র।

দেবতা (বিশ্বদেব)ঃ উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রের অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন বিশ্বদেব (দশজন দেবতার সমষ্টি)। এর ফলে এই নক্ষত্রের জাতকদের মধ্যে বহুমুখী গুণাবলি, উচ্চ আদর্শ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ দেখা যায়। তারা সাধারণত অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং সত্যনিষ্ঠ হন। উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে আরও জানুন।

প্রতীক (হাতির দাঁত/হাতি)ঃ এই নক্ষত্রের প্রতীক হলো হাতির দাঁত (Tusk of an Elephant)। এটি রাজকীয় ক্ষমতা, ধৈর্য এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তির প্রতীক। হাতি যেমন শান্ত কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী, এই নক্ষত্রের জাতকরাও ধীরস্থির এবং অদম্য মানসিক শক্তির অধিকারী হন। তারা জীবনের বড় লক্ষ্য অর্জনে ধৈর্য হারান না।

বৈশিষ্ট্য (বিজয়ী ও স্থিতিশীল):

বিজয়ীঃ উত্তরাষাঢ়া শব্দের অর্থ হলো 'পরবর্তী অপরাজেয়'। এরা যেকোনো প্রতিযোগিতায় বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত জয়ী হওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ২০২৬ সালের আধুনিক প্রেক্ষাপটেও এদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হয়।
স্থিতিশীলঃ এরা স্বভাবগতভাবে খুব স্থিতিশীল এবং দায়িত্বশীল। হঠকারিতা এদের স্বভাবে নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এরা নিজেদের অবস্থান মজবুত করেন।


২২. অভিজিৎ (Abhijit)

(অনেক তালিকায় ২৮তম, অনেক সময় বাদ দেওয়া হয়)
অভিজিৎ (Abhijit) নক্ষত্রকে বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে ২৮তম নক্ষত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, যা উত্তরাষাঢ়া ও শ্রবণা নক্ষত্রের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।
অধিষ্ঠাত্রী দেবতা: ব্রহ্মা (Brahma)
পরিচয়ঃ অভিজিৎ নক্ষত্রের দেবতা স্বয়ং সৃষ্টির কর্তা ব্রহ্মা।
প্রভাবঃ ব্রহ্মার আশীর্বাদে এই নক্ষত্রটি সৃজনশীলতা, জ্ঞান এবং উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির প্রতীক। এটি নতুন কোনো মহৎ কাজ শুরু করার জন্য অজেয় শক্তি প্রদান করে।

প্রতীকঃ মাথার ওপরের অংশ বা একটি ত্রিভুজ (The Zenith or a Triangle)
সর্বোচ্চ শিখর: এর প্রতীক 'জেনিত' বা আকাশের সর্বোচ্চ বিন্দু, যা জীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য এবং বিজয়ের নির্দেশক।
অজেয় শক্তি: 'অভিজিৎ' শব্দের অর্থই হলো 'যাকে জয় করা যায় না'। এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অদম্য সাহসের প্রতীক।

বৈশিষ্ট্যঃ বিজয়ী ও আধ্যাত্মিক (Victorious & Spiritual)
সর্বদা বিজয়ীঃ এই নক্ষত্রের জাতকরা বা এই নক্ষত্রে শুরু করা কাজ সাধারণত ব্যর্থ হয় না। মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুন এই নক্ষত্রকে তাঁর বিশেষ শক্তির উৎস হিসেবে দেখেছিলেন।
শুভ মুহূর্ত (Abhijit Muhurta): প্রতিদিন দুপুরে যখন সূর্য সর্বোচ্চ বিন্দুতে থাকে, সেই সময়টিকে 'অভিজিৎ মুহূর্ত' বলা হয়। ২০২৬ সালেও যে কোনো নতুন ব্যবসা বা শুভ কাজের সূচনা করার জন্য এটি শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে বিবেচিত। [৯.৫.৫, ৯.৫.৭]
স্বভাবঃ এরা অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ, সত্যবাদী এবং আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী হন। সমাজে এরা অত্যন্ত সম্মানের পাত্র হয়ে থাকেন। [
উপযুক্ত কাজঃ রাজ্যাভিষেক, বড় ব্যবসা শুরু, শপথ গ্রহণ বা দীর্ঘমেয়াদী কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ।

