
১
অম্বা মহাভারতের একমাত্র নারী যিনি অন্যায়ের শিকার হয়ে, প্রচন্ডভাবে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের আগুনে ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করেছিলেন। ঠিক এই চরিত্রটির সাথে রত্না তার বড় ননাসের খুব মিল পায়। ননাস যেন অম্বার দ্বিতীয় রূপ।
স্বামী তাকে রেখে গেছে তার ছোট দেবরের ঘাড়ে। স্বামীটি বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার উছিলায় সময় পার করে আর মেয়ে বান্ধবী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ননাসটি মনমরা হয়ে পড়ে থাকে। একদিন ননাসের ড্রেসিং টেবিলের দুপাশের রডে কাঁচের চুরির সমারোহ দেখে রত্না তো অবাক!
বলল, আপা চুড়িগুলো পড়েন না?
তার দীর্ঘশ্বাস।
‘কি আর চুড়ি পড়বো?’
মানে যার জন্য সাজবে সেই মানুষটি তো নেই। সে যে তাকে অন্যায়ভাবে ফেলে রেখে চলে গেছে।
রত্না তাকে নির্ভরতার সাহস জোগায়। তার থেকে পনের বছরের বড় চল্লিশোর্ধ ননাস -অম্বা আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। অম্বা তখন ইংরেজী মিডিয়াম স্কুলে জয়েন করে টিচার হিসেবে । সুনাম অর্জন করেছিল পরের দিকে। রত্না বলেছিল তার ননাসকে যে, তার সাফল্য তাকে একদিন হেডমিস্ট্রেস বানাবে। সেই কথাগুলো মন্ত্রের মত কাজ করেছে অম্বার মাঝে।
১৫০০ টাকা বেতনের চাকরি। বেবিট্যাক্সি মেরে মিরপুর থেকে বনানী আসতো ক্লাস নিতে। তবুও তো নিজের একটা আয়। স্বামীর সরকারি চাকরির বেতন চার হাজার টাকা তুলতে মাসে মাসে যেত স্বামীর অফিস সংলগ্ন ব্যাংকে। একদিন যাবার পথে বেবিট্যাক্সি উল্টে অ্যাক্সিডেন্টও করলো অম্বা। হাসপাতাল থাকার খরচ ননাসের স্বামীকে দিতে দেখেনি । রত্নার শ্বশুরই চালিয়েছে। স্বামীর বেতনের টাকাটা শুধু যে হাতখরচ ছিল তা না, অম্বা বলতো সে দেবরকে খাওয়ার খরচ, থাকার খরচ দিয়েই তার আট বছরের কন্যাকে নিয়ে ওদের সাথে থাকে। কিন্তু কেন থাকে দেওরের সংসারে?
কারণ বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েদের ঠিকানা তো শ্বশুরবাড়ি।
কিন্তু দেওরের বাড়ি কিভাবে শ্বশুরবাড়ি হয়?
হয়।
ওই যে – শ্বশুর যেখানে থাকে, সেটাই শ্বশুরবাড়ি।
অম্বার শ্বশুরের নিজস্ব বাড়ি বাসস্থান নেই। তার থাকা তার ছোট ছেলের সাথে। বড় ছেলে গেছে ৪৫ বছর বয়সে বিদেশে পি.এইচ.ডি. করতে। চ্যাংড়া প্রকৃতির অনেক জ্ঞানী এই বড় ছেলেটি তার বউকে মানে রত্নার ননাসকে পছন্দ করে বিয়ে করেনি । তার শ্বশুরের ধুরন্ধর বুদ্ধির চালে পড়ে বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল, একরকম জোর করেই বা কে জানে ব্ল্যাক মেইল করে কিনা।রত্নার শ্বশুরের কুটবুদ্ধি আর কথার মারপ্যাচের সাথে তো কেউ পারবে না। অম্বার সাথে বিবাহের পর জীবন নিয়ে মনে হয় লোকটা ফেড্ আপ। অন্তত রত্নার তাই -ই মনে হয়।
আফটার অল্ লোকটার শ্বশুরতো রত্নার ননাসের জন্মদাতা বাবা। এড়ানোর উপায় নাই।
কিভাবে অম্বা ননাস হলো সম্পর্কে?
