নিবেদন সমগ্র
আমার কবিতা সংকলনের ২য় পর্ব এটা। বিরহের কবিতা দিয়ে সাজানো। এপর্বেও আমার পুরোনো বেশ কিছু কবিতা থাকল। আশা করছি কবিতাগুলো কারো বিরক্তির কারণ হবে না। শেষ কবিতাটা স্কুল শেষ করে সবে মাত্র কলেজে উঠেছি এমন সময়ে লেখা।
১. প্যাঁচা বৃত্তান্ত
এটা প্যাঁচার দুর্ভাগ্য যে
তার চেহারাটা উপরওয়ালা
এমন গম্ভীর করে গড়েছেন,
তাই আনন্দ বল বেদনা বল
সব সময়ই তার মুখে এমন
নিরাসক্ত ভাব।
সৌভাগ্য যে তোমার মুখের গড়নটা
এমন নয়।
তাই সেখানে অনায়াসেই
ষড়ঋতুর খেলা চলে,
চৈত্রের খর রোদ কি হেমন্তের নবান্ন
অথবা পৌষের নরম সূর্য
এমন কি কালবৈশাখীর ঘনঘটা
অঝোর শ্রাবণ-
তাও দেখেছি কতবার দূর থেকে
তোমার মুখের গভীর ক্যানভাসে।
তবে তোমার অনুভূতিরা সব
হারিয়ে যায়
থেমে যায় অভিব্যাক্তির নাচন।
যখনই শুধু আমাকে দেখ
তুমি হয়ে যাও নিরাসক্ত এক হুতুম।
২৩/১১/২০০৯ রাত ১০টা ১৭মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
২. হাসির যোগ
আজকে তোমার হাসির যোগ
সুতরাং তুমি হাসবে
এটাই স্বাভাবিক।
আর সে হাসিতে মূহুর্মূহ পল্লবিত হবে
সংগীতের সব কটি রাগ,
মালকোষ কি ভৈরবী
পিলু অথবা বেহাগ
সবই আজ একাকার তোমার
উচ্চকিত হাসিতে।
অনেকেই যোগ দেবে তোমার মন কাড়া
এমন হাস্য কলায়,
চায়ের দোকানের আড্ডাবাজ ছেলেগুলো
থেকে শুরু করে পাশের বাড়ির
গোমরা মুখো লোকটা,
এমনকি রিক্সাওয়ালা, বাস ড্রাইভার
অথবা ট্রাফিক সার্জেন্ট..
যে পথ দিয়েই যাবে তুমি
কেউই বাদ যাবে না তোমার ছোঁয়াচে হাসির
প্রকোপ থেকে।
আর অতি অবশ্যই হাসব আমি,
হাসব আমার বরাবরের মতই
প্রাণ ভরা হাসিটা।
যদিও গতকালকে আমার হাসির যোগ ছিল,
তুমি কিন্তু একটুও হাসোনি।
৬/১১/২০০৯ রাত ১০টা ৫ মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
৩. হাসি
তোমার সাথে আমার হাসির সর্ম্পক।
বন্ধুদের আড্ডায় চায়ের টেবিলে
সরকার ও বিরোধী দল যখন মুখোমুখি
তখন আমার কোন এক কথায়
বড্ড হেসে উঠলে তুমি,
প্রশমন করলে উত্তেজনা।
যখন আমার মনের কোনে মেঘ জমে
সর্তক সংকেত জানায় রেডিও
আর সাহায্য কর্মীরা ব্যস্ত সবাই
আশ্রয় কেন্দ্রকে ঘিরে
ঠিক তখনই তুমি হেসে উঠলে,
যেন সূর্য উঠল ঝড়ের শেষে।
যখন আমার সুখের সময়
বিজয় নিশান আকাশে ওড়ে
সেনাপ্রধানরা সব কুর্নিশরত
পরাজিত যত শত্রু সেনা
তখন তোমার ডাগর চোখে
হাসির ঝিলিক উছলে ওঠে।
আমার যত কর্মকান্ডে
তোমার হাসি আছে মিশে
আবেগ বল দুঃখ বল
দ্রোহ বল আর বিদ্রোহে
প্রাপ্তি আর অপাপ্তি শেষে
অথবা নিছক গল্প কথায়
তোমার হাসি উচ্চকিত।
এমনকি যখন বললাম আমি
“তোমায় আমি ভালোবাসি”