২৩. শ্রবণা (Shravana)
দেবতাঃ বিষ্ণু, প্রতীক: কান
বৈশিষ্ট্যঃ মনোযোগী, শ্রবণক্ষম
প্রতীকঃ কান (Ear) বা তিনটি পদচিহ্ন
অধিপতি গ্রহ: চন্দ্র (Moon)।
রাশি: সম্পূর্ণ নক্ষত্রটি মকর রাশিতে অবস্থিত।
উপযুক্ত পেশা: শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সংগীত, ভাষাতত্ত্ববিদ, বা কাউন্সেলিং।
শ্রবণা (Shravana) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ২২তম নক্ষত্র। ২আধ্যাত্মিক জ্ঞান আহরণ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই নক্ষত্রকে অত্যন্ত প্রভাবশালী মনে করা হয়।

অধিষ্ঠাত্রী দেবতাঃ ভগবান বিষ্ণু (Lord Vishnu)
পরিচয়ঃ শ্রবণা নক্ষত্রের অধিপতি স্বয়ং জগতের পালনকর্তা ভগবান বিষ্ণু।
প্রভাবঃ বিষ্ণুর প্রভাবে এই নক্ষত্রের জাতকদের মধ্যে শৃঙ্খলা, সংগঠন করার ক্ষমতা এবং অন্যের সেবা করার প্রবৃত্তি দেখা যায়। এটি জ্ঞানের প্রসার এবং সত্যের পথে চলার অনুপ্রেরণা দেয়।
বামন অবতারঃ অনেকে এই নক্ষত্রকে বিষ্ণুর 'বামন অবতারের' সাথেও যুক্ত করেন, যা ৩টি পদক্ষেপের মাধ্যমে জগত জয়ের প্রতীক। [

প্রতীকঃ কান (Ear) বা তিনটি পদচিহ্ন
শ্রবণ শক্তিঃ এর প্রধান প্রতীক হলো 'কান', যা মৌখিক জ্ঞান বা শ্রুতির মাধ্যমে শেখার নির্দেশ করে। প্রাচীনকালে গুরুমুখী বিদ্যা অর্জনের জন্য এই নক্ষত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।
গ্রহণযোগ্যতাঃ কান যেমন শব্দ গ্রহণ করে, এই নক্ষত্রের জাতকরাও চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য ও জ্ঞান খুব দ্রুত গ্রহণ করতে পারেন।
তিনটি পদচিহ্নঃ এটি জ্ঞানের তিনটি স্তর বা বিষ্ণুর পদক্ষেপের মাধ্যমে আকাশ, পৃথিবী ও পাতাল জয়ের প্রতীক।
বৈশিষ্ট্যঃ মনোযোগী ও শ্রবণকারী (Attentive & Listener)
নিপুণ শ্রোতাঃ শ্রবণা নক্ষত্রের জাতকরা খুব ধৈর্যশীল শ্রোতা হন। তারা কেবল কথা শোনেন না, বরং শব্দের পেছনের অর্থ বা নির্যাস বুঝতে পারদর্শী।
মনোযোগী স্বভাবঃ এরা যে কোনো কাজে খুব গভীর মনোযোগ দিতে পারেন। পড়াশোনা বা গবেষণামূলক কাজে এদের সাফল্য নজরকাড়া হয়।
শিষ্টাচার ও শিক্ষাঃ এরা সাধারণত খুব ভদ্র এবং উচ্চ শিক্ষিত হন। অন্যের কথাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং সম্মান জানানো এদের অন্যতম গুণ।
গোপনীয়তাঃ এরা অন্যের গোপন কথা নিজের কাছে রাখতে পারেন, তাই এদেরকে নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা পরামর্শদাতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

২৪. ধনিষ্ঠা (Dhanishta)
দেবতাঃ অষ্টবসু
প্রতীকঃ ড্রাম
বৈশিষ্ট্যঃ সংগীতপ্রেমী, সামাজিক
অধিপতি গ্রহঃ মঙ্গল (Mars)
রাশিঃ এই নক্ষত্রের প্রথমার্ধ মকর রাশিতে এবং দ্বিতীয়ার্ধ কুম্ভ রাশিতে অবস্থিত।
উপযুক্ত পেশাঃ সংগীতশিল্পী, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, সামরিক বাহিনী, বা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট।

ধনিষ্ঠা (Dhanishta) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ২৩তম নক্ষত্র, যা সমৃদ্ধি এবং ছন্দের জন্য সুপরিচিত। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রে এই নক্ষত্রকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও রাজকীয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