ননাসের একটা ভোলাভালা ভাই আছে । নাম আবিদুর । ভোলাভালা কারণ বয়স ত্রিশ হলেও মানসিক বয়স পাঁচ, সাত বছরের শিশুদের মতন। সেই ছেলেটিই রত্নার স্বামী। সেই সূত্রে নন্দাই-এর শ্বশুর, রত্নারও শ্বশুরও। আর সেই শ্বশুর কেমন মানুষ, রত্নার তা না চেনার তো কথা নয়। চেনা মানে ধুরন্ধর প্রকৃতির নাকি অন্যরকম তাই বলার চেষ্টা। তবে রত্না ভেবে পায় না, এরকম ধুরন্ধর শ্বশুরের ঘরে ভোলাভালা আবিদ কিভাবে জন্মালো! মানসিক প্রতিবন্ধী একমাত্র পুত্র সন্তান নিয়ে শ্বশুর দিশেহারা। কোন্ অভিশাপের বলে এমন হলো ?
‘৭১ এর নামকরা রাজাকার ছিল শ্বশুরটি। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে মানুষ মারার কলকাঠি নাড়তো। কিন্তু বলে বেড়াতো, ‘আমি কিছু জানি না। প্রিন্সিপালের বাসার পাশের ভাঙ্গাচোড়া বিল্ডিং -এ যুদ্ধের সময় কি হতো, আমি তা জানিনা।‘ অথচ সে নিজেই ছিল সেই কলেজের প্রিন্সিপাল।
রত্না তার শ্বশুরের এই উক্তিটি শুনে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের সময়ে দেশের পিশাচরূপী মানুষগুলো কিভাবে গাদ্দারি করে নিজের দেশেরই মানুষদের হত্যা করেছে, নিজের দেশের মানুষকে নির্যাতন করতে পেরেছে রত্না তা ভেবে পেত না। তার খুব ‘শখ’ ছিল মানুষ মারার যন্ত্রমানব খুনিগুলোকে স্বচক্ষে দেখার। আর আজ সেরকমই এক লোক তার শ্বশুর হয়ে তার পাশে বসে আছে। খাচ্ছে আর খ্যাক খ্যাক করে কাশছে আর যুদ্ধের গল্পে তার সাফসুতরা চেহারার বর্ণনা দিচ্ছে ।
বাস্তবে মানসিক বিকারগ্রস্ত এই লোকটা বেঁটে এবং দেখতে ভীষণ কুতসিৎ। তার বড় মেয়েটি মানে অম্বা সামান্য কমবুদ্ধি। একটু ব্যাক্কল বলেই কিনা – তার ওপর তার চ্যাঙড়া জামাই খুবই বিরক্ত।
তারপরের মেয়েটি মাঝারী বুদ্ধি নিয়ে জন্মেছে। জটিল হলেও কথায় তা প্রকাশ পায় না। সে ছোট্ট একটি বোবা কন্যা সন্তানের জননী। বাচ্চাটির চোখের গঠণেও সমস্যা। অন্ধ নয় যদিও। শিশুটি বংশগত ত্রুটি বহন করছে। শ্বশুরের ভাষ্যমতে বাচ্চাটি জন্মের সময় হাঁটুতে একটা প্যাচ নিয়ে জন্মেছিল। তাই দৌঁড়াতে পারে না বেশীদুর। স্পেশাল স্কুলে না দিয়ে ক্যম্ব্রিজ স্কুলে গতানুগতিক বাচ্চাদের সাথে ভর্তি করেছে। তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ে। কানে না শুনে বাচ্চা কি আর পড়া ধরবে । সব বিষয়ে শূন্য । কিন্ত মায়ের তাতে চিন্তা নেই। সে নিজেও সেই স্কুলের শিক্ষিকা, তাই বাচ্চা ভর্তি করাতে তো তার ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। ভবিষ্যতে কি হবে তা ভবিষ্যত আসলেই দেখা যাবে।
