আমি কিংবা আমরা কেউ কি কোনদিন ভেবেছিলাম যে, নবধ্বনি কখনো বন্ধ হয়ে যাবে, থেমে যাবে এর সব কোলাহল, কত পাঠক আর অপেক্ষায় থাকবেনা মাসের শুরুতে নতুন নবধ্বনি হাতে পাওয়ার জন্য, ডাক পিয়ন ছুটে আসবেনা আর এত এত চিঠি নিয়ে, মাসের শেষ সপ্তাহে দিন রাত ভুলে আর ব্যস্ত হব না প্র“ফ সংশোধনে, হিসাব তৈরীতে, মেক আপ গেটআপ আর কভার ডিজাইনের জন্য আকুতি করব না ডিজাইনার মহাজনদের কাছে। যা কখনো ভাবিনি, তাই হয়েছে আর যা যেমন ভেবেছিলাম তা হয়নি।
মাত্র পয়ত্রিশ টাকায় আমরা শুরু করেছিলাম এর সূচনা। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল শুরু হল। ২০০৭ সাল। বাংলাদেশ তখন উত্তপ্ত কিংবা আতঙ্কিত। ড. ইউনুস তখন রাজনীতিতে আসি আসি করছেন। দেশের পরিস্থিতি তখন মোড় নিচ্ছে ভিন্নদিকে। এমনই সময় আমাদের যাত্রা শুরু হল। এক সকালে ক্লাসের ফাঁকে নীলক্ষেত গিয়ে বিজ্ঞাপনের চিঠি তৈরী করে নিয়ে এলাম, খরচ হল আপাতত তখন পয়ত্রিশ টাকা। আমার সাথের কারো কোনো অভিজ্ঞতা ছিলনা, আমার ছিল ছিঁটেফোঁটা।
ফরিদাবাদে পড়ার সময় নিজে নিজে বের করতাম কিশোর কানন। ক্রেতা নেই, বিক্রেতা নেই, বিজ্ঞাপন নেই, বাহিনী নেই, এক আমি সব করতাম উত্তেজনার বশে। কিশোর কাননের প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় লিখে দিয়েছিলেন ফরিদপুরের মামুন। দৈনিক জনকণ্ঠের প্রিন্টার্স লাইন দেখে নিজের নাম একটু পাল্টে ঐভাবে বসিয়েছিলাম প্রথম পাতার নীচে। তখনো ট্রেসিং কিংবা ছাপাখানা চেনা হয়নি। ফটোকপিই ভরসা। জাবের ভাই ঢাকা আসার পর তাকে দেখালাম আমার করা কয়েকটি নিঃস্ব পত্রিকা। তিনি বন্ধু হিসেবে কিংবা উৎসাহের জন্য আমাকে তোয়াজ করা শুরু করলেন। শুরু হল, মাননীয় সম্পাদক লিখে চিঠি প্রাপ্তির পালা। হরদম লেখা পাঠাতেন তিনি। আমিও সোৎসাহে ছাপাতাম। কী যে এক সময় কাটিয়েছি, আজ মনে পড়লে হাসি পায়। ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি বইয়ের সাথে। কি ইরান, কি বাংলাদেশ, বই ছিল আমাদের বাসায় প্রয়োজনীয় উপকরণ। তাই বলে লেখালেখি কিংবা মানুষের লেখা কাটাকাটি করে ছাপাছাপি করব, চিঠি পাব, স্বপ্ন কিংবা কল্পনায়ও এ তরী ভিড়েনি আমার মনবন্দরে।
জাবের ভাইয়ের লেখা আর উৎসাহে আমি গরম হয়ে থাকতাম নতুৃন সংখ্যা ছাপাতে, ঝকঝকে সংখ্যা হাতে নিয়ে এবং বন্ধুদের হাতে তুলে দিয়ে ঠান্ডা হতাম। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, সাধু চলিত কিংবা ভাষারীতির ক খ আমি কিছুই জানতাম না। শূন্য থেকে এভাবেই শুরু হয়েছিল আমার। একসময় ভালো ভালো লেখা সংকলনের জন্য, তথ্য সংগ্রহের জন্য, লেখা সম্পাদনার জন্য আমি নানা জাতের বই পড়া শুরু করলাম। শুধূ কি তাই, সেটআপ মেকআপ সুন্দর করার জন্য দেশী বিদেশী ম্যাগাজিন সংগ্রহ শুরু হল পল্টনের ফুটপাত থেকে। নামে বেনামে আমার আর জাবের এর লেখা দিয়ে প্রকাশিত হল প্রথম সংখ্যাগুলো। আট দশ কিংবা বারো, এফোর সাইজের পৃষ্ঠার মাপে তৈরী হয়ে এভাবে চলল কয়েক সংখ্যা। তখনো কোনো স্টল কিংবা বিক্রয় প্রতিনিধি ছিলনা আমার। পঞ্চাশ কিংবা শ খানেক কপি তৈরী করে একে ওকে দিয়ে নিজেকে ভাবতাম, কিছু একটা করেছি। ষোলো পেরোনো এক তরুণের আর কতুটুকুই বা ভাব ভারিক্কি?!