১. অধিষ্ঠাত্রী দেবতা: অষ্টবসু (Ashta Vasus)
পরিচয়: ধনিষ্ঠার অধিপতি হলেন আটজন দেবতা বা 'অষ্টবসু' (পৃথ্বী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র)।
প্রভাব: এই আটজন দেবতা প্রাকৃতিক উপাদান এবং জাগতিক প্রাচুর্যের প্রতীক। অষ্টবসুর আশীর্বাদে এই নক্ষত্রের জাতকরা সাধারণত সম্পদশালী হন এবং বিভিন্ন বিষয়ে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হন।
২. প্রতীক: ড্রাম বা ঢোল (Drum)
ছন্দ ও তাল: এর প্রতীক হলো 'শিবের ডমরু' বা ড্রাম, যা জীবন ও মহাবিশ্বের ছন্দকে প্রকাশ করে।
শূন্যতা ও পূর্ণতাঃ ড্রামের ভেতরটা ফাঁপা থাকে, যা আধ্যাত্মিক শূন্যতা বা উচ্চতর জ্ঞানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ইঙ্গিত দেয়। এটি সংগীত ও শব্দের মাধ্যমে সৃজনশীলতা প্রকাশের ক্ষমতা দেয়।
অন্য প্রতীকঃ বাঁশি এই নক্ষত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে এর গভীর সংযোগ স্থাপন করে।
৩. বৈশিষ্ট্যঃ সংগীতপ্রেমী ও সামাজিক (Musical & Social)

সংগীত ও ছন্দঃ ধনিষ্ঠা নক্ষত্রের জাতকদের মধ্যে জন্মগতভাবে তালের বোধ ও সংগীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ থাকে। তারা নাচ, গান বা যে কোনো পরিবেশন কলায় দক্ষ হতে পারেন।
সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাঃ এরা অত্যন্ত সামাজিক ও মিশুকে প্রকৃতির হন। মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন এবং দলগত কাজে নেতৃত্ব দিতে এরা পছন্দ করেন।
উচ্চাকাঙ্ক্ষীঃ মঙ্গলের (Mars) অধিপতিত্বের কারণে এদের মধ্যে প্রবল সাহস ও লক্ষ্য অর্জনের জেদ থাকে। এরা সাধারণত অর্থ ব্যবস্থাপনা ও: ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে দক্ষ হন।

২৫. শতভিষা (Shatabhisha)
দেবতাঃ বরুণ, প্রতীক: বৃত্ত
বৈশিষ্ট্যঃ নিরাময়কারী, রহস্যময়
রাশি:কুম্ভ রাশি
পেশা: চিকিৎসক, গবেষক, পরিবেশ বিজ্ঞানী, জ্যোতিষী বা পরমাণু বিজ্ঞানী ।

শতভিষা নক্ষত্র (Shatabhisha) বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ২৪তম নক্ষত্র, যা তার রহস্যময় গভীরতা এবং রোগ নিরাময়কারী ক্ষমতার জন্য পরিচিত।
১. অধিষ্ঠাত্রী দেবতাঃ বরুণ (Varuna)
পরিচয়ঃ বরুণ হলেন মহাজাগতিক জলরাশি এবং আকাশ মণ্ডলের অধিপতি দেবতা । তিনি মহাজাগতিক আইন বা 'ঋত' (Rta)-এর রক্ষক ।
ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাঃ বরুণ দেবতাকে একজন কঠোর বিচারক হিসেবে দেখা হয় যিনি পাপীদের শাস্তি দেন এবং সত্যবাদীদের ক্ষমা করেন । এই নক্ষত্রের জাতকরা তাই অত্যন্ত নীতিবান এবং সত্যবাদী হয়ে থাকেন ।
বন্ধন ও মুক্তিঃ তাকে 'ফাঁস' বা মায়া দ্বারা মানুষকে বেঁধে রাখার দেবতা বলা হয়, আবার তিনিই আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে সেই মায়া থেকে মুক্তি দান করেন ।
২. প্রতীকঃ বৃত্ত (Empty Circle)
অসীমতাঃ একটি বৃত্তের শুরু বা শেষ নেই, যা অসীম মহাবিশ্ব এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতার প্রতীক ।
গোপনীয়তাঃ বৃত্তটি একটি সুরক্ষা বলয় বা সীমানা বোঝায়, যা এই নক্ষত্রের জাতকদের অন্তর্মুখী এবং রহস্যময় স্বভাবকে নির্দেশ করে । এরা সহজে নিজেদের মনের গোপন কথা কাউকে প্রকাশ করতে চায় না ।
একাকীত্বঃ বৃত্তটি একক সত্তাকে বোঝায়, যার কারণে শতভিষার জাতকরা অনেক সময় ভিড়ের মধ্যে থেকেও নিজেকে একাকী অনুভব করেন ।
৩. মূল বৈশিষ্ট্যঃ নিরাময়কারী ও রহস্যময় (Healer & Mysterious)
নিরাময়কারী (The Physician)ঃ শতভিষাকে বলা হয় "শত ভিষক" অর্থাৎ একশ জন চিকিৎসকের শক্তি সম্পন্ন নক্ষত্র । এটি সব ধরণের রোগের প্রতিকার এবং বিশেষ করে আয়ুর্বেদ ও প্রাকৃতিক চিকিৎসার সাথে যুক্ত ।

বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মনঃ এই নক্ষত্রের জাতকরা গভীর চিন্তাশীল এবং রহস্য উদ্ঘাটন করতে ভালোবাসেন। বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা এবং দর্শন শাস্ত্রে এদের বিশেষ আগ্রহ থাকে ।
রাহুর প্রভাবঃ এই নক্ষত্রের অধিপতি গ্রহ হলো রাহু । রাহুর প্রভাবে এরা প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে এবং ইলেকট্রনিক্স বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারেন ।
সতর্কতাঃ এদের অত্যাধিক অন্তর্মুখী স্বভাব অনেক সময় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে।

২৬. পূর্বাভাদ্র (Purva Bhadrapada)
দেবতাঃ অজ একপাদ
প্রতীক: তরবারি
অধিপতি (Lord) ঃ বৃহস্পতি।
প্রকৃতিঃ উগ্র, আদর্শবাদী, কখনও কখনও জেদী ও আধ্যাত্মিক।
পূর্বভাদ্রপদ নক্ষত্রের প্রধান দেবতা হলেন অজ একপদ, যিনি শিবের একটি রূপ এবং এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত সত্তা, যিনি আধ্যাত্মিক শুদ্ধি ও ঝড়ের সঙ্গে যুক্ত; এর প্রতীক তরবারি যা সত্য উদ্ঘাটন ও নেতিবাচকতা কাটার ক্ষমতা বোঝায়। এর অধিপতি গ্রহ হলেন বৃহস্পতি (গুরু)।
অজ' শব্দের অর্থ জন্মহীন এবং 'একপাত' মানে এক পা বিশিষ্ট
এই নক্ষত্রের জাতক-জাতিকারা আদর্শবাদী, দূরদর্শী, এবং জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন, তবে কখনও কখনও উগ্র ও দ্বৈত সত্তার অধিকারীও হতে পারেন, যা তরবারির প্রতীক ও দুই মুখের মানুষের ধারণার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
অজ একপদ (Aja Ekapada)ঃ ইনি এক পা-বিশিষ্ট, কখনও সর্প বা ছাগল-মাথাযুক্ত এক রহস্যময় সত্তা।
পরিচইয়ঃ ইনি শিবের একটি রূপ হিসেবে পূজিত হন, যিনি আধ্যাত্মিক শুদ্ধিকরণ এবং ঝড়ের দেবতা হিসেবে পরিচিত।
প্রভাব ( প্রভাব )ঃ এই দেবতা চরম পরিবর্তন ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক, যা পূর্বভাদ্রপদের মূল প্রকৃতি।
প্রতীক - তরবারি
অর্থঃ তরবারি জ্ঞান ও সত্যের প্রতীক, যা অজ্ঞতা ও নেতিবাচকতাকে ছেদন করে।
তাৎপর্য ঃ এটি গভীরে প্রবেশ করা, সমস্যা সমাধানে তীক্ষ্ণতা এবং সঠিক পথে চালিত করার ক্ষমতা নির্দেশ করে।
অন্যান্য প্রতীকঃ এই নক্ষত্রের আরেকটি প্রতীক হল "দুই মুখের মানুষ" (Two-faced man), যা একটি বিষয়ের উভয় দিক দেখার ক্ষমতা বোঝায় এবং "মৃতের খাটিয়ার সামনের পায়া" যা রূপান্তর ও শেষ বোঝায়।

