আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আমি নাকি প্রেমের কবিতায় শুধু আক্ষেপ আর অভিযোগকে নিয়ে আসি। অবশ্য এই অভিযোগ আমি অস্বীকারও করি না। তাই প্রথমটায় ভেবেছিলাম আমার ভান্ডারে নিবেদনমূলক কবিতা বোধ হয় চার পাঁচটার বেশী হবে না। পরে দেখলাম সংখ্যাটা একেবারে খারাপ নয়। তাই আক্ষেপ বা অভিযোগ সমগ্রের আগে নিবেদন সমগ্রটাই নিয়ে এলাম। এখানে আমার টিনএজ সময়কার কবিতাও রয়েছে। হয়ত পড়তে অনেকেরই ভাল লাগবে না।
১. সুর
আমার বুকের মাঝে একটি সুর আছে
যদি শুনতে চাও তো সময় করে
শোনাবো একদিন তোমায়।
সে সুরে হয়ত রাগ রাগিনীর পল্লবিত কোন
মূর্ছনা নেই
তবে সে সুর কেবলই তোমার জন্যে গাঁথা।
যদি ভাল লাগে
তবে উদাত্ত কন্ঠে কন্ঠ মিলিও
একান্ত আপন নিরালা কোন বাসনায়।
নয়ত ফিরিয়ে দিও তোমার
স্পষ্টতম কোন উচ্চারণে।
প্রতিবাদে আমি টুঁ শব্দটিও করব না।
১৯৯৪
দিনাজপুর
২. সূর্যের কথা ভাবি
চাঁদকে দেখে আমি তোমার কথা ভাবি না,
তোমাকে দেখে আমি সূর্যের কথা ভাবি।
চাঁদ তো কেবলই বিলাসী লোকের খেয়াল-
তুমি তো কোন বিলাসিতা নও
যে কবিতা লিখব তোমাকে নিয়ে,
তারপর কোন অভাবী সকালে বেরিয়ে যাব
কাজের খোঁজে,
ভুলে যাব তোমায়।
তোমাকে আমি সূর্য করে রেখেছি
বুকের সারাটা আকাশ জুড়ে,
জীবনের আঙ্গিনায় আঙ্গিনায় তুমি
প্রেরণার রোদ হয়ে আছো।
তবে চাঁদকে দেখে আমি তোমার কথা ভাবব কেন?
তোমাকে দেখে তো আমি সূর্যের কথা ভাবি।
২৩/১০/১৯৯৬ রাত ১টা ১৯মিনিট
দিনাজপুর
৩. চোখ যেন তার
চোখ যেন তার লাজুক লতা
হৃদয় পড়েছে বাঁধা
চোখ যেন তার অনেক কথা
কন্ঠটা সুরে সাধা
চোখ যেন তার ওমর খৈয়াম
মিয়া তানসেনী সুর
চোখ যেন তার ভৈরবী ঠাট
আবেশেতে ভরপুর
চোখ যেন তার সন্ধ্যা সকাল
রৌদ্র ছায়ার খেলা
চোখ যেন তার সুদূরের গ্রাম
পথ মাঝে শেষ বেলা
চোখ যেন তার কুহকিনী মায়া
কত মানুষ যে কুপোকাত
আমি তো আর পারি না রে সখি
আমার তো কাটে না রাত।
১/৬/১৯৯৭ রাত ১১টা ৪৬মিনিট
দিনাজপুর
৪. দরজা
তোমার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল
ক্লাস রুমের দরজায়।
কথা হয়েছিল খুব সামান্য, সৌজন্যমূলক।
খুব সম্ভ্রান্ত ভঙ্গিতে তুমি
আমায় সরে যেতে বলেছিলে,
ভিতরে যাবে বলে।
এরপর থেকেই দরজায় দাঁড়ানো আমার
স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেল।