এক রমযানে পরিচয় হলো উসামার সাথে। প্রস্তাব দিলাম আমার কিশোরকাননে যোগ দিতে। ভদ্রতার খাতিরে সায় দিয়ে একটু খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন উসামা ভাই। তার উৎসাহে আমি ছাপাখানায় ঢুঁ মারার সাহস পেলাম। ছুটি হলেই বাংলাবাজারের আশে পাশে অলিগলিতে চিপায় চাপায় কোন ছাপাখানা আছে, কোথায় কোন গলি ঘুপচিতে বাইন্ডিং খানা আছে, কে কত কম নিবে, ছাপার কত ধরণ আছে, এসব নিয়ে খুঁজে বেড়াতাম, প্রতিটি প্রহর তখন আমাকে এগিয়ে নিচ্ছিল এ জগতে। এই প্রথম মেকআপ হলো ইলোস্ট্রাটরে। তালতলার জাহিদ ভাই হয়তো মায়া করে সাজিয়ে দিলেন সূত্রাপুর থেকে ছুটে আসা এই কিশোরের কয়েকটি পাতা। কম্পোজ, প্র“ফ দেখা নিয়ে কতো দৌড়াদৌড়ি যে করেছি, নাকে দম নিয়ে বাসে উঠেছি, সেসব আজ মনে হলে আনমনা হয়ে যাই নিজের অজান্তে।
চরম উত্তেজনার বসে ২০০৫ সালের জানুয়ারী সংখ্যা ছাপাতে গিয়ে ২০০৪ লেখা ভুলে কভার পৃষ্ঠায় ডিজাইন হয়ে পজেটিভ ফিল্ম আকারে বের হয়ে ছাপাখানায় প্লেট তৈরী যখন সম্পন্ন, তখন মনে পড়ল আরে, এ কোন সর্বনাশ হতে যাচ্ছে মুদ্রিত প্রথম সংখ্যায়?! আবার ভোঁ দৌড় ছাপাখানায়, হাতে পায়ে ধরে এসিড দিয়ে ২০০৪ মুছে শুধু মাসের নামে কভার হলো জীবনের প্রথম মুদ্রিত সংখ্যায়।মাত্র পাঁচশ কপি ছেপেছিলাম। কালো কালিতে কভার ছাপানো এতগুলো কপি কীভাবে বিক্রি করবো ভেবে প্রথম দিন চিন্তিত ছিলাম, কিন্তু অতটুকু বিষন্নতা আমাকে দমাতে পারেনি। কারো কাছে হাত পাতিনি, ধার নেইনি, বাসা থেকে মাস খরচ হিসেবে যে টাকা পেতাম তা দিয়ে এত কাজ সারতাম। উসামার প্রেরণা জাবের এর উৎসাহ উদ্দীপনায় আমি উজ্জীবিত হতাম। কে কিনল, কে পড়ল, কে কী বলল, কত কপি বিক্রি হল, এসব নিয়ে মোটেও ভাবিনি কোনদিন। পতিকার লেখঅ যাতে তথ্য সমৃদ্ধ হয় এবং লেখার কোন অভাব যেন না থাকে সেজন্য ধীরে ধীরে জাবের সংগ্রহ করে আনল বিভিন্ন পেপার কাটিং, তথ্য কণিকা, পুরনো বইপত্রসহ আরও কত কি।
এক কালারের কভার এর পর এবার পা বাড়ালাম রঙীন ভুবনে। চার রঙা কভারের জন্য বিজ্ঞাপন খুঁজে নিয়ে এল উসামা। ফ্যান কোম্পানী আর চশমার দোকানের। এ সংখ্যাটি বেশ গোছালো হল এবং বেশ সাড়া পেলাম। একজনকে দিয়ে নারায়ণগঞ্জ পাঠালাম এবং সে প্রায় শ খানেক কপি বিক্রি করে এল। খুশীতে পুরো বিক্রয়মূল্য তাকে দিয়ে দিলাম। এ রঙীন সংখ্যাটির মাধ্যমে আপাতত ফরিদাবাদের পড়ালেখা শেষ হওয়া এবং পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হওয়ায় কিশোর কাননের যাত্রা থেমে গেল। তবে পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন, প্রতিনিধি ও আরও নতুন নতুন বিভাগ সাজিয়ে মনের ভেতর জল্পনা কল্পনা অবিরাম চলতে থাকল প্রায় এক বছর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