রত্না এ পরিবারে এসে লক্ষ্য করলো শারিরীক, প্রতিবন্ধকতা পরিবারের সকল সদস্যদের সবারই কম বেশী আছে। ধারণা করা হয় শাশুড়ীর জন্মদাত্রী মায়ের মাধ্যমে এসব রোগবালাই এসেছে। ছেলেমেয়েদের নানী ছিল হাবাগোবা প্রকৃতির । শ্বশুর একদিন রত্নাকে বেশ গর্ব করেই বলেছিল , তার স্ত্রীর বাবা ব্রিটিশ আমলে বড় আমলা ছিল। অনেক সম্মানীয় । সেই ঘরে অনেক বাজার সদাই হতো। খাবারগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতো। কেউ ছিল না তদারকি করার। জিজ্ঞেস করলে সেই আমলা নাকি জবাব দিত, ‘আমার দায়িত্ব সদাই কেনে দেবার । দিলাম। তারপর কি হলো সে খোঁজ আমি রাখি না।‘
তার পাঁচ মেয়ে যাদের কম বেশী খুঁত আছে। অনেক যৌতুক দিয়ে অনেক খরচপাতি করে পাঁচ পাঁচটা মেয়েকে পার করেছে। বড় মেয়েটি পড়েছে এই বেঁটে, কুতসিতের ঘাড়ে। এই বড়টা একটু বেশী রকমের কমবুদ্ধি । ধুরন্ধর শ্বশুর একে নিয়েই তার দাম্পত্য জীবনে আরোও কয়েকটা বিকলাংগ ও মানসিক প্রতিবন্ধী জন্ম দিয়ে সংসার চালাচ্ছে। যদিও বাইরে দিয়ে বুঝবার উপায় নেই যে ভেতরে তারা সদরঘাট । রত্নার শাশুড়ি এ দিক দিয়ে পাকা আছে। ধুরন্ধর স্বামীর ঘরের ঠেলা সামলে এখন সে অত হাবা নয়। অনেক পাকা। কোন কথা লুকিয়ে ঢেকে রাখতে হয় সে জানে। অনুষ্ঠানে গেলে ষাঁড়ের মতন ডেকে ডেকে মানুষকে সালাম দিয়ে সালাম আদায় করতে জানে। তাকে কেউ গ্রাহ্য করলো কি করলো না, তাতে কিছু যায় আসে না। মানুষের ঘাড়ের কাছে যেয়ে হলেও সালামের উত্তর সে নিয়েই ছাড়বে।
অনেক চালাক এখন সে।
রত্নার স্বামীর জন্মগত ভাবে শাররীরিক ত্রুটি কোথা থেকে এসেছে কে জানে। তবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর বৈশিষ্ট্য এসেছে তার মায়ের দিক থেকে নিঃসন্দেহে। রত্না ওই বাড়িতে যেয়েই দেখেছে তার শাশুড়ি একটু খোঁড়ায় । কেন খোঁড়ায়? বয়স হয়েছে বলে? নাহ্।
তাদের মেজর- জেনারেল আত্মীয় বলেছে, তার নাকি পাঁজরের হাড্ডি একটা কম , তাই হাঁটায় সমস্যা। রত্না জানতো স্বামীর পাঁজরের হাড্ডি দিয়ে মেয়েরা সৃষ্টি। তাহলে তো হাড্ডি শ্বশুরের একটা কম হবার কথা । শাশুড়ির না।
কিন্তু ৭২ বছরের শ্বশুর ততই জোয়ান। লুঙ্গীর কোণা হাতে ধরে মুখ খিঁচাতে খিঁচাতে তেড়ে মেরে যখন এগিয়ে আসে তখন বেশ তাগড়া তাগড়া ভাব দেখা দেয়। একটা তাগড়া ষাঁড়।