ক্লাশরুম, লাইব্রেরী, ক্যান্টিন, প্রতিটি দরজায়
আমি ব্যারিকেড হয়ে গেলাম।
রাস্তায় রাস্তায় বাঁশ ঝুলিয়ে
ট্রাফিক জ্যাম করে দিলাম।
ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে ভরিয়ে দিলাম
বিস্তৃত আকাশটা-
পাখিদের কাছে হপ্তা নিলাম।
বিরাট দীঘিতে জাল হয়ে গেলাম
যেন মাছেরা আমায় সরে যেতে বলে।
আর আমার ঘরের দরজায়
প্রেমিক হয়ে রইলাম-
যেন সম্ভ্রান্ত স্বরে নয়,
খুব পরিচিত কোন বন্ধুর সুরে বলে ওঠো
‘একটু সরবে? আমি ভিতরে যাব।’
১৩/৯/১৯৯৩
দিনাজপুর
৫. তুমি আছো তাই
তুমি আছো তাই
ভাষা খুঁজে পাই
দীপ জ্বেলে যাই কবিতার।
তুমি আছো বলে
এ ব্যস্ত লোকালয়ে
ফুল ফোটে আজো ভালবাসার।
তুমি আছে বলে
এ পোড়া মবিল ডিজেলে
ফুসফুস খোঁজে নিঃশ্বাস আবার।
তুমি আছো তাই
সব ভুলে যাই
প্রতারণা, দুর্নীতি, প্রাণ সংহার।
তুমি থেকে যাও
দীর্ঘায়ু পাও
সৌর তারার মত অপার।
তুমি চলে গেলে
মনের খেয়ালে
কি লাভ বল বেঁচে থাকার?
মে ২০০৬
মোহাম্মদপুর, ঢাকা
৬. চল স্বর্গে যাই
এসো, বিশ্বাস কর
হাতে রাখ হাত
চলো স্বর্গে যাই।
ভালবাসা যদি অগ্নিকুন্ড হয়
এসো অগ্নিস্নান করি।
ভালবাসা যদি ভুলে ভরা অংক হয়
এসো না প্রাণ ভরে দুজনে ভুলগুলো করে যাই,
হতেও তো পারে রক্ত গোলাপ
রক্তে রাঙ্গানো এই ভুলগুলো থেকে।
এসো, ঝুঁকিটুকু নেই
হাতে রাখি হাত
চল স্বর্গে যাই।
৯/৭/১৯৯৭ রাত ২টা ২মিনিট
দিনাজপুর
৭. তুমি ছুঁয়ে দাও
তুমি ছুঁয়ে দাও-
আর আমি পূর্ণাঙ্গ হয়ে যাই।
আশ্রয় পাই যেন সুশীতল কোন
বট বৃক্ষের নীচে,
যেখানে আল্পনা আঁকে রৌদ্রের কড়া দীপালি
পল্লবীত সবুজ পত্রপুঞ্জ।
ঝরে যাওয়া পাতা যেন প্রাণ ফিরে পায়
হৃদয়ের তারে তারে বেজে ওঠে
সারগাম-
মনে হয় এই তো জীবন,
এই তো বেঁচে থাকা।
৯/৭/১৯৯৭ রাত ১টা ২১মিনিট
দিনাজপুর
৮. স্বীকৃতি
মৃত্যুকে আমি আলিঙ্গন করব,
যদি কথা দাও আমার সমাধীতে তুমি
তাজমহল গড়বে।
সোনায় বাঁধানো রূপোলী ইতিহাস-
আমি ইতিহাস হয়ে যাব।
অথবা শপথ কর,
আমার জীর্ণ কবরে
প্রতি সাঁঝে
অন্ততঃ একটি করে পলাশ দেবে।
তাতে অন্ততঃ আমার ভালবাসা তোমার
স্বীকৃতিটুকু পাবে।
২/৩/১৯৯৩
দিনাজপুর
৯. তোকে নিয়ে পংক্তিমালা
১
তোকে দেখলেই তো মন ভরে যায়।
তাহলে আবার জোরাজুরি কেন?
নাকি মানতে চাস না
তোর উপস্থিতিই যথেষ্ট
মনটা ভাল হবার জন্যে।
২
ঢাল তলোয়ার চাইছে কে বল?