মূল গুণ (Core Quality) : গভীর অন্তর্দৃষ্টি, পরিবর্তন আনার ক্ষমতা, এবং তীব্র মূল্যবোধ।
সংক্ষেপে, পূর্বভাদ্রপদ নক্ষত্রটি আধ্যাত্মিক গভীরতা, জ্ঞানার্জন এবং রূপান্তরের প্রতিনিধিত্ব করে, যার পেছনে অজ একপদ ও তরবারির প্রতীকী শক্তি কাজ করে।

২৭. উত্তরাভাদ্র (Uttara Bhadrapada)
দেবতাঃ অহির্বুধ্ন্য বা অহিভৃৎ (গভীর সাগরের সর্প দেবতা)
প্রতীকঃ যমজ বিছানা, দুই পা বিশিষ্ট খাট, বা সাপের পেছনের অংশ
বৈশিষ্ট্যঃ স্থিতিশীল, সহানুভূতিশীল
অধিপতি গ্রহঃ শনি, রাশিঃ মীন রাশি
যোগতারাঃ গামা পেগাসি (Gamma Pegasi) ও আলফা অ্যান্ড্রোমিডি
নাম অর্থঃ "উত্তরাভাদ্রপদ" = "উত্তর" + "ভাদ্রপদ" = "পরবর্তী শুভ পদ" বা "পরবর্তী সৌভাগ্যের পা"

বৈশিষ্ট্যঃ
১. স্থিতিশীলতা ও ধৈর্যঃঅত্যন্ত ধৈর্যশীল ও স্থির, দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে মনোনিবেশ করে, সহনশীল ও দৃঢ়চেতা। জীবনে স্থিতিশীলতা খোঁজে,গভীর শিকড় বিশিষ্ট।
২. গভীর সহানুভূতিঃ অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও করুণাময়। অন্যদের কষ্ট অনুভব করতে পারে। পরোপকারী মনোভাব।ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত। মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে।
৩. অন্যান্য গুণাবলীঃ গভীর চিন্তাশীল ও দার্শনিক। আধ্যাত্মিক প্রবণতা প্রবল। রহস্যময় ও গোপনীয়, প্রজ্ঞাবান ও পরিপক্ব, দায়িত্বশীল ও বিশ্বস্ত, গম্ভীর ও গভীর ব্যক্তিত্ব।

পূর্বভাদ্রপদঃ
দেবতাঃ অজ একপাদ (এক পা বিশিষ্ট ছাগল) যা আগুন, তীব্রতা, রূপান্তর, বিদ্যুৎ, আকস্মিক পরিবর্তন নির্দশন করে।

অহির্বুধ্ন্য দেবতার পরিচয়ঃ
অহির্বুধ্ন্য (অহিভৃৎ) হলেন "গভীরে স্থিত সর্প" - সমুদ্রের তলদেশের সাপ। কুণ্ডলিনী শক্তির প্রতীক। গভীর অচেতন মনের দেবতা। লুকানো শক্তি ও জ্ঞানের রক্ষকরুদ্রের একটি রূপ বা সহযোগী। একাদশ রুদ্রের অন্যতম।

বৈদিক সাহিত্যে অহির্বুধ্ন্যঃ ঋগ্বেদে উল্লিখিত পৃথিবীর গভীরে অবস্থিত। জলের তলদেশে থাকে। গুপ্ত শক্তি ও রহস্যের প্রতীক।
দেবতা অহির্বুধ্ন্য (গভীর সর্প) জল, স্থিতিশীলতা, গভীরতা শান্তি, পরিপক্বতা নিদর্শন করেন। একসাথে তারা আগুন ও জলের সমন্বয়, রূপান্তর ও স্থিতিশীলতা প্রতিনিধিত্ব করে।

অহির্বুধ্ন্যের প্রভাবঃ
উত্তরাভাদ্রপদ নক্ষত্রে জন্মগ্রহণকারীরা গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করে। অচেতন মনের রহস্য বোঝে। কুণ্ডলিনী জাগরণে সক্ষম।
গভীর ধ্যান ও তপস্যায় আগ্রহী হন। লুকানো সত্য উদ্ঘাটন করতে পারেন।