কিন্তু ৬৪ বছরের শাশুড়ি ভীষণই অসুস্থ। যেমন বললাম, শাশুড়ির বাবা ছিলেন সেই বৃটিশ আমলের সরকারি আমলা । তার অপ্রকৃতস্থ স্ত্রীর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া পাঁচ পাঁচটি কন্যার মাঝে এই অথর্ব বড় মেয়েটিকে বিপুল যৌতুকের বিনিময়ে হত দরিদ্র ঘরের ডাক্তার জামাই ধরে বিবাহ দিয়েছে। সেই ডাক্তার জামাই, বিয়েতে খাবার টেবিল, খাট, আলমারি কত কিনা পেয়েছে। রত্নাকে দেখিয়ে দেখিয়ে গল্প করেছে তার শাশুড়ি তার সাথে। বলেছে বিয়ের সময় কি কি ফার্নিচার নিয়ে এসেছে সে, এই ঘরে। নগদ টাকা কত এনেছে সে টুকু শুধু বলেনি।
ঐ যে বললাম না, ধুরন্ধর লোকের ঘর করে সেও জানে কোন কথাটা বলতে হয় আর কোন সময় চুপ করে যেতে হয়।
তার স্বামী মুক্তিযুদ্ধের সময় বিকৃত মানসিকতা প্রয়োগ করে মানুষ মারার মতো হিংস্র কাজগুলো সম্পন্ন করতো। তার স্ত্রীর সাথেও বিকৃত যৌনাচার করতে গিয়ে একবার তার স্ত্রীর ঠ্যাং ভেঙে ফেলেছিল। এ কথা অবশ্য রত্নাকে সে বলেনি। কিন্তু পরিবারের মধ্যে তাদের স্বামী স্ত্রীর এই গল্প খুব চাউর ছিল। আবিদুরই রত্নাকে জানিয়েছিল। বলেছিল, ‘জানো আমার আব্বা আমার আম্মার সাথে সেক্স করতে গিয়ে আম্মার পা ভেঙ্গে দিয়েছিল।‘
২
তাদের একমাত্র পুত্র তাদের সাত রাজ রাজার ধন হাবাগোবা ছেলেটি তো এখন রত্নার স্বামী। বিয়ের বাজারে পাত্র হিসাবে তাদের ছেলের খুব কদর ছিল। কারণ ছেলের বাবা অগাধ টাকা পয়সার মালিক। এত সম্পত্তি, যে একা এই ছেলে ছাড়া খাবার কেউ নেই। এসব কথা রত্না তার ঘটকের মারফৎ জেনেছে। ঘটকরা তো একটু বেশিই বলে। কিন্তু এই ঘটক মানে মল্লিকা আন্টি কি বেশী করে ‘বেশী’ বলে ফেলেছে –কে জানে । বিয়েটা দিতে মল্লিকা আন্টি মোটা টাকা হাতিয়ে নিয়েছে কি না তাতে রত্নার যথেষ্ট সন্দেহ হয়!
পরিবারে এই অথর্ব পুত্র জন্ম দিয়ে বাবা মা ভেতরে ভেতরে খুব চিন্তিত। উপর দিয়ে নয়। ছেলেটি দেখতে তার মায়ের ধাঁচের। মায়ের বিরাট বপু পায় নি। ছোটখাটো, ফর্সা । গোলগাল ললিপপ চেহারার সারল্য তার মাঝে।
ঘটকী মল্লিকা আন্টি তো আরো অনেক কিছুই জানে ছেলে সম্বন্ধে । কিন্তু সব কি আর বলতে পারে? পারে না। ঘটকালি করতে করতে মল্লিকা আন্টি পাকা। জানে কোন কথাটি গোপন রাখতে হবে। তাই সে গোপন রেখেছে বরাবর, রত্নাদের কাছে। কারণ – চাইলেও মুখ খুলতে পারবে না। অনেক টাকা পেয়েছে না ছেলের বাবার তরফ থেকে ? রত্নারা যদিও মল্লিকা আন্টির বেশী কাছের, বেশী চেনা। কিন্তু ছেলের বাবা বলেছে, ‘যেমন করে হোক এ বিয়েটা করিয়ে দিতেই হবে।‘ ঘটকী তখন ছেলেদের পক্ষের ফুফু হয় এমন এক মহিলার কাছে গেল। তারা ছেলেদের ৪২ বছরের চেনা।সব খবর জোগাড় করলো। যা না খবর জোগাড় করে দিল, রত্না এসে আবিষ্কার করলো তার স্বামী প্রবরটি গুনের দিক দিয়ে আরো কাঠি উপরে। সে শুধু শারিরীক ভাবেই প্রতিবন্ধী নয়, মানসিক ভাবেও । আবিদুর নিজেই বলেছে তার জন্মের সময় পা উল্টো হয়ে জন্ম নিয়েছিল।