তুই-ই তো আছিস রক্ষা ব্যূহ,
বৃথাই কেন আমার তরে
খুঁজেই মরিস
সৈন্য সেপাই কামানগুলো।
৩
শুধু তুই হলেই তো গাঁথতে পারি
হাজার কথার পংক্তিমালা।
তবে কেন আমায় রেখে
কিনতে গেলি অভিধান আর
সহজ ভাষায় পদ্য শেখা।
৭/৬/২০১১ বিকাল ৫টা ৫৫মিনিট
মিরপুর ঢাকা।
১০. ভালবাসা
‘তুমি মরে গেলে আমি বাঁচব না’
এ মিছে কথা তোমায় কখনও বলব না।
তবে বেঁচে থাকার অর্থ যাবে বদলে,
তুমিহীন এই ক্লান্ত বিকেলে।
এ আমার প্রতিশ্রুতি,
তোমাকে দেয়া গভীর ভালোবাসা।
২/৯/১৯৯৩
দিনাজপুর
১১. যদি তুমি চাও
হয়ত কোন রূপকথার প্রাসাদ নয়,
নয় কোন ভাললাগার আধিভৌতিক শিহরণ
হয়তবা শুধুই মধ্যবিত্ত জীবন যাপন।
অথবা ধর,
আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা কোন
আকাশের খুব কাছাকাছি
তুমি আছো, আমি আছি
প্রগাঢ় ব্যস্ততা, তবুও খুঁনসুটি।
নতুবা ধরা যাক
বস্তির পাশে
কোন ছা-পোষা জীবন যাপন।
তবুও যৌবন-
ভাঙ্গা ঘরের ভাঙ্গা চালায়
চাঁদের আস্ফালন।
এসবই সম্ভব হতে পারে
তোমার আমার এই মেলামেশা
হয়ত কোন ঠিকানা গড়তে পারে
যদি তুমি চাও,
একবার শুধু চাও।
২৫/৭/২০০৮ সকাল ৯টা ৫৫ মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
১২. তবে
যদি কেউ তোমার পকেটে হাত দেয়,
তবে সে পকেটমার।
যদি কেউ তোমার বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধরে,
তবে সে খুনি।
যদি কেউ তোমায় দেখে শিষ দেয়,
তবে সে মাস্তান।
যদি কেউ তোমায় মিছিলে যেতে উৎসাহিত করে,
তবে সে রাজনীতিবিদ।
যদি কেউ তোমার প্রশংসা করে উচ্ছাসিত,
তবে সে ভক্ত।
যদি কেউ তোমার সুরেলা কন্ঠ শুনে মাতাল হয়,
তবে সে ভক্ত শ্রোতা।
যদি কেউ তোমার দিকে শুধু তাকিয়েই থাকে নিষ্পলক,
তবে সে রূপের পূজারী।
যদি কেউ তোমার সাথে হেঁটে যায় দূর থেকে বহু দূরে,
তবে সে সহযাত্রী।
আর যদি কেউ তোমার হাতে তুলে দেয় তার
সমস্ত গোপনয়ীতা, জীবনের ঝুঁকি?
তবে?
তবে সে প্রেমিক।
তোমায় ভালবাসে।
১২/৪/১৯৯২ গাজীপুর
১৩.ভাংচুর
আমি নিজেকে ভাংচুর করতে রাজী আছি,
যদি আমাকে ভালোবাসা দাও।
আমি এই বিশ্বকে বয়কট করব
তুমি যদি কাছে টেনে নাও।
আমায় ভালবাস,
আমায় অনুরোধ কর,
তোমার শিশির ভেজা মুখের দিকে চেয়ে
নিজেকে বদলে ফেলব,
তুমি নুতন করে সাজাবে
ঠিক তোমার মনের মত।
এ্যাই শ্যামলা মেয়ে, তুমি কি জানো?
তোমায় দেখে বুকের মাঝে অনুভুতি যত
নুতন করে ভাংচুর হয় সেখানে প্রতিনিয়ত।
আমায় খনিকটা ভালোবাসা দাও
একটু খানি আদর,
তোমায় উপহার দেব আমি আনকোরা নুতন
একটি হৃদয়,
যে হৃদয়ে আছে ভালবাসার সমুদ্দুর।
তোমার জন্যে আমি সব করতে পারি,
স-ব।
পারি না শুধু তোমার ঐ তথাকথিত ভালোবাসাকে
পাবার জন্যে করতে নিজেকে ভাংচুর।
২৭/২/১৯৯২
দিনাজপুর
নিবেদন সমগ্র
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