প্রতীকের তাৎপর্যঃ
১. যমজ বিছানা / দুই পা বিশিষ্ট খাটঃ বিশ্রাম ও শান্তির প্রতীক। জাগতিক থেকে আধ্যাত্মিক যাত্রা, মৃত্যুশয্যা (জাগতিক জীবনের সমাপ্তি)
গভীর ধ্যান ও সমাধি, দ্বৈততা ও একত্বের মিলন প্রদর্শন করেন।
২. সাপের পেছনের অংশঃ লুকানো শক্তি, গভীরে স্থিত কুণ্ডলিনী, ভিত্তি ও সমর্থন, গভীরতা ও স্থিতিশীলতা প্রদর্শন করেন।

উত্তরাভাদ্রপদঃ উপযুক্ত পেশা -আধ্যাত্মিক গুরু, যোগী, ধ্যানী, দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী, সমাজসেবক, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, নিরাময়কারী জ্যোতিষী, তান্ত্রিক, লেখক, কবি (গভীর বিষয়ে),পরিবেশবিদ, সামুদ্রিক বিজ্ঞানী, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সংক্রান্ত পেশা।
শনির প্রভাবঃ
শনি অধিপতি হওয়ায় এরা ধীর কিন্তু স্থিতিশীল অগ্রগতিল্ভ করে। কর্মফলের গভীর উপলব্ধি, দায়িত্ব ও শৃঙ্খলা, ত্যাগ ও তপস্যার প্রবণতা,জীবনের গভীর অর্থ খোঁজা।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্যঃ
কুণ্ডলিনী শক্তি - মূলাধার চক্রে সুপ্ত শক্তি গভীর সাধনার মাধ্যমে জাগরণ ঘটে। আধ্যাত্মিক উন্নতির শেষ পর্যায় আরোহণ। মোক্ষের পথ লাভ।
মৃত্যু ও পুনর্জন্মঃ জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্তি, আধ্যাত্মিক পুনর্জন্ম, অহংকার বিসর্জন, উচ্চতর চেতনায় উত্তরণ
সম্পর্ক ও পরিবারঃ গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল,আবেগীয় গভীরতা,ত্যাগস্বীকারে প্রস্তুত
কিন্তু একাকীত্ব পছন্দ করতে পারে।
বিশেষত্বঃ গভীর জল -এই নক্ষত্র সমুদ্রের গভীরতার প্রতীক। লুকানো সত্য ও রহস্য, অচেতন মনের শক্তি। আবেগের গভীরতা নিদর্শন করে।
শেষের দিকের নক্ষত্র- ২৬তম নক্ষত্র (২৭টির মধ্যে)পরিপক্বতা ও জ্ঞানের প্রতীক। জীবনচক্রের শেষের দিকে মোক্ষের প্রস্তুতি নির্দেশ করে।
চ্যালেঞ্জঃ
চিন্তা অতিরিক্ত গম্ভীর হতে পারে, জাগতিক বিষয়ে অনাগ্রহী হয়ে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে পারে। অতিরিক্ত ত্যাগ করে নিজের ক্ষতি, বিষণ্ণতার প্রবণতা দেখা যায়। এই নক্ষত্র গভীর আধ্যাত্মিকতা, স্থিতিশীলতা, করুণা এবং লুকানো শক্তির প্রতীক। এটি জাগতিক জীবন থেকে আধ্যাত্মিক মুক্তির পথে যাত্রার প্রতিনিধিত্ব করে।

২৮. রেবতী (Revati)
দেবতা: পূষা বা পূষণ (রক্ষক ও পথপ্রদর্শক দেবতা)
প্রতীক: মাছ বা ঢোল (মৃদঙ্গ)
বৈশিষ্ট্যঃ সুরক্ষাদাতা, কোমল
অধিপতি গ্রহ: বুধ
রাশিঃ মীন
যোগতারা: জেটা পিসিয়াম (Zeta Piscium)
স্থান: ২৭তম ও শেষ নক্ষত্র