জ্বীনদের মত ? উলটো পা? তাই রত্নার কাছে তার স্বামীকে ভোলাভালা একটা জ্বীন মনে হতো।
শ্বশুরের ছোট কন্যা মানে ছোট ননদ সে হয়েছে শ্বশুরের অষ্টকাঠি। শ্বশুরের সকল সন্তানদের খুঁত ছাড়িয়ে, সমস্ত অপূর্ণতা পূর্ণ করে সে আরেকটি চতুর দানব হয়ে জন্ম নিয়েছে। তার মায়ের দিকের হাবাগোবা, খোঁড়া ভাবসাব –, এসব ত্রুটির কোন লক্ষণ তার মাঝে নেই। শারীরিক ভাবে একদম ফিট। বাবার মতন তাগড়া জোয়ানী নেই। কিন্তু অসুস্থতা নেই। তার বাবা তার সেই ৭২ বছর বয়সে লুংগির কোণাটা তুলে যখন হাঁটতো মনে হতো কালো ষাঁড় তেড়ে আসছে। ভেতর থেকে জোয়ানী ছিটকে ছিটকে বের হচ্ছে। ৩০ বছরের ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সে যেন আরও জোয়ান হয়ে গেছে। রত্না তার স্বামীকে বলেছিল, ‘তোমার বাবা যেভাবে তাকায় আর চলাফেরা করে, মনে তো হয় না তার প্রস্টেট অপারেশান হয়েছে! বা বুড়ো হয়েছে।‘
কি আশ্চর্য, রত্নার ভোলাভালা স্বামীটি তার বাবার কাছে যেয়ে এই সব কথাটুকু বলে বসলো। শুনে শ্বশুর মনে মনে বোধহয় লকলক করে উঠেছিল । আর উপর দিকে দিয়ে তার সে কি রাগ। ছেলেকে বিয়ে দেবার পর তাদের বাবা –ছেলের মাঝে চুক্তি হয়েছিল যে, তারা বন্ধুর মতো সব কথা আলাপ করবে। মানে ছেলে বউয়ের সাথে রাত্রে কি কি করলো সব যখন জানতে চাইবে ছেলে তখন বন্ধুর মতো গল্পে গল্পে সব কথা তাকে জানাবে।
কি সুন্দর আঁটা বুদ্ধি শ্বশুরের। তার প্রতিবন্ধী ছেলে কাজে কর্মে তার বউয়ের কাছে পারদর্শীতা দেখাতে পারছে কি না এ নিয়ে তার সন্দেহ থাকাতে সে এই বুদ্ধি এঁটেছে। তাই রেগুলার ছেলে থেকে জেনে কনফার্ম করে নেবে দাম্পত্য জীবনের জন্য তার ছেলে লায়েক হয়েছে কি না । আর ছেলে লায়েক না হলে কি অসুবিধা। সে তো আছেই। তার জোয়ানী আছে। তা দিয়ে সে টেক্ –ওভার করবে। পুত্রবধূ মেয়েলোক, মুখ খুলবে নাকি?
রত্নার ছোট ননদ তার বাবার মতন ভীষণ ধুরন্ধর। কিন্তু বিদেশে থাকায় রত্নাকে পিষে ফেলার জন্য তেমন সুযোগ পায় না। তাতে কি? তার বাবাই তো আছে এ কর্ম সম্পাদনে। ’৭১- এ মানুষ মেরে হাত পাকা। লোকজন কন্ট্রোল করতো বলে তার বলে মেজাজ টা একটু চড়া। তাই গলা প্রায়ই বাড়ির ভেতর উঁচু হয়ে যায় সেজন্য ।সে রাস্তা থেকে শোনা যায়। দাপটে তাকে ভয় করে চলে সবাই। প্রয়োজনে বয়সে তিন ভাগের এক ভাগ বয়সের রত্নার মতন ২৪ বছরের মেয়েকে শাসন করে ‘কন্ট্রোল’ করতে পারবে না আবার?