তখনও তুমি উঠলে হেসে।
১০/৩/২০০৯ রাত ৭টা ৫০ মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
৪. চাঁদ ও তুমি
হঠাৎ করে মধ্যরাতে
যদি দৃষ্টি মেলেই পূর্ণিমা চোখে পড়ে
জানালার ফাঁক ফোকোর গলে
জানি না কেন,
তোমার কথা মনে পড়ে।
অথচ তোমার সাথে আমার
নেই কোন রাত্রীকালীন স্মৃতি,
চন্দ্রলোকে ভরা জোৎস্না মাখা
কোন আলিঙ্গনও নেই।
নেই সরু চাঁদের দিকে তাকিয়ে
আলো আঁধারীর ঘনিষ্টতায়
সুখকর কোন রাত্রী যাপন।
নিদেনপক্ষে দিনে দুপুরে
হঠাৎ করেই চাঁদকে নিয়ে
তোমার সাথে অযথা তর্ক,
না। তাও নেই।
অথচ এখন চাঁদ দেখলেই মনে হয়
কি এমন ক্ষতি হত
যদি অলস একঘেঁয়ে ঐ চাঁদটাকে ঘিরে
এক আধটা স্মৃতি থাকত
কেবল তোমাকে নিয়ে?
২৫/৪/২০০৯ রাত ১০টা ৪৫ মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
৫. কষ্ট
মাঘের শীতে
শহরের ফুটপাথে
নিঃস্ব কিশোরের লাশ দেখে
অট্টালিকার উষ্ণতায় ঘেরা
কিছু মানুষের বুক কেঁপে ওঠে।
প্রতিদিন টিভিতে একই সংবাদ
দেখে দেখে
রক্ত তাদের নেচে ওঠে।
কিছু একটা করবে বলে
দল বেঁধে সবাই মাঠে নামে,
নেচে গেয়ে আর মিটিং করে
দুঃস্থদের জন্যে তারা
কাঁড়ি কাঁড়ি রিলিফ আনে।
এমন কি
পরণের উষ্ণ কাপড়টাও
খুলে দেয় কেউ কেউ
ভর দুপুরের টাটকা রোদে।
তারপর সন্ধ্যা বেলায়
ক্লাবে বসে
নিজেদের মহানুভবতার নির্দশনে
নিজেরাই খুব মুগ্ধ হয়ে
বেশ তৃপ্তির একটা
ঢেকুর তোলে।
আমার বুকের কষ্টগুলো
দেখে দেখে
তোমারও বোধ হয় বুকের ভেতর
এমনই কোন কষ্ট জাগে।
ভাঙ্গা ঘরের
শীতের রাতের
ছেঁড়া কাঁথার কাতরতা
তোমার কখনও
জানাও হয় না।
১/২/২০০৮ রাত ১টা ৫৬ মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
৬. শত্রুতা নেই
খুব কি এমন ক্ষতি হয়ে যায়?
যদি একটু দাঁড়াও
কথা বলে যাও
পুরোনো দিনের মত।
না হয় আগের মত হৃদ্যতা নেই
তবুও তো পরিচিত জন
একটু কথা বলে যেও।
বলে যেও-
কোন অভিযোগ নেই
শত্রুতা নেই
স্মৃতিরা কেবলই মৃত।
১৮/৮/১৯৯৭ রাত ১টা ৪৮মিনিট
দিনাজপুর
৭. সনদ পত্র
ছোট্ট বেলায় গল্প শুনে
স্বপ্ন দেখেছিলে-
তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে
রাজপুত্র এক আসবে
তোমার ঘরে।
আদর দেবে
সোহাগ দেবে
বিনি সুতোর মালা দেবে;
সুয়ো রাণী হবে তুমি
রাজ রাজড়ার ঘরে।
কৈশোর গেল
যৌবন এলো
আরো এলাম আমি।
আদর দিলাম
সোহাগও দিলাম
বিনি সুতো পাইনি বলে
সুতোয় বাঁধা হারও দিলাম।
শুধু রাজ পুরুষের সনদটুকু
নেই বলে আজ
তোমায় পেয়েও বড্ড বেশী
একা হলাম।
৯/৮/২০০৮ রাত ১২টা ৩ মিনিট
মিরপুর, ঢাকা
৮. আজ বুধবার
সবাই এসেছে যার আসবার
আসছো না শুধু তুমি
আজ বুধবার, ভুলে গেছ নাকি?