নাম অর্থঃ
"রেবতী" = "সমৃদ্ধ", "ধনী", "উজ্জ্বল", "প্রাচুর্যময়"
বৈশিষ্ট্যঃ দাঁতহীন দেবতা হিসেবে বর্ণিত (পুরাণ অনুসারে)। ছাগল তাঁর বাহন।
১. কোমল ও দয়ালুঃ অত্যন্ত সহানুভূতিশীল, স্নেহময় ও যত্নশীল, শান্তিপ্রিয় স্বভাব, মৃদু ও ভদ্র আচরণ
২. রক্ষণশীল ও পরিচর্যাকারীঃ অন্যদের সুরক্ষা দেয়, পথ দেখায় ও সাহায্য করে। পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি নিবেদিত, দুর্বলদের রক্ষা করে।
৩. অন্যান্য গুণাবলীঃ ধৈর্যশীল ও সহনশীল, শৈল্পিক ও সৃজনশীল, আধ্যাত্মিক প্রবণতা, বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য। সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের প্রতীক, ভ্রমণপ্রিয়।
পূষা দেবতার পরিচয়ঃ
পূষা পথের রক্ষক ও পথপ্রদর্শক দেবতা। যাত্রীদের সুরক্ষা প্রদানকারী, হারানো জিনিস খুঁজে দেন। পশুপালক ও কৃষিকাজের দেবতা। খাদ্য ও পুষ্টির দেবতা। বিবাহের সময় কন্যাকে পথ দেখান।

বৈদিক সাহিত্যে পূষাঃ
ঋগ্বেদে পূষাকে সূর্যের একটি রূপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি দুর্বল ও অসহায়দের রক্ষক।

প্রতীকের তাৎপর্য মাছঃ
জলের প্রবাহে চলা (জীবনের গতি), প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি আনয়ন করা, উর্বরতা ও সৃষ্টিশীলতা দান করা, মীন রাশির সাথে সংযোগ। আধ্যাত্মিক গভীরতা

প্রতীকঃ ঢোল/মৃদঙ্গঃ
সঙ্গীত ও শিল্পকলা। উৎসব ও আনন্দ, ছন্দ ও সমন্বয়, সময়ের গতি
বিশেষত্বঃ শেষ নক্ষত্রঃ অর্থাৎ ২৭টি নক্ষত্রের শেষ নক্ষত্র। সমাপ্তি ও পূর্ণতার প্রতীক। নতুন চক্রের প্রস্তুতি নির্দেশ করে। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার পরিপক্বতা দান করে।
উপযুক্ত পেশাঃ
পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা, কোচ, ভ্রমণ শিল্প, ট্যুর গাইড, পশুপালন, কৃষি, সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, সমাজসেবক, দাতব্য কাজ। শিক্ষক, প্রশিক্ষক, পরিবহন ব্যবসা, খাদ্য শিল্প।
নক্ষত্রের সাথে পৌরাণিক সংযোগঃ
রেবতী ছিলেন রাজা রৈবত বা কাকুদ্মীর কন্যা। বলরামের (শ্রীকৃষ্ণের ভ্রাতা) স্ত্রী। অত্যন্ত সুন্দরী ও গুণবতী।
সময় ভ্রমণের কাহিনীতে উল্লিখিত (পিতা ব্রহ্মলোকে গিয়ে ফিরে আসেন)।
শুভত্বঃরেবতী নক্ষত্র অত্যন্ত শুভ বিবেচিত হন। বিবাহের জন্য উত্তম, নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য শুভ, ভ্রমণ শুরুর জন্য আদর্শ
শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর।
সম্পর্ক ও পরিবারঃ পরিবারের প্রতি অত্যন্ত নিবেদিত।বিবাহিত জীবনে সুখী, সন্তানদের প্রতি স্নেহশীল, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে
সহযোগিতামূলক ও সমন্বয়কারী।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্যঃ জীবনযাত্রার শেষ পর্যায়,মোক্ষের পথে অগ্রসর, পূর্ণতা ও সমাপ্তির প্রতীক, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শন করে।
এই নক্ষত্র সমৃদ্ধি, রক্ষা, পথপ্রদর্শন এবং কোমল শক্তির প্রতীক। এটি সবচেয়ে শুভ ও কল্যাণকর নক্ষত্রগুলির মধ্যে অন্যতম এবং জীবনচক্রের পূর্ণতার প্রতিনিধিত্ব করে।

* কখনও কখনও অভিজিৎ নক্ষত্রকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন মোট নক্ষত্র হয় ২৮টি।