৩
অম্বার স্বামী তাকে ফেলে রেখে বিদেশে যাবার পর রত্নার উৎসাহে সে স্কুলে জয়েন করায় রত্না খুব গর্ববোধ করেছে। কারণ তার উৎসাহেই তো তার ননাস বাড়ির বাইরের পৃথিবীতে পা রাখতে পেরেছে। । স্বনির্ভর হচ্ছে।
পরবর্তীতে আরো ৩০ বছর পর ফেসবুক নামে যে অ্যাপটি চালু হবে এবং সেখানে যে রত্না তার ননাসকে নিয়ে পোস্ট দেখবে, তা কি তখন রত্না জানতো?
জানতো না।
কারণ তখন তো অনেক আগের কথা। ১৯৯৫ সাল। ডেস্কটপ সব বাড়িতে নেই। একজন দু’জন হাতে গোণা ল্যাপটপের মালিক। অম্বার স্বামী যদিও তার মধ্যে একজন। কাঁধে তার ল্যাপটপ ঝোলানো ব্যাগ দেখিয়ে আবিদকে আর রত্নাকে বলেছিল, ‘বলতো এটির দাম কত? আবিদতো তো জানে না, রত্নাও বলতে পারেনি।
ননাসের সেই উড়চুংগা মার্কা স্বামীটা গর্বের সাথে বলেছিল, ‘ল্যাপটপের দাম এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা!
ও মাগো! গর্ব করার মতই।
কত দামি একটা যন্ত্র কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে লোকটা।
তার পরবর্তী ধাপে ২০০০ সালে এলো মুঠোফোন। দু’ হাজার সাত বা আটে এলো ফেসবুক। আর আজ ২০২৪ সাল। ফেসবুকে রত্না পোস্ট দেখছে। পোস্টটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলের এক গ্রুপের। অম্বার মৃত্যু সংবাদ ছাপানো হয়েছে। সেখানে লিখেছে, ‘অম্বা মানুষ হিসাবে খুব ভালো মানুষ ছিল। কারো সাথে বিবাদে জড়াতো না। চুপচাপ শান্ত নিরীহ প্রকৃতির ছিল।‘ আরো দেখলো, সবাই খুব কন্ডোলেন্স জানাচ্ছে। কিন্তু মহাভারতের অম্বা চরিত্রের মতই ননাস –সম্পর্কের এই নারী কিভাবে রত্নার জীবনটা নষ্ট করতে তার ধূর্ত বাবার পক্ষ নিয়ে প্রতিশোধের কুটচালে জড়িয়েছিল তা রত্না ছাড়া আর কে জানে?
রত্নার শ্বশুর চেয়েছিল এমনভাবে রত্নাকে মারবে যেন উঠে দাঁড়াতে না পারে। দৈহিকভাবে আঘাত করে বা লোক লাগিয়ে হাত পা ভেঙ্গে বা প্রাণে মেরে হলেও রত্নাকে সে পিষে ফেলবে। কারণ পিষতে তার বড্ড ভালো লাগে। ‘৭১ এ হাত পাকা করে এসেছে না?
কিন্তু কিভাবে জানি শিকার তার হাত থেকে ফসকে গেল। এখন কি করা যায়? বুদ্ধি আঁটে তার কনিষ্ঠা কন্যার সাথে। কিন্তু সে তো দেশে নাই আর মধ্যমাটি তো বাবার মতে ‘খুব অনেস্ট।‘ তাকে দিয়ে অনৈতিক কিছু করানো যাবে না বা কিছু বলে করানোর চেষ্টাও ভুল হবে । তাহলে বাকী রইলো অম্বা।
মহাভারতে খল চাতুরীতেও ষড়যন্ত্রকারীনি হিসাবে অম্বাকে ধূসর চরিত্রের নারী হিসেবে যে ভাবে বর্ণিত করা হয়েছে, তার সাথে অম্বারূপী ননাসের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ রত্নার জীবনে একটা ধূসর স্থান দখল করে নিয়েছিল।
কিভাবে খেলাটা খেলবে অম্বা?