ওপাড়ার হাজী করিম এসেছে
পাওনা নিয়েছে বুঝে।
বাচাল হাবিব কথা বলে বলে
ফিরে গেছে নিজ কাজে।
এসে গেছে দেখ দাঁড়কাকগুলো
ল্যাম্প পোস্টের তারে
সকাল হয়েছে
সূর্য উঠেছে
দশটা বেজেছে কবে।
আসছ না কেন? ভুলে গেছ নাকি
আমি আছি পথ চেয়ে?
২৩/৭/১৯৯৭ রাত ১১টা ২৫মিনিট
দিনাজপুর
৯. শাসন
এ শহরে এতো পথিক,
অথচ তুমিই কিনা জুটলে আমার কপালে।
আর কি আশ্চর্য! চিনতেও পারলে।
বুনো জানোয়ারের মত একদিন বলেছিলাম
“যদি বশ করতে পার, আমি তোমার,
একান্তই তোমার।
কাঁকন দিয়ে কিনে নেয়া ভৃত্য।”
জানোয়ার বশে ভীষণ আনাড়ী তুমি,
মমতা দিলে উজাড় করে
অথচ শাসন দিলে না এতটুকুও।
ইদানিং দল বেঁধে লুকিয়ে থাকি,
নিরীহ পথিকেরা দিয়ে যায়
নেশার পথ্য।
না চাইতেই তুমি দিয়ে দিলে
প্রয়োজনীয় মুদ্রাগুলো।
দুর্বৃত্ত বলে তোমার ঘৃনাও হল না এতটুকুও।
গারদ ঘেরা খুপড়ির ভয় ওদের
তাড়িয়ে নিয়ে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম তোমার
চলে যাওয়া।
এলোমেলো চুল, বিশৃংখল পা...
আমি বসে রইলাম পথের উপর।
৩০/৮/১৯৯৩
দিনাজপুর
১০. কয়েক ফোঁটা মুক্তো
প্রায় এক শতাব্দী পরে দেখা হল তোমার সাথে।
আংগুল তুলে দেখালাম আমার ভিখারী জীবনের
রোজনামচা-
যা তুমিই নির্ধারণ করে দিয়েছিলে
পরের ঘরে যাবার মুহূর্তে।
তোমার চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা মুক্তো ঝরে পড়ল,
আর কি আশ্চর্য!