ভারতীয় নক্ষত্রসমূহের অবস্থান কোন zodiac sign অনুসারেঃ

বৈদিক নক্ষত্র ----প্রধানত যে রাশিতে অবস্থিত (Western Zodiac Sign)
১) অশ্বিনী (Ashwini) মেষ (Aries)
২) ভরণী (Bharani) মেষ (Aries)
৩) কৃত্তিকা (Krittika) মেষ (Aries) ও বৃষ (Taurus)
৪) রোহিণী (Rohini) বৃষ (Taurus)
৫) মৃগশিরা (Mrigashira) বৃষ (Taurus) ও মিথুন (Gemini)
৬) আর্দ্রা (Ardra) মিথুন (Gemini)
৭) পুনর্বসু (Punarvasu) মিথুন (Gemini) ও কর্কট (Cancer)
৮) পুষ্য (Pushya) কর্কট (Cancer)
৯) আশ্লেষা (Ashlesha) কর্কট (Cancer)
১০) মঘা (Magha) সিংহ (Leo)
১১) পূর্ব ফল্গুনী (Purva Phalguni) সিংহ (Leo)
১২) উত্তর ফল্গুনী (Uttara Phalguni) সিংহ (Leo) ও কন্যা (Virgo)
১৩) হস্ত (Hasta) কন্যা (Virgo)
১৪) চিত্রা (Chitra) কন্যা (Virgo) ও তুলা (Libra)
১৫) স্বাতি (Swati) তুলা (Libra)
১৬) বিশাখা (Vishakha) তুলা (Libra) ও বৃশ্চিক (Scorpio)
১৭) অনুরাধা (Anuradha) বৃশ্চিক (Scorpio)
১৮) জ্যেষ্ঠা (Jyeshtha) বৃশ্চিক (Scorpio)
১৯) মূলা (Mula) ধনু (Sagittarius)
২০) পূর্বাষাঢ়া (Purva Ashadha) ধনু (Sagittarius)
২১) উত্তরাষাঢ়া (Uttara Ashadha) ধনু (Sagittarius) ও মকর (Capricorn)
২২) শ্রবণা (Shravana) মকর (Capricorn)
২৩) ধনিষ্ঠা (Dhanishta) মকর (Capricorn) ও কুম্ভ (Aquarius)
২৪) শতভিষা (Shatabhisha) কুম্ভ (Aquarius)
২৫) পূর্বভাদ্রপদ (Purva Bhadrapada) কুম্ভ (Aquarius) ও মীন (Pisces)
২৬) উত্তরভাদ্রপদ (Uttara Bhadrapada) মীন (Pisces)
২৭) রেবতী (Revati) মীন (Pisces)


তথ্যসূত্রঃ উইকিপডিয়া
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:২৮
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার কথা : তৃতীয় পর্বের পর

লিখেছেন সুম১৪৩২, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৩০



“আসলে উনি কে…?”
এই শিরোনামের একটি লেখা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু।
সামুতে।
এটার পর, আমি এই গল্পের কয়েকটা পর্ব লিখেছিলাম। মোট তিনটি । শেষ পর্বটির নাম ছিল—“পশ্চিম পাড়ার পথে”।

গল্পটার সময়কাল ১৯৯০ সাল।
রহস্য আছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাঁধ ভাঙার আওয়াজ আজ আর কেন আ্ওয়াজ করছেনা ?

লিখেছেন সূচরিতা সেন, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১০:৩০



সত্যি করে বলছি মাঝে মাঝে ভাবি এটা কি সেই বাঁধ ভাঙার আওয়াজ ? একটা সময় যে বাঁধ ভাঙা আওয়াজের
একটাই পরিচয় ছিল,বিশ্বের সব থেকে বড় বাঙলা ভাষীর ব্লগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালোবাসা নাও, হারিয়ে যেও না

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:২৯



মুনা, আজ ঢাকায় শীতের তীব্রতা কিছুটা কম।
যদিও অনেকের কাছে এই শীত টুকুই অনেক শীত। আমার আবার শীত কম। তুমি শুনলে অবাক হবে এই শীতে আমি পাতলা একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান - বাংলাদেশ

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:০০

ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একেবারে উথাল পাথাল অবস্থা। যেকোন সময়ে সরকার পতন হয়ে যেতে পারে।
এর আগে কয়েক বছর আগেও এমনটা হয়েছিল, হিজাব ইস্যু নিয়ে লোকজন সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ শীতার্ত একটি শিশু ও দুটি কুকুর

লিখেছেন ইসিয়াক, ১০ ই জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৩২


রাত বাড়ে যত তাপমাত্রা নামে তত,
পা ফাটে, ঠোঁট ফাটে গভীর হয় ক্ষত।

একটা শিশু কাঁপছে শীতে ছাতিম গাছটার নীচে।
দুটো কুকুর গা ঘেঁষাঘেসি করে তাকে ছুঁয়ে আছে।

শীতার্ত সবাই তারা,সমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

×