আজ অম্বা তার বাবাকে খবর এনে দিয়েছে । রত্নার কলেজের শিক্ষক ‘প্রফেসর লিজার্ড’ এর স্ত্রী অম্বার কলিগ। এ দুজনা এতই সখ্য যে অম্বার কথায়, রত্নাকে ডিপার্টমেন্টে অপদস্ত করাতে চাইলে, তাও তার প্রফেসর স্বামীটিকে দিয়ে তার স্ত্রী করাতে পারবে। যদিও তারা স্বামী স্ত্রী একসাথে থাকে না ,আলাদা থাকে। প্রফেসর এবং তার স্ত্রী গম্বা একজন আরেকজনের ভীষণ সখ্য – কুট চালে তারা এক কাটঠা্ ।
রত্নার শ্বশুর যখন জানতে পারলো অম্বার সেই কলিগের মাধ্যমে তার ডক্টরেট ডিগ্রীধারী প্রফেসর স্বামীকে কাজে লাগিয়ে তার আঁটা কু-কাজটি খুব সহজে করানো যাবে, তখন আর যায় কই। প্ল্যান অনুযায়ী যখন লিজার্ড প্রফেসর তার ফণা তুলে ছোবল মারবে, রত্না ধরাশায়ী হয়ে যাবে – এক্কেবারে জীবনের নামে।
বাস্তবে দৈহিক ভাবে রত্নাকে আক্রমণ যদি করতে না পারে তাহলে এ পথ তো খোলাই আছে।
ছোবল।
ছোবল দেওয়াবে।
প্রফেসর, স্বভাবে লিজার্ড না? জিহবা তো লক লক করতেই থাকে ।
শিকার পেলেই হলো। ফণা তুলে আক্রমণ করবে।
অম্বা তার বাবার সাথে পরামর্শ করতে বসে । রত্নার ক্লাস কেজিউল, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সবকিছুর তথ্য এনে দেয় লিজার্ড প্রফেসরের স্ত্রী গম্ভা ননাসের কাছে । তারা স্কুলে কাজের ফাঁকে আলাপের ছলে খবর চালাচালি করে। সাথে সাথে খবর চলে যায় তার মাধ্যমে রত্নার শ্বশুরের কাছে। তারপর ? যেই কথা সেই কাজ।
রত্নার শ্বশুর কলেজে চলে গেল লক্ষ টাকা বস্তায় ভরে। আজ লিজার্ড প্রফেসরকে দেবে। বিনিময়ে ষড়যন্ত্রটা এমন হবে যে রত্না পরীক্ষায় ডাব্বা পাবে।
এই গল্পগুলো রত্না তার ভোলাভালা স্বামী আবিদুরের কাছ থেকেই জেনেছে।
৪
পরবর্তীতে অম্বার কুকীর্তি তার বিদেশ প্রবাসী স্বামীও জেনেছে। এমনিতেই শ্বশুরের ধুরন্ধরপনা আর শ্বশুর -কন্যা অম্বার হাবাগোবা আচরণ, তাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তাই অম্বা থেকে তার এই দূরে থাকা কিনা রত্না জানে না। আঁচ করে শুধু। লোকটা ৪৫ বছর বয়স হলেও ব্যক্তিত্বের দিক দিয়ে চ্যাংড়া ছেলেদের মতন ছিল। রত্না যে কয়েকবার, অম্বার স্বামীকে দেখেছে, তার মনে হয়েছে লোকটা অম্বাকে নিয়ে ফেড্ আপ।
তার ওপর সেই শ্বশুরের একমাত্র ছেলেটির মানসিক প্রতিবন্ধকতা অম্বার স্বামীটিকে সমাজে আরো নীচু তে নামাতো কি না, তাই বা কে জানে। আবিদুর তো তার বউয়ের ছোট ভাই। সম্পর্কে তো তার শালা। তার সরল সোজা হাবাগোবা শালার কথা তো ‘তার’ বাড়ির সকলের জানা। আর এই শালাটা জুটেছে তার বড় বোন অম্বাকে স্ত্রীরূপে গ্রহন করার ফলেই তো।পরবর্তীতে অম্বার গর্ভে একটা টেরা চোখের, ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের কন্যা সন্তানের জন্মও তো লোকটার জন্য সে কি এক যন্ত্রণা!