তোমাকে আমি ক্ষমা করে দিলাম।
১২/৮/১৯৯২
দিনাজপুর
১১. ঘুড়ি ওড়ানো
পুতুল কিংবা রান্নাবাটি নয়
তোমার প্রিয় খেলা ছিল ঘুড়ি ওড়ানো,
দামাল ছেলেদের মত ঘুড়ি ওড়াতে তুমি।
অথচ দেখ ডাংগুলি কিংবা ঘুড়ি ওড়ানো
কোনটাই ঠিক আসত না আমার।
তাই নির্দ্বিধায় তোমার শিক্ষা নবীশ
হয়ে গেলাম একদিন।
ঘুড়ি উড়ে গেল আকাশে-
খোলা মাঠে আর খোলা আকাশে
কি এক নিবিড়তা এনে দিল মাঞ্জা
দেয়া ঐ চিকন সুতাটি
তা দেখে ভারী অবাক হলাম।
হাতে ধরে তুমি সব শেখালে আমায়,
কখন সুতায় টান দিতে হয়
আর কখন সুতায় ঢিল,
কি হলে ঘুড়ি গোত্তা মারে
তুমি তাও শিখালে আমাকে।
কি জানি কেন আমরা আরো শিখলাম
কাটাকাটি খেলা-
সুতোয় সুতো বাঁধিয়ে এ যেন এক
ব্যক্তিত্বের লড়াই,
একজন থেকে যাবে আকাশে
অন্যজনকে নেমে যেতে হবে
অপমানিত হয়ে।
১৯৯৪
দিনাজপুর
১২. ছিনতাই
দুহাত পেতে আমি তোমাকে ভিক্ষা চাইলাম,
অথচ তুমি দিলে তোমার সর্বস্ব। এবং
পরক্ষণেই ধিক্কার দিলে ছিনতাইকারী বলে।
অভিমানে আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম।
আদালতের শমন এল,
লুটের মাল ফেরত চাই, নয়ত দ্বীপান্তর।
বললাম, লুটের মাল ঐ দূর আকাশের নীলিমায়
ছড়িয়ে দিয়েছি,
অতএব, দ্বীপান্তরই সই।
১৭/৭/১৯৯২
দিনাজপুর
১৩. আজ যৌবন
ছেলেবেলায় আমার ঘুম ভাংত বাবার কন্ঠ শুনে।
কাক ডাকা ভোরে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন বাবা।
তার কন্ঠ ছিল উদাত্ত
কেমন যেন নেশা ধরানো।
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম তার উচ্চকিত কন্ঠ
আর চোখ বুজে অপেক্ষা করতাম
কখন এসে বাবা আমার মাথায় হাত বুলোবে,
বলবে,
‘ওঠ বাবা, ভোর হয়ে গেছে,
হাঁটতে যাবি না?’
ঘুম ঘুম চোখে, বাবার হাত ধরে ছোট ছোট পায়ে হাঁটতাম আমি।
কৈশোরে, আমি ছিলাম এপাড়ার সব চেয়ে দুরন্ত ছেলেটি।
সারাদিন হৈ হৈ করে পাড়া মাত করতাম
প্রচন্ড দুপুরে ওড়াতাম ঘুড়ি,
আর বাড়ি ফিরে মার বকা খেতাম।
আজ যৌবন।
জীবন এখনও হেঁটে যেতে হবে আরো অনেকটা,
অথচ, হৃদয় কেন এখনই বেদনা বিধুর?
নেশা আসক্ত?
সে কি তোমারই জন্যে?
২০/৫/১৯৯২
দিনাজপুর
১৪. নুতন কেউ
দেখা হল দুজনের বহুদিন পরে,
পিচ ঢালা এই কালো রাজপথে।
নিঃসঙ্গ দুপুরে সূর্যটা আকাশে,
ছড়াচ্ছে তাজা রোদ যেন দাপটের সাথে।
কথা হল না তেমন, শুধু হাঁটলাম দুজনে।
অতীতের কপাট ভেঙ্গে স্মৃতি
বেরিয়ে এসে নাচে হৃদয়কে ঘিরে
মন হারিয়ে যায় সীমা ছাড়া
অতীত আঁধারে।
সেদিনও ছিল তীব্র তাজা রোদ,
তুমি এসে বলেলে,“চল না হাঁটি।”
নগ্ন পায়ে হাঁটলাম দুজনে,
তপ্ত রাস্তা পোড়ালো পা
আর ভালোবাসা পোড়ালো হৃদয়।
তারপর কি হল? জানতে চেও না,
ঝলসানো হৃদয় থাকলো পড়ে
আর তুমি হারালে অজানায়।
“নুতন কেউ কি এসেছে জীবনে?”
জানতে চাইলে তুমি।
উত্তরে শুধু হাসলাম আমি
এতোদিন পর আজ
এ প্রশ্নের আছে কোন মানে?
মৃদু কন্ঠে বললাম তাই,
“আগে তুমিই বল না মেয়ে
তোমার জীবনে কি নুতন কেউ আসে নাই?”
১৯৯১
দিনাজপুর
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ বিকাল ৪:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