অম্বার মৃত্যু সংবাদ জানতে পেরে দীর্ঘ ২৫ বছর পর রত্না ওয়েবে সার্চ শুরু করল। অম্বার সেই আট বছরের কন্যা এখন মধ্য বয়সী মহিলা। মা হারিয়ে কন্যাটি বিপর্যস্ত। একাই মনে হয় জীবন চলছে তার। কিন্তু তার মা হারানোর মত কষ্টের সময়ে কোথাও তার বাবার কথা সে উল্লেখ করেনি। সর্বত্র সে তার মায়ের, অকাল বয়সের অসুস্থ ও পঙ্গু অবস্থার বহু তথ্য দিয়েছে। অথচ তার মায়ের পাশে তার বাবার কোন কথা উল্লেখ নেই।
মহাভারতের অম্বা অন্যায়ের শিকার হয়েছিল। রত্নার ননাসরূপী অম্বাও অন্যায়ের এবং অবহেলার শিকার হয়েছিল তার স্বামী দ্বারা। ননাসের বুদ্ধির সরলতা, নাকি বেশি ভালোমানুষী দেখিয়ে তার শ্বশুর আর দেবরদের সাথে অম্বার মানিয়ে চলার ক্ষমতা – কোনটা, যা তার স্বামীকে তার প্রতি আকৃষ্ট করতে পারেনি? তা অম্বাই একমাত্র ভালো জানে।
রত্না কিভাবে জানবে?
রত্না তো ধূর্ত শ্বশুরবাড়ির হাত থেকে প্রাণটা নিয়ে কোনভাবে সরে পড়তে পেরেছিল তখন। না হলে তো প্রাণটা হারিয়ে কবরের সাত হাত মাটির নিচে বসে থাকতে হতো। তখন সেই প্রতিশোধকামী অম্বার কুটচালের বাস্তব সঞ্চালন দেখার কোন সুযোগই রত্না আর পেত না।
বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসাবে বলে রাখা ভালো, সবাই ভাবতে পারে এসবের মাঝে আবিদুরের, তার স্ত্রী রত্নার প্রতি ভূমিকা কি ছিল?
রত্না ঐ বাড়িতে যাবার পর বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে আবিষ্কার করে তার স্বামী প্রবরটি হ্যালুসিনেশানে আক্রান্ত। ঘুমের ঘোরে ভুত দেখে। মৃগীরোগও আছে। শারিরীক ভাবে বিকলাংগ ও মানসিক ভাবে প্রতিবন্ধী বলেই নিস্পাপ চেহারা ও সরল মন নিয়ে বাবা মায়ের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যে সে তার বাড়িতে বড় হয়েছে। রত্না আসার পর তার কাছেই আশ্রয় পেয়েছে, সকল নির্ভরতা পেয়েছে।
ললিপপ চেহারা নিয়ে ললিপপ খেতে সে ভীষণ পছন্দ করতো। এই তিন দশক ধরে সে ললিপপই খেয়ে যাচ্ছে। সময়ের স্রোতে তার ধূর্ত বাবা, অম্বার কিছু সময় আগে গত হয়েছে। রেখে গেছে অগাধ টাকা। আর অগাধ সম্পত্তি। আবিদুর আর অম্বার ১৪ গুষ্টি ছাড়িয়ে ১৫ গুষ্টি এখন আরামে খেয়ে পড়ে চলে যেতে পারবে।
.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।.।
২৮/১১/২০২৫
এডিটেডঃ ১/১/২০২৬
লিজার্ড প্রফেসর ২ of ২
ঝড়ে বক মরে
শ্বশুর যার খালু
বাবা ছেলের এক রা
বিয়ে বাড়ির তত্ত্ব
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


